সেদিন মাশরাফির টি-টোয়েন্টি অভিষেক ছিল, ছিল বাংলাদেশেরও

মাহবুব মিলন
নভেম্বর ২৮, ২০১৭
সেই মাশরাফি এখন টি-টোয়েন্টিতে নেই! সেই মাশরাফি এখন টি-টোয়েন্টিতে নেই!

সেদিনও ছিল আজকের মতোই ২৮ নভেম্বর! বারটাও একই- মঙ্গলবার!

১১ বছর আগে ২০০৬ সালের এই দিনটিতেও হালকা শীতের মিষ্টি আমেজ ছিল। খুলনার শেখ আবু নাসের স্টেডিয়ামে দুপুর একটায় টসে জিতে জিম্বাবুয়ের অধিনায়ক প্রসপার উৎসিয়া বাংলাদেশকে আমন্ত্রণ জানালেন ব্যাটিংয়ের। শুরু হলো টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে বাংলাদেশের যাত্রা! একইসঙ্গে সেটি ছিল ক্রিকেটের সংক্ষিপ্ত সংস্করণে জিম্বাবু‌য়েরও প্রথম ম্যাচ!

শুভ জন্মদিন, বাংলাদেশের টি-টোয়েন্টি ক্রিকেট!

বাংলাদেশ অভিষেক টি-টোয়েন্টি খেলেছিল শাহরিয়ার নাফিসের নেতৃত্বে। একাদশের অন্য দশজন ছিলেন- নাজমুস সাদাত, আফতাব আহমেদ, সাকিব আল হাসান, নাদিফ চৌধুরী, ফরহাদ রেজা, মুশফিকুর রহিম, মাশরাফি বিন মর্তুজা, মোহাম্মদ রফিক, আবদুর রাজ্জাক ও শাহাদাত হোসেন।

প্রথম ওভারের তৃতীয় বলেই গ্যারি ব্রেন্টের শিকার হয়ে আউট হয়ে যান ৪ রান করা বাঁহাতি ওপেনার নাজমুস সাদাত। দ্বিতীয় উইকেটে ৫৩ রানের জুটি গড়েন শাহরিয়ার (২৫) ও আফতাব (২৮)। আট রানের ব্যবধানে এই দুজনের আউটে চাপে পড়া বাংলাদেশ ৯৭ রানে ৬ উইকেট হারিয়ে বেশ বিপদেরই আভাস পাচ্ছিলো।

তখনই আট নম্বরে ব্যাট করতে নামলেন ২৩ বছরের তেজোদীপ্ত সেই যুবক- মাশরাফি বিন মর্তুজা কৌশিক! তখন যিনি ‘নড়াইল এক্সপ্রেস’ নামেই একনামে পরিচিত। উইকেটে গিয়ে পেলেন আরেক তরুণ, সাকিবকে। প্রথম দিকে বোলারদের একটু সমীহ করে খেললেন। কিন্তু ১১৫ রানের মাথায় সাকিব (২৬) বিদায় নিলে বলতে গেলে নিঃসঙ্গ যোদ্ধা হয়ে যান মাশরাফি! দায়িত্বের বোঝা মাথায় নিয়ে তারপরও আচ্ছ্বাসে পেটাতে থাকেন জিম্বাবুয়ান বোলারদের!

ইনিংসের এক বল বাকী থাকতে যখন শেষ ব্যাটসম্যান হিসেবে আউট হন, তখন মাশরাফির নামের পাশে লেখা হয়ে গেছে দলীয় সর্বোচ্চ ৩৬ রান! ২৬ বলের ইনিংসে ২টি চার ও ২টি ছক্কা! ততক্ষণে বাংলাদেশও পৌঁছে গেছে ১৬৬ রানের চ্যালেঞ্জিং স্কোরে!

জবাব দিতে নামা জিম্বাবুয়েকে প্রথম ধাক্কাটাও দিয়েছিলেন সেই মাশরাফি! দলীয় ২০ রানের মাথায় সরাসরি বোল্ড আউট করে দেন ততদিনেই বিপজ্জনক ব্যাটসম্যানের খ্যাতি পাওয়া ব্রেন্ডন টেলরকে (৫)। ইনজুরির সঙ্গে মিতালী গড়ে উঠেনি বলে মাশরাফি তখন গতিদানব, দারুণ এক ডেলিভারিতে ছিটকে দেন এই উইকেটকিপার ব্যাটসম্যানের স্ট্যাম্প!

