কে ভেবেছিল ঝাঁকড়া চুলের ছেলেটা একদিন বিশ্বজয় করবে!

রিমন ইসলাম
জানুয়ারী ৬, ২০১৭
 এখন থেকে উইকেটরক্ষক ব্যাটসম্যান হিসেবে ধোনি খেলবেন। এখন থেকে উইকেটরক্ষক ব্যাটসম্যান হিসেবে ধোনি খেলবেন।

মনে আছে ২০০৭ সালের ওয়ানডে বিশ্বকাপের কথা?

বাংলাদেশ আর শ্রীলঙ্কার কাছে হেরে গ্রূপ পর্ব থেকেই বিদায় নিতে হয়েছিল তারকাসমৃদ্ধ ভারতীয় দলকে। এরই প্রেক্ষিতে ভারতীয় ক্রিকেটে বড়সড় একটি ঝড়ই বয়ে যায়। ক্ষুদ্ধ ভক্তরা পথেঘাটে খেলোয়াড়দের কুশপুত্তলিকা পোড়ানোর পাশাপাশি বেশ কয়েকজন তারকা খেলোয়াড়দের বাসায়ও হামলা চালানো হয়।

সবমিলিয়ে ভারতীয় ক্রিকেটের জন্য সময়টা ছিল বেশ নাজুক। একই বছর অনুষ্ঠিত প্রথম টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ থেকে শচিন টেন্ডুলকার, রাহুল দ্রাবিড়, সৌরভ গাঙ্গুলি নাম প্রত্যাহার করে নেয়ার পর টি-টোয়েন্টি দলের জন্য নতুন অধিনায়ক হিসেবে বীরেন্দ্র শেবাগ, গৌতম গম্ভীর, যুবরাজ সিং এবং হরভজন সিংদের নাম জোরেসোরেই উচ্চারিত হচ্ছিল।

তবে সবাইকে ছাপিয়ে আকস্মিকভাবে মহেন্দ্র সিং ধোনিকে টি-টোয়েন্টি দলের অধিনায়কের দায়িত্ব তুলে দেয় বোর্ড অব কনট্রোল ফর ক্রিকেট ইন ইন্ডিয়া (বিসিসিআই)। তখন কে ভাবতে পেরেছিল রাঁচির ঝাঁকড়া চুলের সেই ছেলেটির হাতেই শেষমেষ উঠবে বিশ্বকাপ ট্রফি!

সেই বিশ্বকাপ ফাইনালেই অধিনায়ক ধোনি খেলেছিলেন তার ক্যারিয়ারের টার্নিং পয়েন্ট হিসেবে বিবেচিত জুয়াটি। ৬ বলে পাকিস্তানের প্রয়োজন ১৩ রান। উইকেটে সেট ব্যাটসম্যান মিসবাহ উল হক। অভিজ্ঞ হরভজন সিংয়ের কোটার ওভার বাকি থাকার পরও ধোনি বল তুলে দিলেন অনভিজ্ঞ মিডিয়াম পেসার যোগিন্দর সিংয়ের হাতে।

তৃতীয় বলে ছক্কা মেরে ধোনির সিদ্ধান্তটিকে প্রশ্নবিদ্ধ করে তোলেন মিসবাহ। তবে 'ওস্তাদের মাইর শেষ রাইতে' প্রবাদটিকে সত্যি প্রমান করে শেষ হাসি হাসলেন ধোনিই। উচ্চাভিলাসী শট খেলতে গিয়ে মিসবাহ ক্যাচ তুলে দিলেন শ্রীশান্তের হাতে। সাথে সাথে ভারতীয় ক্রিকেট ইতিহাসে রচিত হল একটি নতুন যুগের। বলা ভাল, ‘ক্যাপ্টেন কুল’ যুগের।

তার ৯ বছর পর গত পরশু ধোনি সীমিত ওভারের অধিনায়কত্ব ছেড়ে দিলেন। টেস্ট ক্রিকেট থেকে ২০১৪ সালেই অবসর নিয়েছিলেন ধোনি। ফলে এখন থেকে ওয়ানডে ও টি-টোয়েন্টিতে তিনি খেলবেন উইকেটরক্ষক ব্যাটসম্যান হিসেবে।

