মিরাজ কিন্তু অলরাউন্ডার

উদয় সিনা
জানুয়ারী ১১, ২০১৭
 ভুলে গেলে চলবে না - মিরাজ কিন্তু অলরাউন্ডার! ভুলে গেলে চলবে না - মিরাজ কিন্তু অলরাউন্ডার!

ফার্স্ট ক্লাস ক্যারিয়ারে ১৪ ম্যাচে ৩১.১১ গড়ে পাঁচটি হাফ সেঞ্চুরিসহ রান করেছেন ৫২৯। ব্যাটিংয়ের চেয়ে বোলিংটা আরো বেশি ভাল। সমপরিমাণ ম্যাচে সংগ্রহ করেছে ৬০ টি উইকেট। এর মধ্যে রয়েছে দুইবার ১০ উইকেট ও ৬ বার ৫ উইকেট নেয়ার কীর্তি। ফার্স্ট ক্লাস ক্যারিয়ারের এই পরিসংখ্যানগুলো স্পষ্ট বলে দিচ্ছে যে মেহেদি হাসান মিরাজ একজন অলরাউন্ডার।

 মেহেদি হাসান মিরাজের নাম নিলেই স্মৃতির কোটরে ভেসে ওঠে অনূর্ধ্ব ১৯ দলে খেলা সেই অধিনায়ক মিরাজের কথা যিনি ব্যাটে-বলে অসাধারণ পারফর্ম করে দলকে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। সর্বশেষ অনূর্ধ্ব ১৯ বিশ্বকাপে তাঁর হাত ধরে শিরোপার স্বপ্ন দেখেছিলো বাংলাদেশ। কিন্তু সে স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে না পারলেও পুরো টুর্নামেন্টজুড়ে মিরাজ ছিলেন অপ্রতিরোধ্য। বিশ্বকাপে ৬ ম্যাচে ৬০.৫০ গড়ে মিরাজের সংগ্রহ ২৪২ রান।

ব্যাট হাতে টানা চার ইনিংসে অর্ধশতক হাকিয়ে বিশ্ব ক্রিকেটকে তাক লাগিয়ে দিয়েছিলেন তিনি। বোলার হিসেবে মিরাজের সংগ্রহ ছিল ১২ উইকেট। যে কারণে অধিনায়ক হিসেবে বিশ্বকাপের ট্রফি মিরাজের হাতে না উঠলেও টুর্নামেন্টসেরার ট্রফিটি কিন্তু ঠিকই উঠেছিল তাঁর হাতে।

এমন অলরাউন্ড পারফরম্যান্সে ফার্স্ট ক্লাস ক্রিকেট ও অনূর্ধ্ব ১৯ দলের চৌকাঠ মাড়িয়ে জাতীয় দলের চৌহাদ্দিতে প্রবেশাধিকার পান মিরাজ। বয়সভিত্তিক দলের সবগুলো সিড়ি পেরিয়েই জাতীয় দলে এসেছেন তিনি। সর্বশেষ ইংল্যান্ডের বিপক্ষে টেস্ট সিরিজে প্রথমবারের মত জাতীয় দলের হয়ে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট খেলার সুযোগ পেয়েছিলেন মেহেদি হাসান মিরাজ। সুযোগটা বেশ ভালভাবেই কাজে লাগান তিনি।

অভিষেকটাও হয়েছিল একপ্রকার বাধিয়ে রাখার মত। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ১ম টেস্টে ১ম দিনে চতুর্থ সর্বকনিষ্ঠ ক্রিকেটার হিসেবে অভিষেকে মিরাজ তুলে নেন ৫ উইকেট এবং সবমিলিয়ে ৬ উইকেট। অভিষেকে চমকে দেয়া মিরাজ পারফরম্যান্সের ধারাবাহিকতা ধরে রেখেছিলেন দ্বিতীয় ম্যাচেও। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে দ্বিতীয় টেস্টের প্রথম ইনিংসে মিরাজ আবারো তুলে নেন ছয় উইকেট।