পরে অবশ্য জিম্বাবুয়ে আর কোনো উইকেট দেয় নি মাশরাফিকে। ৪-০-২৯-১; এই ছিল তার বোলিং ফিগার। তবে অন্য পেসার শাহাদাত (২/২২) ও বাঁহাতি স্পিনার রাজ্জাকও (৩/১৭) দারুণ বল করেছেন। স্পিনে উইকেট নিয়েছেন রফিক (১/২২) ও সাকিবও (১/৩১)।

মিডল অর্ডারে শন উইলিয়ামস (৩৮) ও হ্যামিল্টন মাসাকাদজার (৩৫) প্রতিরোধ সত্ত্বেও নিয়মিত বিরতিতে উইকেট হারাতে থাকে জিম্বাবুয়ে। শেষ পর্যন্ত কোনোক্রমে ২০ ওভার কাটিয়ে দিতে পারলেও রান তুলতে পারে ৯ উইকেটে ১২৩।

৪৩ রানের দারুণ এক জয়ে নিজেদের টি-টোয়েন্টি অভিষেক ম্যাচকে স্মরণীয় করে রাখে বাংলাদেশ! প্লেয়ার অব দ্য ম্যাচ বিবেচিত হন অলরাউন্ডিং নৈপূণ্য দেখানো মাশরাফি! মজার ব্যাপার হলো, ৫৪ টি-টোয়েন্টিতে সেই শুরুর ৩৬ রানই হয়ে আছে তার ক্যারিয়ারের সর্বোচ্চ ইনিংস!

বাংলাদেশের সেই ম্যাচের একাদশের দু’জন মোহাম্মদ রফিক ও আফতাব আহমেদ আগেই খেলোয়াড়ী জীবনের সমাপ্তি টেনে কোচিং পেশায় নাম লিখিয়েছেন। অন্যরা এখনো ক্রিকেটেই আছেন এবং তাদের বেশিরভাগই চলমান বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগ (বিপিএল) খেলছেন। শুধু নাজমুস সাদাত ও শাহাদাত হোসেন কোনো দল পান নি। একমাত্র টি-টোয়েন্টির পর আর কখনোই জাতীয় দলে ডাক পান নি ৩১ বছর বয়সী সাদাত। তবে তিনি এবারের ঢাকা প্রিমিয়ার ডিভিশন ক্রিকেটে খেলাঘর সমাজকল্যাণ সমিতির হয়ে ৮ ম্যাচে ৩টি ফিফটির সাহায্যে করেছেন ২১৫ রান।

টেস্ট জন্মদিনের মতো টি-টোয়েন্টির জন্মদিন সেভাবে জমকালোভাবে পালন করা হয় না কোনো দেশেই। বাংলাদেশে তো অনেকের মনেই থাকে না! কিন্তু যারা দেশের ইতিহাসের শুরুর সাক্ষী, তারা কী ভুলতে পারেন! আজ রংপুর রাইডার্সের খেলা আছে। তারপরও দলটির অধিনায়ক মাশরাফি, রাজ্জাক ও শাহরিয়ার আনমনে হলেও ২০০৬ সালে ফিরে যাবেন! রাজশাহীর কিংসের মুশফিক ও ফরহাদ এবং ঢাকা ডায়নামাইটসের সাকিব ও নাদিফেরও নিশ্চয় মনে পড়ে যাবে সেই দিনটির কথা!

রেকর্ডের পাতা ঘেঁটে দেখা যাচ্ছে, গত এগারো বছরে টি-টোয়েন্টিতে বাংলাদেশ ৬৯ ম্যাচ খেলে জয় পেয়েছে ২১টিতে, পরাজিত হয়েছে ৪৬ ম্যাচে এবং ২টি ম্যাচ পরিত্যক্ত হয়েছে। সবচেয়ে বেশি ৫টি জয় এসেছে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে, আয়ারল্যান্ডের সঙ্গে ৩টি, নেদারল্যান্ডস, পাকিস্তান, ওয়েস্ট ইন্ডিজ ও শ্রীলংকার মোকাবেলায় ২টি করে এবং আফগানিস্তান, কেনিয়া, নেপাল, ওমান ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের বিপক্ষে একটি করে জয়ের মুখ দেখেছে টাইগাররা।

সবচেয়ে কষ্টের ব্যাপার হলো, ওয়ানডে র‌্যাংকিংয়ের বর্তমানে সাতে থাকা বাংলাদেশ টি-টোয়েন্টিতে পড়ে আছে সেই দশ নম্বরেই! এক্ষেত্রে অনেকদিন ধরেই বাংলাদেশের একধাপ উপরে রয়েছে আফগানিস্তান!

নিয়তির কী পরিহাস দেখুন- যার হাত ধরে টি-টোয়েন্টিতে জিততে শিখেছিল বাংলাদেশ, যিনি হয়েছিলেন ইতিহাসগড়া অভিষেক ম্যাচের সেরা খেলোয়াড়; সেই মাশরাফিকেই কী-না ফর্ম থাকা স্বত্বেও এই সংস্করণের ক্রিকেট থেকে নিজের ইচ্ছের বিরুদ্ধে জোর করে অবসর নিতে বাধ্য করা হলো!

তবুও আজকে নাহয় সেসব কথা থাক! আনন্দের দিনে হৃদয় খুঁড়ে দু:খ জাগাতে কেই বা ভালোবাসে?

Category : ফিচার
Share on your Facebook
Share this post