নতুন প্রোফাইল রিয়াদ ভাই

দেবব্রত মুখোপাধ্যায়
ডিসেম্বর ৭, ২০১৬
মাহমুদউল্লাহ মাহমুদউল্লাহ

সংবাদ সম্মেলন শেষ হয়ে গেছে। খেলোয়াড়রা সবাই টিম বাস ধরার জন্য চলে গেছেন।

ফ্লাড লাইটের আলোয় কুয়াশা মোড়ানো নির্জন স্টেডিয়ামটাকে বিষন্ন বলে বোধ হচ্ছিলো। পাশে পাশে হাটতে হাটতে মজা করেই বললাম, ‘সারা জীবন লো প্রোফাইল টিম নিয়ে খেললেন। নিজে লো প্রোফাইল থাকতে চাইলেন। এবার আর পারলেন না। এখন আপনি হাই প্রোফাইল স্টার।’

একটু দাড়িয়ে পড়লেন। বিষ্ময় মেশানো হাসি হেসে বললেন, ‘আমি! আমি আবার হাই প্রোফাইল হলাম কবে?’

‘হয়েছেন। লোকে এখন আপনাকে বড় তারকা মনে করে। ভবিষ্যতের ক্যাপ্টেন।’

‘ক্যাপ্টেন তো পরের কথা। কিন্তু হাই প্রোফাইল হওয়ার কোনো ইচ্ছে আমার নেই। বিশ্বাস করেন, দাদা। আমি লো প্রোফাইলই থাকতে চাই। লো প্রোফাইল টিম, লো প্রোফাইল রিয়াদ; এই বেশ ভালো।’

তাই বললে কী হয়!

সময় যে আপনাকে ডাকছে রিয়াদ। হাতছানি দিয়ে ডেকে বলছে, রিয়াদ বের হয়ে আসো ওই লো প্রোফাইলের খোলস ছেড়ে। এবার তোমার সর্বার্থে হাই প্রোফাইল হয়ে ওঠার পালা। এবার আরেক ধাপ এগিয়ে যাওয়ার পালা। এবার রিয়াদের সুপার স্টার হয়ে ওঠার পালা।

রিয়াদ কখনোই সুপার স্টার হতে চান না। বহুবার এই আমাকে বলেছেন, সাইড ক্যারেক্টরই সবচেয়ে বেশী এনজয় করেন। ফোকাসের ঠিক মধ্যিখানে থাকাটা ভালো লাগে না। সবচেয়ে বড় কথা প্রোফাইলটাকে হাই-লো করে মাপতেই ইচ্ছে করে না।

কিন্তু রিয়াদ না চাইলেও তাকে আস্তে আস্তে ফোকাসের মাঝখানে চলে আসতে হচ্ছে। পরপর দুটো বিপিএলের ঝলক রিয়াদকে টেনে নিয়ে আসছে আলোচনায়, রিয়াদকে পার্শ্ব নায়ক থেকে নায়ক হিসেবে বরণ করে নিতে তৈরী বাংলাদেশের ক্রিকেট।

ঘরোয়া ক্রিকেটে রিয়াদের মেধা অনেক কাল ধরেই অতিমাত্রায় পরীক্ষিত। তিনবার ঢাকা প্রিমিয়ার লিগের শিরোপা জিতেছেন তিনটি ভিন্ন ভিন্ন দলের হয়ে। তিনবারই একেবারে লো প্রোফাইল দল নিয়ে খেলতে হয়েছে। বাজি মাত করেছেন ক্ষুরধার অধিনায়কত্ব আর ‘বিগার দ্যান’ টিম পারফরম্যান্স দিয়ে।

রিয়াদকে প্রথম আমরা নোটিশ করলাম গত বিপিএলে।

বরিশালের এরকমই খর্বশক্তির এক দল নিয়ে মাঠে নেমে ম্যাজিক দেখালেন; না ম্যাজিক বলাটা ঠিক হবে না। ম্যাজিক শব্দটার মধ্যে ঠিক এই বৈজ্ঞানিক শক্তি নেই। ফিল্ডিং নিয়ে কতো ধরণের পরীক্ষা করা যায়, টি-টোয়েন্টির মতো খেলায় টেস্টের চেয়ে আক্রমনাত্মক অধিনায়কত্ব করা যায় কিংবা বল হাতে স্রেফ ভেরিয়েশন দিয়ে বাজি জিতে যাওয়া যায়; এসব ব্যাপার ম্যাজিক বোঝাতে পারে না।

আবার এবার খুলনার হয়ে সেই কান্ড করলেন। ব্যাট হাতে তাদের সেরা খেলেয়াড়, বল হাতে সেরা ত্রাটা। খুলনা হয়ে উঠলো ‘রিয়াদ এবং যে কোনো এগারো জন’। রিয়াদ অবশ্য এই কথায় খুব আপত্তি করলেন, ‘আমি এভাবে কল্পনাও করি না। আমি পারফরম করতে পেরেছি, বাকীরা দারুন সাপোর্ট দিয়েছে বলে। দেখুন, হারলে তো সবাই বলে, দল খারাপ করেছে। তাহলে জিতলে আমার একার কৃতিত্ব কেনো হবে? ইটস আ টিম গেম।’