প্রথম বাংলাদেশি এবং আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ২৪ তম ক্রিকেটার হিসেবে প্রথম দুই টেস্টে ৫ উইকেট নেয়ার এ কীর্তি গড়েন মিরাজ। তবে টেস্ট ইতিহাসে তিনিই প্রথম অফ স্পিনার হিসেবে প্রথম দুই টেস্টে ৫ উইকেট নিয়েছেন। দ্বিতীয় টেস্টের দ্বিতীয় ইনিংসে ক্যারিয়ারের তৃতীয়বারের মত ৬ উইকেট নিজের পকেটে পুড়েন মিরাজ। এর ফলে ভারতের নরেন্দ্র হিরোয়ানির পর দ্বিতীয় বোলার হিসেবে ক্যারিয়ারের প্রথম দুই টেস্টে তিনবার ৬ বা তার বেশি উইকেট পান মিরাজ।

ইংল্যান্ডের বিপক্ষে টেস্ট সিরিজের পুরোটাই ছিল মিরাজময়। আন্তর্জাতিক ক্রিকেট ক্যারিয়ার শুরু করেছেন বল হাতে দুর্দান্ত পারফর্ম করে। নিজের স্পিন ঘূর্ণিতে তুর্কি নাচন নাচিয়েছেন ইংল্যান্ডের সিংহভাগ ব্যাটসম্যানকে। ডানহাতি স্পিন ভেলকিতে অভিষেক দুই ম্যাচে তিনি তুলে নেন ১৯ টি উইকেট। ১৯ উইকেটের মধ্যে পাঁচ উইকেট নেন ৩ বার। সেই সাথে সিরিজ সেরা পুরস্কারও নিজের দখলে নিয়ে যান মিরাজ।

এই গেল বোলার মিরাজের কথা। ব্যাটসম্যান মিরাজের কথাও তো বলতে হয় যেহেতু মিরাজ একজন অলরাউন্ডার। তবে ইংল্যান্ড সিরিজের প্রেক্ষাপটে ব্যাটসম্যান মিরাজের কথা কম বলাই শ্রেয়। কারণ বল হাতে তিনি যতটা উজ্জ্বল ছিলেন ব্যাট হাতে ছিলেন ততটাই নিষ্প্রভ। দুই টেস্টে মিরাজের ব্যাট থেকে এসেছে মাত্র ৫ রান। এই পারফরম্যান্সে অবশ্য বুঝার উপার নেই যে তিনি একজন অলরাউন্ডার।

ফার্স্ট ক্লাস ক্রিকেট ও বয়সভিত্তিক দলে নিয়মিত অলরাউন্ড পারফর্ম করা মিরাজকে এখন পর্যন্ত খুঁজে পাওয়া যায় নি জাতীয় দলে। সর্বশেষ ইংল্যান্ড সিরিজে জাতীয় দল ও মিরাজের অভাবনীয় পারফরম্যান্সের নিচে চাপা পড়ে যায় মিরাজের ব্যাটিং ব্যর্থতা। অবশ্য এতে মিরাজের কিছুই করার নেই। কারণ তাকে যে বোলার হিসেবেই দলে নেয়া হয়েছিল!

ইংল্যান্ডের বিপক্ষে টেস্ট সিরিজে মেহেদি হাসান মিরাজকে একজন স্পেশালিস্ট  স্পিনার হিসেবেই দলে রাখে টিম ম্যানেজমেন্ট। কারণ ইংল্যান্ডের টেস্টে স্কোয়াডে বেশ কয়েকজন বাহাতি ব্যাটসম্যান ছিল। তাদের জন্য সারপ্রাইজ প্যাকেজ হিসেবেই মিরাজকে এক প্রকার সংরক্ষণ করে রাখা হয়েছিল। যে কারণে ইংল্যান্ড সিরিজের আগে আফগানিস্তানের বিপক্ষে ওয়ানডে সিরিজে মিরাজকে চূড়ান্ত স্কোয়াডে রাখা হয়নি।

