৪০ বছরে বাংলাদেশ ক্রিকেট

উদয় সিনা
জানুয়ারী ৭, ২০১৭
  আজ বিশ্ব ক্রিকেটে বাংলাদেশের ৪০ বছর পূর্ণ হলো।   আজ বিশ্ব ক্রিকেটে বাংলাদেশের ৪০ বছর পূর্ণ হলো।

একুশ শতকে বাংলাদেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় খেলা যে ক্রিকেট তাতে কারো দ্বিমত পোষণ করার কথা নয়। তাহলে লেখার শুরুতে এত ঘটা করে কেন তা বলা! বলতেই হয় কেননা একটা সময় জনপ্রিয়তা তো দূরে থাক, এদেশে পরিচিতিই লাভ করেনি ক্রিকেট।

তখন পুরো বিশ্বের মত দেশেও সবচেয়ে আলোচিত ছিল ফুটবল; জনপ্রিয় ছিলেন ফুটবলাররা। আজকের মাশরাফি, তামিম, সাকিবদের মত তখন দেশের পোস্টার বয় ছিলেন জাকারিয়া পিন্টু, কায়সার হামিদ, কাজী সালাউদ্দিনরা।

সত্তর দশকে বাংলাদেশে ফুটবলই ছিল গণমানুষের প্রাণের খেলা। তখন মানুষের আবেগের একটি বড় অংশ জুড়ে অবস্থান করত ফুটবল। দল বেধে মানুষ মাঠে যেত ফুটবল ম্যাচ দেখতে। হোক জাতীয় দলের খেলা বা লিগ ফুটবল, স্টেডিয়াম থাকত কানায় কানায় পরিপূর্ণ।

বেশিরভাগ সময়ই গ্যালারিতে দর্শকদের ঠাঁই দিতে বিপাকে পড়তে হতো কর্তৃপক্ষকে। ফুটবলের এমন স্বর্ণালি সময়ে এদেশে অবির্ভাব ঘটে ক্রিকেট নামের নতুন ও অপরিচিত একটি খেলার। ক্রিকেটকে পুরো দেশে ছড়িয়ে দিতে ও খেলাটির প্রতি মানুষের আগ্রহ বাড়াতে ১৯৭২ সালে গঠিত হয় বাংলাদেশ ক্রিকেট কনট্রোল বোর্ড (বিসিসিবি) যা বর্তমানে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) নামে পরিচিত।

ক্রিকেটের প্রতি মানুষের আগ্রহ বাড়াতে একই বছর ঢাকা ও চট্টগ্রামে একটি ক্রিকেট লিগ আয়োজন করে বিসিসিবি যা একটি বিরাট ধাক্কা হিসেবে আবির্ভূত  হয় তাদের সামনে। কারণ লিগটি ক্রিকেটের প্রতি দর্শকদের উৎসাহ জোগাতে পুরোপুরি ব্যর্থ হয়। তবে সময় বাড়ার সাথে সাথে ক্রিকেট খেলাটি বাংলাদেশে পরিচিতি লাভ করতে শুরু করে যার শুরুটা হয় ১৯৭৭ সালে।

১৯৭৭ সালের সাত জানুয়ারি। বরাবরের মতই বাংলাদেশে তখন হাড় কাপানো শীতের প্রকোপ। এমন শীতে দেশের মানুষদের একটু উত্তাপের দরকার ছিল যা বয়ে আনে ক্রিকেট।

বর্তমানে বাংলাদেশের খেলার দিন মিরপুরের শেরে বাংলা জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়ামে মানুষের যে ঢল দেখা যায় তা ঠিক ৪০ বছর আগে দেখা গিয়েছিল ঢাকা স্টেডিয়ামে (বর্তমান বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়াম)।

সেদিন প্রচুর দর্শক সমাগম হয়েছিল ঢাকা স্টেডিয়ামে। তখনকার প্রেক্ষাপটে কোন ক্রিকেট ম্যাচে দর্শকদের এমন সরব উপস্থিতি অনেকটা অবাক হওয়ার মতই ছিল। সেদিন প্রায় ৯০ হাজার দর্শকের কলরবে মুখরিত ছিল ঢাকা স্টেডিয়াম। কারণ সেদিন যে ছিল ক্রিকেট ইতিহাসে বাংলাদেশের প্রথম ম্যাচ!

