কমেডি অব এররস: বিপিএল আম্পায়ারিং

রিমন ইসলাম
ডিসেম্বর ৭, ২০১৬
প্রতীকি ছবি প্রতীকি ছবি

বছরখানেক আগে বলিউড তারকা অক্ষয় কুমারের 'এন্টারটেইনমেন্ট' নামক একটি কমেডি ফিল্ম এসেছিল।

সেখানে দেখা যায় তিনি পার্টটাইম জব হিসেবে বেশকিছু কাজ করেন। তারই একটি হল পাড়া মহল্লার খেলায় আম্পায়ারের দায়িত্ব পালন করা। সেখানে একটি দৃশ্যে দেখা যায় তিনি ম্যাচের প্রথম বলেই লেগ বিফোর আউট দিয়ে দেন যেখানে বলটি সোজা গিয়ে ব্যাটে লেগেছিল, প্যাডে একেবারেই লাগেনি। কিন্তু বোলার আর ফিল্ডারদের আবেদনে আম্পায়ার অক্ষয় কুমার আউট দিয়ে দেন! ক্ষুদ্ধ ব্যাটসম্যান তাকে বকতে বকতে মাঠ ছেড়ে যান। অপরপ্রান্তের ব্যাটসম্যান প্রতিবাদ করলে তাকেও আউট দেয়ার হুমকি দেয়া হয়। তারপর এভাবেই একটার পর একটা আউট দিতেই থাকেন অক্ষয়। এমনকি ক্যাচ ধরে সেটি মাটিতে ফেলে আবার ধরে আবেদন করলে তাতেও আউট দিয়ে দিয়েছেন! ম্যাচ শেষে অবশ্য ক্ষুদ্ধ ব্যাটসম্যানরা তার অর্ধেক সম্মানী নিয়ে যায়!

ওপরের ঘটনাটি নিতান্তই কাল্পনিক এবং শুধুমাত্র হাস্যরসের জন্যই দেখানো হয়েছিল। কিন্তু বিপিএলের চলতি আসরের আম্পায়ারিং দেখে যে কারোরই মনে হতে পারে তাদের প্রিয় ফিল্মের তালিকায় এই ফিল্মটিও আছে। এটা ছাড়া পুরো টুর্নামেন্ট জুড়েই আম্পায়ারদের হাস্যকর এবং অবিশ্বাস্য সব ভুল সিদ্ধান্তের আর তো কোন যৌক্তিকতা খুঁজে পাওয়া সম্ভব না।

শুধু দেশী আম্পায়াররাই নন। সাথে আছেন বিদেশী (পাকিস্তানি) আম্পায়াররাও। সেই গ্রুপ পর্ব থেকেই মোটামুটি একটি রেওয়াজ চালু হয়ে গিয়েছিল যে বোলার এবং ফিল্ডাররা যত বেশি আবেদন করবেন, আউটের সম্ভাবনা ততই বেশি। এরই ধারাবাহিতায় বেশকিছু লেগ বিফোর আউট দেখা গেছে যা প্রথমে ব্যাটে লেগে তারপর প্যাডে লেগেছে। সেটাও এতটাই পরিষ্কার যে টিভির পর্দায় খেলা দেখা দর্শকরাও বলে দিতে পারবেন বলটা ব্যাটে লেগে তারপর প্যাডে আঘাত হেনেছে। কিন্তু কিসের কি! বোলার এবং উইকেটরক্ষকের টানা আবেদনে আম্পায়াররা নির্দ্বিধায় আঙুল তুলে দিচ্ছেন। ভাবটা এমন খালি চোখে যাই দেখা যাক না কেন, বোলার কিংবা অন্যরা তো ভুল আবেদন করতে পারেন না। সুতরাং আউট!

তবে সবচেয়ে অবিশাস্য ঘটনাটির জম্ন দিয়েছেন পাকিস্তানি আম্পায়ার খালিদ মাহমুদ। বরিশাল বুলসের বিপক্ষে ম্যাচে রাজশাহী কিংসের ব্যাটসম্যান উমর আকমলকে তিনি লেগ বিফোর আউট দেন। অথচ বোলার কিংবা উইকেটরক্ষক কেউই নুন্যতম আবেদন করেননি। একটি আন্তর্জাতিক ম্যাচ পরিচালনা করা আম্পায়ার এভাবে আউট দেয়ার বেসিকটাও জানবেন না! কোন ব্যাটসম্যানের পক্ষেই এরকমভাবে আউট হওয়াটা সহনীয় নয়। কিন্তু উমর আকমলের প্রতিক্রিয়া জানানোর তো কোন পথই ছিলনা। ডিআরএস পদ্ধতি নেই যে রিভিউ করবেন, আবার আম্পায়ারকে কিছু বলাও যাবেনা। তাতে আউট তো বহাল থাকবেই, মরার ওপর খরার ঘাঁ হয়ে আসবে ম্যাচ ফি'র একাংশ জরিমানা এবং সাথে নতুন নিয়মে যোগ হবে ডি মেরিটস পয়েন্টও! তাই চোখেমুখে একরাশ বিস্ময় নিয়েই মাঠ ত্যাগ করলেন উমর আকমল। তার মতই একই দশা অন্যদেরও। বিস্মিত ব্যাটসম্যানরা কখনো উইকেট ছাড়তে চাননি, কখনো হেসে দিয়েছেন কিংবা মাথা ঝাঁকিয়ে প্রতিবাদ জানিয়েছেন ভুল সিদ্ধান্তের।

