নেইমার: অবিসংবাদিত শ্রেষ্ঠত্বের পথে

ইকরাম উদ্দীন সুজন
নভেম্বর ২৫, ২০১৭
 নেইমারকে কিন্তু এখনো পাড়ি দিতে হবে লম্বা পথ। নেইমারকে কিন্তু এখনো পাড়ি দিতে হবে লম্বা পথ।

এই সপ্তাহের চ্যাম্পিয়ন্স লিগের সবচেয়ে বেশি রেটেড প্লেয়ার ছিলেন।  দুই গোলের পাশাপাশি পিএসজির ৭-১ গোলের ঐতিহাসিক জয়ে কাভানির প্রথম গোলে গোলে ছিলেন এসিস্টম্যান।  জয়টি ঐতিহাসিক কারণ ইউরোপিয়ান প্রতিযোগিতায় এটাই পিএসজির সবচেয়ে বড় জয়।

আর এই জয়ের মধ্য দিয়ে চ্যাম্পিয়ন্স লিগের গ্রুপ পর্বে সর্বোচ্চ ২৪ গোলের রেকর্ড গড়ল পিএসজি,  হাতে আছে আরো এক ম্যাচ। এম্বাপ্পে, কাভানি আর নেইমার ট্রাইওর প্রতাপে পুড়ে ছাই যায় সেলটিক এবং বরাবরের মতই উজ্জ্বল নেইমার।

.

ঘটনার শুরু গত মৌসুমের চ্যাম্পিয়ন্স লিগের দ্বিতীয় রাউন্ড থেকে।  বার্সেলোনা বনাম পিএসজির প্রথম লেগের ম্যাচে ৪-০ গোলে হেরে বসে মেসি সুয়ারেজ নেইমারের বার্সা।  স্পেসিফিকলি বললে মেসির বার্সেলোনা।  ইউসিএল এর নকাউটে ৪-০ গোলে পিছিয়ে থেকে জয় ছিল প্রায় অসম্ভব, কারণ প্রতিপক্ষ যথেষ্ট শক্তিশালী পিএসজি।  কিন্তু তখনো আশা হারাননি একজন।  ক্যাম্প ন্যুর কিং হলেন মেসি,  তাই ফ্যানরা নেইমারকে ডাকতেন প্রিন্স বলেই।

ফিরতি লেগের ম্যাচের আগে নেইমারের টুইট এরকম, ‘১% চান্স, ৯৯% ফেইথ’ - জিতার চান্স যদি এক ভাগও থাকে বাকি ৯৯ ভাগই আস্থা আছে নিজের উপর, নিজের দলের উপর।  সেই আস্থার পাল্লা এত ভারি ছিল যে ৬-১ গোলের অসম্ভব লক্ষ্যও সেদিন অর্জিত হয়ে যায় বার্সার। বার্সার শেষ তিন গোলের দুইটিই করেন নেইমার আর বাকিটা আসে নেইমারেরই দেওয়া বল থেকে। 

অসাধ্য সাধন সম্পন্ন করে বার্সা, চ্যাম্পিয়ন্স লীগ ইতিহাসের একটি স্মরণীয় ম্যাচ উপহার দেয় নেইমার এন্ড কোং।  কিন্তু সেদিনের ম্যাচের পর নেইমার ও তার ভক্তরা একটা জিনিস বুঝে ফেলে, মেসি থাকা অবস্থায় বার্সায় নেইমারের পক্ষে মেসিকে আউটশাইন করা সম্ভব না।  কারণ ওই ম্যাচে নেইমারের ওইরকম অতিমানবীয় পারফর্মেন্সের পরও আলোচনায় ছিল মেসির দর্শকদের সাথে করা উদযাপনের ছবি,  ঢাকা পড়ে গেল নেইমারের ১৫ মিনিটের ম্যাজিক স্পেল।

বার্সেলোনা বোর্ড সেদিন বুঝতে পারেনি এর প্রভাব কতদূর পর্যন্ত যাবে।  তাদেরও অবশ্য বেশি কিছু করার ছিলনা।  পিকে নিজেই স্বীকার করেছিলেন, মেসি থাকা অবস্থায় বার্সায় অন্য কোন রাজা থাকবেনা।  ফলাফল রেকর্ড ট্রান্সফার ফি তে নেইমারের পিএসজি যাত্রা।

.

