একজন কিংবদন্তি ক্রীড়াবিদ, একজন শহীদ

উদয় সিনা
নভেম্বর ২৫, ২০১৭
শহীদ শাহেদ আলি শহীদ শাহেদ আলি

৭১ এর নভেম্বরের শেষের দিক। স্বাধীনতা যুদ্ধে লক্ষ-কোটি মুক্তিসেনার প্রতিরোধের সামনে নিজেদের পরাজয় সুনিশ্চিত বুঝে যায় পাকিস্তানি হানাদারবাহিনী। তাই পরাজয় বরণ করার অন্তিমক্ষণে তাদের মাথায় আটলো নতুন ষড়যন্ত্র।  স্বাধীন হওয়ার পর বাংলাদেশ যেন মাথা তুলে দাঁড়াতে না পারে সেজন্য দেশের গণ্যমান্য বরেণ্য ব্যক্তিদের হত্যার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হন তারা। তাদের উদ্দেশ্য একটাই- বাংলাদেশ ত্যাগ করার আগে দেশ বরেণ্য ব্যক্তিবর্গদের শেষ করে দিয়ে পুরো বাঙালি জাতিকে পঙ্গু করে দেয়া। পাকিস্তানি স্বৈরশাসকদের সেই ঘৃণ্য ষড়যন্ত্রেরই বলি ময়মনসিংহের সেহরার শাহেদ আলি।

একজন শাহেদ আলির পরিচয় দিতে গিয়ে যে কারোরই ধন্দে পড়ে যাওয়াটা স্বাভাবিক। তাঁর এত পরিচয় যে কোনটা রেখে কোনটা আগে বলি তা নিয়ে মধুর সমস্যায় পড়তেই হয়। ময়মনসিংহের কৃতি সন্তান শাহেদ আলি পরিচিত একাধারে  ফুটবলার, হকি খেলোয়াড় ও অ্যাথলেট হিসেবে। ফুটবল, হকি ও অ্যাথলেটিকসে সমান পারদর্শী হলেও অ্যাথলেট হিসেবেই বেশ পরিচিতি লাভ করেন তিনি।

ষাটের দশক থেকে সত্তরের দশকের প্রারম্ভে শাহেদ আলিকে চিনতেন না এমন লোক খুব কমই ছিল এ দেশে। তখন ৪০০ মিটার স্প্রিন্টে তিনি ছিলেন দেশসেরা অ্যাথলেট। ১৯৬৬ সালে ইন্দোনেশিয়া, তুরস্ক ও ইরানের অ্যাথলেটদের নিয়ে লাহোরে অনুষ্ঠিত অ্যাথলেটিক মিটে তিনি পাকিস্তানের প্রতিনিধিত্ব করেন। সেখানে ৪০০ মিটার স্প্রিন্টে চতুর্থ হন তিনি। সেসময় লাহোর, করাচি ও রাওয়ালপিন্ডিতে অনুষ্ঠিত পাকিস্তান জাতীয় ক্রীড়ায়ও তিনি অংশ নেন।

তারপর ১৯৭০ সালে পাকিস্তান অলিম্পিকে ৪০০ মিটার স্প্রিন্টে মাত্র ৫১ সেকেন্ড সময় নিয়ে দৌঁড় শেষ করে স্বর্ণপদক জিতে রেকর্ড গড়েছিলেন শাহেদ আলি যা ১৯৭৯ সালের আগ পর্যন্ত কেউ ভাঙ্গতে পারেনি। শুধু ৪০০ মিটার স্প্রিন্টে নয়, ২০০ মিটার স্প্রিন্টেও তিনি ছিলেন অপ্রতিরোধ্য। ১৯৬৩ থেকে ১৯৬৯ সাল পর্যন্ত ময়মনসিংহ জেলা ক্রীড়া সংস্থা পরিচালিত বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় তিনি চ্যাম্পিয়ন ছিলেন। এ সময় রাজশাহীতে অনুষ্ঠিত আন্তবোর্ড ক্রীড়া প্রতিযোগিতায়ও তিনি চ্যাম্পিয়ন হয়েছিলেন।

দেশের একসময়কার কীর্তিমান ক্রীড়াবিদ শাহেদ আলির জন্ম ময়মনসিংহ জেলার শেহরায়। স্কুলে অধ্যায়নরত অবস্থায় তাঁরা খেলোয়াড়ি জীবনের শুরু। পড়তেন ময়মনসিংহ জিলা স্কুলে। জিলা স্কুলের হয়ে একইসাথে অংশ নিয়েছেন ফুটবল, হকি ও অ্যাথলেটিকসে। আন্তস্কুল অ্যাথলেটিকসে তাঁর ছিল একক আধিপত্য। তাঁর ফুটবল খেলা শুরু হয় জিলা স্কুলের পরিচালনায় লীলাদেবী শিল্ড ফুটবল টুর্নামেন্টে খেলার মাধ্যমে।