লেগ বিফোর ছেড়ে এবার আসা যাক ক্যাচ আউটের সিদ্ধান্তে। রংপুর রাইডার্স বনাম রাজশাহী কিংসের ম্যাচে শহিদ আফ্রিদির একটি বল সাব্বির রহমানের ব্যাটে এবং প্যাডে লেগে হাওয়ায় ভেসে ওঠে। ডানদিকে ঝাঁপিয়ে পড়ে বলটিকে তালুবন্দী করেন আফ্রিদি। নিশ্চিত আউট জেনেও তিনি আবেদন করেন। তার সাথে যোগ দেন অন্যরাও। কিন্তু আম্পায়ার একেবারে নিশ্চুপ। আফ্রিদি পুরোপুরি নিশ্চিত ছিলেন এটি আউট, তাই তিনি আবেদন চালিয়েই যান। একপর্যায়ে তাকে দেখা যায় হাত নেড়ে আম্পায়ারকে সিদ্ধান্তটিকে টিভি আম্পায়ারের কাছে যাচাইয়ের জন্য ইশারা করতে।

এরপরই যেন টনক নড়ে মূল আম্পায়ারের। সহযোগী লেগ আম্পায়ারের সাথে কথা বলে তিনি টিভি আম্পায়ারের শরণাপন্ন হন। সাথে সাথেই আফ্রিদি উল্লাস শুরু করে দেন, কারন তিনি জানতেন এবার আউটের ঘোষনা আসবেই। এবং হলোও তাই। পরিষ্কার দেখা গেল বলটি ব্যাটে লেগেছে এবং মাটিতে স্পর্শ করার আগেই আফ্রিদি ক্যাচটি নিয়েছেন। ফলাফল আউট। এরকম একটা আবেদনের প্রেক্ষিতে মূল আম্পায়ারের তো প্রথমেই টিভি আম্পায়ারের দ্বারস্থ হওয়ার কথা। খেলোয়াড়দের কেন তা অনুরোধ করে বলতে হবে!

এতো গেল মূল আম্পায়ারদের কথা। লেগ আম্পায়াররাও কিন্তু কম যাননা। গতকাল চায়ের দোকানে বসে খেলা দেখছিলাম। চিটাগাং কিংসের ব্যাটসম্যান মোহাম্মাদ নবী ক্রিজ থেকে প্রায় দেড় হাত বাইরে থাকা অবস্থায় রাজশাহী কিংসের উইকেটরক্ষক সোহান উইকেট ভেঙে দেন। সেই দূর থেকেই আমরা দেখলাম এটি আউট। কিন্তু লেগ আম্পায়ার সেটিকেও পাঠিয়ে দিলেন টিভি আম্পারারের কাছে! চা-ওয়ালা রেগে প্রশ্ন তুললো, "হেতেরা কি চোক্ষে কিছু দেহেনা নাকি টিনের চশমা পিন্দা খেলে দেহে!"

নাহ, আমি শ্রদ্ধেয় আম্পায়ারদের প্রতি এতটা অসম্মান দেখাতে চাইনা। কিন্তু যেগুলো একেবারে নিশ্চিত আউট, সেগুলোও কেন বারবার টিভি আম্পায়ারের কাছে পাঠানো হবে! এতে অনর্থক ম্যাচের সময় নষ্ট হয়। পাশাপাশি এমনটা দেখাও বিব্রতকর একদিকে জায়ান্ট স্ক্রিনে ভাসছে “Decision Pending”, অন্যদিকে ফিল্ডিং দল উইকেট পতনের উদযাপন শেষ করে পানীয় পান করছেন এবং ব্যাটসম্যানও প্রায় ডাগআউটের কাছাকাছি পোঁছে গেছেন। কারন দুই পক্ষই জানেন এটা নিশ্চিত আউট। কিন্তু লেগ আম্পায়ারের মনে যে তখনো সংশয়!

খেলোয়াড়দের বিসিবির নিয়ম ভঙ্গ করা, ফলস্বরুপ বড় অংকের জরিমানা ভোগ করা, ফ্র্যাঞ্চাইজিদের নানান অনিয়ম, কোন দলের বিরুদ্ধে সুবিধা আদায়ে ইচ্ছা করে ম্যাচ ছেড়ে দেয়ার অভিযাগ ইত্যাদি নানান ইস্যুতে পুরো আসর জুড়েই আলোচিত সমালোচিত বিপিএলের চতুর্থ আসর। তবে ভুতুড়ে আম্পায়ারিংয়ের জন্যও অনেক দিন স্বরনীয় হয়ে থাকবে এবারের বিপিএল, অন্তত ভুক্তভোগী ব্যাটসম্যানদের কাছে হলেও।

 

Category : ফিচার
Share this post