যেদিন মাশরাফি অধিনায়ক হয়েছিলেন

কাওসার মুজিব অপূর্ব
সেপ্টেম্বর ৩০, ২০১৬
অনেকগুলো নাম আসছিল - রিয়াদ, তামিম, সাকিব এমনকি আব্দুর রাজ্জাকও। অনেকগুলো নাম আসছিল - রিয়াদ, তামিম, সাকিব এমনকি আব্দুর রাজ্জাকও।

‘আপনার কি মনে হয় না এনাফ ইজ এনাফ? মানে অন্তত এখন কি আপনার মনে হয় না অধিনায়ক হিসেবে আপনার যা দেওয়ার ছিল সবটাই দিয়ে দিয়েছেন?’

প্রশ্নটা শুনে যেন আকাশ থেকে পড়লেন অধিনায়ক মুশফিকুর রহিম।

টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের সময় বিদেশি গণমাধ্যম বহুবার তাকে এমন প্রশ্নের মুখে ফেলেছিল। কিন্তু, দেশী একজন ক্রীড়া সাংবাদিক প্রথম তাকে এমন প্রশ্ন করলেন।

মুশফিক যথারীতি বললেন, না। তার অধিনায়ক হিসেবে আরও চ্যালেঞ্জ নেওয়ার আছে। কিন্তু বাতাসে আবহ তখন পরিষ্কার, দুই ফরম্যাটে অন্তত মুশফিক আর অধিনায়ক থাকছেন না। কে হবেন অধিনায়ক?

অনেকগুলো নাম আসছিল - রিয়াদ, তামিম, সাকিব এমনকি আব্দুর রাজ্জাকও।

তখন আমি দৈনিক ইত্তেফাকে কাজ করি। দিনের কাজ শেষ করে একদিন সোহাগের দোকানে চা খাচ্ছিলাম আমি, মাসুম ভাই (ইত্তেফাকের ক্রীড়া সম্পাদক মোতাহার হোসেন মাসুম) ও দেবু দা (ইত্তেফাকের সিনিয়র স্পোর্টস রিপোর্টার দেবব্রত মুখোপাধ্যায়)।

দেবু দা তখন হঠাৎ করে বললেন, ‘কেন যেন মনে হচ্ছে, মাশরাফি কে ফিরিয়ে আনবে বোর্ড।’ -

মাশরাফি!!!

- হ্যা!

- কেমনে কি?

এর কিছুদিন পর ইত্তেফাকে একটা খবর আসলো - ‘অধিনায়ক হতে যাচ্ছেন মাশরাফি!’

মনে আছে, এই লেখা ছাপা হওয়ার পর আমার সামনে দেবুদাকে এক সিনিয়র সাংবাদিক বেশ বকা দিয়েছিলেন। ‘কিছু না জেনে’ প্রতিবেদন করার জন্য!

এরপর এই নিয়ে অনেক জল্পনা কল্পনা চললো বেশ ক’দিন। অনেকে অনেক মত দিলেন, অনেক তর্ক-বিতর্ক করলেন। অনেকে তো এমন প্রশ্নও ছুড়ে বসলেন - যে অধিনায়কের ম্যাচ ফিটনেস নাই তাকে কেন অধিনায়ক করা?

এত নেতিবাচক আলোচনার মধ্যেও বোর্ডের একটা অংশকে সাথে নিয়ে সিদ্ধান্তে অটল ছিলেন একজন। তিনি হলেন বিসিবি সভাপতি নাজমুল হাসান পাপন। এর মধ্যে মাশরাফিকে নিয়ে দুটো ‘টেস্ট কেস’ করলো বোর্ড-দুটো টি-টোয়েন্টিতে অধিনায়ক করা হলো এবং এশিয়ান গেমসে অধিনায়ক হিসেবে পাঠানো হলো। সে নিয়ে অনেক পানিও ঘোলা হলো।

