থিসারা ‘ফিনিশার’ পেরেরা!

মাহবুব মিলন
নভেম্বর ২৬, ২০১৭
পেরেরার কীর্তি রয়ে গেল অনেকটা নীরবে-নিভৃতেই! পেরেরার কীর্তি রয়ে গেল অনেকটা নীরবে-নিভৃতেই!

ছোট্ট হলেও ব্যাট হাতে ভীষণ প্রয়োজনীয় কিছু ইনিংস। খুব দরকারের সময় বল হাতে এক-দুটি উইকেট নিয়ে ব্রেক থ্রু এনে দেয়া। সঙ্গে অসাধারণ ফিল্ডিং তো আছেই। সব মিলিয়ে দারুণ কার্যকরী এক খেলোয়াড় হয়ে উঠেছেন থিসারা পেরেরা!

জহুর আহমেদ চৌধুরী স্টেডিয়ামে মাশরাফি বিন মর্তুজার অমন একটা অবিস্মরণীয় ইনিংস আরেকটু হলে বৃথা যেতে পারতো পেরেরা দৃড়তা না দেখালে! প্রচন্ড স্নায়ুচাপ সামলে তাসকিন আহমেদকে ইনিংসের শেষ বলে পেরেরা মারলেন ছক্কা! চিটাগং ভাইকিংসের বিপক্ষে প্রায় হারতে বসা ম্যাচটা নাটকীয়ভাবে জিতে গেল রংপুর রাইডার্স!

কাল রাতের ক্রিকেট রোমাঞ্চের সব স্তুতি অনুমিতভাবেই গেছে মাশরাফির দিকে; ম্যাচসেরার পুরষ্কারও পেয়েছেন তিনি। কিন্তু একবার ভেবে দেখেছেন কী, থিসারা ১৪ বলে অপরাজিত ২৮ রানের অমন একটা ঝড়ো ইনিংস না খেললে মাশরাফিকে নিশ্চয়ই থাকতে হতো মন খারাপ করে! রংপুরও তো জয়ের মুখ দেখতো না!

অথচ পেরেরার কীর্তি রয়ে গেল অনেকটা নীরবে-নিভৃতেই!

শ্রীলংকার থিসারা পেরেরা দারুণ একজন অলরাউন্ডার। বিশেষ করে সীমিত ওভারের ক্রিকেটে ব্যাটে-বলে যে কোনো সময় ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারেন তিনি; এসব কথা ক্রিকেটপ্রেমীদের মোটামুটি সবারই জানা।

কিন্তু বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগের (বিপিএল) পঞ্চম আসরে পেরেরা যেভাবে খেলছেন, এতটা ধারাবাহিক পারফরম্যান্স তার কাছ থেকে আগে খুব বেশি দেখা যায় নি। ব্যাটিং-বোলিংয়ে বলা চলে রংপুরের মধ্যমনি তিনি।

বিশ্বাস না হলে পরিসংখ্যান দেখুন- রাইডার্সরা এ পর্যন্ত যে ৪টি জয় পেয়েছে, তার সবগুলোতেই কিন্তু ‘ফিনিশিং টাচ’ দিয়েছেন একজনই, পেরেরা! কখনো ব্যাট হাতে, আবার কখনো বল হাতে! কিন্তু একবারও ম্যাচসেরা হন নি!

সিলেটের মাঠে রাজশাহী কিংসের বিপক্ষে ৬ উইকেটের জয় দিয়ে এবারের বিপিএল শুরু করেছিল রংপুর রাইডার্স। ২ ওভারে ২৩ রান দিয়ে বোলিংটা বাজে করলেও সেটি পুষিয়ে দিয়েছেন ব্যাট হাতে ১২ বলে ২০ রানের অপরাজিত ইনিংস খেলে। ফরহাদ রেজার বলে উইনিং শটটাও খেলেছিলেন পেরেরা।

সিলেট সিক্সার্সের সঙ্গে উত্তেজনাময় ম্যাচে রংপুরের ১২ রানের জয়ে পেরেরার অবদান ছিল ১২ বলে ১৫ রান এবং ৪৩ রানে ১ উইকেট। খেলা দেখে না থাকলে মনে হতেই পারে, এটা আহামরি কোনো পারফরম্যান্স নয়। কিন্তু বাস্তবতা অন্য।

