ক্রিকেট ব্যাটের পাঁচ কাণ্ড

রিমন ইসলাম
জানুয়ারী ১, ২০১৭
 ব্যাট নিয়ে বির্তকের সূত্রপাত এই প্রথম নয়। ব্যাট নিয়ে বির্তকের সূত্রপাত এই প্রথম নয়।

কিছুদিন আগেই বিগ ব্যাশে ওয়েস্ট ইন্ডিজ অল-রাউন্ডার আন্দ্রে রাসেল উজ্জ্বল কালো ব্যাট দিয়ে ব্যাট করতে নেমে ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দেন। টুর্নামেন্ট শুরুর দিন সেই ব্যাট দিয়ে মাঠে নামার পর ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়া (সিএ) প্রথম দফায় বলের ক্ষতির দোহাই দিয়ে নিষিদ্ধ করে ফেলেছিল এই ব্যাট। পরে আবারও শর্তসাপেক্ষে এই ব্যাট ব্যবহারের অনুমতি পান রাসেল।

শোনা যাচ্ছে, আসছে এপ্রিলে ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগে (আইপিএল) রঙিন ব্যাট ব্যবহার করতে যাচ্ছেন মহেন্দ্র সিং ধোনি। আবার একদিন আগেই ব্র্যাড হগ বিগ ব্যাশে লাল ব্যাট ব্যবহারের ঘোষণা দিয়ে দিলেন। ফলে, চোখ বন্ধ করে বলে দেওয়া যায়, চলছে এখন ব্যাট নিয়ে তোলপাড়ের সময়।

তবে, ব্যাট নিয়ে বির্তকের সূত্রপাত এই প্রথম নয়। এটা অনেকটা আমাদের ক্রিকেট ইতিহাসের সাথেই মিশে আছে। চলুন জেনে নেওয়া যাক এর পাঁচটি নজীর।

দানব আকৃতির ব্যাট (১৭৭১)

ব্যাটের আকার নিয়ে প্রথম বিতর্কের সূত্রপাত এখানেই। সময়টা ১৭৭১ সাল, আন্তর্জাতিক ক্রিকেট শুরুর অনেক আগের কথা। আর এই ম্যাচের ঘটনা থেকেই ব্যাটের নির্দিষ্ট সাইজ নিয়ে নিয়মকানুন চালু করা হয়। ২৫ সেপ্টেম্বর চেরটসে এবং হাম্বলটনের মধ্যকার ম্যাচে থমাস হোয়াইট ব্যাট করতে নামেন এমন এক ব্যাট নিয়ে যা পুরো স্ট্যাম্পই ঢেকে ফেলেছিল!

জানা যায়, হোয়াইট যদি কখনো চাইতেন তিনি সব বল ঠেকিয়ে পার করবেন, তাহলে তাকেই কেউই আউট করতে পারতোনা। ফাস্ট বোলার থমাস ব্রেটের নেতৃত্বে হাম্বলটনের ফিল্ডাররা তাৎক্ষণিকভাবে আম্পয়ারের কাছে এর প্রতিবাদ জানান। ব্যাটের সাইজ নিয়ে বিতর্ক অবসানে হাম্বলটনের অধিনায়ক রিচার্ড ন্যারেন এবং অলরাউন্ডার জন স্মল একটি আবেদন করেন যা পরবর্তীতে ব্যাটের একটি নির্দিষ্ট সাইজ নির্ধারণে গুর্তুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। প্রসঙ্গত, ঘটনাবহুল সেই ম্যাচে হাম্বলটনের ২১৮ রানের জবাবে চেরটসে শেষ পর্যন্ত এক রানে পরাজিত হয়েছিল।

ডেনিস লিলির অ্যালুমিনিয়ামের ব্যাট (১৯৭৯)

১৯৭৯ সালের ১৫ ডিসেম্বর অস্ট্রেলিয়ান ফাস্ট বোলার ডেনিস লিলি ব্যাট করতে নেমে যান অ্যালুমিনিয়াম দিয়ে তৈরি ব্যাট নিয়ে। পার্থে অনুষ্ঠিত অ্যাশেজের প্রথম টেস্টের প্রথম দিনশেষে ৮ উইকেটে হারিয়ে ২৩২ করে ধুঁকছিল অস্ট্রেলিয়া। ডেনিস লিলি অপরাজিত ছিলেন ১১ রানে।

কিন্তু, পরদিন সকালে সবাই বিস্ময়ের সাথে লক্ষ্য করেন লিলি অ্যালুমিনিয়ামের ব্যাট নিয়ে মাঠে প্রবেশ করেছেন। এর ১২ দিন আগেই ওয়েস ইন্ডিজের বিপক্ষে একটি ম্যাচেও একই কাজ করেছিল লিলি, তবে সে দফায় ব্যাট নিয়ে কেউ অভিযোগ তোলেনি। কিন্তু এখানে মাত্র চার বল পরই সমস্যার উদ্রেগ হয় যখন ইয়ান বোথামের একটি বলে স্ট্রেইট ড্রাইভ করে দৌড়ে তিন রান নেন লিলি।

বলটা হওয়ার পরপরই অস্ট্রেলিয়ার অধিনায়ক গ্রেগ চ্যাপেল দ্বাদশ ব্যক্তি রডনি হগকে কাঠের ব্যাট দিয়ে লিলির কাছে পাঠান কারণ তার কাছে মনে হয়েছিল কাঠের ব্যাট দিয়ে ব্যাট করলে বলটি বাউন্ডারি হত। কিন্তু, লিলি মোটেও ব্যাট পরিবর্তনের পক্ষে ছিলেন না।

