ডাগআউটের সেই খিটখিটে বুড়ো

সঞ্জয় পার্থ
জানুয়ারী ১, ২০১৭
ক্যারিয়ার জুড়ে অসংখ্যবার ‘ফার্গি টাইম’ আদায় করে নিয়েছেন ফার্গুসন। ক্যারিয়ার জুড়ে অসংখ্যবার ‘ফার্গি টাইম’ আদায় করে নিয়েছেন ফার্গুসন।

When my daddy was dying, he was in a hospital in London, and it was not good. I said to him, ‘Coach, I want to go.’ It was a crucial moment of the season, but he said: ‘Football doesn’t mean anything compared to your dad. If you want to go, go. I will always appreciate that.’ He is my football father.

আপনি ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড ফ্যান না? আচ্ছা কোন ব্যাপার না। আপনি ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর ও ফ্যান না? তাতেও কোন সমস্যা নেই। আপনি নিয়মিত ফুটবলের খবরাখবর রাখেন? তাহলে অন্তত শেষের লাইনটা দেখে আপনার বুঝে ফেলার কথা, উপরের কথাগুলো কাকে উদ্দেশ্য করে বলেছেন রোনালদো। রোনালদোর ‘ফুটবল ফাদার’, আধুনিক সময়ের অন্যতম গ্রেট কোচ, ওল্ড ট্রাফোর্ডের প্রাণ- স্যার আলেকজান্ডার চ্যাপম্যান ফার্গুসন।   

২৪ বছর ডাগ আউটে কাটানোর পর স্যার ম্যাট বাসবি বিদায় নিলেন ইউনাইটেড থেকে, যাওয়ার সময় বোধহয় সঙ্গে করে নিয়ে গেলেন ইউনাইটেডের ট্রফিভাগ্যকেও। স্যার বাসবির আমলে যেখানে ২৪ বছরে ১৩ টি ট্রফি জিতেছিল রেড ডেভিলরা, সেখানে তিনি বিদায় নেয়ার পরের ১৭ বছরে ইউনাইটেডের সম্বল কেবল তিন টি এফ.এ. কাপ আর তিন টি কমিউনিটি শিল্ড শিরোপা!

১৭ বছরে কোচ বদল হলেন পাঁচ জন, কিন্তু কাঙ্ক্ষিত লিগ শিরোপা আর জেতা হচ্ছিল না। লিগ শিরোপার আশায় গ্লেজার পরিবারের নজর পড়ল এক স্কটিশের উপর, এরইমধ্যে যিনি ফুটবল দুনিয়ায় মোটামুটি পরিচিত হয়ে উঠেছেন। ১৯৮৬ সালের ছয় নভেম্বর, ওল্ড ট্রাফোর্ডে পদার্পণ করলেন সেই স্কটিশ, যেই ওল্ড ট্রাফোর্ডের সাথে আস্তে আস্তে আজীবনের জন্য মিশে গেছে তাঁর নাম!   

গ্লাসগোতে জন্ম নেয়া ১৬ বছরের এক কিশোরের ফুটবল অভিষেক হল স্থানীয় ক্লাব কুইন্স পার্কের হয়ে। প্রথম ম্যাচেই জাল খুঁজে পেল ছেলেটা, কিন্তু দল জিতল না। প্রথম মৌসুমেই দলের সর্বোচ্চ গোলদাতা হল, তবুও ক্লাবে তাঁর ভবিষ্যৎ নিশ্চিত হল না। স্থায়ী একটা ক্যারিয়ারের আশায় এ ক্লাব সে ক্লাব ঘুরল, কিন্তু কোন দলেই স্থায়ী হতে পারল না। শেষমেশ খেলোয়াড়ি জীবনের ইতি টেনে দিয়ে ছেলেটা মনোনিবেশ করল ম্যানেজার হওয়ার দিকে। শুরু হল ভবিষ্যতের কিংবদন্তি এক কোচ, স্যার অ্যালেক্স ফার্গুসনের কোচিং ক্যারিয়ার।  

মাত্র ৩২ বছর বয়সেই বুটজোড়া তুলে রেখে ম্যানেজারের চেয়ারে বসে পড়লেন ফার্গুসন, ক্লাবের নাম ইস্ট স্টার্লিংশায়ার। একেবারেই আনকোরা এক তরুণের হাতে ক্লাবের ভার দিয়ে বোধহয় নিশ্চিন্ত হতে পারছিল না ক্লাবের মালিক পক্ষ, দীর্ঘমেয়াদী চুক্তির বদলে তাই করা হল পার্ট টাইম চুক্তি, সপ্তাহে বেতন মাত্র ৪০ পাউন্ড! তিন মাস পরেই ক্লাব বদলে সেন্ট মিরেনে চলে আসলেন তিনি।

