গালমন্দ কখনও সুফল বয়ে আনে না (প্রথম পর্ব)

রিমন ইসলাম
জানুয়ারী ২, ২০১৭
 এভাবে ট্রল কিংবা গালমন্দ করা থেকে বিরত থাকাটাই হবে সবার জন্য মঙ্গলজনক। এভাবে ট্রল কিংবা গালমন্দ করা থেকে বিরত থাকাটাই হবে সবার জন্য মঙ্গলজনক।

ইংল্যান্ডের এবং নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে টানা দুটি ওয়ানডে সিরিজ পরাজয়ে খেলোয়াড়দের পাশাপাশি বাংলাদেশের কোটি কোটি ভক্তরাও হতাশ। সীমিত ওভারের ক্রিকেটে দেশের মাটিতে গত দুই বছরে প্রায় অপ্রতিরোধ্য হয়ে ওঠা দলটির কাছে থেকে এই দুই সিরিজেও সবাই জয়ের আশাই করেছিলেন। দেশের মাটিতে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ওয়ানডে সিরিজে তীব্র প্ৰতিদ্বন্দিতা গড়ে হারলেও নিউজিল্যান্ডে গিয়ে রীতিমত হোয়াইটওয়াশ হতে হয়েছে বাংলাদেশ দলকে।

দারুণ খেলতে থাকা দলটির কেন এই ছন্দপতন?  ব্যবচ্ছেদ করতে গিয়ে অনেকেই কোচ এবং নির্বাচকদের প্রশ্নবিদ্ধ দল নির্বাচনকেই দায়ী করছেন। অপরদিকে ভক্ত সমর্থকদের বড় অংশ একটি পরাজয়ের সব অভিযোগের তীর ছুড়ে দিচ্ছেন এই দুই সিরিজে অভিষিক্ত এবং ফর্ম হারানো কিছু খেলোয়াড়ের দিকেই।

দল নির্বাচন এমনি একটি কঠিন প্রক্রিয়া যাতে কখনোই সবাইকে সন্তুষ্ট করা সম্ভবপর হয়ে ওঠেনা। যতই নির্ভুল এবং সেরা দল নির্বাচন করা হোক না কেন, বাদ পড়া খেলোয়াড়দের নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাবে। উদাহরণ হিসেবে দেখা যেতে পারে আইসিসি এবং অন্যান্য বেশকিছু বিখ্যাত স্পোর্টস সাইটের নির্বাচিত গত বছরের বর্ষসেরা একাদশগুলো যা নিয়ে সর্বত্রই তর্ক-বিতর্ক হয়েছে। কে বাদ পড়লো আর কে সুযোগ পেলো সেটা নিয়ে বিস্তর আলোচনা হয়েছে।

আপনি একটি বর্ষসেরা একাদশও খুঁজে পাবেন না যা নিয়ে সবাই সন্তুষ্ট। এই দলগুলো কিন্তু মাঠেও নামবেনা, স্রেফ একটি প্যানেলের সদস্যের বিচারে নির্বাচিত একাদশ। অথচ তা নিয়েও গত কয়েকদিনে ক্রিকেটবিশ্বে কত তোলপাড় বয়ে গেল। সেখানে জাতীয় দল নির্বাচন নিয়ে প্রশ্ন উঠবেনা, সেটা ভাবাটাও অন্যায়। বিশেষ করে উপমহাদেশের বাংলাদেশ, ভারত এবং পাকিস্তানে জাতীয় ক্রিকেট দল নির্বাচনটা কোন কোন ক্ষেত্রে দেশের জাতীয় নির্বাচনের মতোই গুর্তুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে আপামর জনতার কাছে। ফলে যতই যাচাই বাছাই করে দল নির্বাচন করে হোক না কেন, চায়ের টেবিলে ঝড় উঠবেই সেই দল নিয়ে।

স্বাভাবিকভাবেই তাই বাংলাদেশের জাতীয় দলের নির্বাচকদের কাজটাও বেশ কঠিন। এই দল নির্বাচন বিতর্কেই ফারুক আহমেদ, হাবিবুল বাশার, মিনহাজুল আবেদীন নান্নুর মত সাবেক কীর্তি খেলোয়াড়দেরও তীব্র জনরোষের মুখে পড়তে হয়েছে এবং এখনো হচ্ছে। যদিও তারা সবসময় চেষ্টা করেন যারা দেশের জন্য যারা ভালো কিছু করতে পারবেন এবং যারা দলের জন্য কার্যকরী হবেন তাদেরই নিতে। তবে তাদের নির্বাচিত দলটিই শেষকথা নয়।

