আমলা কি পারবেন!

উদয় সিনা
ডিসেম্বর ২৬, ২০১৬
  'ফর্ম ইজ টেম্পোরারি বাট ক্লাস ইজ পার্মানেন্ট' 'ফর্ম ইজ টেম্পোরারি বাট ক্লাস ইজ পার্মানেন্ট'

ক্রিকেট যদি হয় ভদ্রলোকের খেলা তাহলে এই খেলার রোল মডেল হিসেবে হাশিম আমলার নাম নিঃসন্দেহে প্রকাশ করা যায়। মাঠ এবং মাঠের বাইরে নিতান্তই ভদ্র স্বভাবের অধিকারী হাশিম আমলা। তবে ব্যাট হাতে তাঁর পরিচয়টা একটু ভিন্ন। ২২ গজে ব্যাট হাতে খুব বেশি খুনে মেজাজের না হলেও তাকে বলা যায় ঠান্ডা মাথার খুনি। যেকোন পরিবেশে, যেকোন পরিস্থিতিতে, যেকোন প্রতিপক্ষের জন্য হাশিম আমলা যেন এক আতঙ্কের নাম।

আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ধারাবাহিকতার এক মূর্ত প্রতীক এই দক্ষিণ আফ্রিকান। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে অভিষেকের পর থেকে হাশিম আমলাকে খুব বেশি দমতে দেখা যায় নি। অভিষেকের পর বিশেষ করে সাদা পোশাকের ক্রিকেটে অবিরাম ছড়ি ঘুরিয়েছেন প্রতিপক্ষের বোলারদের সামনে। দলের যখন প্রয়োজন তখন খেলেছেন বড় বড় সব ইনিংস।কিন্তু এবার বোধহয় খারাপ সময়টা এসেই গেছে হাশিম আমলার। কারণ ব্যাট হাতে গত দেড় বছর টেস্ট ক্রিকেটে একেবারে নিষ্প্রভ ছিলেন তিনি। টেস্ট ক্রিকেটে অভিষেকের পর বর্তমানের এই সময়টাতে নিজের ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বাজে সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন হাশিম আমলা।

সাধারণত ক্রিকেটাঙ্গনে একজন ভদ্র ক্রিকেটারের পাশাপাশি ধারাবাহিক পারফর্মার হিসেবে খুব খ্যাতি রয়েছে হাশিম আমলার। ক্যারিয়ারের শুরু থেকে ব্যাট হাতে ধারাবাহিকতার পরিচয় দিয়েই এই খ্যাতি অর্জন করেছেন তিনি। ২০০৪ সালের নভেম্বরে ক্রিকেটের বৃহৎ সংস্করণে পথচলা শুরু হয় হাশিম আমলার। সেই বছরের নভেম্বরে কলকাতার ইডেন গার্ডেন্সে অভিষেক টেস্ট খেলেছিলেন তিনি। তবে টেস্ট ক্রিকেটে অন্যতম সফল এই ব্যাটসম্যানের অভিষেকটা ‘এলাম,দেখলাম, জয় করলাম’ টাইপের ছিল না।

বরং ক্যারিয়ারের শুরুতেই কঠিন সময়ের মুখোমুখি হতে হয় তাকে। অভিষেক টেস্টে ৫ নাম্বারে ব্যাট করতে নেমে দুই ইনিংসে আমলা করেছিলেন ২৪ ও ২ রান। নিজের দ্বিতীয় টেস্টের দুই ইনিংস মিলিয়ে মাত্র ১ রান ও তৃতীয় টেস্টের দুই ইনিংস মিলিয়ে মাত্র ৩৫ রান করে দল থেকে বাদও পড়েছিলেন। মাত্র ৩ ম্যাচ খেলে দল থেকে ছিটকে গিয়ে আবারো জতীয় দলের হয়ে সাদা পোশাকের ক্রিকেটে ফিরতে এক বছরেরও বেশি সময় লাগে তাঁর।

তবে, তাঁর প্রত্যাবর্তনটা ছিল মনে রাখার মত। প্রায় পনেরো মাস পর খেলতে নেমে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ১৪৯ রান করে নিজের সক্ষমতা প্রমাণ করেছিলেন আমলা। তবে কিছুতেই যেন রানের ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে পারছিলেন না তিনি। নিজের তৃতীয় ম্যাচেই প্রথম সেঞ্চুরি করা আমলা দ্বিতীয় সেঞ্চুরি পেতে সময় নেন প্রায় তিন বছর। প্রথম সেঞ্চুরির বারো ম্যাচ পর তিনি দেখা পান নিজের দ্বিতীয় সেঞ্চুরির।

টেস্ট ক্রিকেটে নিজের ক্যারিয়ার দাঁড় করাতে বেশ সময় নেন হাশিম আমলা। নভেম্বর ২০০৪ থেকে ফেব্রুয়ারি ২০০৮ পর্যন্ত তিনি খেলেন ২২টি টেস্ট যেখানে ৩৩.৯২ গড়ে সংগ্রহ করেন ১১৫৭ রান। তারপর থেকে হাশিম আমলাকে আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয় নি। হাশিম আমলার ব্যাট থেকে ছুটা শুরু করে রানের ফোয়ারা।

