গালমন্দ কখনও সুফল বয়ে আনে না (শেষ পর্ব)

রিমন ইসলাম
জানুয়ারী ৩, ২০১৭
 ধৈর্য ধরুন এবং খেলোয়াড়দের প্রতি বিষেদাগার পরিহার করুন। ধৈর্য ধরুন এবং খেলোয়াড়দের প্রতি বিষেদাগার পরিহার করুন।

গতকাল আলোচনা করেছিলাম দলে অন্তর্ভুক্ত বিতর্কিত কিছু খেলোয়াড়দের নিয়ে যাদেরকে নিয়ে প্রতিনিয়ত নানারকমের ট্রল করা হচ্ছে এবং ক্ষেত্রবিশেষে বিদ্রুপের সম্মুখ্খীন হতে হচ্ছে। এমন অনেকেই মূল একাদশে সুযোগ পাচ্ছেন যারা ফর্মের বিচারে স্কোয়াডেই বিবেচিত হতে পারেন না। তবে কোচ-নির্বাচকদের কাছে তাদের কোন না কোন দিক দিয়ে কার্যকরী বলে মনে হচ্ছে বলেই একের পর এক সুযোগ দিয়ে যাচ্ছেন।

এতে কিন্তু উক্ত খেলোয়াড়দের কোন হাত নেই। গড়পড়তা পারফর্মেন্স দিয়ে এমনিতেই তাদের দল থেকে বাদ পরে যাওয়ার কথা। কিন্তু তা হচ্ছেনা বলে তাদের গালমন্দ করাটাও যৌক্তিক নয়। এই খেলোয়াড়দের জায়গায় একবার নিজেকে ভেবে দেখুন, আপনি ব্যাট ঠিকঠাকমত না ধরতে না জানলেও জাতীয় দলে খেলার সুযোগ পেয়ে গেলে মাঠে কিন্তু ঠিকই নেমে যাবেন। আর এই খেলোয়াড়রা তো বছরের পর সাধনা করে আসছেন জাতীয় দলের জার্সি গায়ে দেশের প্রতিনিধিত্ত্ব করার জন্য। তাই যোগ্য দাবিদার না হওয়ার পরেও দলে নেয়া হলে সেজন্য কোনভাবেই তাদের দোষারোপ করা যায়না।

এবার একটু চোখ বোলানো যাক পুরো ২০১৬ জুড়েই আলোচনায় থাকা নাসির হোসেনের দিকে। বাংলাদেশ দল যতগুলো ম্যাচ হেরেছে, ততবারই সবকিছু ছাপিয়ে মূল শিরোনাম হয়ে উঠেছেন নাসির। অথচ এই পরাজয়গুলোর মূল কারণ ব্যাটসম্যানদের ধারাবাহিক হুড়মুড়িয়ে ভেঙে পড়াটা হলেও সেটিকে পাশ কাটিয়ে নাসিরই হয়ে উঠেছেন মূল আলোচ্য বিষয়। তার বারবার দল থেকে বাদ পড়ার পাশাপাশি শুভাগত হোম, তানবীর হায়দার, মোশাররফ রুবেলদের দলে সুযোগ পাওয়াটা আগুনে আরো ঘিঁ ঢেলে দিয়েছে।

ফলে নাসিরকে দলে ফেরানোর জন্য ক্রীড়ামোদীরা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম থেকে শুরু করে চায়ের টেবিলেও সোচ্চার হয়েছেন। পাশাপাশি তার জায়গায় স্কোয়াডে এবং দলে সুযোগ পাওয়া অন্যান্য খেলোয়াড়দের তীব্র জনরোষের স্বীকার হতে হয়েছে শুধুমাত্র জাতীয় দলে সুযোগ পাওয়ার অপরাধে! কারণ অনেকেরই ধারণা উক্ত খেলয়ারদের বাদ দিয়ে অনায়াসে নাসিরকে দলে নেয়া যেত। আসলেই কি তাই?

