কোলপাক: ক্রিকেটের দারুণ হুমকি

রিমন ইসলাম
জানুয়ারী ৬, ২০১৭
 কোলপাক কোলপাক

ক্রিকেটবিশ্বে সাম্প্রতিক সময়ে সবচেয়ে আলোচিত বিষয় কোলপাক।

বিতর্কিত এই চুক্তির মারপ্যাঁচে সবচেয়ে বেশি ক্ষতির সম্মুখীন দক্ষিন আফ্রিকা। গ্রায়েম স্মিথ, জ্যাক ক্যালিস, মার্ক বাউচার পরবর্তী যুগে এমনিতেই টেস্টে দক্ষিন আফ্রিকা পার করছে কঠিন সময়। গত দুই বছরে অধিনায়কত্বের পালাবদল হয়েছে তিনবার।

টেস্ট র‍্যাংকিংয়ে প্রথম স্থান থেকে নেমে যেতে হয়েছে পঞ্চম অবস্থানে। ঠিক এমনি একটি সময়ে একের পর খেলোয়াড়দের জাতীয় দল থেকে অবসর নিয়ে কাউন্টি খেলতে ইংল্যান্ডে পাড়ি জমানোটা দক্ষিন আফ্রিকান ক্রিকেটের জন্য বড় ধাক্কা। বিশেষ করে ব্যাটসম্যান রাইলি রুশো এবং ফাস্ট বোলার কাইলি অ্যাবটের বিদায় দীর্ঘমেয়াদে দক্ষিন আফ্রিকা বোর্ডকে চিন্তায় ফেলে দিয়েছে। অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে ওয়ানডেতে অস্ট্রেলিয়াকে হোয়াইট ওয়াশ করা সিরিজে দলের সেরা ব্যাটসম্যান ছিলেন রুশো। অন্যদিকে ডেল স্টেইন এবং মরনে মরকেলের অনুপস্থিতিতে তিন ফরমেটেই দলের অন্যতম সেরা বোলার ছিলেন অ্যাবট।

খালি চোখে দেখলে মনে হবে এই দুইজন খেলোয়াড় হয়ত দেশের সাথে বেইমানী করেছেন। জাতীয় দলের হয়ে সুযোগ পেয়েও তা হেলায় হারালেন। তবে পেছনের গল্পটা কিন্তু বলবে অন্য কথা। দক্ষিন আফ্রিকার ক্রিকেট ইতিহাসের সেরা অধিনায়ক গ্রায়েম স্মিথ থেকে শুরু করে হাল সময়ের ডি ভিলিয়ার্স, ডিউ প্লেসিস, বর্ণবৈশ্যম্যের সাথে সবাইকেই লড়তে হয়েছে।

বর্ণবৈষম্যের বিপক্ষে সবচেয়ে বেশি সোচ্চার হয়েছিলেন স্মিথ, তবে কাজের কাজ কিছুই হয়নি। উল্টো ২০১৫ সালে পাশ হয় কৃষ্ণবর্ণের খেলোয়াড় কোটা যাতে সব ফরমেটেই দলে নির্দিষ্ট সংখ্যক কৃষ্ণবর্ণের খেলোয়াড়ক দলে রাখা বাধ্যতামূলক করা হয়। এরই ফলশ্রুতিতে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ওয়ানডে সিরিজে দুর্দান্ত খেলেও শ্রীলংকার বিপক্ষে টেস্ট সিরিজে দলে ডাক পাননি রাইলি রুশো। অথচ ডি ভিলিয়ার্সের অনুপস্থিতিতে রুশো অনায়াসে দলে সুযোগ পাওয়ার দাবিদার ছিলেন। তাকে দলে নিতে হলে জেপি ডুমিনি এবং টেম্বা বাভুমার মধ্যে একজনকে বাদ পড়তে হত। দলের পঞ্চম বোলার এবং ব্যাট হাতে ফর্মে থাকায় ডুমিনিকে বাদ দেয়াটা কার্যত সম্ভব ছিলোনা। অন্যদিকে ফর্ম যেমনি হোক না কেন, কোটা সিস্টেমের মারপ্যাঁচে বাভুমাকে বাদ দেয়াটাও অসম্ভব। অজ্ঞতা বাদ পরে গেলেন রুশোই।