ঠিক তখন থেকে নিজেকে মেলে ধরতে শুরু করেন তিনি যার প্রমাণ মেলে সময় বাড়ার সাথে সাথে। সময়ের সাথে পাল্লা দিয়ে টেস্টে  ক্যারিয়ারের ভীতটা শক্ত করতে থাকেন তিনি যা পরবর্তীতে তাঁর পারফরম্যান্সে লক্ষ্য করা যায়। সেই ফলশ্রুতিতে তাঁর ব্যাটিং গড়ের গ্রাফটাও উর্ধ্বমুখী হতে থাকে।

২০০৮ সালের মার্চ থেকে ২০১০ সালের জানুয়ারি, এই সময়ে ১৯ টেস্ট খেলা আমলা চারটি সেঞ্চুরিসহ  সংগ্রহ করেন মোট ১৪৮২ রান। এ সময়ে তাঁর ব্যাটিং গড় ছিল ৪৯.৪০ যা পূর্বের চেয়ে ১৫.৪৮ বেশি। তারপর সময় বাড়ার সাথে সাথে আমলার ব্যাটিং গড় তরতরিয়ে বাড়তে থাকে। ফেব্রুয়ারি ২০১০ থেকে জুন ২০১২ সময়টাতে ১৮ টেস্টে ১টি ডাবল সেঞ্চুরি ও ৩টি সেঞ্চুরিতে আমলা সংগ্রহ করেন ১৬৯৩ রান।

সেই সময়টাতে তাঁর ব্যাটিং গড় ৬২.৭০ যা পূর্বের চেয়ে বেড়ে দাঁড়ায় ১৩.৩০।  জুলাই ২০১২ থেকে জুন ২০১৫ সময়টাতে আর ব্যাটিং গড় ছিল আরো ঈর্শ্বনীয়। এই সময়ে ২৩টি টেস্ট খেলে ৭০.০৯ গড়ে তিনি করেছিলেন ২৩১৩ রান যেখানে রয়েছে ১টি ত্রিপল সেঞ্চুরি, ১টি ডাবল সেঞ্চুরি ও ৭টি সেঞ্চুরি।

কিন্তু, বিপত্তিটা ঘটে জুলাই ২০১৫ থেকে নভেম্বর ২০১৬ সময়টাতে। এই সময়ে যেন আচেনা এক আমলাকে দেখেছে ক্রিকেট বিশ্ব। ব্যাটে হারিয়ে ফেলেছেন ধার সেইসাথে হারিয়েছেন পারফরম্যান্সের ধারাবাহিকতা। এ সময়টাতে ১৫টি টেস্ট খেলে ৩৪.৮৭ গড়ে করেছেন ৮০২ রান।

সদ্যসমাপ্ত অস্ট্রেলিয়া সিরিজেও নিজের নামের প্রতি সুবিচার করতে ব্যর্থ হন আমলা। সিরিজে তিন টেস্টে সংগ্রহ করেন মাত্র ৯৮ রান। ফর্ম এতটাই হারিয়েছেন তিনি যে ক্যারিয়ারের ব্যাটিং গড় ৫০ এর নিচে নেমে যাওয়ার শঙ্কাও একটা সময় দেখা দিয়েছিল যদিও সবশেষ ইনিংসে ৪৫ রান করায় তা আর সম্ভব হয় নি।

আসলে পূর্বের আমলা আর এখনকার আমলার মধ্যে কোন সাদৃশ্য নেই। একসময়ের ধারাবাহিকতার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত এখন নিজেই হারিয়েছেন ধারাবাহিকতা। আমলার ব্যাটে সেই বসন্ত এখন আর নেই। বর্তমানে ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বাজে সময় পার করছেন এই দক্ষিণ আফ্রিকান। কথায় আছে, 'ফর্ম ইজ টেম্পোরারি বাট ক্লাস ইজ পার্মানেন্ট।'

আমলা যে একজন ক্লাস ব্যাটসম্যান তাতে কোন সন্দেহ নেই। মূল কথা হলো সময়টা তাঁর পক্ষে যাচ্ছে না। কিন্তু সুযোগ তো আর হারিয়ে যায়নি। সোমবার থেকে শুরু হল শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে দক্ষিণ  আফ্রিকার তিন ম্যাচের টেস্ট সিরিজ। এই সিরিজটি আমলার জন্য একটি মুখ্য সুযোগ। নিজেকে চিরচেনা রূপে ফিরে পেতে নিশ্চয়ই সিরিজটিকে পাখির চোখ করবেন হাশিম আমলা। তবে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে এই সিরিজে তিনি কতটুকু ছন্দ ফিরে পান তা সময়ই বলে দিবে।

Category : ফিচার
Share this post