এতে কোচ এবং টিম ম্যানেজম্যান্টের চাহিদা, কন্ডিশন এবং প্রতিপক্ষের শক্তিমত্তা এবং দুর্বলতার দিকটিও বিবেচনা করা হয়ে থাকে। তারপরেও দলে বেশকিছু খেলোয়াড়ের অন্তর্ভুক্তি প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে সর্বমহলে। এই তালিকায় প্রথম সারিতেই থাকবেন বাজে ফর্মে থাকা সৌম্য সরকার এবং অলরাউন্ডার থেকে বোলারে পরিনিত শুভাগত হোম। তাদের দলে নেয়া হচ্ছে খারাপ খেলার পরেও, সেজন্য তাদের ভাল খেলার চেষ্টা করা ছাড়া তো আর কিছুই করার নেই। এমন কিছু বিতর্কিত সিদ্ধান্তের প্রেক্ষাপটে কোচ নির্বাচকরা সমালোচিত হতেই পারেন, তবুও তাদের নিয়ে ট্রল করা কিংবা তাদের গালমন্দ করাটা মোটেও শোভনীয় নয়।

২০১৫ সালটা বাংলাদেশ দলটা কাটিয়েছিল স্বপ্নের মত। এক্ষেত্রে টপ ও মিডল অর্ডারে সবার দায়িত্বশীল ব্যাটিং অগ্রণী ভুমিকা পালন করেছিল। প্রতি ম্যাচেই এক দুইজন দাঁড়িয়ে গেছেন, বিপদের মুখে একপাশ আগলে রেখে দলকে এগিয়ে নিয়ে গেছেন। কিন্তু, ২০১৬ তে এসে সব গড়বড় হয়ে গেল। খেলোয়াড়দের কিন্তু তেমন বদল হয়নি, তবে রহস্যজনকভাবে একই খেলোয়াড়রাই ২০১৬ তে তিন ফরমেটেই চাপের মুখে বারবার ভেঙে পড়েছেন। ফলে হাতছাড়া হয়েছে ইংল্যান্ড ও নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ওয়ানডে সিরিজ। আফগানিস্তানের বিপক্ষে সিরিজ জিতলেও তা ছিল কষ্টেসৃষ্টে পাওয়া।

একটু খেয়াল করলেই দেখা যাবে এই বছর খেলা সাতটি ওয়ানডেতে দলের সেরা ব্যাটসম্যান মুশফিকুর রহিম নিজের নামের প্রতি তেমন সুবিচার করতে পারেননি। টপ অর্ডারে প্রমোশন পাওয়া মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ নয়টি ওয়ানডে খেলে দুটি অর্ধশত রানের ইনিংস ছাড়া তেমন অবদান রাখতে ব্যর্থ হয়েছেন। বিশেষ করে সদ্যসমাপ্ত নিউজিল্যান্ড সিরিজে তিন ম্যাচেই তার ব্যর্থতা বাংলাদেশ দলকে বেশ ভুগিয়েছে।

দলের প্রধান দুই ব্যাটসম্যানের ফর্মহীনতা ওয়ানডেতে বাংলাদেশ দলের হতাশাজনক পারফরমেন্সের প্রধান কারন। তবে ইমরুল, তামিম, সাব্বির এবং সাকিবরা টাচেই ছিলেন। অনেকগুলো ম্যাচেই তারা রান পেয়েছেন এবং বড় ইনিংস খেলার পথেই ছিলেন। তবে প্রয়োজনের মুহূর্তে দলকে বিপদ থেকে রক্ষায় কিংবা জয়ের বন্দরে পৌঁছে দিতে প্রত্যেকেই ব্যর্থ হয়েছেন ।

ইমরুল কায়েস ইংল্যান্ডের সাথে প্রথম ও নিউজিল্যানন্ডের সাথে দ্বিতীয় ওয়ানডেতে চমৎকার ব্যাটিং করে অর্ধশত রান করেন। দলও ছিল জয়ের পথেই। তবে অপরপ্রান্তে ধারাবাহিকভাবে উইকেট পড়ার ফলে পরিস্থিতির চাহিদা অনুযায়ী তার উচিত ছিল একপ্রান্ত আগলে সিংগেলস, ডাবলসে খেলা এবং উইকেট পতন রোধ করা। তবে তিনি করেছেন ঠিক উল্টোটা।

