খালি হাতে ফেরায় না ইংল্যান্ড

উদয় সিনা
জুন ১১, ২০১৭
বাংলাদেশের ঐতিহাসিক একগাদা জয়ের সাক্ষী এই ইংল্যান্ড বাংলাদেশের ঐতিহাসিক একগাদা জয়ের সাক্ষী এই ইংল্যান্ড

গত দুই বছরে বেশ কয়েকটি বড় বড় সাফল্যের মধ্য দিয়ে গমন করেছে বাংলাদেশ ক্রিকেট। তারই ধারাবাহিকতায় দীর্ঘ ১১ বছর পর খেলতে এসে শনিবার নিজেদের ক্রিকেট ইতিহাসে প্রথমবারের মত আইসিসি চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফির সেমিফাইনালে জায়গা করে নিলো বাংলাদেশ।

গ্রুপ পর্বের প্রথম ম্যাচে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে হার, অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে দ্বিতীয় ম্যাচ বৃষ্টিতে পন্ড হওয়ার পর নিজেদের তৃতীয় ম্যাচে নিউজিল্যান্ডকে হারিয়ে এবারের চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফির সেমিফাইনালে খেলার সম্ভাবনা বাঁচিয়ে রাখে তাঁরা। অবশ্য সেমিফাইনালে উঠার জন্য তাদের তাকিয়ে থাকতে হয় ইংল্যান্ড-অস্ট্রেলিয়া ম্যাচের দিকে। সমীকরণ ছিলো সহজ।

‘এ’ গ্রুপের শেষ ম্যাচে ইংল্যান্ড জিতলেই বাংলাদেশ চলে যাবে সেমিফাইনালে। হলোও তাই। শনিবার বার্মিংহামে বৃষ্টি আইনে ইংল্যান্ড ৪০ রানে অস্ট্রেলিয়াকে পরাজিত করলে সার্থক হয় চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফির সেমিফাইনালে বাংলাদেশের খেলার স্বপ্ন।

পূর্বে ২০০০, ২০০২, ২০০৪ ও ২০০৬ চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফি খেললেও কোনবারই ভালো অবস্থানে থেকে আসর শেষ করতে পারেনি বাংলাদেশ। অবশেষে ২০১৭ সালে ইংল্যান্ডে এসে প্রথমবারের মত আইসিসি চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফির শেষ চারের টিকেট কাটতে সক্ষম হলো বাংলাদেশ।

ক্রিকেটের চারণভূমি ইংল্যান্ডের সাথে বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের বেশকয়েকটি সুখস্মতি জড়িয়ে আছে। এখন পর্যন্ত ওয়ানডে ক্রিকেটে বড় দলগুলোর বিপক্ষে যে জয়গুলো পেয়েছে বাংলাদেশ তাঁর বেশকিছু সংগঠিত হয়েছে ইংল্যান্ডের মাটিতে। সেই ১৯৯৯ সালের আমিনুল ইসলামের বাংলাদেশ থেকে ২০১৭ সালের মাশরাফি বিন মুর্তজার বাংলাদেশের বহু ঐতিহাসিক জয়ের সাক্ষী হয়ে আছে ইংল্যান্ড।

একটু ১৯৯৯ বিশ্বকাপের কথা মনে করে নেয়া যাক। ১৯৯৭ আইসিসি ট্রফি চ্যাম্পিয়ন হবার বদৌলতে ১৯৯৯ আইসিসি ক্রিকেট বিশ্বকাপে প্রথমবারের মত অংশগ্রহণ করার ছাড়পত্র মেলে বাংলাদেশের। ইংল্যান্ডে অনুষ্ঠিত ওই বিশ্বকাপে পুরো ক্রিকেটবিশ্বকে তাক লাগিয়ে দেয় বাংলাদেশ। প্রথমবারের মত বিশ্বকাপে খেলতে এসে গ্রুপপর্বের ম্যাচে সাবেক বিশ্বচ্যাম্পিয়ন পাকিস্তানকে হারিয়ে বসে আমিনুলবাহিনী।

নিউজিল্যান্ড ও ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে হেরে ৯৯' বিশ্বকাপ যাত্রা শুরু করে বাংলাদেশ। পরে তৃতীয় ম্যাচে এসে বহুল প্রতিক্ষিত জয়টি আসে স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে। আইসিসি ক্রিকেট বিশ্বকাপে নিজেদের প্রথম জয় পাওয়ার ম্যাচে বাংলাদেশ স্কটিশদের রুখে দেয় ২২ রানে।

তারপরের ম্যাচে শক্তিশালী অস্ট্রেলিয়ার কাছে বিধ্বস্ত হবার পর নর্দাম্পটনে গ্রুপপর্বের শেষ ম্যাচে পাকিস্তানের বিপক্ষে খেলতে নেমে অবিশ্বাস্যভাবে তাদের বিপক্ষে জয় তুলে নেয় বাংলাদেশ। শুধু জয় বললে কমিয়ে বলা হবে। বলতে হবে আধিপত্য বিস্তার করে জয় তুলে নেয় বাংলাদেশ।

