মাশরাফিকেই বানান আপনার ভক্ত!

অনুপম হোসেন পূর্ণম
অক্টোবর ৪, ২০১৬
 শুভ জন্মদিন, মাশরাফি! শুভ জন্মদিন, মাশরাফি!

গত বছর রোজার ঈদের সময়কার ঘটনা। দেবুদার 'মাশরাফি' নামক বইয়ের কাজে নড়াইলে গেলাম, ঈদের দিনেই। সারাদিন অনেক গুল্প-গুজব হলো, পেট পুরে খাওয়া হলো। রাতের বেলা ঘুমানোর ব্যবস্থা হলো মাশরাফিদের বাড়িতেই। যদিও মাশরাফি নিজে ঐ বাড়িতে থাকেন না, খুব ছোটবেলা থেকেই তিনি তার মামার বাড়িতে থাকেন।

যাই হোক, খুব সকালে তীব্র কোলাহলে ঘুম ভেঙ্গে গেল। আগের রাতেই মাশরাফির মুখে ছোটবেলায় তার খালি হাতে ডাকাত জাপটে ধরার লোমহর্ষক গল্প শুনেছি, তার রেশ মনে হয় ঘুমের ঘোরেও ছিল! হঠাৎ ঘুম ভাংতেই তাই নিশ্চিত হয়ে গেলাম, নিশ্চয়ই বাড়িতে ডাকাত পড়েছে! লাফ দিয়ে বিছানা থেকে উঠলাম!

দেখলাম দেবুদা হাসি হাসি মুখে জানালা দিয়ে তাকিয়ে আছেন! আমি তো অবাক? কি ব্যাপার? দেবুদার মুখে হাসি কেন? লোকটা কি তবে ডাকাতদের সাথে হাত মিলিয়েছে? এতোদিন এই পেটমোটা ডাকাতটাকেই এতো বেশি সম্মান করতাম? মাশরাফির বন্ধু বলে জানতাম? না না, মানুষ চিনতে এতো বড় ভুল তো হবার কথা নয়!

এরপর কিছুটা সাহস করে দেবুদার কাছে দিয়ে আমিও জানালা দিয়ে উঁকি দিলাম! এবং দেখলাম, বাড়ির সামনে বিশাল এক ট্রাক! তবে কি ডাকাতদল সরাসরি ট্রাক নিয়ে দেয়াল ভেঙ্গে বাড়ির ভেতরে ঢুকে পড়তে চায়? তাহলে তো এক্ষুণি দৌঁড় দিয়ে বাসা থেকে পালানো দরকার!

এমন উল্টা-পাল্টা ভাবনা ভাবতে ভাবতেই ঘুম পুরোপুরি কেটে গিয়ে ধাতস্ত হলাম। এবং দেবুদার মতো আমার মুখেও হাসি ফুটে উঠলো! ঘটনা আর কিছু না। যশোর থেকে একটা ট্রাকে করে শখানেক ছেলে-পেলে নড়াইল চলে এসেছে, মাশরাফির সাথে দেখা করবে বলে! গড়ে তাদের বয়স ১৫-১৬ বছরের বেশি হবে না!

যাই হোক, মাশরাফির বাসার লোকজন(যদিও এই লোকজনের মধ্যে কে আসলেই এই বাড়ির, আর কে অতিথি তা বুঝে ওঠার চেয়ে বারমুডা ট্রায়াঙ্গালের রহস্য ভেদ করা তুলনামূলক সহজ বলেই আমার ধারণা) ততক্ষণে তাদের জানিয়ে দিয়েছে যে এই বাসায় এখন মাশরাফিকে পাওয়া যাবে না। যেতে হবে ১০ মিনিট হাঁটা পথের দূরত্বে তার মামার বাড়িতে।

