ক্রিকেট নিয়ে বাঁচি প্রবাসে

পলাশ গাজী
নভেম্বর ১৯, ২০১৬
 প্রতীকি ছবি প্রতীকি ছবি

ক্রিকেট নিয়ে বাংলাদেশের মানুষের উচ্ছাস আর স্বপ্নের কোন শেষ নেই। গ্রাম থেকে শহর; দেশের আনাচে কানাচে ক্রিকেট পাগল জাতির উন্মাদনার কথা পৃথিবীর অধিকাংশ দেশই জানে।

হতে পারে দেশটির ক্রিকেটে পথচলাটা বেশী দিন হয়নি কিংবা অন্যসব দেশের মতো অনেক গুলো তারকা ক্রিকেটার নেই তারপরেও ক্রিকেটের সব বাঘা বাঘা দেশের সাথেই পাল্লা দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ। দেশে থাকা মানুষরা যেমন ক্রিকেট নিয়ে ভালোবাসা বহি প্রকাশ করে, ঠিক প্রবাসে থাকা কোটি বাঙ্গালীর এই প্রানের খেলাটা নিয়ে আরও বেশী উচ্ছসিত হতে দেখেছি আমি।

মধ্যপ্রাচ্যের ছোট একটি দেশ বাহরাইনের প্রবাসী বাংলাদেশীদের কথা বলছি। যেখানে প্রায় ৩ লাখ বাঙ্গালী শ্রম ও সততা দিয়ে দেশের নাম উজ্জল করে রেখেছে এবং অর্থনীতিকে ভালো রেখেছে। প্রায় সব প্রবাসী বাংলাদেশীর ন্যুনতম ৮ ঘন্টা থাকতে হয় কাজে। অল্প কেউ কেউ হয়তো ভালো কাজ করেন। তবে বেশীর ভাগকেই বিল্ডিং কনস্ট্রাকশনের মতো ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করতে হয়। এরপর নিজে রান্না করে খাবারের ব্যবস্থা করতে হয়। তারপরেও দেশের বিভিন্ন ইস্যুতে খোঁজ খবর রাখা ও ক্রিকেটের জন্য ছোটাছুটি দেখলে আপনার চোখে পানি এসে যাবে।

এতোসব ঝামেলা, চিন্তাকে দূরে সরিয়ে বাংলাদেশের ম্যাচ দেখতে ভুল করেন না বেশীরভাগই। ওয়ানডে ও টি-২০ ম্যাচ সন্ধার দিকে হওয়ায় বেশীর ভাগ ম্যাচই দেখা হয় প্রবাসীদের। কারও চুলায় রান্নার কাজ চলে সাথে সামনে মোবাইলে খেলা চলে। কেউ ডিউটিতে আছে সেও কিছুক্ষন পরপর মোবাইলটা পকেট থেকে বের করে বারবার দেশের ক্রিকেটের স্কোরে চোখ বুলিয়ে নেয়!

প্রায়শই চ্যানেল জটিলতা জনিত কারনে টেলিভিশন থাকা স্বত্তেও খেলা দেখা হয় না। তখন ভরসা হয়ে দাঁড়ায় বাংলাদেশী খাবারের রেস্টুরেন্ট গুলো। খেলার সময় যেগুলো এক একটা মিনি স্টেডিয়াম হয়ে যায়। চিৎকার, হৈ হুল্লোড় আর হাজার রকমের মতামত নিয়েই চলতে থাকে নিজ দেশের ক্রিকেট উপভোগ।

দিনশেষে কখনো হাসি বা কান্না দিয়েই সমাপ্ত হয় এই ভালোবাসাটার।

টি-২০ বিশ্বকাপে ভারতের কাছে ১ রানে পরাজয়ের পর অনেক বাংলাদেশী প্রবাসীর চোঁখে পানি পড়তে দেখিছি। কিংবা ইংল্যান্ডের কাছে টেস্টে হারের পরে কত রকমের আলোচনা নিয়ে সময় কাটিয়েছে অনেক প্রবাসী। অনেক কম শিক্ষিত মানুষও কর্মের জন্য প্রবাসে পা বাড়ায়। কিন্তু ক্রিকেট নিয়ে বিভিন্ন মতামত শুনলে বোঝা যায়, তারাও মন দিয়ে খেলা অনুসরণ করতে করতে একটা দারুন ধারণা তৈরী করে ফেলেছেন।

একটা ম্যাচ শুরুর পর নানান জনের প্রশ্ন, নাসির কেন নেই, আল-আমিন কেন নেই। এইসব দেখেই মাঝে মাঝে মনে হয় দেশ ছেড়ে এতোটুকু দূরে নেই! চলছে বিপিএল। আর এই টূর্নামেন্ট চলাকালীন ক্রিকেটের আসল মজাটা দেখা যায় প্রবাসে। রুমের ৬ জন ৬ বিভাগের কিংবা রেস্টুরেন্টে সব দলের সাপোর্টাররা এক সাথেই খেলা দেখতে হয়। নিজ দল নিয়ে আশা, খোঁচা মেরে কথা বলা, উস্কানি দেয়া সবই হয় এই বাহরাইনে বাংলাদেশীদের মধ্যে।

অনেকদিন হলো প্রবাসে আছি, নিজের দেখা ই অনেক ম্যাচে জয়-পরাজয় নিয়ে মানুষ গুলোর মন্তব্যের সাক্ষী। ম্যাচ জয়ের পর যেমন জয়ের নায়ককে নিয়ে আলোচনা হয়, কিছু সমালোচনাও করা হয়। তবে সবচেয়ে স্বস্তির ব্যাপার হলো এরা কোনদিন কোন ক্রিকেটার বা দলকে গালাগালি করে না। কেননা এখানকার মানুষরা জানে দেশপ্রেম কী, আর ওরা মাঠে লড়াই করছে ই কার জন্য।

এখানকার অল্প শিক্ষিত মানুষগুলো লোক দেখানো সাপোর্টারদের মতো সাকিব-তামিম, মাশরাফিদের ভাগ করে না। এখানে সবাই বাংলাদেশ, এক একজন সেই দেশটির পতাকা জড়িয়ে বিশ্ব দরবারে ক্রিকেট নিয়ে লড়াই করে!

প্রবাসে কোন বাঙ্গালীই সুখে নেই। প্রত্যেকেই কোন না কোন ভাবে চরম দুঃখে জীবন কাটায়। তারপরেও দেশ ও পরিবারের কথা চিন্তা করে কখনোই নিজের দুঃখের কথা কাউকে বলে না।

মনের মধ্যে জমিয়ে থাকা এই বেদনা, এই কষ্ট লাঘব করে দেয় ক্রিকেট। এই ক্রিকেটই হাজার মাইল দূরে থাকা আমাদেরকে টের পেতে দেয় না, দেশ ছেড়ে দূরে আছি। ক্রিকেট কেবল আমাদের জন্য খেলা নয়, দেশের বুকে থাকার একটা ব্যাপার।

ভালো থাকুক বাংলাদেশ, ভালো থাকুক বাংলাদেশের ক্রিকেট।

Share this post