এই জবাবই বলে দেয়, রিয়াদ একটু অন্যরকম একজন।

এই অন্যরকম রিয়াদের গল্পটা বলতে গেলে আমার একটু ব্যক্তিগত স্মৃতিচারণ করতে ইচ্ছে করে।

আমেরিকান সেন্টারে একটা অনুষ্ঠান ছিলো।

অনুষ্ঠানটা ছিলো সেখানকার কিছু তরুনের সাথে রিয়াদের মতবিনিময় অনুষ্ঠান। সাংবাদিকদের কোনো ব্যাপার ছিলো না। তারপরও আমরা জনা কয়েক হাজির হয়েছিলাম। রিয়াদ লিডারশিপ আর পারফরম্যান্স নিয়ে বলতে গিয়ে বলছিলেন, ‘পারফরম্যান্স একটা কন্টিনিউয়াস ব্যাপার। আজ করেছি বলে কাল করবো না, হবে না। আপনি একদিন পারফরম করে, পরদিন না পারলে পেছনে বসে থাকা আমার ভাইয়েরাই আপনাকে সবার আগে ধরবেন।’

হাসতে হাসতে আমাদের কয়েক জন সাংবাদিককে দেখিয়ে দিলেন।

অনুষ্ঠান শেষ হয়ে গেলো। রিয়াদ আবার মঞ্চে উঠে মাইক্রোফোনটা চেয়ে নিলেন। বললেন, ‘আমার আগের কথায় হয়তো আপনারা সাংবাদিকদের সম্পর্কে একটু ভুল ম্যাসেজ পেলেন। ভাবলেন, ওনারা শুধু ভুলটাই ধরেন। দেখেন, আগে কখনো বলিনি, আজ বলি, আমাদের ক্রিকেটের ক্ষেত্রে অন্তত আমি এই মানুষগুলোকে টিমের পার্ট মনে করি। ওনারা ভুল ধরেন, আমরা সেটা কারেকশন করি। ওনারা আমাদের সম্পর্কে গল্প লেখেন, আপনারা জানতে পারেন। ওনারা না থাকলে আমাদের কথাই তো কেউ জানতো না।’

আমি অন্তত চোখের জল সামলাতে পারিনি। এমন করে কেউ আমাদের ছোট্ট পেশাদার স্বীকৃতি এর আগে দিয়েছে বলে মনে হয় না। সেদিন বুঝেছিলাম, এই লোকটা অনেক বড় হতে এসেছে। আমরা চিনতে পারিনি, কিন্তু মহাতারকাই হতে এসেছেন রিয়াদ।  

এক ফুটবল ভক্ত বলছিলেন—রিয়াদ আমাদের সার্জিও বুসকেটস। আবার একজন—না, সে আমাদের জ্যাভিয়ের মাশ্চেরানো। শেষ পর্যন্ত একটা ব্যাপার সত্যি যে, এমন চরিত্র ক্রিকেটে খুঁজে পাওয়া মুশকিল। ম্যাশেরানো হোক আর বুসকেটস; ফুটবলেরই দ্বারস্থ হবে। আমাদের স্বীকার করতে হবে যে, তিনি ফুটবলের ওই ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডারদের মতোই এক আনসাং হিরো।

সুযোগ পেলেই ইদানিং রিয়াদকে মনে করিয়ে দেই, আর আড়ালে থাকার উপায় নেই। এবার আলোর সামনে আসতে হবে।

যে বাস্তবতা আমরা খুব একটা আলাপ করতে চাই না, সেই বাস্তবতা কাছাকাছি চলে এসেছে-মাশরাফি আর খুব বেশী দিন ক্রিকেটে নেই। এখন আমাদের আরেক যুগে প্রবেশের প্রস্তুতি গ্রহণ করার সময় চলে এসেছে।

ক্রিকেট সমর্থক হিসেবে আমরা অতি মাত্রায় ভাগ্যবান। যখন এক মহাশূন্যতা তৈরী হতে পারতো, সেই সময়েই পূর্ণ বিকশিত এক অধিনায়ক; মাঠে ও মাঠের বাইরে নেতা হিসেবে নিজেকে দাড় করাতে চলেছেন রিয়াদ।

অধিনায়কত্বের স্বপ্ন নিয়ে কখনোই লুকোচুরি করেন না।

কালও কুয়াশা ভেদ করে হাটতে হাটতে বলছিলেন, ‘এই স্বপ্ন না দেখার তো কারণ নেই। নিশ্চয়ই সুযোগ এলে জাতীয় দলে অধিনায়কত্ব করবো। তবে লো প্রোফাইল অধিনায়ক হবো নিশ্চয়ই। হা হা হা...’

রিয়াদ বুঝতেও পারছেন না মনে হয়, প্রোফাইলটা তার এই হাসির মতো করেই বড় হয়ে যাচ্ছে। আর লো প্রোফাইল নয়।  

Category : ফিচার
Share this post