দেশের ক্রিকেট অগ্রযাত্রার প্রথম কাণ্ডারী

উদয় সিনা
নভেম্বর ১, ২০১৬
  আসলে ক্রিকেটটা তাঁর রক্তের সাথে মিশে আছে।  আসলে ক্রিকেটটা তাঁর রক্তের সাথে মিশে আছে।

একটি দলের মেরুদণ্ড হলেন দলের অধিনায়ক। সেটা ক্রিকেট-ফুটবল বা অন্য যেকোনো খেলার ক্ষেত্রে সত্য। তেমনি যুগ যুগ ধরে বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের মেরুদণ্ড হিসেবে কাজ করেছেন অনেক অধিনায়ক।

যুগ যুগ ধরে বহু অধিনায়কের হাত ধরে সামনে এগিয়ে গেছে বাংলাদেশ ক্রিকেট। আকরাম খান থেকে শুরু করে নাইমুর রহমান দুর্জয়, আমিনুল ইসলাম বুলবুল, খালেদ মাহমুদ সুজন, খালেদ মাসুদ পাইলট, হাবিবুল বাশার সুমন, মোহাম্মদ আশরাফুল, সাকিব আল হাসান - সবাই বাংলাদেশ দলকে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন। বর্তমানে যে দায়িত্ব পালন করছেন মাশরাফি বিন মুর্তজা ও মুশফিকুর রহিম।

বাংলাদেশ দল এদের আগেও অনেক অধিনায়কের নেতৃত্বাধীন ছিল। রকিবুল হাসান যেমন দলকে নেতৃত্ব দিয়েছেন সত্তর দশকের দিকে। কিন্তু বাংলাদেশ দল প্রথম যার হাত ধরে যাত্রা শুরু করে তিনি হলেন জনাব শামিম কবির। অনেকে হয়ত এই প্রথম শুনছেন তাঁর নাম। তিনিই ছিলেন বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসের সর্বপ্রথম অধিনায়ক।

শামিম কবির যিনি আনোয়ারুল কবির শামিম নামেও পরিচিত, জন্মগ্রহণ করেন নরসিংদী জেলার ঘোড়াশালের মিয়াপাড়ার এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে। পিতা আবু ইউসুফ লুৎফর কবির ও মা সুফিয়া খাতুনের চার ছেলে দুই মেয়ের মধ্যে তিনিই ছিলেন সবচেয়ে কনিষ্ঠ। মিয়াবাড়ির সেই কনিষ্ঠ ছেলেটি পড়ালেখার জন্য বেশিরভাগ সময়ই অবস্থান করত ঢাকায়। সেখান থেকেই মূলত ক্রিকেটে প্রবেশ তাঁর।

খেলোয়াড়ি জীবনে শামিম কবির একজন ওপেনিং ব্যাটসম্যান হিসেবেই পরিচিত ছিলেন। সেইসাথে মাঝেমাঝে উইকেটের পিছনেও গ্লাভস হাতে দায়িত্ব পালন করতেন তিনি।

১৯৬১ সালে ফার্স্ট ক্লাস ক্রিকেটে অভিষিক্ত হওয়া শামিম কবির বাংলাদেশকে প্রথম আন্তর্জাতিক ম্যাচে নেতৃত্ব দেন ১৯৭৭ সালে। ইংরেজি বর্ষ ১৯৭৭ এ পা দেবার ঠিক চার দিন আগে বাংলাদেশের বিপক্ষে খেলতে টেড ক্লার্কের নেতৃত্বে ঢাকায় পা রাখে মেরিলিবোন ক্রিকেট ক্লাব (এমসিসি)। ১৯৭৭ এর ৭ জানুয়ারি শামিম কবিরের নেতৃত্বে প্রথম আন্তর্জাতিক ম্যাচ হিসেবে ৩ দিনের টেস্ট খেলতে মাঠে নামে বাংলাদেশ।