আরেক অভাগা খেলোয়াড় কাইলি অ্যাবট। ২০১৩ সালে টেস্ট অভিষেক হলেও এই চার বছরে খেলতে পেরেছেন মাত্র ১১ টি টেস্ট যার সিংহভাগই আবার ইনজুরির কারনে নিয়মিত বোলারদের ছিটকে যাওয়ার সুবাদে। স্টেইন, মরকেল, ফিলান্ডার, রাবাদাদের সমন্বয়ে দক্ষিন আফ্রিকার বোলিং লাইনআপ সব ফরমেটেই বিশ্বসেরা। এই চারজনই ফিট থাকলে কাকে রেখে কাকে নেবেন এই নিয়েই নির্বাচকদের পড়তে হয় মধুর সমস্যায়। সেখানে অ্যাবট সবসময় ছিলেন ব্যাক আপ বোলার। তাকে বলা হত বিশ্বের সেরা দ্বাদশ ব্যাক্তি কেননা মূল দলের কোন পেসার ইনজুরিতে পড়লেই প্রথম পছন্দ ছিলেন তিনিই।

তবে পারফরমেন্স যত ভালই থাকুক না কেন, তারকা বোলাররা ফিরে আসলে অ্যাবটকেই জায়গা ছেড়ে দিতে হয়েছে বারবার। এর একটি জলজ্যান্ত উদাহারণ গত ওয়ানডে বিশ্বকাপের সেমিফাইনাল। ফিলান্ডারের ইনজুরির সুবাদে সুযোগ পেয়ে আগের ম্যাচগুলোতে খুবই ভাল করছিলেন অ্যাবট। সেমিফানালেও তার খেলাটা ছিল একরকম নিশ্চিত। তবে শেষ মুহূর্তে ফিটনেস টেস্টে ফিলান্ডার উত্তীর্ণ হওয়ায় বিস্ময়করভাবে বাদ পরে যান অ্যাবট। সেই ম্যাচে হেরে বিশ্বকাপ থেকেই ছিটকে পড়ে দক্ষিন আফ্রিকা।

ঘরে বাইরে এ নিয়ে তীব্র সমালোচনা হলেও ক্রিকেট দক্ষিন আফিকা ক্রিকেট বোর্ড নিজেদের প্রনীত নীতিতে এখনো অটল। বিশ্বকাপের অনেকদিন পর ডি ভিলিয়ার্স আকারে ইংগিতে বুঝিয়ে দিয়েছিলেন সেদিন কোটা পূরণ করতেই ফর্মে থাকা অ্যাবটকে বাদ দিয়ে ফিলান্ডারকে একাদশে নেয়া হয়েছিল। পারফরমেন্স নয়, স্রেফ মাঠের বাইরের উদ্ভট নিয়মে বাদ পড়ার চেয়ে একজন খেলোয়াড়ের কাছে হতাশাজনক আর কিইবা হতে পারে।

এতো গেল ওয়ানডের কথা। ধারাবাহিক নৈপুণ্যের পরও দক্ষিন আফ্রিকার টেস্ট দলে এখনো অ্যাবটের জায়গা মোটেও নিশ্চিত নয়। ডেল স্টেইন ইনজুরি থেকে ফিরে আসলেই তিনি বাদ পরে যাবেন। এখানে আবার অ্যাবট হার মানবেন স্টেইনের তারকাখ্যাতির কাছে। একদিকে কোটা সিস্টেম, অন্যদিকে তারকাদ্যুতির প্রাধান্য, অ্যাবটের ভাগ্যটা যেন সবদিক থেকেই অন্ধকারে ঢাকা।

তবুও মনে হতে পারে রুশো এবং অ্যাবট তো বর্তমানে দলে নিয়মিত। তবুও তারা কেন কোলপাক চুক্তিতে গেলেন?

এখানেও পুরো ব্যাপারটি কিছুটা খোলাসা করা প্রয়োজন। ইউরোপের বহিরাগত হওয়ায় দক্ষিণ আফ্রিকার ক্রিকেটারদের পক্ষে কোলপাক চুক্তির আওতায় আসা সম্ভবপর হতো না। তবে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সাথে কোনটুনু নামক এক চুক্তি স্বাক্ষরের মাধ্যমে দক্ষিণ আফ্রিকা, জিম্বাবুয়ে এবং বেশ কিছু ক্যারিবিয়ান দেশও কোলপাক চুক্তির জন্য বিবেচিত হতে পারছে।

দক্ষিণ আফ্রিকার সাবেক ব্যাটম্যান জ্যাক রুডলফ ২০০৭ সালে কোলপাক চুক্তির মাধ্যমে কাউন্টিতে যোগদান করেন। চুক্তি শেষে ২০১১ সালে আবারো জাতীয় দলে ফিরেও আসেন। কোলপাক চুক্তিতে সাক্ষর করার মাধ্যমে একজন খেলোয়াড় তার চুক্তিবদ্ধ ক্লাবকেই প্রাধান্য দিতে বাধ্য থাকেন। তাই স্বাভাবিকভাবেই তার পক্ষে আর জাতীয় দলে আর খেলা সম্ভব হয়ে ওঠেনা। তবে, ক্রিকেট বোর্ড চাইলে কাউন্টি মৌসম ব্যতীত বাকি সময়ের জন্য খেলোয়াড়দের বিবেচনা করতে পারবে। সেক্ষেত্রে নিজ নিজ ক্লাবের কাছ থেকে অনুমতি নিয়ে তারা জাতীয় দলের হয়ে খেলতে পারবেন।

