সংগ্রাম, অত:পর উত্থানের গল্প

ইকরাম উদ্দীন সুজন
নভেম্বর ২৯, ২০১৭
 কাভানির সংগ্রামের গল্প কাভানির সংগ্রামের গল্প

আগস্টে পিএসজিতে আসেন নেইমার, মেসির তথাকথিত ছায়া থেকে বের হবেন বলে। সবচেয়ে দামি ফুটবলার খুব সহজেই স্যাটেল হয়ে যান প্যারিসে। তার পথ ধরে আসেন উঠতি তারকা এমবাপ্পে। কাভানি-নেইমার-এমবাপ্পে - এই তিনে মিলে তৈরি করেছেন ইউরোপের সবচেয়ে লিথ্যাল এটাকিং ট্রাইও।

অবশ্য, নেইমার বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই কেড়ে নেন লাইমলাইটের সব আলো; আর উদীয়মান এমবাপ্পে তার মত করেই হচ্ছেন হেডলাইন । আর এদের পরে সুযোগ থাকলেই কেবল মিডিয়া ও দর্শকমহলে আলোচিত হন কাভানি । অবশ্য তার এই সংগ্রাম নতুন না। এই পিএসজিতেই প্রথম তিন সিজনে ইব্রাহিমোভিচকে নিজের জায়গা ছেড়ে দিয়ে খেলতে বাধ্য হয়েছে রাইট উইংয়ে।

এমনকি নিজের জাতীয় দল উরুগুয়েতেও সুয়ারেজের জন্য প্রায় সময় ভিন্ন পজিশনে খেলেছেন, সুয়ারেজের আগে ছিল ফোরলান। দলে আরো বড় তারকা থাকায় ওয়ার্ল্ড ক্লাস স্ট্রাইকার হিসেবে প্রায় সময়ই তার সঠিন মুল্যায়নটা পাননি সেভাবে। দেখতে দেখতে বয়সও ত্রিশ পার হয়ে গেছে, আর কি সুযোগ হবে তার নিজের জেনারেশনের সেরাদের তালিকায় আসার?

বিশ্বমঞ্চে উরুগুয়ের প্রথম প্রতিনিধিত্ব করেন ২০০৭ যুব বিশ্বকাপে। সেবারই দক্ষিণ আমেরিকান যুব চ্যাম্পিয়নশিপে ৭ গোল করে হয়েছিলেন টুর্নামেন্টের সর্বোচ্চ গোলদাতা যেটা এসি মিলান আর জুভেন্টাসের মত দলগুলোকে আকৃষ্ট করে। কিন্তু তাদের কোন কিছু করার সুযোগ না দিয়েই আরেক সিরি আ ক্লাব পালের্মোর প্রেসিডেন্ট মাওরিজিও জাম্পারিনি কাভানিকে ৪.৫ মিলিয়ন ইউরোতে কেনার কথা ঘোষনা করেন।

পালের্মোর হয়ে অভিষেক হয় ২০০৭ সালের মার্চে। ফিওরেন্তিনার সাথে ম্যাচটাই দল পিছিয়ে ছিল ০-১ গোলে।  ৫৫ মিনিটে নেমে করেন ফন বাস্তেন এর ১৯৮৮ ইউরোতে করা গোলের মতই একটা গোল।  ডিবক্সের বাইরে থেকে ডান পায়ের দুর্দান্ত ভলি, মাথা নষ্ট করা গোল। পরের মৌসুমের (২০০৭-০৮) শুরুতে প্রথম একাদশে খেলার জন্য সংগ্রাম করতে হয়,  কিন্তু পালের্মোতে তার তৃতীয় মৌসুম শুরু হওয়ার আগে পালের্মোর মেইন স্ট্রাইকার আমাওরি জুভেন্টাসে যোগ দেয়ার পর দলে জায়গা পোক্ত হয় কাভানির। ২০০৮-০৯ সিরি আ মৌসুম শেষ করেন ৩৫ ম্যাচে ১৪ গোল করে। তবে শুধু গোলসংখ্যা দিয়ে আসল চিত্রটা বোঝা যাবেনা।

ওই মৌসুমে রোমা আর এসি মিলানের সাথে জয় এসেছিল তার গোলে, আর মোরিনহোর ইন্টারের বিপক্ষে সান সিরোতেই তার ক্লিনিক্যাল ফিনিশিংয়ে ম্যাচ শেষ হয় ২-২ এ। পরের মৌসুমে, অর্থাৎ ২০০৯-১০ এ, আরো দুর্দান্ত ছিলেন কাভানি, বিশেষ করে বড় ম্যাচগুলোতে। ওইবার মোট গোল ছিল ১৫। ন্যাপোলি, লাজ্জিও, জুভেন্টাস এবং ইন্টারের বিপক্ষে গোল করেন। ন্যাপলস এর ক্লাব এর চোখ এড়ায়নি ব্যাপারটা।