১৯২০ সাল থেকে আয়োজিত হওয়া এ প্রাচীন ফুটবল টুর্নামেন্টের পাশাপাশি তিনি খেলেছেন আন্তস্কুল ফুটবল টুর্নামেন্টে। সেখানে নিজের প্রতিভাদীপ্ত ফুটবল নৈপুণ্যের স্বাক্ষর রেখে ১৯৬১ সালে ঢাকায় স্কুল জাতীয় ফুটবল প্রশিক্ষণে অংশ নেয়ার সুযোগ  তৈরি করে নেন তিনি। পরবর্তীতে ময়মনসিংহের স্থানীয় ফুটবল লিগে মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাব, স্টেশন কোয়ার্টার এ সি ও সিঅ্যান্ডবি ক্লাবের হয়ে মাঠ মাতান শাহেদ আলি। ফুটবল পায়ে তাঁর ছিল চিতার গতি। সাদা-কালো জার্সি গায়ে মাঠের বাঁ প্রান্ত দিয়ে অসামান্য গতিতে প্রতিপক্ষের খেলোয়াড়দের কাটিয়ে পেনাল্টি বক্সে ঢুকে গোল করায় ছিল তাঁর সুনিপুণ দক্ষতা।

অ্যাথলেটিকস ও ফুটবলের মত হকিতেও নিজের প্রতিভার জানান দিয়েছেন শাহেদ আলি। হকিতে তিনি ছিলেন আক্রমণভাগের খেলোয়াড়। জিলা স্কুলের হয়ে আন্তস্কুল হকিতে তিনি ছিলেন সবার চেয়ে একধাপ এগিয়ে। তাঁর স্টিকের ওপর ভর করেই বছরের পর বছর আন্তস্কুল হকিতে চ্যাম্পিয়ন হয় ময়মনসিংহ জিলা স্কুল। তারপর স্কুল পেরিয়ে কলেজে গিয়েও অব্যাহত ছিল শাহেদের হকি চর্চা।

ময়মনসিংহের বিখ্যাত আনন্দমোহন কলেজের হকি দলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সদস্য ছিলেন তিনি। ১৯৬৪ সালে আন্তকলেজ হকিতে তাঁর দুর্দান্ত পারফরম্যান্সেই মূলত প্রাদেশিক চ্যাম্পিয়ন হয় আনন্দমোহন কলেজ।

ফুটবল ও হকিতে তুখোড় পারদর্শীতা থাকা সত্ত্বেও কলেজে অধ্যায়নরত অবস্থায় অ্যাথলেটিকসের দিকে বেশি মনযোগী হয়ে পড়েন শাহেদ আলি। নিজেকে একজন দেশসেরা অ্যাথলেট হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে তখন তাঁর চেষ্টার কোন ত্রুটি ছিল না। আর তাঁর সেই চেষ্টা ও কঠোর পরিশ্রমের সাক্ষী আনন্দমোহন কলেজ মাঠ। সেখানেই অ্যাথলেটিকস ক্যারিয়ারের অনুশীলনের একটা দীর্ঘ সময় পার করেছেন তিনি।

একজন সফল অ্যাথলেট হিসেবে আনন্দমোহন কলেজকে ছাপিয়ে সারা দেশে তিনি কিভাবে নিজেকে সুপ্রতিষ্ঠিত করেছেন সে গল্প তো প্রথমেই সেরে এসেছি। গল্পটা সন্দেহাতীতভাবে আরো দীর্ঘ হতে পারতো।  অ্যাথলেট হিসেবে শাহেদ আলির মুকুটে আরো অসংখ্য পালক যোগ হওয়ার সম্ভাবনা ছিল। কিন্তু সে সম্ভাবনা অঙ্কুরেই বিনষ্ট হয়ে যায় ১৯৭১ সালের স্বাধীনতাযুদ্ধে। ১৯৭১ সালের ২৫ নভেম্বর ভোরে আল-বদররা শাহেদ আলিকে তাঁর সেহরাস্থ বাসা থেকে ধরে নিয়ে যায়। সেদিনের পর থেকে আজ পর্যন্ত একটিবারের জন্যও দেখা মেলেনি তাঁর।

শাহেদ আলির হারিয়ে যাওয়ার আজ ৪৬ বছর হয়ে গেল। তিনি আমাদের মাঝে না থাকলেও তাঁর কীর্তিগুলো কিন্তু এখনও বর্তমান। নিজের কীর্তির মাধ্যমেই শাহেদ আলি এখনও বেঁচে আছেন এই ধরনীতে, বেঁচে আছেন কিছু কিছু মানুষের মনেও। হয়ত অনেকেই তাকে মনে রাখেনি। কিন্তু আনন্দমোহন কলেজ তাকে নিশ্চিতভাবে ভুলেনি। এ কলেজের প্রতিটি ঘাসের পরতে পরতেই যে বেঁচে আছেন শহীদ শাহেদ আলি।

Category : ফিচার
Share on your Facebook
Share this post