চার বছর ছিলেন সেন্ট মিরেনে, এই সময়ের মধ্যেই আমূল বদলে দিলেন ক্লাবের খোলনলচে! দ্বিতীয় বিভাগের নিচের দিকে থাকা এক দলকে ৩ বছরের মধ্যে ১ম বিভাগে তুলে এনে চ্যাম্পিয়ন বানালেন! সেন্ট মিরেন ফার্গুসনের জীবনে আলাদা হয়ে থাকবে দুইটি কারণে। প্রথম কারণ, ক্যারিয়ারে অসংখ্য ট্রফি জিতলেও প্রথম ট্রফিটা এসেছিল এই সেন্ট মিরেনেই। আর দ্বিতীয় কারণ, সেন্ট মিরেনই কোচ ফার্গুসনের জীবনের একমাত্র ক্লাব, যারা ফার্গুসনকে বরখাস্ত করেছিল!

ফুটবল দুনিয়ায় ইউনাইটেডের ফার্গি বলে পরিচিত হলেও ফার্গুসনের জীবনে আরেকটি ক্লাবও স্মরণীয় হয়ে থাকবে, স্কটিশ ক্লাব এবারডিন। আজকের ফার্গুসন হয়ে ওঠার যাত্রার শুরুটা যে এবারডিন থেকেই!

ইস্ট স্টার্লিংশায়ার, সেন্ট মিরেন ঘুরে ফার্গুসনের পদধূলি পরল এবারডিনে, ১৯৭৮ এর জুনে। স্কটল্যান্ডের অন্যতম বড় ক্লাব হওয়া সত্ত্বেও নিজেদের ইতিহাসে মাত্র একবারই লিগ জিততে পেরেছিল এবারডিন। ফার্গুসনের কাছে তাই প্রত্যাশা ছিল বিবর্ণ ইতিহাস মুছে রঙ্গিন বর্তমান আঁকা। রঙ্গিন সে যাত্রায় শুরুটা একেবারে খারাপ হয়নি ফার্গির।

১৯৭৯-৮০ তে এবারডিনকে স্কটিশ লিগ কাপের ফাইনালে তুললেন, স্কটিশ কাপের সেমিতেও উঠে গিয়েছিল। কিন্তু কোনটারই ট্রফি ছুঁয়ে দেখা হয়নি ফার্গির। তবে এই দুইয়ের আক্ষেপ এবারডিন ভুলে যায় এই মৌসুমেই লিগ জিতে। এবারডিনের লিগ জয় আরেক দিক থেকে তাৎপর্যপূর্ণ ছিল, ১৫ বছরের মধ্যে এই প্রথম সেল্টিক কিংবা রেঞ্জার্সের বাইরে কোন দল লিগ জিতল!

ফার্গির এবারডিন আসল চমকটা দেখাল ১৯৮২-৮৩ মৌসুমে। স্কটিশ কাপ জয়ের কারণে সেই মৌসুমে ইউরোপিয়ান কাপ উইনার্স কাপে অংশগ্রহণের সুযোগ পায় এবারডিন। সুযোগটা যে এভাবে দুহাতে লুফে নেবেন ফার্গি, সেটা বোধহয় কারোর কল্পনাতেও ছিল না। প্রথম চমকটা আসে বায়ার্নকে বিদায় করে দিয়ে। আর চূড়ান্ত চমকটা দেখায় ফাইনালে ২-১ গোলে ইউরোপের অন্যতম অভিজাত ক্লাব রিয়াল মাদ্রিদকে হারিয়ে। মৌসুমটা স্বপ্নের মতই কেটেছিল ফার্গুসনের, এবারডিনকে নিয়ে যে ট্রেবল জিতেছিলেন সেই বছর!

ছয় নভেম্বর, ১৯৮৬। ইউনাইটেডের ইতিহাসের অন্যতম তাৎপর্যপূর্ণ দিন বললে কি কিছু ভুল বলা হবে? ওল্ড ট্রাফোর্ডে পরিচয় করিয়ে দেয়া হল স্কটিশ ফার্গুসনকে, যার হাত ধরেই আগামী ২৬ বছরে ৩৮ টি ট্রফি জিতেছিল ইউনাইটেড। স্বর্ণালী এক যুগের শুরু যে দিনটাতে, সে দিনটাকে তো আলাদা করে মনে রাখতেই হয়!