নাসির হোসেন জাতীয় দলে এসেছিলেন লোয়ার মিডল অর্ডারে একজন কার্যকরী ব্যাটসম্যান হিসেবে যিনি ফিনিশার হিসেবে বিশেষ সুখ্যাতি পেয়েছিলেন। বিশেষ করে ওয়ানডেতে শেষের দিকে অসাধারণ ব্যাটিং করে ক্রমশ তিনি হয়ে উঠেছিলেন দলের অবিচ্ছেদ্য অংশ। অধিকাংশ সময়েই নাসিরকে ব্যাট হয়েছে ছয় এবং সাত নাম্বার পজিশনে।

শুরু থেকেই দলে নাসিরের মূল পরিচয় ছিল একজন স্পেশালিষ্ট ব্যাটসম্যান যিনি অফস্পিনটাও ভাল করতে পারেন। দলে নাসিরকে মূলত ব্যবহার করা হত তার ব্যাটিংয়ের জন্যই এবং সে ভূমিকায় তিনি ভালোভাবেই সফল ছিলেন। তবে ২০১৩ সালের মাঝপথ থেকেই শুরু হয় নাসিরের ছন্দপতন।

ব্যাটিং অর্ডারে একটা সময় মাহমুদুল্লাহ রিয়াদের অবস্থান ছিল নাসিরেরও পরে। কিন্তু ২০১৭ তে এসে রিয়াদ যেখানে টপ অর্ডারের নির্ভরযোগ্য একজন ব্যাটসম্যান এবং সব ফরমেটেই নিয়মিত মুখ সেখানে নাসির দলেই সুযোগ পাচ্ছেন না। কালেভদ্রে যাও সুযোগ পান, তাও দ্বাদশ ব্যক্তি হিসেবে! দুজনের মাঝে এতটা পার্থক্য কিভাবে হয়ে গেল? স্পেশালিস্ট ব্যাটসম্যান হিসেবে নাসিরের এতদিনে রিয়াদের সমপর্যায়ে অথবা আরো ওপরে দিকেই থাকার কথা ছিল। কিন্তু তিনি রিয়াদের থেকে গত ৩ বছরে অনেকটাই পিছিয়ে পড়েছেন। এখন থেকেই স্পষ্ট উন্নতির গ্রাফটা ধরে রাখতে পারেননি বলেই নাসির পিছিয়ে পড়েছেন।

হতাশাজনক ২০১৪ সালের শেষের দিকে জিম্বাবুয়ে সিরিজ দিয়ে ওয়ানডে দলে অভিষেক হয় সাব্বির রহমানের। মনে রাখা প্রয়োজন সাব্বির দলে জায়গা পেয়েছিলেন নাসিরের জায়গাতেই। দলে সুযোগ পাওয়ার পর থেকেই সাব্বির ক্রমশ এতটাই উন্নতি করেছেন যে গত বছর ইংল্যান্ডের বিপক্ষে সিরিজে টেস্ট অভিষেক হয়ে যায় তার। টি-টোয়েন্টিতেই সাব্বির নিয়মিত তিন নাম্বার পজিশনে খেলে থাকেন। টেস্টে সাতে নামলেও ওয়ানডেতে ইদানিং টপ অর্ডারেও সুযোগ পাচ্ছেন।

বেশ কয়েকটি ম্যাচে ওয়ান ডাউনেও খেলছেন এবং সফলতাও পেয়েছেন। সবমিলিয়ে দেখা যাচ্ছে সাব্বির ক্রমশ নিজেকে ছাড়িয়ে যাচ্ছেন এবং এই মুহূর্তে তিন ফরমেটেই দলের নিয়মিত মুখ। সেখানে নাসির কোথায়? যেই সাব্বিরের কাছে তিনি দলে জায়গাটা হারালেন, তাকে পেছনে ফেলে হারানো জায়গা পেতে হলে নাসিরকে মূলত ব্যাটসম্যান হিসেবেই ছাড়িয়ে যেতে হবে সাব্বিরকে।

মোসাদ্দেক হোসেন সৈকত নাসিরের প্রায় সমমানের একজন খেলোয়াড়। দলে ভুমিকা লোয়ার মিডল অর্ডার ব্যাটসম্যান এবং পার্টটাইম অফস্পিনার। ওয়ানডেতে অভিষেকের পর থেকেই ধারাবাহিকতা বজায় রেখেছেন তিনি। ফলে এই মুহূর্তে তাকে বাদ দিয়ে নাসিরের জন্য দলে ঢোকাটা একটু কঠিন হলেও অসম্ভব নয় মোটেও।

নাসির জাতীয় দলে এসেছিলেন প্রতিভাবান ব্যাটসম্যান হিসেবে, অলরাউন্ডার হিসেবে নয়। তাই নাসিরের অফস্পিনটা যতই কার্যকারী হোক না কেন, দিনশেষে সেটা বোনাস হিসাবেই ধরা হবে এবং ব্যাটিংটাই হবে তার মূল চালিকাশক্তি। তবে ব্যাট হাতে গত তিন বছরে নাসিরের পরিংখ্যান কিন্তু তার হয়ে কথা বলছেনা। ২০১৩ সালের মে মাসের পর থেকে ওয়ানডেতে ২৬ টি ইনিংসে কোন অর্ধশতক নেই নাসিরের। টেস্টে এবং টি-টোয়েন্টিতে সংখ্যাটা যথাক্রমে ১০ ও ১৬ ইনিংস !