আগস্টে জয়েন করার পর থেকে পিএসজির হয়ে খেলে ফেলেছেন ১৪ টি ম্যাচ।  গোল করেছেন ১৩ বার, এসিস্ট ৮ টি।  মোট ১২৫৭ মিনিট খেলে  মোট ২১ টি গোলে সরাসরি অবদান রাখেন নেইমার।  এর মধ্যে চ্যাম্পিয়ন্স লীগের প্রথম পাঁচ ম্যাচে গোল করার রেকর্ডে ভাগ বসিয়েছেন। চ্যাম্পিয়ন্স লিগে রেটিং প্রতি ম্যাচেই ৯ ছাড়ানো। লিগ ওয়ান মিলিয়ে ওভারল রেটিং ৯.০৭ হুস্কোরড.কম-এর মতে।

এতো গেল সংখ্যার হিসাব। কিন্তু নেইমার মাঠে কতটা ভয়ঙ্কত হতে পারেন সেটা বুঝতে হলে আপনাকে ওর খেলা দেখতে হবে। বার্সার তুলনায় এখানে নেইমারের স্বাধীনতা অনেক বেশি।  বার্সায় যেখানে লেফটে খেলতে বাধ্য ছিলেন, সেখানে পিএসজি তে অনেকটা ফ্রি রোলেই খেলার সুযোগ পাচ্ছেন। উনাই এমেরির ৪-৩-৩ ফর্মেশনে নেইমারের পজিশন লেফটে উইং এ হলেও মাঠে সেটা কার্যত ৪-২-৩-১ পরিণত হয় যখন পিএসজি আক্রুমনে যায় ।

এখানে নেইমার লেফট উইংগারের চেয়েও এটাকিং মিডফিল্ডার বা প্লেমেকার রোল প্লে করছে বেশি। তবে মাঠের প্রায় যেকোন জায়গাতেই নেইমার খেলতে দ্বিধাবোধ করেননা। প্রয়োজন বুঝে নিচে নামছেন আবার রাইট সাইডেও যাচ্ছেন  কাভানি বা বাপ্পের সাথে পজিশন এক্সচেঞ্জ করে। অথবা তার ফেইক মুভমেন্ট তৈরি করছে খালি জায়গা যেটা অন্য প্লেয়ারকে আরো স্বাধীণভাবে খেলার সূযোগ করে দিচ্ছে।   রাবিওট, ভেরাত্তি কিংবা ড্রাক্সলারদের মতো প্লেয়ারদের আরো ভাল খেলতে সাহায্য করছে।

৩.

বর্তমান পিএসজির একটা কমন মুভ হল সেন্টার মিড থেকে রাবিওট বা ভেরাত্তি নেইমারকে পাস বাড়িয়ে বাম পাশে চলে যাবে,  নেইমার নাম্বার টেন পজিশনে গিয়ে ওর নরমাল পজিশনে একটা ভয়েড তৈরি করবে।  অন্যদিকে এমবাপ্পে ডান দিকে ওয়েট করবে নেইমারের পাসের।  এই অবস্থায় নেইমারের এবিলিটি তার কাছে তিনটা অপশন উন্মুক্ত রাখে - এমবাপ্পে বা ভেরাত্তিকে কে পাস দিয়ে বক্সে ঢুকে যাওয়া।

কাভানিকে পাস দেওয়া অথবা নিজেই বল নিয়ে বক্সে ঢুকা।  এই কাজটা সব প্লেয়ারের পক্ষে করা সম্ভব না।  কারণ সব প্লেয়ারের স্কিল দিয়ে প্লেয়ার বিট করার এবিলিটি থাকেনা। সাথে নেইমারের পাসিং এবিলিটি (আউটস্ট্যান্ডিং বললেও কম বলা হবে) আর ভিশন মিলে প্রতিপক্ষের জন্য এক বিভীষিকার নাম উঠেছে।  ঠিক একই রোলে মেসি বিশ্বের সেরা প্লেয়ার যেটা বার্সায় থাকলে কখনোই পাওয়া হতোনা নেইমারের।

 এই মুহুর্তে শুধু একটা ক্রাইটেরিয়াতেই নেইমার পিছিয়ে থাকবে মেসি থেকে, সেটা হচ্ছে গোলস্কোরিং এবিলিটি। চান্স ক্রিয়েশন বা ড্রিবলিং এর মত ক্রাইটেরিয়া গুলাতে নেইমার গত সিজন থেকেই মেসিকে পিছনে ফেলে এসেছে মেসির সাথে খেলেই।  পিএসজি তে এসে নেইমারের গোলসংখ্যাও বৃদ্ধি পেয়েছে চোখে পড়ার মত। গত মৌসুমে বার্সার হয়ে যেখানে ৪৫ ম্যাচে করেছেন ২০ গোল সেখানে এবার ১৪ ম্যাচেই করে ফেলেছে। ১৩ গোল।