দায়িত্ব নেয়ার সময় লিগে ইউনাইটেডের অবস্থান ছিল ২১ তম, নিচের দিক থেকে ২য়। প্রথম মৌসুমে দলকে ১১ তে রেখে লিগ শেষ করলেন ফার্গি। আস্তে আস্তে উন্নতি করতে থাকে ফার্গির ইউনাইটেড, প্রথম শিরোপা জিতলেন ১৯৮৯-৯০ এ, এফ.এ কাপ জিতে। তবে সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত যেই শিরোপা, সেই লিগ শিরোপা জয়ের স্বাদ পেলেন ১৯৯২-৯৩ মৌসুমে এসে।

অথচ, জিততে পারতেন আগের মৌসুমেই, মৌসুমের বেশিরভাগ সময়টা প্রাধান্য বজায় রাখলেও গোল ব্যবধানে পিছিয়ে থাকায় শিরোপা হারাতে হয় লিডস ইউনাইটেডের কাছে। ফার্গুসন আরেকদিক থেকেও অমরত্ব পেয়ে গেছেন ইংলিশ ফুটবলে, প্রিমিয়ার লিগ চালু হওয়ার পর ফার্গুসনই প্রথম প্রিমিয়ার লিগ জয়ী কোচ।  

পরের মৌসুমে এল আরও সাফল্য। রেকর্ড গড়ে রয় কিনকে নিয়ে এলেন, টানা দ্বিতীয়বার লিগও জিতলেন। এফ.এ কাপ ফাইনালে চেলসিকে হারালেন ৪-৩ গোলে, কিন্তু কাপ ফাইনালে অ্যাস্টন ভিলার কাছে হেরে ট্রেবল হাতছাড়া হয় ইউনাইটেডের।

ট্রেবল জয়ের এই আক্ষেপ ঘুঁচে যায় ১৯৯৮-৯৯ মৌসুমে। লিগের পর নিউক্যাসলকে হারিয়ে যেতে এফ.এ কাপ, এরপর চ্যাম্পিয়ন্স লিগ ফাইনালে বায়ার্ন মিউনিখকে ২-১ গোলে হারিয়ে ওল্ড ট্রাফোর্ডে ট্রেবলের আনন্দধারা বইয়ে দেন ফার্গি।

ইউনাইটেডের দায়িত্ব নেয়ার আগে মাঝে কিছুদিন স্কটল্যান্ড জাতীয় দলের দায়িত্বও পালন করেন ফার্গি। প্রধান কোচ জক স্টেইনের আকস্মিক মৃত্যু হলে ফার্গুসনের কাঁধে দায়িত্ব দেয়া হয় স্কটল্যান্ড দলের। বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্ব থেকেই স্কটিশরা বিদায় নিলে কোচের পদ ছেড়ে দেন ফার্গুসন।

সার্জিও রামোস ইদানীংকালে অতিরিক্ত সময়ে গোল করছেন বলে ভক্তরা ভালোবেসে নাম দিয়েছেন ‘সার্জি টাইম’, তবে এই সার্জি টাইম নামটা কোত্থেকে এসেছে সেটা আন্দাজ করতে পারছেন কি? হ্যাঁ, ঠিকই ধরেছেন, নামটা ধার করা হয়েছে ‘ফার্গি টাইম’ থেকে। ফুটবলের ইতিহাসেই যে নামটা এক প্রকার অমরত্ব পেয়ে গেছে স্যার অ্যালেক্স ফার্গুসনের কারণে!

ফুটবলে দুই অর্ধেই কিছুটা অতিরিক্ত সময় দেয়া হয় খেলার মাঝের কালক্ষেপণগুলো পুষিয়ে নেয়ার জন্য। ফার্গুসন এই অতিরিক্ত সময়েরও অতিরিক্ত সময় বের করে নিতেন রেফারিদের উপর পরোক্ষ চাপ তৈরি করে! শুরুটা হয়েছিল ১৯৯৩ এর এপ্রিলে। ১৯৬৭ এর পর থেকে আর লিগ জেতা হয়নি ইউনাইটেডের, এবার সবচেয়ে ভালো সুযোগ লিগ জেতার। দরকার শুধু শেষ ম্যাচে শেফিল্ডের বিপক্ষে জয়। খেলা শেষ হয়ে যাচ্ছে, অতিরিক্ত সময়ও প্রায় শেষের পথে, কিন্তু জয়সূচক গোলের দেখা আর মেলে না।