আর বোলার মিরাজও তাঁর দায়িত্বটুকু যথাযথভাবে পালন করেন। সাধারণত মিডল অর্ডারে ব্যাটিং করলেও ইংল্যান্ড সিরিজে মিরাজ ব্যাটিং করে লোয়ার অর্ডারে। সিরিজে ৮ নাম্বারে ব্যাটিং করে ৪ ইনিংসে মিরাজ সংগ্রহ করেন মাত্র ৫ রান। তবে এতে তাঁর কিছুই করার ছিল না। সিরিজ শুরুর আগে তাকে স্পিনার হিসেবে সম্পূর্ণভাবে প্রস্তুত করা হয়েছিল। যে কারণে নেটে শুধু বল করেই সময় পার করতে হতো মিরাজকে, ব্যাটিংয়ের সুযোগ পেতেন না। আর কোন রকম প্রস্তুতি ছাড়া অভিষেক সিরিজে মিরাজের এমন ব্যাটিংয়ে অবাক হবার মত কিছুই ছিল না।

আগামিকাল থেকে শুরু হচ্ছে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে বাংলাদেশের টেস্ট সিরিজ। ইংল্যান্ড সিরিজের আগে কন্ডিশন ও প্রতিপক্ষের দুর্বল দিক বিবেচনায় মিরাজকে শুধু বোলার হিসেবে ব্যবহার করার সিদ্ধান্তটা খুব একটা ভুল ছিল না। তবে নিউজিল্যান্ড সিরিজে মিরাজকে আগের মত শুধু বোলার হিসেবে ব্যবহার করলে ভুল হবে। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে সিরিজে আমাদের লোয়ার অর্ডারের ব্যাটসম্যানদের ব্যর্থতা যথেষ্ট ভুগিয়েছিল।

নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে টেস্ট সিরিজে সিমিং কন্ডিশনে আমাদের ব্যাটসম্যানদের কঠিন পরীক্ষা দিতে হবে। যদি কোন কারণে ওয়ানডে ম্যাচগুলোর মত টেস্ট ম্যাচেও টপ অর্ডার ও মিডল অর্ডার ব্যর্থ হয় তাহলে দলীয় ইনিংসকে একটা ভালো অবস্থানে নিয়ে যাওয়ার দায়িত্ব নিতে হবে দলের লোয়ার অর্ডার ব্যাটসম্যানদেরই। সেদিক থেকে চিন্তা করে এবার অন্তত মিরাজকে ব্যাটসম্যান হিসেবে ব্যবহার করা এবং নেটে ব্যাটিং অনুশীলনটাও করানো দরকার।

যদি কোন কারণে আমাদের টপ অর্ডার ও মিডল অর্ডার কলাপ্স করে তাহলে কিন্তু মিরাজই হয়ে উঠতে পারেন আমাদের তুরুপের তাস। কারণ মিরাজ দলে ৮ নম্বরে ব্যাটিং করে এবং দায়িত্ব নিয়ে ব্যাটিং করার উদাহরণ এর আগেও আমরা দেখেছি। প্রয়োজন শুধু সুযোগের। তাকে অবশ্যই নেটে ব্যাটিংয়ের সুযোগ করে দেয়া দরকার।

এর আগে ২০০৮ সালে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে হোম সিরিজে দলের প্রয়োজনে সাকিব আল হাসানকে স্পেশালিস্ট বোলার হিসেবে খেলাতে দেখা গিয়েছিল কোচ জেমি সিডন্সকে। কিন্তু পরে আবারো অলরাউন্ডার হিসেবে তাকে তাঁর দায়িত্বটা বুঝিয়ে দেয়া হয়। তাই নিউজিল্যান্ড সিরিজে দলের প্রয়োজনে মিরাজকে শুধু বোলার হিসেবে নয়, ব্যাটসম্যান হিসেবে ব্যবহার করা হোক।

কারণ, ভুলে গেলে চলবে না - মিরাজ কিন্তু অলরাউন্ডার!

Category : ফিচার
Share on your Facebook
Share this post