স্কুটার গফুরের খবর রাখি না আমরা!

উদয় সিনা
ডিসেম্বর ১৯, ২০১৬
  বহুবার কর্নার থেকে সরাসরি গোল করার অসামান্য দক্ষতাও দেখিয়েছেন তিনি।  বহুবার কর্নার থেকে সরাসরি গোল করার অসামান্য দক্ষতাও দেখিয়েছেন তিনি।

নাম তাঁর আব্দুল গফুর ভূঁইয়া হলেও স্কুটার গফুর নামেই বেশি পরিচিত তিনি। ষাটের দশকে ঢাকার রাস্তায় সবচেয়ে দ্রুতগতির যানবাহন ছিল স্কুটার। সে সময়টাতে ফুটবল পায়ে মাঠ মাতাতেন আব্দুল গফুর ভূঁইয়া। পায়ে বল পেলেই অদম্য গতিতে ছুটতেন প্রতিপক্ষের ডিবক্সে। এই বিখ্যাত দৌঁড়ের জন্য তখন দর্শকরা তাঁর নাম দেয় স্কুটার গফুর।

ষাটের দশকের মাঝামাঝি সময় থেকে এক যুগেরও বেশি সময় ঢাকার ফুটবল মাতিয়েছেন স্কুটার গফুর। পূর্ব পাকিস্তান জাতীয় দলে খেলার পাশাপাশি খেলেছেন পাকিস্তান যুব দলেও। পাকিস্তান জাতীয় দলেও খেলতে পারতেন যদি পূর্ব পাকিস্তানের খেলোয়াড়ের তখন অবজ্ঞা করা না হত। একবার তাকে পাকিস্তান জাতীয় দলে রেখেও বিমানে চড়ার কিছুক্ষণ আগে বাদ দেয়া হয়।

গফুর ভূঁইয়া ঢাকার ফুটবলে বিজি প্রেস, রহমতগঞ্জ ও আবাহনীর হয়ে খেলেছেন। ১৯৬৪ সালে ক্লাব ফুটবলে তাঁর অভিষেক হয় বিজি প্রেসের জার্সি গায়ে। এরপর রহমতগঞ্জের হয়ে খেলে যোগ দেন ঢাকার ক্লাব ফুটবলের অন্যতম পরাশক্তি আবাহনীতে। আবাহনীর প্রথম গোলদাতা ছিলেন এই স্কুটার গফুরই।

১৯৭০ সালে পূর্ব পাকিস্তানের হয়ে তিনি খেলেছেন নেপাল চ্যালেঞ্জ কাপ। ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি বাহিনী গফুরকে বন্দি করে রাখায় যোগ দিতে পারেননি স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলে। ১৯৭৪ সালে আবাহনীর হয়ে অংশ নিয়েছিলেন আইএফএ শিল্ডেও। স্বাধীনতার পর তিন মৌসুম খেলে আবাহনীর জার্সি গায়েই ফুটবল থেকে বিদায় নেন আব্দুল গফুর ভূঁইয়া।

গফুর ভূঁইয়া তাঁর ফুটবল ক্যারিয়ার জুড়ে গতির জন্য জনপ্রিয় ছিলেন। ছোটখাটো গড়নের হলেও দৌঁড়ে তাঁর ছিল চিতার গতি। চিতার গতির পাশাপাশি দুর্দান্ত ড্রিবলংয়ে কাঁপন ধরাতেন প্রতিপক্ষের শিবিরে।

তাঁর এক একটা ক্রস প্রতিপক্ষের জন্য ছিল ভয়ঙ্কর আর স্ট্রাইকারদের জন্য 'ব্রেড অ্যান্ড বাটার'। গোল করার চেয়ে গোল করানোয় বেশি ব্যস্ত থাকতেন তিনি। তাছাড়া কর্নার কিকেও তিনি ছিলেন সেরা। বহুবার কর্নার থেকে সরাসরি গোল করার অসামান্য দক্ষতাও দেখিয়েছেন তিনি।

নরসিংদী জেলার চিনিশপুর ইউনিয়নের দঘরিয়া গ্রামের সেই গফুর খেলা ছাড়ার পর জড়িয়ে যান নরসিংদীর ক্রীড়াঙ্গনে। নরসিংদীর জেলা ক্রীড়া সংস্থার যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হিসেবে অনেক বছর দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। স্কুটার গফুরের পরিবার পুরোপুরি ফুটবল সংস্কৃতির আবহে পরিপূর্ণ।

তাঁর চার ছেলের সবাই ফুটবলার। তাঁর তৃতীয় ছেলে মোবারক হোসেন ভূঁইয়া শেখ রাসেল, মোহামেডান ক্লাবের পাশাপাশি খেলেছেন জাতীয় দলেও। ২০১৩ সালে মোহামেডানকে সুপার কাপ জেতাতে মূখ্য ভূমিকা ছিল মোবারকের। হয়েছিলেন টুর্নামেন্টের সেরা খেলোয়াড়ও। গফুরের আরেক ছেলে নাজিমউদ্দিন খেলেছেন অনূর্ধ্ব-১৯ জাতীয় দলে।

আব্দুল গফুর ভূঁইয়া এখন জীবনের শেষভাগে। বয়স পেরিয়ে গেছে ৭৫। শরীরে বাসা বেধেছে বিভিন্ন রোগ। কয়েকবার আক্রান্ত হয়েছেন হৃদরোগে। চোখে ঠিকমত দেখেন না। শ্রবণশক্তিও কমে যাচ্ছে দিনকে দিন। কিন্তু এই বুড়ো বয়সেও ফুটবলকে নিজের হৃদয়ে লালন করছেন তিনি। বাংলাদেশ ফুটবলকে নিয়ে চিন্তা করেন তিনি।

বাংলাদেশ ফুটবলের বর্তমান অবস্থা, দর্শকশূণ্য গ্যালারি, আর মাঠের উত্তেজনাহীন ফুটবল ব্যথিত করে তাকে। আর সবার মত তিনিও চান বাংলাদেশ ফুটবলের সেই স্বর্ণালী যুগ যেন ফিরে আসে। আমরা স্কুটার গফুরের খবর রাখি না, খবর রাখি না বাংলাদেশ ফুটবলেরও!

Category : ফিচার
Share on your Facebook
Share this post