শেষমেশ জানা গেল, ৩০ সেপ্টেম্বর জানা যাবে নতুন অধিনায়কের নাম। সেদিনই বোর্ড সভা, সেদিনই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসবে। সেসময় কোনো একটা পারিবারিক কারণে ছুটিতে ছিলেন দেবুদা। পুরো ইভেন্টটা ইত্তেফাকের হয়ে কাভার করার দায়িত্ব পড়লো আমার কাঁধে। সময়টা আবার ছিল ঈদের মৌসুম।

১১ বাজে মিটিং শুরু। আর আলসেমি করে বের হলাম ১০টায়। দ্রুত যেতে আমার সিএনজি-মামা গাড়ী ঢোকালো ষাট ফুট দিয়ে। কিন্তু, একটু গিয়েই বুঝলাম - এই পথ সাত সমুদ্র তের নদী পাড়ি দেওয়ার মত এক মহাযজ্ঞ বিষয়। কারণ, রাস্তায় বসেছে গরুর হাট। মিরপুর পৌঁছাতে লাগলো পাক্কা দুই ঘণ্টা। গিয়ে দেখি সবে মিটি শুরু হয়েছে।

বাকিটা ইতিহাস, মিটিংয়ের মাঝ পথেই শোনা গেল, চার নেতার যুগে প্রবেশ করেছে বাংলাদেশ। মাশরাফি ওয়ানডে অধিনায়ক, সাকিব সহকারী। মুশফিক টেস্টে বহাল থাকছেন, সহকারী তামিম। সাথে আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত হয়েছিল সেদিন। আমাদের কাজ শেষ করতে করতে প্রায় রাত আটটা-নয়টা বেজে গিয়েছিল। ঈদের আগে সেদিনই শেষ অফিসিয়াল ডিউটি ছিল আমার।

বাসায় যখন ফিরছিলাম, তখন ঈদ উপলক্ষে গোটা রাস্তায় আলোকসজ্জা ছিল। আমার কাছে মনে হয়েছিল অন্যান্য সময়ের চেয়ে একটু বেশিই ছিল। এখন বুঝি, দেশের ইতিহাসের সেরা অধিনায়ককে বরণ করে নেওয়ার সাজে সেজেছিল ঢাকা সেদিন। আমরা দেশের ক্রিকেট সাংবাদিকরা খবরটাতে উচ্ছ্বসিত ছিলাম। কিন্তু, মাশরাফি সত্যি এত লম্বা সময়, এত দক্ষ হাতে দেশের ক্রিকেটকে আগলে রাখবে সেটা কেউ হলফ করে বলতে পারছিলাম না।

একটা অজানা ভয় আমাদের গ্রাস করে নিয়েছিল। সেই ভয় পাবো নাই বা কেন?

২০০৯ সালে টেস্ট অধিনায়কত্বের অভিষেকই ওয়েস্ট ইন্ডিজ থেকে জয় নিয়ে ফিরেছিলেন মাশরাফি। কিন্তু, সেই টেস্টেই বড় একটা সময় চোট নিয়ে মাঠের বাইরেই ছিলেন। জয়টা যে মাঠের বাইরে থেকেই দেখতে হয়েছিল ‘নড়াইল এক্সপ্রেস’কে! অন ফিল্ড অধিনায়ক ছিলেন সাকিব। এক বছর বাদে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষেও আবার একই দৃশ্য। ইনজুরির কারণে নিয়মিত অধিনায়ক মাশরাফির ডেপুটি সাকিবকেই নেতৃত্ব দিতে হল। সাকিব সেবার হোয়াইটওয়াশ করেছিলেন মাশরাফি।

না, এবার এমন কিছু হতে দেননি মাশরাফি। বরং তিনি চমকে দিয়েছেন আমাদের, চমকে দিয়েছেন ক্রিকেট সমর্থকদের। চমকে দিয়েছেন গোটা বিশ্বকেই।

এমন অধিনায়ক থাকতে কিসের ভয়!

Share on your Facebook
Share this post