সিলেটের ৩ ওভারে ৩৩ রান দরকার, এমন অবস্থায় ১৮তম ওভারে এসে ৭ রান দিয়ে মেরেকেটে ৭০ রান করে ম্যাচ জিতিয়ে দেয়ার পটভুমিতে দাঁড়িয়ে থাকা সাব্বির রহমানকে আউট করে ঘুরিয়ে দিয়েছেন ম্যাচ। আবার ২০তম ওভারটিও করেছিলেন, যেখানে প্রথম দুই বল ডট করে তৃতীয় বলে ব্রেসনানকে সিঙ্গেলস দিয়ে সিলেটের প্রয়োজনীয় ১৯ রানের সমীকরণ অসম্ভব করে তোলেন পেরেরা।

ঢাকা ডায়নামাইটসের বিপক্ষে রংপুরের ৩ রানে জয়ের রুদ্ধশ্বাস ম্যাচটিতেও ছিল পেরেরা ম্যাজিক! শেষ ওভারে ১০ রান দরকার ঢাকার, উইকেটে কাইরন পোলার্ড ছিলেন বলে সম্ভাবনাও ছিল বেশ। কিন্তু প্রথম দুই বলে কোনো রান না দিয়ে তৃতীয় বলে ছক্কা খাওয়ার পর শেষ দুই বলে পোলার্ড ও আবু হায়দারকে বোল্ড করে মাশরাফিদের দারুণ এক জয় এনে দেন পেরেরা। সব মিলিয়ে ৩৭ রানে ২ উইকেট, তারও আগে ৯ বলে করেছিলেন ১২।

আর গতকালের ম্যাচটির স্মৃতি তো এখনো তরতাজা! বল হাতে ৪ ওভারে ৩৫ রান দিয়ে আউট করেছেন ৬৮ রান করা স্টিয়ান ভ্যান জিলকে। পরে ১৪ বলে ২৮ রান করে রংপুরের জয়ের ক্যানভাসে দিলেন তুলির শেষ আঁচড়!

এছাড়া দুদিন আগে খুলনা টাইটান্সের সঙ্গে যে ৯ রানে হেরে গেল রংপুর রাইডার্স, সেখানে পেরেরা আরেকটু আগে নামলে হয়তো ম্যাচের ফলই বদলে যেতে পারতো! শুধু একটি বল মোকাবেলার সুযোগ পেয়ে এক রান করা পেরেরা উইকেটে থাকলে শেষ ৪ ওভারে ৪৪ রানের অংক মিলিয়ে ফেলাও অসম্ভব ছিল না।

প্রায় ২৯ বছর বয়সী ডানহাতি মিডিয়াম পেসার ও মিডল অর্ডার ব্যাটসম্যান থিসারা পেরেরা গত বিপিএলে খেলেছিলেন বরিশাল বুলসে। ১১ ম্যাচে ২৭.১৬ গড়ে করেছিলেন ১৬৩ রান এবং ২৯.২২ গড়ে পান ৯ উইকেট। তার অমন অলরাউন্ডিং নৈপূণ্য দেখেই মুলত ‘ঘরের ছেলেকে’ ফিরিয়ে এনেছিল রাইডার্সরা! অবশ্য ২০১৫ বিপিএলে রংপুরের হয়ে খেলে ১২ ম্যাচে ১৭.২২ গড়ে ১৫৫ রান ও ১৩.৬১ গড়ে ১৮ উইকেট নিয়ে আরও বেশি উজ্জ্বল ছিলেন পেরেরা।

একাই ম্যাচের রং পাল্টে দিতে জানেন পেরেরা। তার মতো একজন রংপুর দলে আছেন বলে অধিনায়ক মাশরাফি স্বস্তিবোধ করতেই পারেন। তবে প্রতিপক্ষ দলের স্বস্তির কোনো জায়গা নেই, বরং আছে ‘ফিনিশ’ হয়ে যাওয়ার শঙ্কা!

Category : ফিচার
Share on your Facebook
Share this post