পরের মৌসুমের জন্য ৫ মিলিয়ন ইউরো লোন ফি দিয়ে কাভানিকে দলভুক্ত করে নেয় ন্যাপোলি, চুক্তিতে অতিরিক্ত ১২ মিলিয়ন দিয়ে একেবারে কিনে ফেলার অপশনও ছিল। তবে পালের্মোর সাথে ওই মৌসুমের শেষের দিকে স্বদেশী আবেল হার্নান্দেজের কাছে জায়গা হারান। কিন্তু সেটা তার বিশ্বকাপ দলে জায়গা করে নিতে বাধা হয়ে দাড়ায়নি। ২০১০ বিশ্বকাপে নিয়মিত প্রথম একাদশে ছিলেন।

উরুগুয়ের অবিশ্বাস্য সেমিফাইনাল যাত্রায় অবশ্য ফোরলান আর সুয়ারেজই ডমিনেট করে উরুগুয়ে ফ্রন্টলাইন, তাই তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচে জার্মানীর সাথে এক গোল নিয়েই সন্তুষ্ট থাকতে হয় কাভানিকে।

বিশ্বকাপ শেষে ফিরেন ক্লাব ফুটবলে। ন্যাপোলির সাথে প্রথম সিজন শুরু করেন দারুণভাবে। উইন্টার ব্রেকের আগেই করেন ১৭ গোল যেটা ইতিমধ্যেই তার আগের সিরি আ রেকর্ড অতিক্রম করে ফেলে। সেবার কাভানির নেতৃত্বে ন্যাপোলি সিরি আ তে তৃতীয় হয়ে মৌসুম শেষ করে চ্যাম্পিয়নস লিগে জায়গা করে নেয়।

মৌসুমের দ্বিতীয় ভাগে কাভানি ছিলেন ডিসাইসিভ। লাজ্জিও ও জুভেন্টাসের বিপক্ষে করেন হ্যাটট্রিক, রোমার সাথে করেন দুই গোল। এই বিদ্ধংসি ফর্ম নিয়েই খেলতে যান কোপা আমেরিকাতে। কাভানি, ফোরলান আর সুয়ারেজ নিয়ে গড়া আক্রমনভাগ উরুগুয়েকে ১৯৯৫ এর পর কোন শিরোপা জয়ের স্বপ্ন দেখায়।

কোপাতে কাভানি রাইটেই খেলে, ফোরলান মাঝখানে আর সুয়ারেজ বামে। টুর্নামেন্ট চলাকালীন আবার ইঞ্জুরিতে পড়েন ফলে ফাইনালের আগের নকাউট ম্যাচগুলো খেলেননি। ফাইনালে ৬৩ মিনিটে মাঠে নামেন, ওই ম্যাচে উরুগুয়ে ৩-০ গোলে হারায় প্যারাগুয়েকে। সেই সাথে নিজের দেশের রেকর্ড পঞ্চদশ কোপা আমেরিকা শিরোপা জিতে নেন। সেবারও তার অবদান সামান্যই ছিল ইনজুরির জন্য কিন্তু ইতালিতে ফিরে আবারো নিজের জাত চেনাতে মুখিয়ে ছিলেন।

আগের মৌসুমে লিগে করেছিলেন ২৬ গোল। কিন্তু কাভানির আরো গুরুত্বপূর্ণ ইম্প্যাক্ট আসে পরের মৌসুমে। দ্বিতীয় মৌসুমে (২০১১-১২) লিগে ২৩ গোলের পাশাপাশি চ্যাম্পিয়ন্স লিগের নকাউট রাউন্ডে নিয়ে যান দলকে। এই পথে ম্যানসিটির বিপক্ষে দুই লেগ মিলিয়ে করেন তিন গোল যেটা পরের রাউন্ডে যাওয়ার জন্য অপরিহার্য ছিল। দ্বিতীয় রাউন্ডে চেলসিকে হোম ম্যাচে ৩-১ গোলে হারানোর পথে করেন এক গোল।

