বাংলাদেশের প্রথম জয় ও ফিজির ক্রিকেট

হাসনাইন মো: আকীফ
অক্টোবর ২৮, ২০১৭
 বাংলাদেশের প্রথম জয়ের স্মৃতি বাংলাদেশের প্রথম জয়ের স্মৃতি

বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসের দূর্লভ একটি ছবি। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের প্রথম জয়। ১৯৭৯ সালে বার্মিংহামে আইসিসি ট্রফিতে ফিজিকে হারায় বাংলাদেশ দল। ফিজিকে ৮১ রানে অল আউট করে জয় তুলে নেয় বাংলাদেশ। অবশ্য বাংলাদেশ বা ফিজি কারোরই ওয়ানডে স্ট্যাটাস না থাকায় এই ম্যাচের ওয়ানডে স্ট্যাটাস ছিলো না।

২৪ মে ১৯৭৯, বার্মিংহামের ওয়াটার অরটন ক্রিকেট ক্লাব গ্রাউন্ডে প্রথমে ব্যাট করে ভয়াবহ ব্যাটিং ধ্বসের মুখে পড়ে, ৪৩ ওভার ব্যাট করে মাত্র ১০৩ রানে অল আউট হয় তখনকার বাংলাদেশ দল। দলের পক্ষে ম্যাচ ডিফাইনিং সর্বোচ্চ ২৮ রান করেন ওমর মাহমুদ। বাংলাদেশ এক সময় ৫৪/৮ ছিলো, সেখান থেকে শেষ দুই উইকেটে ৪৯ রান আসে মূলত ওমর মাহমুদ এবং দশ নম্বরে নামা দিপু রায় চৌধুরীর (১৯) ব্যাটে ভর করেই।

জবাবে ব্যাট করতে নেমে সৈয়দ আশরাফুল হকের মায়াবি ঘূর্নির বাঁকে মাত্র ৮১ রানেই গুটিয়ে যায় ফিজি। আশরাফুল হকের বোলিং ফিগার ছিল এমন - ৯.২-৪-২৩-৭! বাংলাদেশ ২২ রানে ম্যাচ জিতে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রথম জয় পায়। আশরাফুল হকের এই বোলিং ফিগার ১৯৯৪ সাল পর্যন্ত আইসিসি ট্রফির সেরা বোলিং ফিগার ছিলো।

১৯৭৯ সালের সেই ম্যাচের পর অনেকটা সময় পার হয়ে গিয়েছে, কেমন আছে ফিজির ক্রিকেট? কেনই বা পথ হারালো?

একটা দেশের ক্রিকেটে ভালো করার জন্য প্রতিবেশী দেশগুলার অনেক বড় হাত থাকে। বাংলাদেশের উত্থানে এশিয়ান ক্রিকেট কাউন্সিলের (এসিসি) বিরাট ভূমিকা ছিলো। ১৯৮৬ সালে ওয়ানডে মর্যাদা পাবার পর ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলংকা সবাই নিয়মিত বাংলাদেশ সফর করেছে। সেই সময় নিয়মিত সার্ক ক্রিকেট প্রতিযোগীতা (বর্তমানে ইমার্জিং নেশনস এশিয়া কাপ) হতো।

তাতে তিন প্রতিবেশী দেশ তাদের ‘এ’ দল পাঠাতো (অবশ্য তখন ‘এ’ দল নামে কাগজে কলমে কিছু ছিলোনা)। আর বাংলাদেশ সহযোগী দেশ হওয়ায় নিয়মিত দল খেলাতো। সার্ক ক্রিকেট প্রতিযোগীতা সর্বশেষ হয়েছিলো ১৯৯৭ সালে ঢাকায়। সেই '৯৩ সালের টুর্নামেন্টে বাংলাদেশ ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা - সবাইকে একবার করে হারালেও ফাইনালে ভারতের কাছে হেরে যায়।

টুর্নামেন্টে পাকিস্তানের ক্যাপ্টেন ছিলো রমিজ রাজা, শ্রীলঙ্কার চান্দিকা হাতুরুসিংহে। এই টুর্নামেন্টের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে উঠে আসে সৌরভ গাঙ্গুলী, রাহুল দ্রাবিড়, রাসেল আরনোল্ড, শোয়েব আখতার, মোঃ রফিক, মেহরাব হোসেন অপিরা। তারও আগে ১৯৯১ সালে শক্তিশালী পশ্চিম বঙ্গ দল তিন দিনের ম্যাচ খেলতে ঢাকায় আসে, সেটাই গাঙ্গুলীর প্রথম ঢাকা সফর।

এসিসির সহায়তা এবং প্রতিবেশী দেশগুলার সমর্থন পেয়ে ১৯৯৮ সালে বাংলাদেশ আয়োজন করে আইসিসি মিনি বিশ্বকাপ (বর্তমানে চ্যাম্পিয়নস ট্রফি), আট দলের সেই টুর্নামেন্ট অবশ্য বাংলাদেশ খেলেনি। বাংলাদেশের টেস্ট স্ট্যাটাস পাওয়ার পেছনেও বিরাট ভূমিকা ছিলো এশিয়ান ক্রিকেট কাউন্সিল তথা এশিয়ার অন্য দেশগুলার, বিশেষ করে ভারতের।

১৯৭৯ সালের ওই ম্যাচের পর আজকে বাংলাদেশ ক্রিকেটের পরাশক্তি হবার পরিকল্পনা করছে। আর ফিজি এখনো সহযোগী দেশই হয়ে আছে। অথচ অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড এর মতো দুই ক্রিকেট পরাশক্তির বলা যায় বগলের ভেতর বসে আছে মানচিত্রে ফিজি!