ক্রাইসিস মুহূর্তে কোথায় একজন ব্যাটম্যান শট খেলার ব্যাপারে সচেতন হবেন, তা না করে উভয়ক্ষেত্রেই ইমরুল মেরে খেলতে গিয়েই আউট হয়ে দলকে আরো বিপদে ফেলে দিয়েছেন। সাথে রয়েছে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচে দৃষ্টিকটুভাবে সাব্বিরের রান আউটের ঘটনাটি যা ছিল ম্যাচের টার্নিং পয়েন্ট। তবে ম্যাচ শেষে আরো বিস্ময়করভাবে ইমরুল জানান অপরপ্রান্তে সতীর্থদের যাতায়াতের মিছিলে তিনি নার্ভাস হয়ে গিয়েছিলেন বলেই শট খেলতে চেয়েছিলেন!

এটা কেমন ব্যাখ্যা ! ১০০ টিরও বেশি আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলা একজন ব্যাটম্যানের এ কেমন মানসিকতা ! এখানে আপনি কাকে দায় দেবেন? কোচকে, নির্বাচককে? নাকি দাবি জানিয়ে বসবেন ইমরুলকে বাদ দিয়ে বিজয়কে দলে ফেরানোর জন্য ?

ইমরুলের ওপেনিং পার্টনার এবং তিন ফরমেটেই বাংলাদেশ দলের সেরা ব্যাটসম্যান তামিম ইকবাল ভালোই ফর্মে ছিলেন। তবে উইকেটে সেট হয়ে যাবার পর বারবার দৃষ্টিকটুভাবে উইকেট বিলিয়ে দিয়ে তিনি দলকে বিপদে ফেলছেন। এছাড়া ইনিংসের শুরুতে সিঙ্গেল ডাবলসে না খেলে পরে চাপের মুখে বড় শট খেলতে গিয়ে আউট হয়েছেন যা দলকে মোটেও সাহায্য করেনি।

একজন সিনিয়র ব্যাটম্যান হিসেবে তামিমের উচিত ছিল আরো দায়িত্বশীল ব্যাটিং করা এবং বড় ইনিংস খেলে দলকে বিপদমুক্ত করা। তাই দেখা যাচ্ছে ওপেনিং জুটিতে তামিম-ইমরুল ছিলেন বেশ সফল এবং ধারাবাহিক, তবে দুজনই দায়িত্ব নিয়ে খেলতে ব্যর্থ হয়েছেন যা ছিল হতাশাজনক।

২০১৫ তে ওয়ানডেতে ৫০ এর ওপর গড়ে রান তোলা সৌম্য সরকার ২০১৬ সালে এসে নিজেকে হারিয়ে খুঁজেছেন এবং রানের জন্য রীতিমত সংগ্রাম করেছেন। টি-টোয়েন্টি, ওয়ানডে, বিপিএল কোথাও তিনি রান পাননি। তারপরও তার প্রতিভা এবং অতীত পারফর্মেন্সের সুবাদে কোচ, নির্বাচকরা তাকে বারবার সুযোগ দিয়েছেন যার কোন প্রতিদানই তিনি দিতে পারেননি। স্বাভাবিকভাবেই তার পড়তি ফর্ম দলকে ভুগিয়েছে।

বাংলাদেশের দলের ব্যাটিং লাইনআপে সাব্বির রহমানের গুরুত্ব দিনদিন বেড়েই চলেছে। গত বছর টেস্ট অভিষেক হয়ে গেছে তার। টি-টোয়েন্টির মত ওয়ানডেতেও সাব্বিরকে তিনি প্রমোশন দেয়া হয়েছিল। সেখানে তিনি বেশ কয়েকটি ভাল ইনিংসও খেলেছেন। তবে শুরুটা ভাল করলেও সেটি বড় ইনিংসে রূপ দিতে তিনিও ব্যর্থ।

