আফতাব আহমেদ: হেলায় হারানো সম্পদ

হাসনাইন মো: আকীফ
নভেম্বর ১০, ২০১৭
অলসতা আর পরিশ্রমের অভাবে হারিয়ে যান আফতাব। অলসতা আর পরিশ্রমের অভাবে হারিয়ে যান আফতাব।

চট্টগ্রামের বিখ্যাত চৌধুরী পরিবারের ছেলে তিনি, খেলার মাঝেও সেই আভিজাত্যের ছোঁয়া ছিলো। তিনি খেলেছেন শাষন করে, চোখ জুড়ানো সব শটে মাতিয়েছেন ক্রিকেটপ্রেমীদের। তার ব্যাটের আঘাতে জর্জরিত হয়েছেন স্টিভ হার্মিসন, চামিন্দা ভাস, এন্ড্রু ফ্লিনটফ, এলটন চিগুম্বুরা এমনকি জেসন গিলেস্পি।

গিলেস্পির সারাজীবনের দুঃস্বপ্নের নাম তিনি, আর সেটাও একটি মাত্র শটে। ওই একটি শট যেটা অস্ট্রেলিয়াকে টেনে মাটিতে নামানোর দিনে কফিনে শেষ পেরেক ঠুকে দিয়েছিলো, সেই শট যা দেখে ইয়ান চ্যাপেল বিস্ফোরিত কন্ঠে বলেছিলেন – ‘দ্যাট ইজ স্লেয়ার, দ্যাটস সিক্স! দ্যাটস আউট অব হেয়ার। দ্যাটস অ্যাওয়ে! অল দ্য ওয়ে। আফতাব আহমেদ, ১৯ ইয়ার্স অব এজ!’

নিশ্চয় বুঝে ফেলেছেন কার কথা বলছিলাম। আফতাব আহমেদ চৌধুরী, বাংলাদেশের প্রথম হার্ড হিটার টপ অর্ডার ব্যাটসম্যান, ভালোবেসে যাকে আমরা নাম দিয়েছিলাম ‘বুম বুম আফতাব’। মাথায় পতাকা বাধা সেই আফতাব যার নাম ধরে গলা ফাটায়নি এমন একজন সমর্থক পাওয়া কঠিন।

আফতাব যার ব্যাটে ভর করে প্রথমবার ভারতকে হারানো, টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে উইন্ডিজকে হারানো, বগুড়ায় শ্রীলঙ্কার সাথে জয়ে যার গুরুত্বপুর্ণ ভূমিকা, দোদুল্যমান অবস্থায় কার্ডিফে অস্ট্রেলিয়াবধ অথবা জিম্বাবুয়ের সাথে শেষ ম্যাচে টর্নেডো ইনিংস খেলে টেস্ট প্লেয়িং দেশের বিরুদ্ধে প্রথম সিরিজ জয়।

এলটন চিগুম্বুরা কি ভুলতে পেরেছেন সেই ২৪ রানের ওভার? ৬,৪,২,৪,৪,৪ অঙ্কগুলা এমনভাবে সাজানো যে হতে পারে নিজের মোবাইল নম্বর ভুলে যাবো কিন্তু এটা ভুলবো না।

অসম্ভব হোম সিকনেস ছিলো। ছোট বেলা থেকেই কিছুটা ঘরকুনো, বড় বড় বোলারের ঘাম ছুটায় দিতো সে অথচ সমস্যা একটাই ঢাকায় সে থাকতে পারে না! বাড়ি থেকে ছোটবেলা থেকেই কম বের হতেন ফলে তার দুনিয়া ছিলো তার বাড়ি। ঢাকায় থাকলে নিয়মিত জিম করা লাগে, ট্রেনিং করা লাগে এজন্য তিনি বাড়িতেই বেশি থাকেন, সিরিজ থাকলেই কেবল ঢাকা আসেন।

বিদেশে সিরিজ খেলতে গেলেও খালি দেশে ফোন দিতেন রুটিন অনুযায়ী ঘুমায় না ছেলেটা, বিদেশের গভীর রাত মানে দেশে দিন, সারারাত দেশে কথা বলে, ফলাফল সকালে ট্রেনিং-এ লেট, কোচের বকা।

একসময় জাতীয় দল ছেড়েই দিলেন, যোগ দিলেন বর্তমানের ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগের (আইপিএল) জন্মদাতা ইন্ডিয়ান ক্রিকেট লিগে (আইসিএল)। নিষিদ্ধ হলেন। অবশ্য আইসিএল ফেরত ক্রিকেটারের ভেতর সবার আগে সুযোগ পেয়েছিলেন। স্বস্তির নি:শ্বাস ফেলেছিলো ভক্তরা। কিন্তু আফতাব আর তাল মেলাতে পারলেন না। আফতাবের ভাষায়, ‘অনেক কিছুই বদলে গিয়েছে, হয় আমি না হয় ক্রিকেটটাই আর আগের মতো নেই।’

ফিরে আসার প্রত্যয়ে সম্ভবত সবচেয়ে বড় ভুল করলেন, ঢাকা প্রিমিয়ার ডিভিশন লিগের বদলে এক মৌসুম খেলার সিদ্ধান্ত নিলেন চট্টগ্রামের স্থানীয় প্রিমিয়ার ডিভিশন লিগে। যেন দ্বিতীয়বার নিজের পায়ে নিজেই কুঁড়াল মারলেন, ডিপিএল আর স্থানীয় লিগের ভেতর মানের পার্থক্য আকাশ আর পাতাল।