ম্যাচটি ছিল বাংলাদেশ বনাম মেরিলিবোন ক্রিকেট ক্লাবের মধ্যকার তিন দিনের প্রথম শ্রেণির ম্যাচ। ১৯৭৬ সালের ২৭ ডিসেম্বর টেড ক্লার্কের নেতৃত্বে ঢাকায় পা রাখে ইংল্যান্ডের মেরিলিবোন ক্রিকেট ক্লাব (এমসিসি)।

বাংলাদেশের বিপক্ষে মূল ম্যাচটি খেলার আগে রাজশাহী ও চট্টগ্রামে যথাক্রমে নর্থ জোন ও ইস্ট জোনের বিপক্ষে তাঁরা দুই দিনের দুটি ম্যাচ খেলেছিল। আর বাংলাদেশের বিপক্ষে ম্যাচের পর যশোরে সাউথ জোনের সাথে দুই দিনের ম্যাচ খেলে বাংলাদেশ সফর শেষ করে মেরিলিবোন ক্রিকেট ক্লাব।   

১৯৭৭ সালের সাত জানুয়ারি তিন দিনের টেস্ট খেলতে মাঠে নামে বাংলাদেশ ও এমসিসি। টস করতে আসেন বাংলাদেশের অধিনায়ক শামিম কবির ও এমসিসির অধিনায়ক টেড ক্লার্ক। টসের আগে শামিম কবির অবশ্য সিদ্ধান্ত নিয়ে রেখেছিলেন যে টসে জিতলে আগে ব্যাটিং নিবেন।

যেই ভাবনা সেই কাজ। শামিম কবির জিতলেন টসে এবং আগে ব্যাটিং করার সিদ্ধান্তও নিলেন। নয়টা ৪৫ মিনিটে ম্যাচ পরিচালনার জন্য মাঠে নামেন দুই আম্পায়ার রেযা-ই-করিম ও আলতাফ হোসেন।

বাংলাদেশের হয়ে ইনিংস ওপেন করেন অধিনায়ক শামিম কবির ও রকিবুল হাসান। শুরু হয় ক্রিকেটে বাংলাদেশের পথচলা। শামিম কবির ও রকিবুল হাসান দেখেশুনে খুব সাবধানতার সাথে ইনিংসটি শুরু করেছিলেন। তাঁরা যখন আস্তে আস্তে ইনিংস বিল্ড আপ করা শুরু করেন ঠিক তখনই আঘাত হানে এমসিসি।

এমসিসির পেসার মার্টিন ভারননের বলে আউট হয়ে যান ওপেনার রকিবুল হাসান। তারপর নিয়মিত বিরতিতে উইকেট হারাতে থাকে বাংলাদেশ। এক পর্যায়ে স্কোরবোর্ডে ১৪৫ রান যোগ করতে বাংলাদেশ হারিয়ে ফেলে ৬ উইকেট।

তবে ব্যাটিং ধসের ধাক্কাটা সেদিন সামলেছিলেন বাংলাদেশের অলরাউন্ডার ইউসুফ বাবু। দলকে একটি ভালো পজিশনে নিয়ে যাওয়ার দায়িত্ব একাই তুলে নেন নিজের কাঁধে। পুরো ইনিংসজুড়েই তিনি চড়াও হয়ে খেলেছিলেন এমসিসির বোলারদের ওপর। প্রথম দিন শেষে ইউসুফ বাবু অপরাজিত ছিলেন ৬০ রানে।