বছরের শেষভাগে এসে মাঠের বাইরের বেশকিছু ঘটনায় সমালোচিত হলেও সবার আশা ছিল নিউজিল্যান্ড সিরিজে ব্যাট হাতেই সেসবের জবাব দেবেন সাব্বির। মুশফিকের অনুপস্থিতিতে টি-টোয়েন্টি এবং টেস্টে সিরিজেই সাব্বিরের স্বরূপে ফেরাটা তার এবং দলের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

গত কয়েক বছরে ক্রিকেটার এবং ব্যাটসম্যান হিসেবে বাংলাদেশ দলে সবচেয়ে বেশি উন্নতি করেছেন মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ। টি-টোয়েন্টিতে তিনিই এখন দলের অবিমাংসীত 'ফিনিশার'। ধারাবাহিক উন্নতির পুরুষ্কার হিসেবে সব ফরমেটেই এখন তিনি ওপরের দিকেই ব্যাট করেন। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ওয়ানডে সিরিজে একমাত্র জয়ী ম্যাচেও তিনি খেলেছিলেন ৭৫ রানের দায়িত্ত্বশীল একটি ইনিংস।

বিপিএলে হয়েছেন টুর্নামেন্ট সেরা। তবে নিউজিল্যান্ডে তিনটি ওয়ানডেতেই তিনি ব্যর্থ। বলা ভাল নিদারুনভাবে ব্যর্থ, কেননা একটি ম্যাচেও তিনি দুই অংকের ঘরে পিছতে পারেননি। লম্বা ক্যারিয়ারে পুরো সিরিজেই এই প্রথম রিয়াদ এতটা খারাপ খেললেন। অথচ প্রথম ওয়ানডেতে মুশফিকের ইনজুরির পর রিয়াদের ওপর দায়িত্বটা আরো বেড়ে গিয়েছিল।

ওয়ানডেতে অভিষেকের পর থেকেই দলে নিয়মিত মুখ তরুণ ব্যাটসম্যান মোসাদ্দেক হোসেন। ছয় থেকে আট, বিভিন্ন সময়ে তার ব্যাটিং অর্ডার পরিবর্তিত হলেও ধারাবাহিকটি ধরে রেখেছেন তিনি। সাথে রয়েছে কার্যকরী অফস্পিন। নাসিরের দলে ফেরাটা তিনিই কঠিন করে দিয়েছেন কেননা দুজনই প্রায় সমমানের খেলোয়াড় এবং এই মুহূর্তে ফর্মের বিচারে মোসাদ্দেকই প্রাধান্য পাচ্ছেন।

ওয়ানডেতে গত বছর ব্যর্থতার মূল কারণ বাংলাদেশ দলের ধারাবাহিক ব্যাটিং ধস।অথচ বছরজুড়ে বারবার এভাবে ব্যাটিং ধ্বসের সাথে কোচ, নির্বাচক, নাসির, শুভাগত এবং তানবীরদের কোন সম্পর্কই নেই। তাই দল নির্বাচন প্রশবিদ্ধ হলেও পরাজয়ের পেছনে সেটিই মুখ্য ভূমিকা পালন করেনি। তবুও নির্দিষ্ট কিছু খেলোয়াড়ের ওপর প্রতিনিয়ত সব দোষ চাপিয়ে দেয়া হয়। শুভাগত হোম, মোশাররফ রুবেল, নুরুল হাসান সোহান, শুভাগত হোম, তানভির হায়দার, কামরুল হাসান রাব্বি, শুভাশীষ রায়, সৌম্য সরকাররা তেমনি কিছু নাম।

দল হারলেই তাদের মুণ্ডুপাত করা হয়। সৌম্য ফর্মে নেই একবছর ধরেই, তারপরেও তাকে বিশ্রাম না দিয়ে খেলিয়ে যাচ্ছে টিম ম্যানেজম্যান্ট। তারা আশা করছেন সৌম্য একটা বড় ইনিংস খেলে আবার নিজেকে ফিরে পাবেন যা মোটেও হচ্ছেনা। কেবল ফিক্সার ছাড়া দুনিয়ার কোন খেলোয়াড়ই ইচ্ছা করে খারাপ খেলেননা। এক্ষেত্রে সৌম্য কি করবেন? তিনি অনুরোধ করবেন তাকে যেন আর না নেয়া হয়?