ওই সময়ে আইসিসির সহযোগী দেশ হয়েও সাইদ আনোয়ার, ইনজামাম উল হক, ওয়াকার ইউনুস, ওয়াসিম আকরাম, সাকলাইন মুশতাক ও শোয়েব আখতারদের নিয়ে গড়া পাকিস্তানের মত দলকে হারানো ছিলো আকাশ-কুসুম কল্পনা। কিন্তু নর্দাম্পটনে সেই অলীক কল্পনাকেই বাস্তবে রূপ দেয় বাংলাদেশের ক্রিকেটাররা।

অলরাউন্ডার খালেদ মাহমুদ সুজনের জ্বলে উঠার দিনে পাকিস্তানের বিপক্ষে ২২৩ রান করেও বাংলাদেশ জয় পায় ৬২ রানে। ব্যাটিংয়ে ২৭ রান, বোলিংয়ে ৩ উইকেট ও ফিল্ডিংয়ে ৩টি রান আউট করে এই জয়ে বড় অবদান ছিলো সুজনের। আর এটিই ছিল কোন টেস্ট খেলুড়ে দলের বিপক্ষে বাংলাদেশের প্রথম কোন ওয়ানডে জয়।

১৯৯৯ বিশ্বকাপের পর ৬ বছরের মত লম্বা সময় ধরে ইংল্যান্ডে মাটিতে কোন ম্যাচ খেলার সুযোগ পায়নি বাংলাদেশ। তারপর ২০০৫ সালের জুনে অস্ট্রেলিয়া ও স্বাগতিক ইংল্যান্ডের সাথে ত্রিদেশীয় সিরিজে খেলার আমন্ত্রণ পায় তাঁরা। সেখানেই রচিত হয়ে যায় বাংলাদেশের আরেক বীরত্বগাথা।

কার্ডিফে সিরিজের দ্বিতীয় ম্যাচে তখনকার বিশ্বচ্যাম্পিয়ন অস্ট্রেলিয়াকে হারিয়ে নিজেদের সামর্থ্য বিশ্বদরবারে কাছে উপস্থাপন করে বাংলাদেশ। এ ম্যাচে মাশরাফি বিন মুর্তজা ও তাপস বৈশ্যের পেস তোপে ভিত নড়ে যায় অস্ট্রেলিয়ার শক্তিশালি ব্যাটিং লাইন-আপের। নির্ধারিত ওভারে তাই অস্ট্রেলিয়া ২৪৯ রানের বেশি সংগ্রহ করতে পারেনি। জবাবে আশরাফুলের ১০১ বলে ১০০ রানের বিরোচিত ইনিংসে বাংলাদেশ জয় পায় ৫ উইকেটে। এ জয়ে ব্যাট হাতে অবদান ছিলো অধিনায়ক হাবিবুল বাশার সুমন এবং আফতাব আহমেদেরও। এখনো বাংলাদেশের এই জয়কে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের অন্যতম বড় আপসেট হিসেবে গণ্য করেন ক্রিকেটপন্ডিতগণ।

অপেক্ষাকৃত দুর্বল প্রতিপক্ষ হওয়ার বিভিন্ন কারণে হরহামেশা ইংল্যান্ড ট্যুর করতে পারত না বাংলাদেশ। যেকারণে ২০০৫ সালের পর আবারো ইংল্যান্ডে গিয়ে খেলতে বাংলাদেশকে অপেক্ষা করতে হয় আরো পাঁচ বছর।

২০১০ সালে টেস্ট সিরিজের পাশাপাশি প্রথমবারের মত দ্বিপাক্ষিক ওয়ানডে সিরিজ খেলতে ইংল্যান্ডে পা রাখে বাংলাদেশ ক্রিকেট দল। আর সেখানেই প্রথমবারের মত ওয়ানডেতে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে জয় তুলে নেয় তাঁরা। ব্রিস্টলে বাঁচা-মরার লড়াইয়ে সিরিজের দ্বিতীয় ওয়ানডেতে ব্যাটসম্যানদের ব্যর্থতায় আগে ব্যাট করে ইংল্যান্ডের সামনে মাত্র ২৩৭ রানের লক্ষ্যমাত্রা ছুড়ে দেয় বাংলাদেশ।

তবে মাশরাফি, রুবেল,শফিউল, রাজ্জাক ও সাকিব আল হাসানের নিয়ন্ত্রিত বোলিংয়ে লক্ষ্যমাত্রা থেকে ৫ রান দূরে থাকতেই অলআউট হয়ে যায় ইংল্যান্ড। এরই সাথে বাংলাদেশ পেয়ে যায় ইংল্যান্ডের বিপক্ষে প্রথম কোন ওয়ানডে ম্যাচ জয়।

