দ্য ফিজ ফ্যাক্টর ও আইসিসি পুরস্কার

আজাদ মজুমদার
ডিসেম্বর ২৪, ২০১৬
    মুস্তাফিজ গত বছর অনেক কম ম্যাচ খেলেছেন, তবে তাতে মুস্তাফিজের দোষ তেমন একটা ছিলো না।     মুস্তাফিজ গত বছর অনেক কম ম্যাচ খেলেছেন, তবে তাতে মুস্তাফিজের দোষ তেমন একটা ছিলো না।

২০০৫ সালে আফতাব আহমেদের বর্ষসেরা উদীয়ময়ান ক্রিকেটারের তালিকায় নাম আসাটা ছিলো বিস্ময়কর। আর তাছাড়া লিস্টে আরো ছিলো ইয়ান বেল, দীনেশ কার্তিক, কেভিন পিটারসেন এবং এবি ডি ভিলিয়ার্সের নামও। ফলে কেউ যদি স্বপ্নেও আফতাবের হাতে পুরষ্কারটা দেখে থাকেন, তাঁকে 'অতি-আশাবাদী' বলাটা বাড়াবাড়ি হবে না মোটেই। ২০০৫ সালে এই পুরষ্কার ওঠে কেভিন পিটারসেনের হাতে।

দু'বছর পর এ তালিকায় নাম ওঠে সাকিব আল হাসানেরও। সংক্ষিপ্ত তালিকায় নাম থাকার কারণে এবার কিছুটা সম্ভাবনা থাকলেও রবি বোপারা, শন টেইট এবং রস টেইলরের তুলনায় আন্ডারডগই ছিলেন সাকিব। শেষ পর্যন্ত শিকে ছিড়েছিলো শন টেইটের ভাগ্যে।

কোনোবারই বাংলাদেশী ক্রিকেটারের হাতে পুরষ্কার না উঠলেও বাংলাদেশের তাতে মনোক্ষুণ্ন হওয়ার তেমন কারণ ছিলো না। তখন বাংলাদেশ মাত্র জিততে শিখছে, গায়ে লেগে আছে 'মিনোজ' গালিটা। আর এ অবস্থায় সংক্ষিপ্ত তালিকায় কোনো খেলোয়াড়ের নাম আসাই ছিলো বাংলাদেশের বড় অর্জন।

কিন্তু ২০১৫-তে দৃশ্যপট বদলে গেছে, এখন বাংলাদেশ নিয়মিত ম্যাচ জিতছে। মিনোজ গালিটাও আর গায়ের সাথে লেপ্টে নেই। এবছর আইসিসি অ্যাওয়ার্ডের জন্য কোনো সংক্ষিপ্ত তালিকা ঘোষণা করা হয়নি। তবে কোথাও একটা আশার প্রদীপ জ্বলছিলো, হয়তো এবার মুস্তাফিজুর রহমান কিছু একটা করলেও করতে পারেন।

অভিষেকেই মুস্তাফিজ এমন এক কীর্তি করে বসেছিলেন, যেটা আর আগে আর কোনো ক্রিকেটার করতে পারেননি। তাঁর নবীন হাত ধরেই বাংলাদেশ ভারত এবং দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে পরপর দুটো সিরিজ জেতে। ভারত কিংবা দক্ষিণ আফ্রিকা কি এমন কিছু স্বপ্নেও ভাবতে পেরেছিলো বাংলাদেশ সফরে আসার আগে?

অভিষেক টেস্ট সিরিজেও দারুণ পারফর্ম করেছিলেন মুস্তাফিজ, যদিও বোলিং করতে পারেন মাত্র দুই ইনিংসেই। আর তাতেই কাঁপুনি ধরিয়ে দিয়েছিলেন দক্ষিণ আফ্রিকান ব্যাটসম্যানদের হাঁটুতে, তুলে নিয়েছিলেন চার উইকেট। আর তাতেই বর্ষসেরা উদীয়মান ক্রিকেটার হওয়ার দাবিটা জোরালো হয়ে ওঠে মুস্তাফিজের।

কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার, ২০১৫ সালের বর্ষসেরা উদীয়মান তারকার খেতাব জেতেন জশ হ্যাজেলউড, অথচ তাঁর অভিষেক হয়েছে ২০১০ সালে! স্বাভাবিকভাবেই অনেক বাংলাদেশী ভক্তরাই বুঝে উঠতে পারলেন না মুস্তাফিজের কেন পাননি। খুব সম্ভবত হ্যাজেলউডের দারুণ টেস্ট পারফরম্যান্সই সেক্ষেত্রে মূল ভূমিকা রেখেছিলো। যেখানে নয় টেস্টে হ্যাজেলউডের সংগ্রহ ছিল ৪০ উইকেট, সেখানে হয়তো মুস্তাফিজের দুই ইনিংসে চার উইকেট জুরিদের কাছে বড্ড ম্লান দেখাচ্ছিলো। ফলে মুস্তাফিজের ওয়ানডে নৈপুন্যের চেয়ে জুরিদের কাছে বেশি প্রাধান্য পেয়েছিলো হ্যাজেলউডের টেস্ট সাফল্যই, এ কথা বলায় খুব একটা ঝুঁকি নেই।

কিন্তু এখানেই এবারের উদীয়মান ক্রিকেটারের খেতাব নিয়ে খটকাটা বাঁধলো। দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে ঐ টেস্টের পর আর কোনো টেস্ট খেলেননি মুস্তাফিজ, আসলে খেলেছেনই মাত্র তিনটা ওয়ানডে আর ১০টা টি-টোয়েন্টি ম্যাচ। আর তাতে তাঁর সংগ্রহ যথাক্রমে আট এবং ১৯ উইকেট। ইনজুরির খপ্পরে পড়ে বছরের বেশিরভাগটাই কেটেছে সাইডলাইনে, তবুও জুরিদের মনে হয়েছে তিনিই সবচেয়ে যোগ্য!

মুস্তাফিজের পরিসংখ্যান খুব একটা খারাপ তো নয়ই, বরং বেশ ভালো। তবে আদৌ 'আইসিসি বর্ষসেরা উদীয়মান ক্রিকেটার' হওয়ার মত কিনা, সেটা নিয়ে কারো বিস্ময় প্রকাশ করাটা খুব একটা দোষের হবে না।

আর এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়াটাও খুব একটা সহজ নয়। জিনিসটা ঠিক এভাবে ভাবা যায়, মুস্তাফিজের মত একজন বিরল প্রতিভাকে এমন পুরষ্কার দেওয়ার জন্য শুধু পরিসংখ্যানের উপর ভরসা করে থাকলে আসলে চলে না। বরং এক্ষেত্রে মূল ভূমিকাটা রেখেছে মুস্তাফিজের মধ্যের 'এক্স ফ্যাক্টর'। তিনি শুধু বাংলাদেশের জার্সি গায়েই ভালো পারফর্ম করেননি, একই সাথে আইপিএলে সানরাইজার্স হায়েদ্রাবাদকে প্রথমবারের মত চ্যাম্পিয়ন করেছেন। সাসেক্সের হয়ে খেলতে গিয়েছেন, নিজের 'ম্যাচ উইনার' খেতাবটা আরো ভালো করে গায়ে মেখেছেন।

মুস্তাফিজ গত বছর অনেক কম ম্যাচ খেলেছেন, তবে তাতে মুস্তাফিজের দোষ তেমন একটা ছিলো না। বাংলাদেশ দলই গত বছর হাতেগোনা কিছু ম্যাচ খেলেছে, বাকিটা বছর তাঁরা শুধু টি-টোয়েন্টি খেলাতেই ব্যস্ত ছিলো। ফলে মুস্তাফিজের জন্য এই পুরস্কারটা এসেছে অনেকটা সান্ত্বনা পুরষ্কারের মত হয়ে, যেটা গত বছরই তিনি পেয়ে যেতে পারতেন।

যদি পুরষ্কারটা গত বছরই পেয়ে যেতেন, হয়তো দারুণ হতো। হয়তো সেটাই হতো মুস্তাফিজের জন্য 'পারফেক্ট জাজমেন্ট'। কিন্তু দেরি করে হলেও দারুণ পারফরম্যান্সের পুরষ্কার যে মিলেছে, সেটাই বা কম কি? মুস্তাফিজের এই পুরষ্কার হয়তো অন্য বাংলাদেশী তরুন ক্রিকেটারদের জন্য নতুন যুগের সূচনা করে দিলো, এটা তাই আশা করাই যায়।

- মুল লেখাটি X-factor lands Fizz the ICC award! শিরোনামে www.cricwizz.com-এ প্রকাশিত। অনুবাদ করেছেন অর্ক সাহা।

Category : ফিচার
Share this post