শেষ পর্যন্ত ৯৭ মিনিটে গোল করে স্টিভ ব্রুস জিতিয়ে দেন ইউনাইটেডকে। ’৯৯ চ্যাম্পিয়ন্স লিগ ফাইনালেও দেখা গেল ফার্গি টাইমের ক্যারিশমা। নির্ধারিত সময় শেষে বায়ার্ন ১ গোলে এগিয়ে, বাভারিয়ানরা তখন শিরোপা জয়ের আগাম উদযাপন করতে ব্যস্ত। কিন্তু অতিরিক্ত সময়ে ২ গোল করে বায়ার্নের মুখের হাসি কেড়ে নেয় ফার্গির ইউনাইটেড, জিতে যায় ট্রেবল।

এখানেই শেষ নয়, ফার্গি টাইমের নমুনা আছে আরও। ২০০৯ সালে ম্যানচেস্টার ডার্বিতে ৯৬ মিনিটে মাইকেল ওয়েনের গোলে ৪-৩ এ যেতে ইউনাইটেড, অথচ চতুর্থ রেফারি অতিরক্ত সময় দিয়েছিলেন ৪ মিনিট! বাকি ২ মিনিট ফার্গুসন আদায় করে নিয়েছিলেন!  ক্যারিয়ারজুড়ে এমন অসংখ্যবার ‘ফার্গি টাইম’ আদায় করে নিয়েছেন ফার্গুসন, আর প্রায়ই সেইসময়ে কাঙ্ক্ষিত গোল বের করে নিত ইউনাইটেড!

তবে এই ফার্গি টাইম নিয়ে বিতর্ক কম হয়নি। ইউনাইটেডকে বাড়তি সুবিধা দেয়া হচ্ছে কিনা প্রশ্ন উঠেছে সেটা নিয়েও। ফুটবল পরিসংখ্যান বিষয়ক ওয়েবসাইট অপ্টা ২০০৬-২০০৯ সালের মধ্যে ৪৮ টি ম্যাচ পর্যালোচনা করে দেখে, নির্ধারিত সময়ে ইউনাইটেড এগিয়ে থাকলে অতিরিক্ত সময় দেয়া হয় গড়ে ১৯১.৩৫ সেকেন্ড, আর পিছিয়ে থাকলে দেয়া হয় গড়ে ২৫৭.১৭ সেকেন্ড! 

ইউনাইটেডের কোচ হিসেবে ২৬ বছরের যাত্রা শেষ করেন ২০১৩ সালে, কিন্তু ইউনাইটেডের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করতে পারেননি। ক্লাবের পরিচালক ও দূত হিসেবে কাজ করে গেছেন। ২৬ বছরের ইউনাইটেড ক্যারিয়ারে জিতেছেন মোট ৩৮ টি ট্রফি, যার মধ্যে আছে ১৩ টি প্রিমিয়ার লিগ, ৫ টি এফ.এ কাপ ও ২ টি চ্যাম্পিয়ন্স লিগ শিরোপা।

এই ২৬ বছরে লিভারপুলের ম্যানেজার বদল হয়েছে ১০ বার, নগর প্রতিদ্বন্দ্বী সিটির ম্যানেজার বদল হয়েছে ১৯ বার, এমনকি ইংল্যান্ড জাতীয় ফুটবল দলের কোচও বদল হয়েছে ১২ বার, কিন্তু ফার্গুসনের জায়গা টলেনি এক বিন্দুও। ফুটবলে বিশেষ অবদানের জন্য ১৯৯৯ সালে দেয়া হয় নাইট উপাধি। ইউনাইটেডের ইতিহাসে ফার্গুসনই সবচেয়ে বেশি সময় ধরে থাকা কোচ। ইউনাইটেডে ২৫ বছর পূর্তি উপলক্ষে ওল্ড ট্রাফোর্ডে বসানো হয় ৯ ফুট উচ্চতার ব্রোঞ্জের ফার্গুসনের ভাস্কর্য।

বিশ্বজুড়ে নতুন বছরের আমেজ। ঘটা করে উদযাপিত হল ৩১ ডিসেম্বর, বছরের শেষ দিন। তবে ইউনাইটেড ফ্যানদের কাছে এই দিনটির অর্থ অন্য আরেকটা। দিনটি যে তাদের প্রাণের ফার্গুসনের ৭৫ তম জন্মদিন! শুভ জন্মদিন, কিংবদন্তি স্যার অ্যালেক্স ফার্গুসন!  

Category : ফিচার
Share on your Facebook
Share this post