২০০৪ সালের চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফির কথা বাদ দিলে ইংল্যান্ডের মাটিতে খেলতে গিয়ে কোনবারই খালি হাতে ফেরা হয়নি বাংলাদেশের। তার ব্যত্যয় ঘটেনি চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফির এবারের আসরেও। প্রথম ম্যাচে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে হারার পর দ্বিতীয় ম্যাচেও যখন হার নিশ্চিত ঠিক তখন কেঁদে দেয় ওভালের আকাশ। বৃষ্টিতে ধুয়ে যায় বাংলাদেশ-অস্ট্রেলিয়া ম্যাচ।

ফলে নিশ্চিত হার থেকে বেঁচে যাওয়া বাংলাদেশ ১ পয়েন্ট পেয়ে টুর্নামেন্টে টিকে থাকে। এই এক পয়েন্টও হয়ত তাদের টিকে থাকার জন্য যথেষ্ট হত না যদি না এর আগে বৃষ্টিতে অস্ট্রেলিয়া-নিউজিল্যান্ড ম্যাচ পরিত্যক্ত হতো। অবশ্যই জিততে হবে এমন সমীকরণ মাথায় রেখে গ্রুপপর্বে নিজেদের তৃতীয় ম্যাচে মাঠে নামে বাংলাদেশ। দীর্ঘ প্রায় ১২ বছর পর পয়মন্ত কার্ডিফের সোফিয়া গার্ডেন্সে বাংলাদেশের প্রতিপক্ষ নিউজিল্যান্ড।

১২ বছর পরে এসেও এদিন কার্ডিফ ভুলেনি বাংলাদেশকে, দিয়েছে দু'হাত ভরে। ম্যাচে সাকিব, রিয়াদের অসামান্য দক্ষতায় নিউজিল্যান্ডকে হারিয়ে কার্ডিফে নিজেদের শতভাগ জয়ের রেকর্ড গড়ে বাংলাদেশ। এই ম্যাচে নিউজিল্যান্ডের সামনেও জয় ছাড়া বিকল্প কোন পথ ছিল না। তাদের ইনিংসের শেষদিকে মোসাদ্দেকের স্পিন ভেলকিতে একসময় বড় একটি স্কোর গড়তে যাওয়া নিউজিল্যান্ড বাংলাদেশের সামনে ২৬৬ রানের লক্ষ্যমাত্রা দাঁড় করায়।

মাত্র ৩৩ রানে তামিম,সৌম্য,সাব্বির ও মুশফিকের উইকেট খুইয়ে বাংলাদেশ পড়ে যায় বিপাকে। তবে দলের এই বিপর্যয় সামাল দেন সাকিব আল হাসান ও মাহমুদুল্লাহ রিয়াদ। ৫ম উইকেট জুটিতে ২২৪ রান তুলে দলকে জয়ের ঘাটে নোঙ্গড় ফেলতে সাহায্য করেন এই দুই অভিজ্ঞ ব্যাটসম্যান।

সাকিব আল হাসান করেন ১১৪ রান ও মাহমুদুল্লাহ রিয়াদ ১০২ রানে অপরাজিত থেকে মাঠ ছাড়েন। এ জয়ের পরদিন অস্ট্রেলিয়া ইংল্যান্ডের বিপক্ষে হেরে যাওয়ায় নিশ্চিত হয়ে যায় চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফির সেমিফাইনালে বাংলাদেশের খেলার বিষয়টি। ওহ! নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে জয়ের ব্যবধানই তো বলা হয়নি।

২০০৫ সালে কার্ডিফে অস্ট্রেলিয়াকে যে ব্যবধানে পরাজিত করেছিলো এবারও কার্ডিফে এসে সেই একই ব্যবধানে নিউজিল্যান্ডকে হারিয়েছে বাংলাদেশ অর্থাৎ ৫ উইকেটে। তবে এ জয়কে ২০০৫ সালের অস্ট্রেলিয়া বধের মত আপসেট বলতে নারাজ ক্রিকেটপন্ডিতগণ। কারণ এই বাংলাদেশ যে সেই আগের বাংলাদেশ নেই এখন!

২০১৭ চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফির মিশন বর্তমানে অব্যাহত রয়েছে বাংলাদেশের। বাংলাদেশের সামনে এখন সেমিফাইনালের চ্যালেঞ্জ। ম্যাচটি হবে বার্মিংহামে। হতে পারে এ ম্যাচে পূর্বের ন্যায় আবারো ইংল্যান্ডের মাটিতে বাংলাদেশের আরেকটি জয়গাঁথা রচিত হতে যাচ্ছে এবং সে জয় মঞ্চস্থ করার জন্য অধীর আগ্রহে মুখিয়ে আছে বার্মিংহামের এজবাস্টন স্টেডিয়াম।

Category : ফিচার
Share on your Facebook
Share this post