দুর্ভাগ্যবশত ফিরতি লেগে নতুন ম্যানেজারে অনুপ্রাণিত চেলসির কাছে নাটকীয় ম্যাচে ৪-১ এ হেরে বিদায় নেয় ন্যাপোলি। চেলসি পরবর্তিতে চ্যাম্পিয়ন হয়। তবে ন্যাপোলি থেকে থাকেনি, সাফল্য আসে সিজনের শেষে। কোপা ইতালিয়ার ফাইনালে জুভেন্টাসকে ২-০ গোলে হারানোর পথে কাভানি করেন এক গোল। সেই সাথে দিয়েগো ম্যারাডোনা যুগের পর প্রথম কোন শিরোপার স্বাদ পায় ন্যাপোলি। কাভানি করেন পাঁচ গোল। তার হাত ধরে প্রায় দুই যুগ পর ন্যাপলস শহরে চলে রাতভর আনন্দ উতসব। আর ওখানেই হয়ত কাভানি ঢুকে যান ন্যাপোলির ইতিহাসে।

এরই মধ্যে ইউরোপের বড় ক্লাবগুলোর চাপ শুরু হয়ে যায়। কিন্তু কোনভাবে আরো এক সিজন কাভানিকে ধরে রাখে ন্যাপোলি। ২০১২/১৩ তে নিজেকে আরো উচ্চতায় নিয়ে যান। লিগে ২৯ গোলের পাশাপাশি সব প্রতিযোগীতা মিলিয়ে করেন ৩৮ গোল। সিরি আর সর্বোচ্চ গোলদাতা হন আর সেবার ন্যাপোলিকে লিগে দুই নম্বরে রেখে সিজন শেষে প্যারিসের ক্লাবে যোগ দেন। কিন্তু সেখানে পুরনো ভূত চাপে আবার।

উরুগুয়ে আর পালের্মোর মতোই পিএসজি তে ইব্রাহিমোভিচের ছায়ায় থাকতে হয় তাকে। সুইডিশ তারকাকে জায়গা ছেড়ে দিলেও পরবর্তী তিন মৌসুমে উইংয়ে খেলেই ১৪৭ ম্যাচে ৮১ বার বলকে জালে জড়ান উরুগুয়েইন স্ট্রাইকার। আর যখনি ইব্রাহিমোভিচ ম্যানিউতে যোগ দেন - কাভানি তার জাত চেনাতে সময় নিলেন না।

কাভানির ইউরোপে এই প্রথম সত্যিকারভাবে আধিপত্য তৈরি করেন। ২০১৩ থেকে ২০১৬ পর্যন্ত টানা তিন মৌসুম ইব্রা নামের বটবৃক্ষের ছায়ায় না থাকলে তার গোল সংখ্যা কেমন হতো তা বলা মুশকিল তবে অসংখ্য গোল মিস করার জন্য সমালোচিত হয়েও ২০১৬-১৭ মৌসুমে সব মিলিয়ে ৪৭ গোল করেন। শুধুমাত্র মেসির গোলসংখ্যাই ছিল তার চেয়ে বেশি। অবশেষে হয়ত উনত্রিশে এসে কাভানি দলের ‘মেইন ম্যান’ হতে পেরেছেন।

কিন্তু সেই সুখ আর বেশিদিন থাকলো কই। ইউরোপে সাফল্য পেতে উদগ্রীব পিএসজি বার্সেলোনার সাথে ৬-১ গোলে হারের পর ওই ম্যাচের মূল ঘাতককেই নিয়ে আসে দলে। আর নেইমারের রেকর্ড ব্রেকিং ট্রান্সফারের পর রাতারাতি পালটে যায় পিএসজির চেহারা। হঠাত উড়ে এসে দলের প্রধান খেলোয়াড় হয়ে গেলেন নেইমার।

সাথে গত মৌসুমের চমক এমবাপ্পের ফ্লেয়ারও কাভানিকে একপাশে ফেলে দেয় অনেকটা। কিন্তু এত সহজে নিজের জায়গা ছেড়ে দিতে রাজ ছিলেন না। ফলশ্রুতিতে সেট পিস বিতর্ক তৈরি হয় নেইমারকে নিয়ে। কিন্তু এত কিছুর মাঝে যেন লাটিন স্ট্রাইকার নিজেকে আরো বেশি উজ্জ্বল করে তোলেছেন। একের পর এক গোল করে যাচ্ছেন, কোন ক্লান্তি নেই তাতে।

এই মৌসুমে ইতোমধ্যে করেছে ১৯ ম্যাচে ২২ গোল, লিগে ১৬ আর ইউরোপে ৬। শুধু তাইনা, দক্ষিণ আমেরিকার বিশ্বকাপ বাছাই পর্বও শেষ করেছেন ক্যাম্পেইনের সর্বোচ্চ স্কোরার হয়ে, করেছেন ১০ গোল। সুয়ারেজের অবর্তমানে দলকে বাকিদের তুলনায় সহজেই বিশ্বকাপে নিয়ে যান। মোট কথা, এই মুহুর্তে ক্যারিয়ারের অন্যরকম এক উচ্চতায় অবস্থান করছেন কাভানি। সেই সাথে স্বপ্ন দেখছেন পিএসজিকে চ্যাম্পিয়ন্স লিগ উপহার দেওয়ার।