একই কথা প্রযোজ্য শুভাগত হোমের ক্ষেত্রেও। তিনি নিজেও জানেন না দলে তার আসল ভূমিকাটা কি। কেননা কখনো তিনি স্পেশালিস্ট স্পিনার, আবার কখনো লোয়ার অর্ডারের অলরাউন্ডার! টি-টোয়েন্টি এবং টেস্টে সুযোগ পেলেও বলার মত কিছুই করতে পারেননি। তবুওঅদ্ভুত যুক্তিতে বারবার তিনি হয়ত দলে টিকেও যান। জাতীয় দলে খেলার স্বপ্ন সবারই থাকে, শুভাগত হোম ভাগ্যবান বলে ভাল না খেলেও তিনি সুযোগ পেয়েই যাচ্ছেন। তবে সেজন্য তাকে তো কোনভাবেই দোষারোপ করা যায়না কারন তিনি তো নিজেকেই দল বাদ দিতে পারেননা।

নুরুল হাসানের যোগ্যতা নিয়েও কম প্রশ্ন তোলা হয়নি। মাত্র ছয়টি আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টি এবং বিপিএল দিয়েই একজন খেলোয়াড়কে বিচার করাটা কতটা যুক্তিসংগত? দয়া করে স্রেফ টি-টোয়েন্টি দিয়ে কোন খেলোয়াড়দের মানদন্ড বিচারের ঐতিহ্য পরিহার করুন। অস্ট্রেলিয়ায় দ্বিতীয় প্রস্তুতি ম্যাচে তারকা ব্যাটসম্যানদের ব্যর্থতার মিছিলে একাই দাঁড়িয়ে গিয়েছিলেন সোহান এবং খেলেছিলেন ৩৯ রানের দায়িত্বশীল একটি ইনিংস। মুশফিকের ইনজুরিতে শেষ দুটি ওয়ানডেতে সুযোগ পেয়ে সোহান প্রত্যাশার চেয়েও ভাল খেলেছেন।

দ্বিতীয় ওয়ানডেতে ৩১ বলে ২৪ রানের পর তৃতীয় ওয়ানডেতে ১৬৮ রানে পঞ্চম উইকেট পতনের পর খেলেছেন ৩৯ বলে করা ৪৪ রানের কার্যকরী একটি ইনিংস। মাঠের চারদিকেই বেশ সাবলীনভাবেই ব্যাট চালিয়েছেন। মুশফিক দলে ফিরলে নিশ্চিতভাবেই জায়গা হারাবেন সোহান, তবে তার বদলে নেমে একেবারে মন্দও করেননি তিনি।

ব্যাটসম্যান হিসেবে মাহমুদউল্লাহ রিয়াদের চেয়েও এই সিরিজে সোহান ভাল খেলেছেন। উইকেটরক্ষক হিসেবেও ছিলেন অসাধারণ। অথচ সিরিজ শুরুর পূর্বেই তাকে নিয়ে চারিদিকে কতরকমের উপহাস! কতরকমের জল্পনা কল্পনা কেন বিজয়কে বাদ দিয়ে সোহানকে দলে নেয়া হল যিনি কিনা ব্যাটিংটাই পারেন না!

মনে রাখা প্রয়োজন, ইমরুল এবং সোহানের পরিবর্তে ওপেনার ও উইকেটরক্ষক হিসেবে যে বিজয়কে দলে নেয়ার জন্য এখন ভার্চুয়াল জগতে ঝড় বয়ে যাচ্ছে, তাকেই দল থেকে বাদ দেয়ার জন্য সবচেয়ে বেশি গালমন্দ শুনতে হয়েছে এই ভার্চুয়াল জগতেই। বিজয়ের টেকনিক ভালোনা, সে স্বার্থপর, সে দলের জন্য খেলেনা, সে স্টাইল বেশি করে খেলায় মনোযোগ নাই ইত্যাদি অভিযোগে জাতীয় দল থেকে বাদ দেয়ার প্রাক্কালে তাকেও কড়া সমালোচনার মুখোমুখি হতে হয়েছিল।

তো এখন সেই বিজয়কে দলে নিলেই সব বদলে যাবে? বিজয়ের কি স্টাইল সচেতনতা কমে গেছে? নাকি টেকনিকের সব দুর্বলতা তিনি শুধরে ফেলেছেন? নাকি এখন দলে নিলে তিনি দলের জন্য খেলবেন বলে প্রতিজ্ঞা করেছেন? কোনটাই না। কারণ এই সমস্যাগুলো তার আগেও ছিলোনা, এখনো নেই। একজনকে সমালোচনা করে দলের বাইরে ছুড়ে ফেলতেই এখন আরেকজনকে আমরা নিজেরাই বেটার চয়েস বানিয়ে ফেলেছি।