ধীরে ধীরে ওজন বাড়তে থাকলো, হারাতে থাকলো ফর্ম। আগের সেই শট নেই, আক্রমনাত্বক ব্যাটিং নেই। দায়টা কিছুটা তৎকালীন কর্তাদের, তারা বলেছিলেন আগের মত ‘বুম বুম’ চাইনা, সিনিয়র হয়েছো, গ্রাউন্ড শট বেশি খেলতে হবে, লম্বা ইনিংস খেলার জন্য বাতাসে শট খেলার প্রবনতা কমাতে হবে। বদলাতে যেয়ে হারিয়েই ফেললেন নিজেকে।

কার্ডিফের সেই ছক্কার ঠিক দশ বছর পর যখন ক্যারিয়ারের পিক পয়েন্টে থাকার কথা ৩০ বছরের আফতাবের ঠিক তখনই ২০১৫ সালে সব ধরনের ক্রিকেট থেকে অবসর নিয়ে নেন আফতাব। আচমকা এই সিদ্ধান্তের পর একটা কথাই ভেসেছিলো সতীর্থদের মুখে এতো তাড়াতাড়ি ‘হাল ছেড়ে দিল আফতাব’!

হয়তো আফতাবের হারানোর জন্য আফতাবের ভূমিকাই বেশি, আইসিএলে যখন যান তখন তাকে ছাড়া জাতীয় দল চিন্তা করা যায়না, ফেরার পর সবার আগে সুযোগ পেলেও অলসতা আর পরিশ্রমের অভাবে হারিয়ে যান।

অকালে হারানো প্রতিভা আর অপচয়ীত মেধার তালিকা করলে দেশের ক্রিকেটের তালিকায় এক নম্বরেই আসবে আফতাবের নাম। আফতাবের মতো এতো বিপুল সম্ভাবনা নিয়ে এসে বড় কিছুর প্রত্যাশা জাগিয়ে হৃদয়ে রক্তক্ষরণ ঘটিয়ে আর কেউ হারিয়ে যায়নি। আফতাব ছিলেন এক শেকল ভাঙা ক্রিকেটার। বাংলাদেশের কোন ব্যাটসম্যান ডাউন দা উইকেটে যেয়ে বলে কয়ে চার ছয় মারে এটা আফতাবের আগে আর কে দেখিয়েছিলো?

নিজের ক্যারিয়ার ডানা মেলতে পারেনি, নিজে যেসব ভুল করেছেন সেসব যেন তরুন প্রজন্ম না করে সেজন্য খুলেছেন ক্রিকেট একাডেমি। প্রচন্ড ঘুম কাঁতুরে আফতাব এখন সূর্য ওঠার সাথেই সেখানে হাজির হন, কড়া প্রশিক্ষক। কাজ করছেন ব্যাটিং পরামর্শক হিসেবেও। প্রত্যাশা করি আফতাবের ছোঁয়ায় উঠে আসবে আরো অনেক আফতাব আহমেদ।

শুধু ব্যাটিং নিয়েই বলে গেলাম! বাংলাদেশের হয়ে আন্তর্জাতিক ওয়ানডেতে প্রথম পাঁচ উইকেট নেয়া বোলার কে সেটা জানেনতো? আমাদের আফতাবই! ২০০৪ সালে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ৩১/৫। ফিল্ডার হিসেবেও ছিলেন দূর্দান্ত, গালি, পয়েন্ট বা কাভারে শার্প ফিল্ডিং করতেন, দর্শনীয় ক্যাচ নিতেন, দুঃসাহসী সব ডাইভ!

আফতাব যাবার পর থেকে আমরা আজও তিন নাম্বারে কাউকে পেলাম না লম্বা সময়ের জন্য। তিন নাম্বার পজিশনে আফতাবের আছে হাজারের উপর রান।

আফতাবের মত ক্রিকেটার একটা দলে খুবই দরকার, যেকোন সময়ে যিনি প্রতিপক্ষ বোলারদের নাকের জল, চোখের পানি এক করে দিতে পারে। সম্ভবত এই কারনেই আমি চাইনা সৌম্য সরকার হারিয়ে যাক, আফতাবের পর সৌম্যকে পেতে অনেকটা সময় লেগেছে আমাদের।

আজ আফতাব আহমেদের ৩২-তম জন্মদিন, এই বয়সে তার দেশের সেরা ব্যাটসম্যানদের সংক্ষিপ্ত তালিকায় থাকার কথা, তামিম, মুশফিক, সাকিবের পথ প্রদর্শক হবার কথা, কিন্তু নিয়তি তা আর হতে দিলো কই!

তবুও আফতাব থাকবেন, যেকোন প্রজন্মের যে কেউ যখন দেখবে একটি ১৯ বছরের ছেলে গিলেস্পিকে পাড়ার বোলারের মত মাথার উপর দিয়ে ছক্কা মেরে দলকে জেতাচ্ছে, যখন দেখবে ফ্লিনটফকে সামনের পা উঁচু করে পেছনের পায়ে ভর করে ফাইন লেগ দিয়ে ছক্কা মেরেছিলো, যখন জানবে হার্মিসন বলেছিলো ‘ছোট্ট ছেলেটা বলটাকে ওই দূরের দূর্গে পাঠিয়ে দিবে মনে হয়’ ...তখন ঠিকই খুঁজে নিবে কে এই আফতাব!

Category : ফিচার
Share on your Facebook
Share this post