বিতর্কিত ব্রেক্সিট বিল পাশ হলে ইংল্যান্ড ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে বের হয়ে যাবে। তখন কোলপাক চুক্তি আর কার্যকর হবেনা। এ কারণেই বিভিন্ন দেশের খেলোয়াড়দের মধ্যে এই দীর্ঘমেয়াদি কোলপাক চুক্তির হিড়িক পড়ছে। তাছাড়া উভয় খেলোয়াড়ই জানিয়েছেন সিদ্ধান্তটি তারা নিয়েছেন কয়েক মাস আগেই। বোঝাই যাচ্ছে অনেক চিন্তা ভাবনা করেই তারা এমন একটি কঠিন সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

খেলোয়াড়দেরও মাঠের বাইরে জীবন আছে। সেখানে পরিবার নিয়ে স্বচ্চছলভাবে জীবনযাপন করা এবং ভবিষ্যতের কথা ভেবে অনেক সময় তাদেরকেও কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হয়। সেদিক থেকে দেখলে অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ নিয়ে দক্ষিন আফ্রিকায় থাকার চেয়ে কাউন্টিতে ৩-৪ বছর নিয়মিত খেলা, স্বপরিবারে ইংল্যান্ডে বসবাসের সুযোগ এবং অর্থনীতিক নিশ্চয়তা অবশ্যই যৌক্তিক সিদ্ধান্ত। এছাড়াও খেলোয়াড়দের জাতীয় দলে খেলার স্বপ্ন বিসর্জন দেয়ার পেছনে পারিশ্রমিকও একটি বড় ইস্যু। দক্ষিণ আফ্রিকার ঘরোয়া আসরে কাউন্টি ক্রিকেট থেকে অনেক কম পরিমান পারিশ্রমিক প্রদান করা হয়ে থাকে যা খেলোয়াড়দের কোলপাক চুক্তি সাক্ষরের ক্ষেত্রে বড় একটি ভূমিকা পালন করছে।

তারকা খেলোয়াড়দের এভাবে দলে ভিড়িয়ে লাভবান কাউন্টি ক্লাবগুলোও। কাউন্টিতে মাত্র একজন (ন্যাটওয়েস্ট টি-টোয়েন্টি ব্লাস্টে দুইজন) বিদেশী খেলানোর নিয়ম থাকায় কোলপাক চুক্তি ক্লাবগুলোকে নিয়ম ভঙ্গ না করে একের অধিক বিদেশী খেলানোর সুযোগ করে দিচ্ছে। উদাহরণ হিসেবে ধরা যাক আইপিএলের সানরাইজার্স হায়দ্রাবাদকে যাদের দুইজন শীর্ষস্থানীয় বিদেশী খেলোয়াড় ডেভিড ওয়ার্নার এবং মুস্তাফিজুর রহমান। এখন যদি হায়দ্রাবাদকে সুযোগ দেয়া হয় এই দুজনকে দেশি খেলোয়াড় হিসেবে খেলানোর, সেক্ষেত্রে তারা দলে আরো দুইজন অতিরিক্ত বিদেশী যোগ করতে পারবে। ফলে ছয়জন বিদেশী খেললেও কাগজে কলমে ধরা হবে চারজনকে।

বিরূপ পরিস্থিতিতে দক্ষিণ আফ্রিকা ক্রিকেট বোর্ডের পক্ষে খেলোয়াড়দের দেশপ্রেমে উদ্ধুত্ব করা ছাড়া আর তেমন কিছুই করার নেই। কারন কেউ স্বেচ্ছায় কোলপাক চুক্তি সাক্ষর করতে চাইলে তাকে বাধা দেয়াও সম্ভব নয়। ফলে হটাৎ করেই দক্ষিণ আফ্রিকা ক্রিকেটকে ঘিরে ধরেছে অন্ধকারের ঘোর অমানিশা। কাল যদি কাগিসো রাবাদা কিংবা ডি ককের মত প্রতিভাবান খেলোয়াড়রাও কোলপাক চুক্তির দিকে ঝুঁকে পড়েন, বোর্ডের পক্ষে অসহায়ের মত চেয়ে দেখা ছাড়া আর কিছুই করা থাকবেনা।

 

Category : ফিচার
Share on your Facebook
Share this post