এডিনসন কাভানি - যাকে নিয়ে অনেক সমালোচনা হচ্ছে প্রায় সময় একেবারে সহজ সুযোগ নষ্ট করার জন্য। কিন্তু এটাও মাথায় রাখতে ওর মতো ম্যাচের পর ম্যাচ নিরন্তরভাবে ডিবক্সে জায়গা করে নেয়া স্ট্রাইকার এই মুহুর্তে খুব বেশি নেই। সঠিক সময়ে সঠিক সময়ে জায়গা করে নেয়াটা তার জন্য একেবারে পান্তাভাতের মত ব্যাপার হয়ে দাড়িয়েছে। আর সেটার সুফল পাচ্ছে পিএসজি।

কাভানির পা থেকে যেমন আসে ডিবক্সের ভিতরে বুদ্ধিদীপ্ত ফিনিশ, তেমনি বক্সের বাইরে থেকেও কাভানির অবিশ্বাস্য স্ট্রাইক প্রতিপক্ষকে হতভম্ভ করে দেয় প্রায় সময়। মোনাকোর সাথে ম্যাচে ড্রাক্সলারের পাস থেকে আসা ফার্স্ট টাইম ফিনিশ কিংবা গত চ্যাম্পিয়ন্স লিগে বার্সার বিপক্ষে করা ভলি, আবার এই মৌসুমেই বায়ার্নের সাথে বক্সের বাইরে থেকে সাবলাইম স্ট্রাইক - এই সবই বড় ম্যাচে কাভানির কার্যকারিতা প্রমাণ করে।

মাঝে মিসের মোহরা না হলে হয়তো প্রতি মৌসুমেই ৫০ এর বেশি গোল করতেন এডিনসন। ইতোমধ্যে উয়েফা প্রতিযোগীতায় পিএসজির সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতা। হয়েছেন। এই মৌসুমেই ইব্রাকে পিছনে ফেলতে পারেন ক্লাবের সর্বকালের সেরা গোলদাতার রেকর্ডে, অথচ তিন মৌসুমেই কিনা কাভানি খেলেছেন ইব্রার সাপোর্টিভ স্ট্রাইকার হিসেবে।

অনেক প্লেয়ারই আছেন যারা প্লেয়িং ক্যারিয়ারে সঠিক মর্যাদাটা পাননা। লজ্জার ব্যাপার, কাভানি হয়ত সেরকম একজনই হতে চলেছেন । তবে ক্যারিয়ার শেষ করে কাভানিকে একজন লিথ্যাল স্ট্রাইকার হিসেবে মনে রাখবে সবাই, অন্তত ক্যারিয়ারে এখন পর্যন্ত করা ৩০২ গোলের পরিসংখ্যান সেটার পক্ষেই কথা বলছে। খুব কম ফুটবলারই ইউরোপের দুইটা বড় লীগে খেলে গোল্ডেন বুট জিততে পেরেছেন, একই সময়ে দলের প্রধাণ খেলোয়াড় এর জন্যও সংগ্রাম করেছেন।

কিন্তু বয়স ৩০ পার করে হয়ত অবশেষে খেলোয়াড় হিসেবে নিজের অবস্থানটা পরিষ্কার করতে পেরেছেন। ফুটবল বিশ্ব যদি ওর অর্জনকে স্বীকৃতি দিতে ব্যার্থ হয় তবে সেটা হবে দুঃখজনক একটা ব্যাপার।

এক নজরে এডিনসন রবার্তো কাভানি গোমেজ

সিরি আ’র সর্বোচ্চ গোলদাতা: ২০১২-১৩ মৌসুম

কোপা ইতালিয়ায় সর্বোচ্চ গোলদাতা: ২০১১-১২ মৌসুম

লিগা ওয়ান সর্বোচ্চ গোলদাতা: ২০১৬-১৭ মৌসুম

লিগা ওয়ান বর্ষসেরা খেলোয়াড়: ২০১৬-১৭ মৌসুম

কনমেবল ফিফা বিশ্বকাপ বাছাইপর্বে সর্বোচ্চ গোলদাতা (কনমেবল অঞ্চল): ২০১৮ সাল

Category : ফিচার
Share on your Facebook
Share this post