অন্যদিকে ইংল্যান্ড অধিনায়ক মাইক ব্রিয়ারলি আম্পায়ারের কাছে অভিযোগ জানান অ্যালুমিনিয়ামের ব্যাট দিয়ে ব্যাট করার ফলে বলের ক্ষতি হয়েছে। কিন্তু, নাছোড়বান্দা লিলি কোনভাবেই ব্যাট পরিবর্তন করতে চাচ্ছিলেন না। অবশেষে অধিনায়ক গ্রেগ চ্যাপেল নিজেই মাঠে প্রবেশ করেন এবং লিলিকে একটি কাঠের ব্যাট ধরিয়ে দেন। বাকি ইনিংস নতুন ব্যাট দিয়ে ব্যাটিং করলেও অ্যালুমিনিয়ামের ব্যাটটি ছুড়ে ফেলে দিয়ে কুৎসিত এক ঘটনার জন্ম দেন লিলি।

স্টিকার সম্বলিত ব্যাট (২০০৫)

২০০৫ সালে ব্যাটের পিছনের অংশে কৃষ্ণসীস নামক ধাতু সম্বলিত স্টিকার লাগানো ব্যাট ব্যবহার করে অস্ট্রেলিয়ান অধিনায়ক রিকি পন্টিং আলোচনায় আসেন। এমসিসি এই ব্যাপারে আইসিসির কাছে তাদের শঙ্কার কথা জানায়। তাদের ধারণা, স্টিকারটির ব্যবহার ব্যাটে অতিরিক্ত শক্তি যোগ করছে যা ব্যাটসম্যানদের বাড়তি সুবিধা দিচ্ছে।

পরবর্তীতে সেই ব্যাটের সুক্ষ্ম বিশ্লেষণ করে এমসিসি জানিয়ে দেয় এ ধরনের ব্যাট ব্যবহার করাটা অবৈধ। একই কারণে তারা কোকাবুরার আরো দু'টি বিশেষ ব্যাট 'দ্যা বিস্ট' এবং 'জেনেসিস হারিকেন্স' নিষিদ্ধ ঘোষনা করে। প্রসঙ্গত, ২০০৪-০৫ মৌসমে পন্টিং কোকাবুরার এই ব্যাট দিয়েই সিডনিতে পাক্সিতানের বিপক্ষে দ্বিশতক হাঁকান।

‘মঙ্গুজ’ ব্যাট (২০১০)

২০১০ সালে আইপিএলের তৃতীয় আসরে সাবেক অস্ট্রেলিয়ান ওপেনার ম্যাথু হেইডেন 'মঙ্গুজ' নামক ব্যাট দিয়ে খেলতে নেমে সবাইকে অবাক করে দেন। কারন এরকম ব্যাট আগে কেউই ব্যবহার করেনি। প্রথাগত ব্যাট থেকে সেই ব্যাটটি আকৃতিতে ছিল বেশ ছোট। ফলে চারিদিকে প্রশ্ন উঠে এমন ব্যাট আদৌ বৈধ কিনা। তবে, মঙ্গুজ ব্যাট যে কতটা বিদ্ধংসী হতে পারে তার প্রমান পাওয়া যায় দিল্লী ডেয়ারডেভিলসের বিপক্ষে হেইডেনের ৪৩ বলে ৯৩ রানের ঝড়ো ইনিংসটি থেকে।

বাংলাদেশি ক্রিকেটার মোহাম্মদ আশরাফুল মঙ্গুজ ব্যাটকে স্বাগত জানিয়ে বলেছিলেন, ‘পুরো ব্যাটের সব জায়গাই সমান শক্তিশালী। তাই এই ব্যাটের কাজই হল, বল ব্যাটে বলে আসামাত্রই তাকে বাউন্ডারিতে পাঠানো।’

আক্রমণাত্বক ব্যাটিংয়ের ক্ষেত্রে অত্যন্ত কার্যকরী হলেও রক্ষনাতবক ব্যাটিংয়ের ক্ষেত্রে মঙ্গুজ ব্যাট মোটেও সহায়ক ছিলোনা। হেইডেনের চেন্নাই সুপার কিংস সতীর্থ সুরেশ রায়নাও একই ব্যাট ব্যবহার করেছিলেন। নিজের অভিজ্ঞতা জানাতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘আক্রমণের জন্য এই ব্যাট ভাল একটা চয়েস হতে পারে। তবে রক্ষণের ক্ষেত্রে এটা একেবারেই দুর্বল। তাই আমি আবারও আগের ব্যাটে ফিরে গেছি।’

সোনালী ব্যাট (২০১৫)

২০১৫ সালের বিগ ব্যাশে প্রথম ম্যাচের আগে ক্রিস গেইলের জন্য ভারত থেকে সোনালি রংয়ের স্পার্টান ব্যাট পাঠানো হয়। বিশেষ সেই ব্যাট নিয়ে গেইল খেলতে নামেন এবং আউট হওয়ার পূর্বে কয়েকটি ছক্কার সাহায্যে ২৩ রান করেন।

গেইলই ছিলেন প্রথম ব্যাটসম্যান যিনি পুরোপুরি রঙিন ব্যাট ব্যবহার করেছিলেন। তবে এই ব্যাট নিয়ে কম সমালোচনা হয়নি। অনেকেই প্রশ্ন তুলেছিলেন এই ব্যাটে ধাতু রয়েছে।

তবে স্পার্টান কোম্পানির স্বত্তাধিকারী কুনাল শর্মা সব অভিযোগ উড়িয়ে দিয়ে জানান, ‘ব্যাটে শুধুই সোনালি রং ব্যবহার করা হয়েছে, এতে কোনরকমের ধাতু নেই। ব্যাট বানানোর জন্য সুনির্ধারিত একটা নীতিমালা আছে। সেটা মেনেই আমরা কাজ করি।’

Category : ফিচার
Share on your Facebook
Share this post