এবার শুধুই ব্যাটসম্যান ধোনিকে দেখার অপেক্ষা

সঞ্জয় পার্থ
জানুয়ারী ৯, ২০১৭
ধোনি প্রমাণ করেছেন, অধিনায়কত্ব তাঁর কাছে চাপ নয়, বরং অনুপ্রেরণার আরেক নাম! ধোনি প্রমাণ করেছেন, অধিনায়কত্ব তাঁর কাছে চাপ নয়, বরং অনুপ্রেরণার আরেক নাম!

গত বছরের শুরুর দিকের কথা মনে আছে? ইংল্যান্ডের সাথে ডাবল সেঞ্চুরি করা সত্ত্বেও অধিনায়কত্ব ছেড়ে দিলেন হাশিম আমলা। কারণ হিসেবে বলেছিলেন, নিজের ব্যাটিংয়ে আরও বেশি করে মনোনিবেশ করার জন্যই অধিনায়কত্ব ছেড়েছেন। কেবল আমলা নন, এরকম আরও অনেকেই আছেন, নিজের পারফরম্যান্সের জন্য যারা অধিনায়কত্ব ছেড়ে দেন।

অধিনায়কত্বকে তারা বাড়তি একটা চাপ বলে মনে করেন, যার কারণে তাদের ব্যাটিং বা বোলিং পারফরম্যান্সে নেতিবাচক প্রভাব পরতে পারে। চাইলে তারা মহেন্দ্র সিং ধোনির দিকে তাকাতে পারেন। ভারতের অন্যতম সফল অধিনায়কদের একজন ধোনি, তবে শুধু ট্রফি বা সিরিজ জিতে নয়, ধোনি নিজের অধিনায়কত্ব পর্ব রাঙ্গিয়েছেন নিজের ব্যাটিং দিয়েও। এত চাপের মধ্যে অধিনায়কত্ব করেও মরিচা পরতে দেননি নিজের ব্যাটিংয়ে, বরং অধিনায়ক থাকা কালে আরও শাণিত হয়েছে তাঁর ব্যাট।

২০০৭ সালে অধিনায়কত্ব গ্রহণের পর ভারতকে ১৯৯ টি ওয়ানডেতে নেতৃত্ব দিয়েছেন ধোনি। ৯ বছরের এই অধিনায়কত্ব পর্বে নিজের ব্যাটিং নিয়ে দারুণ ধারাবাহিকই ছিলেন ধোনি, যার প্রমাণ দেবে তাঁর ব্যাটিং এভারেজ। অধিনায়ক থাকা কালে ধোনির ব্যাটিং এভারেজ ৫৩.৯২, লোয়ার মিডল অর্ডারে ব্যাট করেও এই গড়ে টানা রান করে যাওয়া এককথায় দুর্দান্তই বলতে হবে।

২০০৭ থেকে ২০১৫ পর্যন্ত প্রতি ক্যালেন্ডার ইয়ারে ধোনির এভারেজ ৪০+ ছিল। সর্বোচ্চ ছিল ২০০৯ সালে, ৭০.৪৭। আর সর্বনিম্ন ছিল ২০০৭ সালে, ৪০.১১। ২০১২ এবং ২০১৩ তেও ধোনির গড় ছিল ৬০-এর ঘরে, আর ২০০৮, ২০১১ ও ২০১৪ তে ছিল ৫০ এর ঘরে। ২০১৬ তে অবশ্য বেশ নিষ্প্রভই ছিলেন ধোনি, ১০ ইনিংসে মাত্র ২৭৮ রান করেছেন, ৫০ পার হয়েছেন মোটে এক বার।

তারপরেও, ওয়ানডেতে অধিনায়ক থাকাকালীন সময়ে ও না থাকাকালীন সময়ে ধোনির ব্যাটিং গড়ের পার্থক্য ৯.৭০। অধিনায়ক হিসেবে ও সাধারণ ব্যাটসম্যান হিসেবে অন্তত ২০০০ রান করেছেন এমন ব্যাটসম্যানদের মধ্যে ধোনির চেয়ে এদিক থেকে ভালো রেকর্ড আছে আর একজনেরই, এ.বি.ডি ভিলিয়ার্স। অধিনায়ক থাকাকালে ভিলিয়ার্সের ব্যাটিং গড় ৬৫.৯২, আর অধিনায়ক না থাকাকালে ৪৫.৬৯, পার্থক্য ২০.২৩।

অনেকে অবশ্য বলতে পারেন লোয়ার মিডল অর্ডারে ব্যাট করেন বলে প্রায়ই অপরাজিত থেকে ইনিংস শেষ করেন, ধোনির গড় তো বেশি হবেই। কিন্তু ক্যারিয়ারের শুরুর দিকে, যখন ধোনি অধিনায়ক ছিলেন না, তখনো কিন্তু তাঁর গড় যথেষ্টই ভালো ছিল। অধিনায়ক না থাকাকালে ধোনির নট আউট পারসেন্টেজ ছিল ২৫%, অধিনায়ক হওয়ার পর সেটা বেড়ে দাঁড়ায় ২৮% এ।