তানবীর, রাব্বি, শুভাশীষ, মোশাররফ রুবেলরাও একইরকম পরিস্থিতির স্বীকার। তাদের মূল অপরাধ তাদেরকে জাতীয় দলে নেয়া হয়েছে! অন্য কোন খেলোয়াড়ের বদলে তাদের নেয়া হয়েছে বলে ঢালাওভাবে তাদেরকে সমালোচনার মুখোমুখি হতে হচ্ছে। এখানে এই খেলোয়াড়দের কিইবা করার আছে? দলে নেয়া হয়েছে, তাই তারা খেলছেন আবার বাদও পড়ছেন। নাসির, রুবেল, বিজয়, আল-আমিনরা দলে সুযোগ পাচ্ছেন না, সেটার জন্য তো যারা সুযোগ পাচ্ছেন তারা তো দায়ী নন।

সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশ দল কোন ম্যাচ হারলেই সর্বত্র নাসিরকে দলে নেয়ার জন্য রব উঠে যায়। নাসিরের মত প্রতিভাবান একজন অলরাউন্ড দক্ষতার খেলোয়ারের এভাবে দলের বাইরে থাকাটা অবশ্যই হতাশাজনক। তবে সেজন্য দল হারলেই নাসিরকে দলে ফেরানোর জন্য ঝড় তোলাটা কতটা যৌক্তিক? সাধারণ ভক্তদের পাশাপাশি নাসিরকে দলে নেয়ার জন্য নিয়মিত নানারকম স্টাস্টাস, পোস্ট দেন দেশের স্বনামধন্য একজন লেখকও!

অন্য কোন খেলোয়াড়কে দলে নেয়ার জন্য অবশ্য কোনরকম তৎপরতা দেখান না তিনি। একজন নির্দিষ্ট খেলোয়াড়কে দলে নেয়ার জন্য আমজনতা এমনকি সেলিব্রেটিদেরও এমন ভূমিকা বিশ্বে বিরল। নাসির তো কোন জাদুকর নন যে তিনি খেললেই রাতারাতি সব ম্যাচ একই জিতিয়ে দিবেন। বাংলাদেশ দল গত বছর নয়টি ওয়ানডের ছয়টিতে হেরেছে মূলত দলগত ব্যর্থতার জন্য, নির্দিষ্ট কোন খেলোয়াড়ের ব্যর্থতার জন্য নয়। তাই এক নাসির কোন সমাধান নন।

আমরা ভুলে যাচ্ছি নাসির আজকের জায়গায় এসেছেন সম্পূর্ণ নিজের যোগ্যতায়। তাই তার ওপর ভরসা রাখুন। ধারাবাহিক পারফর্মেন্স বজায় রাখলে কোচ, নির্বাচকরাই তাকে আবারো দলে ফিরিয়ে আনতে বাধ্য হবেন। নাসির দেশের সম্পদ, তিনি কারো শত্রু নন। তাই ধৈর্য ধরে অপেক্ষা ধরুন, নাসিরের সুযোগ একটু দেরিতে হলেও অবশ্যই আসবে।

সুতরাং জাতীয় দলে সুযোগ পাওয়া জন্য কোন খেলোয়াড়কে এভাবে ট্রল কিংবা গালমন্দ করা থেকে বিরত থাকাটাই হবে সবার জন্য মঙ্গলজনক। খেলোয়াড়দেরও পরিবার আছে, ভার্চুয়াল জগতে এসব দেখলে শুনলে তাদের কষ্ট পাবারই কথা। তাই আমাদের উচিত হবে নিজ নিজ প্রিয় খেলোয়াড়কে সমর্থন দেয়া, দলকে সমর্থন দেয়া এবং তাদের জন্য শুভকামনা জানানো। যিনি যোগ্য, তিনি নিজের জায়গা ফিরে পাবেনই। কেউই তাকে দীর্ঘদিন দমিয়ে রাখতে পারবেন না।

Category : ফিচার
Share on your Facebook
Share this post