মাঝের এই সময়টাতে নিজেকে নিয়ে গেছেন নতুন এক উচ্চতায়। অধিনায়ক ধোনির অর্জনের খাতাটা এতটাই ভারী যে ভারত তো বটেই, পুরো ক্রিকেটবিশ্বেই ধোনি চলে গেছেন অনেকটা ধরাছোয়ার বাইরে।

২৮ বছর পর দেশকে দ্বিতীয়বারের মত ওয়ানডে বিশ্বকাপ জেতানোর পাশাপাশি একবার করে জয় করেছেন টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ এবং আইসিসি চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফি। তার নেতৃত্বেই ভারত টেস্ট র‌্যাংকিংয়ে শীর্ষস্থান দখল করেছিল। ভারতের হয়ে ১৯৯ ওয়ানডেতে নেতৃত্ব দিয়ে ৫৯.৫৭ গড়ে ধোনি জয় পেয়েছেন ১১০ টিতে এবং পরাজিত হয়েছেন ৭৪ টিতে।

তবে অধিনায়কত্বের প্রভাব কখনোই পড়েনি ধোনির ব্যাটিংয়ে। ওয়ানডেতে ৫৪ গড় এবং ৮৬ স্ট্রাইক রেটে ৬৬৩৩ রান তার ব্যাটিং সামর্থ্যের জানান দেয়। এরমধ্যে অধিকাংশ রানই এসেছে ফিনিশার হিসেবে যা ব্যাটসম্যান ধোনির তাৎপর্য আরো বাড়িয়ে দেয়।

মাইকেল বেভানের পর ওয়ানডে ক্রিকেটে সত্যিকারের ফিনিশার হিসাবে আবির্ভূত হয়েছেন ধোনি। অন্যদিকে অধিনায়ক হিসেবে ৭২ টি টি-টোয়েন্টি থেকে ধোনি জয় পেয়েছেন ৪১ টিতে। পাশাপাশি ব্যাট হাতে করেছেন ১১১২ রান।

তবে শুধু পরিসংখ্যান দিয়ে ধোনির মাহাত্ত্ব বোঝানো যাবেনা। যেভাবে তিন ফরমেটেই একটা লম্বা সময় ধরে সফলতার সাথে ভারতকে নেতৃত্ব দিয়েছেন, তাতে অধিনায়ক ধোনির ক্ষুরধার ক্রিকেট মস্তিষ্কের ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এমনিতেই ভারতের ক্রিকেট দলের অধিনায়ক হওয়া মানে এমন এক হট সিটে বসা যেখানে ক্ষুদ্রতম ভুলের জন্যও দিতে হয় কঠিন মাশুল।

সাথে ছিল শচিন, শেওয়াগ, দ্রাবিড়, গাঙ্গুলি, লক্ষণ, হরভজন, জহির খানের মত একঝাঁক তারকাদের সামলানোর গুরুভার। অন্য যেকোন খেলোয়াড় হলে মাঠে এবং মাঠের বাইরের অপরিসীম চাপের মুখে হয়ত অনেক আগেই ঝরে পড়তেন। কিন্তু ধোনি ঝরে পড়েননি। কারণ তিনি যে সবার চেয়ে আলাদা। তিনি যে ‘ক্যাপ্টেন কুল’!

কঠিন সেই কাজটিই ধোনি সামলেছেন ঠান্ডা মাথায়। সিনিয়র খেলোয়াড়দের কাছে থেকে সবসময় সেরাটা বের করে নেয়া এবং তাদের অনুপ্রাণিত করা, দুই ভূমিকাতেই ধোনি সফল। এমনকি দলের প্রয়োজনে সিনিয়রদের দল থেকে ছেঁটে ফেলার অনুরোধ করতেও দ্বিধাবোধ করেননি তিনি। তাতে বির্তকিত হলেও অধিনায়ক ধোনির কাছে সবসময় দলই ছিল আগে, কোন তারকা খেলোয়াড় নন।