অথচ ফিজির ক্রিকেট ইতিহাস বেশ পুরানো। ফিজিতে ক্রিকেট খেলার প্রচলন ১৮৭৪ সালে। প্রথম প্রথম শ্রেনীর ক্রিকেট খেলেছিলো প্রতিবেশী নিউজিল্যান্ডের সাথে ১৮৯৫ সালে। আর প্রথম আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি প্রাপ্ত ম্যাচ খেলেছিলো অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ১৯০৫ সালে।

১৮৯৫ সালের নিউজিল্যান্ড সফরে ওয়েলিংটনের সাথে ম্যাচ ড্র করে সাড়া ফেলে দেয়। ১৯০৭ সালে অস্ট্রেলিয়া সফরে যেয়ে কুইন্সল্যান্ড, ভিক্টোরিয়া আর নিউ সাউথ ওয়েলসের সাথে ম্যাচ ড্র করে অবাক করে দেয় তৎকালীন ক্রিকেট বিশ্বকে। ১৯৫৬ সালে ওয়েস্ট ইন্ডিজ দল ফিজি সফরে যায়, স্যার গ্যারি সোবার্সের ক্যারিবিয়ান দল ফিজির কাছে হেরে বসে ২৬ রানে!

ফিজি আইসিসির সহযোগী সদস্য হয় ১৯৬৫ সালে। ১৯৭৯ সাল থেকে আইসিসি ট্রফিতে অংশ নেয়। সর্বশেষ খেলেছে ২০০১ আইসিসি ট্রফিতে।

আইসিসির সঠিক পরিকল্পনার অভাব এবং আইসিসি ইস্ট এশিয়া প্যাসিফিকের ব্যর্থতা, এবং প্রতিবেশী দুই দেশের পর্যাপ্ত সহযোগীতার অভাবে ফিজির ক্রিকেট ভবিষ্যৎ আজ ধ্বংস হয়ে গেছে। বর্তমানে আইসিসি-ইএপি’এর আশার বাতি হয়ে জ্বলে আছে পাপুয়া নিউগিনি।

রেকর্ড কর্নার

১৯৫৪ সালে নিউজিল্যান্ড সফরে যাওয়া ফিজি দলের সদস্য ছিলেন স্যার রাতু কামিছেছে মারা, যিনি কিনা ওয়েস্ট ইন্ডিজকে হারানো সেই বিখ্যাত ম্যাচে ফিজির অধিনায়ক ছিলেন। কামিছেছে মারা পরে ব্রিটিশ উপনিবেশ থাকার সময় ফিজির মুখ্য মন্ত্রী হন। ফিজি স্বাধীন হলে তিনি ফিজির প্রথম প্রধানমন্ত্রী হন এবং ফিজির রাষ্ট্রপতিও হন।

ক্যারিয়ারে দুটি প্রথম শ্রেনীর ম্যাচে তিনি ৬৪ রান করেছেন যার ভেতর নিউজিল্যান্ড ক্যান্টেরবুরির সাথে আছে ৪৪* রানের একটি ইনিংস, হাত ভেঙে মাঠ থেকে অবসর নেন তিনি। মিডিয়াম পেস বোলিং করে নিয়েছেন ৮ উইকেট, সেরা ৭৭/৪।

স্যার রাতু কামিছেছে মারা একমাত্র প্রথম শ্রেনীর ক্রিকেটার যিনি নিজ দেশের জাতীয় দলের অধিনায়ক, দেশের প্রধানমন্ত্রী এবং দেশের রাষ্ট্রপতিও হয়েছেন।

আরেকটা রেকর্ড আছে ফিজি দলের সাথে জড়িত! ফিজি দলে খেলেছেন আই.এল.বুলা। তিনি নয়টি প্রথম শ্রেনীর ক্রিকেট খেলেছেন। প্রথম শ্রেনীর ক্রিকেট খেলা ক্রিকেটারদের ভেতর সবচেয়ে দীর্ঘ নাম তার, তার আসল নাম উচ্চারন করা আমার পক্ষে সম্ভব না তাই কপি করে দিলাম - ‘Ilikena Lasarusa Talebulamaineiilikenamainavaleniveivakabulaimainakulalakebala।’

এই নামের অর্থ হচ্ছে, ‘লাউ গ্রুপের লাকেবা দ্বীপের নানকুলা হাসপাতাল থেকে তিনি জীবিত ফিরেছিলেন।’ তার জন্মের সময় তিনি বাঁচবেন কিনা সেটা নিয়ে ডাক্তাররা নিশ্চিত ছিলেন না। কিন্তু তিনি বেঁচে যান। যার কারণেই এই বিশাল নাম!

Category : ফিচার
Share on your Facebook
Share this post