চ্যাম্পিয়ন্স লিগে সম্মিলিতভাবে যৌথ দ্বিতীয় সর্বোচ্চ স্কোরার। বর্তমান রেটে চলতে থাকলে নেইমারের গোলসংখ্যা হয়ত ৪০ ও ক্রস করতে পারে।  কিন্তু লিগ ওয়ানের গোলের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চ্যাম্পিয়ন্স লীগের পারফর্মেন্স এবং নিঃসন্দেহে এবারের ইউসিএল এর এখন পর্যন্ত সেরা পারফর্মার নেইমারই। কিন্তু এখনো সিজনের অর্ধেকের বেশি বাকি, আপাতত সামনের গেইমউইকে বায়ার্নের সাথে ম্যাচে তার পারফর্মেন্স দেখার জন্যই এখন অপেক্ষা করবে ফুটবল পন্ডিতরা।

.

প্যারিসে নেইমার যাই অর্জন করুক পিএসজিকে চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জেতানো ব্যাতিত অন্য কোন অর্জন তার ট্রান্সফারের যথার্থতা প্রমাণ করবেনা কখনো।  সেটা নেইমার নিজেও জানে।  এটা অনেক বড় চ্যালেঞ্জ।  কিন্তু বড় খেলোয়াড় হতে হলে বড় চ্যালেঞ্জেও জয়ী হতে হয়। বার্সায় নেইমারের হারানোর কিছু ছিলনা, কিন্তু ব্রাজিলের নাম্বার টেনের মেসির ছায়ায় থাকাটা ছিল বেমানান। 

একটা ফুটবলারের সবচেয়ে ভাল শারীরিক কন্ডিশন থাকে ২৫ থেকে ২৮ বছর বয়স পর্যন্ত। নিজের সেরা সময়ে তাই স্রেফ অন্যের ‘সহযোগী’ হয়ে থাকাটা হয়তো মেনে নেননি।  তবে পিএসজিতে এসেও নেইমারকে বুঝাতে হচ্ছে যে নেইমারই পিএসজির প্রাণ ভোমরা, কারণ কাভানির সাথে পেনাল্টি বিতর্ক এরকম ধারণার জন্ম দিয়েছে।

অবশ্য ইতিমধ্যেই সব মিটমাট হয়ে গেছে,  সেটা মাঠে তাদের পারস্পরিক বুঝাপড়া, শ্রদ্ধাবোধ দেখলেই বোঝা যায়। আর এজন্যই পিএসজি ইতিমধ্যে এবার চ্যাম্পিয়ন্স লীগের অন্যতম দাবিদার হিসেবে উঠে এসেছে ।  এখন পর্যন্ত এই মৌসুমে ১৮ ম্যাচে ৩.৭২ রেটে ৬৭ গোল করেছে পিএসজি যেটা ইউরোপে সর্বোচ্চ।  আর ‘এমসিএন’-ত্রয়ী মিলে করেছে ৪১ গোল যেটা তাদেরকে ইউরোপের সবচেয়ে ভয়ঙ্কর এটাকিং ট্রাইও হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।

অন্যদিকে ম্যানসিটির আগুয়েরো, জিসুস আর স্টার্লিং এর গোলসংখ্যা ৩১, জুভেন্টাসের দিবালা, হিগুয়েন, মানজুকিচের ২৬ আর বার্সার মেসি, সুয়ারেজ, পাউলিনহোর ২৫ গোল।  এরকম ফর্মে থাকলে পিএসজি প্রথমবারের মত চ্যাম্পিয়ন্স লিগের অন্তত  দেখতেই পারে,  যেই সাথে নেইমারের রেকর্ডেও যোগ হতে পারে শ্রেষ্ঠত্বের মুকুট।

আপাতত সঠিক পথেই আছেন নেইমার। কিন্তু এখনো পাড়ি দিতে হবে লম্বা পথ। সামনের বছর আবার বিশ্বকাপ। তার পূর্বসূরি কাকা, রোনালদিনহো, রোনালদো, রিভালদো,  রোমারিও এরা সবাই জিতেছে সোনার ট্রফিটি। এই বিশ্বকাপে নেইমার যাবে স্টার হিসেবে। আর সেটাও জিতেই সেরার স্বীকৃতি নিতে চায়বেন নেইমার, অন্তত বাছাই পর্বে ব্রাজিলের অনবদ্য পারফর্মেন্স সেই স্বপ্ন তাকে দেখাতেই পারে। 

Category : ফিচার
Share on your Facebook
Share this post