দ্বিতীয় দিনের শুরুতে ৭৮ রানে আউট হয়ে যান তিনি। ইউসুফ বাবু দলের সংকটপূর্ণ মুহূর্তে দৌলতুজ্জামান ও এস এম ফারুকের সাথে পৃথক দুটি ভালো জুটি গড়েন যা পরবর্তীতে বাংলাদেশকে একটি ভালো সংগ্রহ পেতে সাহায্য করে। নয় উইকেট হারিয়ে ২৬৬ রান করে প্রথম ইনিংস ঘোষণা করে বাংলাদেশ। বাংলাদেশের হয়ে শামিম কবির ৩০, এস এম ফারুক ৩৫ ও ওমর খালেদ রুমি করেন ২৮ রান। এমসিসির ডেন পিচাউড ৩৮ রানে তুলে নেন ৩ উইকেট।

বাংলাদেশের ২৬৬ রানের বিপরীতে প্রথম ইনিংসে ব্যাটিং করে এমসিসি লিড পায় ৮১ রানের। মাইকেল মেন্সের অপরাজিত ৭৫, মিক নরমানের ৭৪ ও জন বার্কলের ৬৫ রানের সুবাদে সবগুলো উইকেট হারিয়ে এমসিসির সংগ্রহ ৩৪৭ রান।

ব্যাটিংয়ের পর বল হাতেও বাংলাদেশের উজ্জ্বল পারফর্মার ইউসুফ বাবু। মাত্র ৩৭ রানে ৪ উইকেট তুলে নিয়ে এমসিসির রানের চাকা আটকে রাখতে সাহায্য করেন তিনি। তাছাড়া দৌলতুজ্জামান নেন ৬৭ রানে ৩ উইকেট।

৮১ রানে পিছিয়ে থেকে দ্বিতীয় ইনিংসে ব্যাটিংয়ে নেমে শামিম কবিরের ২৫ ও ওমর খালেদ রুমির ৩২ রানে ৬ উইকেট হারিয়ে বাংলাদেশ করে ১৫২ রান। সেইসাথে নিজেদের খেলা প্রথম ম্যাচটি ড্র করে বাংলাদেশ।

বাংলাদেশ যে এখন বিশ্ব ক্রিকেটে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে তার ভিতটা মূলত তৈরি করে দিয়েছিল ১৯৭৭ সালের এমসিসির বিপক্ষে বাংলাদেশের সেই ম্যাচটি। বাংলাদেশের ক্রিকেটে এই ম্যাচটির মাহাত্ম্য অনেক।

এই ম্যাচের মাধ্যমেই বাংলাদেশ ক্রিকেটের ভবিষ্যতের বীজ বপন হয়েছিল। কারণ এই ম্যাচটিই পরবর্তীতে ইন্টারন্যাশনাল ক্রিকেট কনফারেন্সের (বর্তমান ইন্টারন্যাশনাল ক্রিকেট কাউন্সিল) সহযোগী সদস্যপদ পেতে বাংলাদেশকে সাহায্য করেছিল।

১৯৭৬ সালের মে মাসে বাংলাদেশে এসে খেলার জন্য এমসিসিকে প্রথম প্রস্তাব পাঠানো হয়। একই বছরের জুন মাসে ইন্টারন্যাশনাল ক্রিকেট কনফারেন্স বাংলাদেশকে সহযোগী সদস্য বানানোর ব্যাপারে আলোচনা করে এবং এমসিসির বিপক্ষে বাংলাদেশের ম্যাচের দিকে তাকিয়ে থাকে। তারপর এমসিসির বিপক্ষে বাংলাদেশের পারফরম্যান্সে ১৯৭৭ সালের ২৬ শে জুন ইন্টারন্যাশনাল ক্রিকেট কনফারেন্স বাংলাদেশকে তাদের সহযোগী সদস্য হিসেবে ঘোষণা করে।

আজ বিশ্ব ক্রিকেটে বাংলাদেশের ৪০ বছর পূর্ণ হলো। আজকের এই দিনে তাই শ্রদ্ধা জানাই মেরিলিবোন ক্রিকেট ক্লাবের বিপক্ষে খেলা বাংলাদেশের প্রতিটি খেলোয়াড়কে। সেদিন থেকে আজ পর্যন্ত বাংলাদেশের হয়ে মাঠে লড়াই করা প্রতিটি ক্রিকেট যোদ্ধাদের প্রতি শ্রদ্ধা।

Category : ফিচার
Share this post