ম্যাচটি অনুষ্ঠিত হয়েছিল তৎকালিন ঢাকা স্টেডিয়ামে যেটা বর্তমানে বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়াম হিসেবে পরিচিত। সেদিন টস জিতে প্রথম ব্যাটিংয়ের সিদ্ধান্ত নেন অধিনায়ক শামিম কবির। ব্যাট হাতে প্রথম ইনিংসে তিনি করেন ৩০ রান যা ছিল সেই ইনিংসে ব্যক্তিগত তৃতীয় সর্বোচ্চ। আর দ্বিতীয় ইনিংসে ব্যক্তিগত দ্বিতীয় সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহক হিসেবে করেন ২৫ রান। তিন দিনের টেস্ট ম্যাচটি শেষ পর্যন্ত ড্র‍য়ের মাধ্যমে নিষ্পত্তি হয়েছিল।

আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে প্রবেশের আগে শামিম কবিরের প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে অভিষেক হয় ষোল বছর বয়সে। ইস্ট পাকিস্তানের জার্সি গায়ে অভিষেক হয় তাঁর। ক্রিকেট ক্যারিয়ারের ব্যক্তিগত প্রথম অর্ধশতক পেতে তাকে অপেক্ষা করতে হয় তিন বছর। ১৯৬৪ সালের ডিসেম্বরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হয়ে খেলা ৬৪ রানের ইনিংসটি ছিল তাঁর ক্যারিয়ারের প্রথম হাফ সেঞ্চুরি।

সেই মৌসুমে ব্যাট হাতে ভাল ছন্দে ছিলেন তিনি। ১৯৬৫ এর মার্চে ঢাকার বিপক্ষে ৫৫ রানের একটি ইনিংস রয়েছে তাঁর। তাঁর ব্যক্তিগত সর্বোচ্চ রান ছিল ৮৯ যেটা এসেছে ১৯৬৮ সালের জানুয়ারিতে। ঢাকা স্টেডিয়ামে ইস্ট পাকিস্তানের হয়ে ইস্ট পাকিস্তান রেলওয়ের বিপক্ষে প্রথম ইনিংসে তিনি তাঁর ব্যক্তিগত সর্বোচ্চ রানের ইনিংসটি খেলেন।

সবমিলিয়ে প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে মোট ১৫ ম্যাচে ১৭.৮৬ গড়ে শামিম কবিরের সংগ্রহ ৪৪১ রান। তিনি ব্যাটসম্যানের পাশাপাশি পার্ট টাইম উইকেট কিপিংও করতেন। ঢাকার ক্লাব ক্রিকেটে আজাদ বয়েজ ক্লাবের হয়েই তিনি সবচেয়ে বেশি ম্যাচ খেলেছেন।

শামিম কবির আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে বিদায় নেন ১৯৭৬-৭৭ মৌসুমে। অবসরের পর তিনি ক্রিকেট ব্যবস্থাপনার সাথে জড়িয়ে যান এবং উঠতি বাংলাদেশ ক্রিকেটের উন্নতিতে অবদান রাখতে শুরু করেন। ১৯৮২ ও ১৯৮৬ সালের আইসিসি ট্রফিতে বাংলাদেশ দলের ম্যানেজার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন তিনি।

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধেও ভূমিকা রেখেছেন শামিম কাবির। লন্ডনে বাংলাদেশ মিশনে জাস্টিস আবু সাইদ চৌধুরীর সেক্রেটারি হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন তিনি।

বর্তমানে তাঁর বয়স ৭১। এই বয়সেও পারলে তিনি এখন ব্যাট হাতে মাঠে নেমে যেতে চান। আসলে ক্রিকেটটা তাঁর রক্তের সাথে মিশে আছে। এটা হওয়াটাই তো স্বাভাবিক। দেশের প্রথম অধিনায়ক বলে কথা!

Category : ফিচার
Share this post