চলতি বছর ইংল্যান্ডে অনুষ্ঠিত আইসিসি চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফি এবং ২০১৯ সালের ওয়ানডে বিশ্বকাপকে সামনে রেখে এমন সময়ে অধিনায়ক ধোনির পদত্যাগ অনেকের কাছেই বিস্ময়কর ঠেকেছে। টেস্ট অধিনায়কত্ব থেকেও সড়ে দাঁড়ানো এবং অবসরের ঘোষণাও দিয়েছিলেন আকস্মিকভাবেই।

হয়ত এভাবেই একদিন সীমিত ওভারের ক্রিকেটকেও বিদায় জানিয়ে দিবেন অথচ কেউ তা ভাবতেই পারবেনা। অনেকেই মনে করেন হয়ত ২০১৯ সালের ওয়ানডে বিশ্বকাপ শেষেই বুটজোড়া তুলে রাখবেন ধোনি। তবে নামটি ধোনি বলেই নিশ্চিতভাবে কিছুই বলা যায়না। অন্যরা যা আশা করেনা, তিনি সেটাই করে দেখান।

অন্যরা যেখানে শেষটা দেখে ফেলেন, ধোনি সেখান থেকেই নতুন শুরু করেন। ঠিক যেভাবে গতবছর টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে বাংলাদেশের হাতের মুঠো থেকে নিশ্চিত হারা ম্যাচটি ছিনিয়ে নিয়েছিলেন শেষ ওভারে।

অধিনায়কত্বের পদ থেকে ধোনির ইস্তফা দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন উঠলেও ধোনি জানেন তিনি এই দলটিকে ভালোভাবেই প্রস্তুত করেছেন পরবর্তী চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায়। তাছাড়া এই সময়েই ধোনি দেখেছেন অধিনায়ক হিসেবে বিরাট কোহলির উত্থান যিনি ইতিমধ্যেই টেস্ট দলের অধিনায়ক। সীমিত ওভারের ক্রিকেটেও ধোনির উত্তরসূরি হিসেবে প্রধান দাবিদার তিনিই।

তবে এখানেই শেষ নয়। এখন থেকে উইকেটরক্ষক ব্যাটসম্যান হিসেবে ধোনি খেলবেন যার শুরুটা হতে যাচ্ছে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ওয়ানডে ও টি-টোয়েন্টি সিরিজে। মাঠেই থাকবেন ধোনি, তবে সেটা আগের মত অবশ্যই নয়। উইকেটরক্ষক হিসেবে ধোনিকে হয়ত দেখা যাবে ফিল্ডিং সেট করতে, তবে অধিনায়ক ধোনিকে ক্রিকেট ভক্তরা মিস করবেন যিনি প্রচন্ড চাপের মুখেও নির্লিপ্ত থাকবেন এবং ম্যাচ ঘুরানো সিদ্ধান্ত নিয়ে সবাইকে চমকে দিবেন।

আরো একটি বিষয় সবাই বিশেষভাবে মিস করবেন। সেটি হল ধোনির সংবাদ সম্মেলন যেখানে তিনি ছিলেন মজার এক চরিত্র। অধিনায়ক ধোনির বিদায় ঘটলেও ব্যাট হাতে তিনি আরো অনেকদিন ক্রিকেটবিশ্বকে মাতিয়ে রাখবেন, তেমনটাই আশা ভক্তদের।

শেষটা করা যাক ধোনির একটি স্বরনীয় একটা কথা দিয়ে। ২০১৫ সালের ওয়ানডে বিশ্বকাপ শুরুর কয়েক সপ্তাহ আগে ধোনির প্রথম ও একমাত্র কন্যাসন্তান জিবা ধোনি জন্ম নেন। এক সাংবাদিক প্রশ্ন করেন এই বিষয়টি তার মাথায় কাজ করছে কী না।

ধোনির জবাবটা ছিল এরকম, ‘না। আমি এখন জাতীয় দায়িত্বে। বাকি সবকিছু অপেক্ষা করতে পারে।’ দায়িত্ববোধ, দেশপ্রেম এবং পেশাদারিত্বের জলজ্যান্ত উদাহরণ তো একেই বলে!

Category : ফিচার
Share on your Facebook
Share this post