ধোনি-ডি ভিলিয়ার্সরা যে বিরল প্রজাতির অধিনায়ক তা প্রমাণিত হবে আরও কিছু তথ্যে। ইতিহাসের অন্যতম সেরা কিছু ব্যাটসম্যান যখন অধিনায়ক ছিলেন তখন তাঁদের ব্যাটিং গড় উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গিয়েছিল। অনেকেই ওয়ানডে ক্রিকেটের সেরা ব্যাটসম্যান বলে মেনে থাকেন স্যার ভিভ রিচার্ডসকে, সেই স্যার ভিভের অধিনায়ক থাকার সময় ব্যাট হাতে পারফরম্যান্স ছিল বড্ড মলিন। অধিনায়ক না থাকার সময় তাঁর গড় ছিল ৫৭.৩৯, অধিনায়ক হওয়ার পর তা কমে দাঁড়ায় ৩৮.৮১ তে!

অধিনায়ক অবস্থায় ৯১ ইনিংসে যত রান করেছেন, অধিনায়ক না থাকার সময় ৭৬ ইনিংসে তার চেয়ে বেশি রান করেছেন! একই অবস্থা সমসাময়িক দুই সেরা ব্যাটসম্যান শচীন টেন্ডুলকার আর ব্রায়ান লারারও। অধিনায়ক না থাকা অবস্থায় শচীনের গড় ৪৬.১৬, আর অধিনায়ক থাকা অবস্থায় ৩৭.৭৫। লারার ক্ষেত্রে যথাক্রমে ৪৩.৬৬ আর ৩৫.৮২। এমনকি অধিনায়ক হিসেবে যার সাথে ধোনির তুলনা চলে, সেই সৌরভ গাঙ্গুলীও কিন্তু অধিনায়ক হিসেবে ব্যাট হাতে কম সফল ছিলেন।   

মাইকেল বেভানের পর ধোনিকেই এই সময়ের সেরা ফিনিশার রূপে মানা হয়। কথাটা যে ভুল কিছু না, তার সাক্ষ্য দেবে পরিসংখ্যান। সফল রান তাড়া করার ক্ষেত্রে অধিনায়ক হিসেবে সর্বোচ্চ ২৬ বার অপরাজিত থেকেছেন ধোনি, যেকোনো অধিনায়কের জন্য যা সর্বোচ্চ।

দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ২২ বার অপরাজিত থেকেছেন অর্জুনা রানাতুঙ্গা। ৫ ও ৬ নম্বরে ব্যাট করতে নেমে অধিনায়ক হিসেবে সবচেয়ে বেশি রানের মালিকও এই দুজন। অধিনায়ক হিসেবে সবচেয়ে বেশি বার ম্যান অফ দ্য ম্যাচ জেতার তালিকার সেরা দুইয়েও আছেন এই দুজন, রানাতুঙ্গা জিতেছেন ১৯ বার, ধোনি ১৫ বার। জয়াসুরিয়া আর পন্টিংও জিতেছেন ১৯ বার করে।

টি-টোয়েন্টিতে অধিনায়ক ধোনির ব্যাট হাতে পারফরম্যান্স আরও দারুণ। অধিনায়ক হিসেবে টি-টোয়েন্টিতে সবচেয়ে বেশি রানের মালিক ধোনি (১১১২ রান)। তবে আশ্চর্যের ব্যাপার, ৭৩ ম্যাচের টি-টোয়েন্টি ক্যারিয়ারে এখনো পর্যন্ত এক বারও ম্যান অব দ্য ম্যাচের পুরষ্কার জিততে পারেননি ধোনি!

তারপরেও নেতৃত্বগুণে ঠিকই ভারতকে এনে দিয়েছেন টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের শিরোপা। আর ওয়ানডেতে ২৩ বছর পর বিশ্বকাপ জিতিয়ে তো ইতিহাসের অংশই হয়ে গেছেন তিনি। ওয়াংখেড়ে স্টেডিয়ামের সেই ফাইনালে ম্যাচ জেতানো অপরাজিত ইনিংস খেলেই ধোনি প্রমাণ করেছেন, অধিনায়কত্ব তাঁর কাছে চাপ নয়, বরং অনুপ্রেরণার আরেক নাম!

এবার অধিনায়কত্ব ছাড়ার পর দলে উইকেটরক্ষণের বাইরে ধোনির ভূমিকা শুধুই একজন ব্যাটসম্যান। ক্রিকেট বিশ্ব এখন শুধুই ব্যাটসম্যান ধোনিকে দেখার অপেক্ষায় দিন গুনছে।

Category : ফিচার
Share this post