তাই বাস্তবিক বিবেচনায় ভেবে দেখুন এই পারফর্মেন্স দিয়ে নাসির কি রিয়াদ, সাব্বির কিংবা মোসাদ্দেককে হটিয়ে দলে সুযোগ পাওয়ার দাবিদার কি না। বলা যেতেই পারে হোম, তানবীর, সৌম্যদের বাদ দিয়ে নিলেই তো হয়। সৌম্য ওপেনার এবং টপ অর্ডার ব্যাটসম্যান। তাই তার জায়গায় নাসির দলে আসতে পারবেন না। অন্যদিকে হোম এবং তানবীর কিন্তু দলে মূলত তাদের বোলিং দক্ষতার কারণে, ব্যাটিং নয়।

এই দুজনের বোলিংয়ের মান যেমনই হোক না কেন, তারা বিবেচনায় এসেছেন শুধুমাত্র বোলার হিসেবে যারা বোনাস কিছু রান করতে পারবেন। নাসিরের বেলায় ঘটনাটা কিন্তু উল্টো। তিনি মূলত ব্যাটসম্যান যার স্পিনটা বোনাস। তাই হোম, তানবীর, সৌম্যদের বদলে নাসিরকে দলে নেয়ার দাবিটা আদতে তার জন্য ভাল নয়। কেননা এটা খেলোয়াড় হিসেবে তার উন্নতি নয়, বরং অবনতি। জাতীয় দলের তিন ফরমেটে দলে ফেরার জন্য নাসিরের টার্গেট হতে পারেন রিয়াদ, সাব্বির এবং মোসাদ্দেক যারা মূলত ব্যাটসম্যান হিসেবেই দলে থাকলেও নাসিরের মত স্পিনটাও করতে পারেন।

নাসির হোসেন প্রথম দল থেকে বাদ পড়েছিলেন ব্যাটিং ব্যর্থতার জন্য। তাই দলে আবারো নিজের জায়গা ফিরে পাবার লড়াইয়ে তার মূল শক্তি হওয়া উচিৎ সেই ব্যাটিংই, স্পিন নয়। ভারতের ইরফান পাঠানের কথা নিশ্চয় সবার মনে আছে। অসাধারণ একজন বোলার ছিলেন, অলরাউন্ডার হওয়ার দৌড়ে সামিল হয়ে অকালেই হারিয়ে গেলেন। শুভাগত হোম, তানবীর হায়দাররা জাতীয় দলে চিরস্থায়ী কোন বন্দোবস্ত করতে পারবেন না। হয়ত আরো কিছু সুযোগ পাবেন, তবে খারাপ খেললে বাদও পরে যাবেন।

কিন্তু নাসির হোসেন আমাদের ভবিষ্যৎ ব্যাটিং কান্ডারি, ভূমিকা বদলে দলে সাময়িকভাবে দলে সুযোগ পাওয়াটা তার জন্য বড় কোন প্রাপ্তি হতে পারেনা। তাই ঘরোয়া আসর, এ দল কিংবা যেখানেই সুযোগ পান না কেন, নাসিরে প্রধান কাজ হবে সব জায়গাতেই রানবন্যা বইয়ে দেয়া। মুখে নয়, ব্যাটেই জবাবটা দিতে পারলে সেটাই হবে তার দলে ফেরার মূল পাথেয়।

তাই দলে যারা সুযোগ পাচ্ছেন, তাদের গালমন্দ না করে নাসিরের পাশে থাকুন এবং কঠিন এই সময়ে তাকে সমর্থন দিন। আজ নাহয় কাল, নাসিরের সময় আসবেই। তাই ধৈর্য ধরুন এবং অন্যান্য খেলোয়াড়দের প্রতি বিষেদাগার পরিহার করুন।

Category : ফিচার
Share this post