এরপর তারা হইহই করতে করতে, নাচতে নাচতে মাশরাফির মামার বাড়ির সন্ধানে রওনা হলো! কি অদ্ভুত এক আনন্দ তাদের সবার চোখে-মুখে! এবং কিছুটা দেরিতে হলেও তারা যে অবশ্যই লুঙ্গিপরা মাশরাফির দর্শন পেয়েছিল, এ কথা বলাই বাহুল্য!
এই মাশরাফি নড়াইল হোক আর ঢাকায় নিজের বাসার এলাকায় হোক, পাড়ার আর দশটা বড় ভাইয়ের মতই সহজলভ্য ব্যাপার। টং দোকানে বসে ঘন্টার পর ঘন্টা আড্ডা দেন। সেই মাশরাফিকে এক নজর দেখার জন্য একটু ছোঁয়ার জন্য একটা আন্তর্জাতিক ম্যাচ চলাকালে ১০০টাকার টিকেট দিয়ে চুরি করে গ্র্যান্ডস্ট্যান্ডে ঢোকা লাগে না, সেখান থেকে নিরাপত্তারক্ষীদের চোখ ফাঁকি দিয়ে লাফিয়ে পড়ে মাঠে ঢুকে যাওয়া লাগে না।
এমনটা যে করে সে আসলে মাশরাফিকে ঠিকমতো চিনতেই পারে নাই! আসলে সে চিনতে চায়ই নাই! সবচেয়ে বড় কথা, মাশরাফিকে ভালবেসে আপনি যদি বাংলাদেশ ক্রিকেটের ক্ষতির কারণ হন, তবে সেই ভালবাসা কারো দরকার নেই, মাশরাফিরও না!

আমি একটা ছেলেকে চিনি, যে সাকিব আল হাসানের পাগলা ভক্ত। কিছুদিন আগেই বন্ধুকে সাথে নিয়ে সাকিবের জন্মস্থান মাগুরা ভ্রমণ করে এসেছে। দুর্ভাগ্য, সাকিবের দর্শন তার মেলেনি। কিন্তু ছেলেটা ঠিকই খুশিমনে সাকিবের বাবা-মা ও গ্রামবাসীর সাথে দেখা করেই নারায়নগঞ্জে নিজের বাড়ি ফিরে গেছে। এবার হয়নি তো কি হয়েছে, অন্য কোন একসময় ঠিক দেখা হয়ে যাবে! ভক্ত হলে এমন হন!

যেই মাশরাফি কোটি টাকার ফিক্সিং এর প্রস্তাব অনায়াসে ফিরিয়ে দিতে পারেন, একজন 'চোর' কখনো সেই মাশরাফির সত্যিকারের ভক্ত হতে পারে না। যে ১০০টাকার টিকেট দিয়ে চুরি করে গ্র্যান্ড স্ট্যান্ডে ঢুকে যায়!

মাশরাফির ভক্ত হতে চান? তবে সবার আগে নিজেকে ঠিকঠাক করেন। নিজের জায়গা থেকে সততার সাথে নিজের দায়িত্বটুকু ঠিকঠাক পালন করেন। যেখানে-সেখানে ময়লা ফেলা বন্ধ করেন। ট্রাফিক আইন মেনে চলুন। মানুষের ক্ষতি হয় এমন যেকোন কাজ করা থেকে বিরত থাকেন। এমন অন্তত একটা কিছু করেন যেটা দেশের কাজে লাগে, দশের কাজে লাগে।

এরপর কোনদিন যদি তার দেখা নাও পান, শুধু এটুকু জেনে রাখবেন, আপনার ঐ সততাকে মাশরাফি পাগলের মতো সম্মান করেন। ঐ মাশরাফিই তখন উলটো আপনার একজন ভক্ত, সামনে গেলে তিনি নিজেই আপনাকে জড়িয়ে ধরবেন! একবার না হয় মন থেকে চেষ্টা করেই দেখুন, মাশরাফিকেই বানান আপনার ভক্ত!

Share this post