সোনায় মোড়ানো রিও-র দিনগুলো

রাকিবুল হাসান
সেপ্টেম্বর ২৩, ২০১৬
    রিও ডি জেনিরো!  রিও ডি জেনিরো!

রিও!

রিও ডি জেনিরো!

সব শহরের মানুষ আনন্দের পুরো স্বাদ নিতে জানে না। কিন্তু রিও-র বাসিন্দারা জানে। অদ্ভুত এক মাদকতা ছড়িয়ে পুরো শহরে। আর পাহাড়ের উপর থেকে মুচকি হেসে সে মাদকতা বছরের পর বছর ধরে উপভোগ করছেন ক্রাইস্ট দ্য রিদিমার। সব শহরের উপর ঈশ্বরের আর্শিবাদ থাকে না। সৌভাগ্য রিও-র, কারণ তার উপরে আছে যীশুখ্রীস্টের হাত!

অলিম্পিক বিশালতার কাছে আগের অনেক আয়োজক শহর মলিন হলেও রিও-র বেলাতে সেটা ঘটেনি। বরং বিতর্ক হতে পারে এটা নিয়ে যে, অলিম্পিক ধন্য হয়েছে রিও-তে পা রেখে, নাকি রিও ধন্য হয়েছে অলিম্পিকের আগমনে? মাছরাঙা টেলিভিশনের হয়ে যেদিন অ্যাক্রিডিটেশন নিশ্চিত হলো সেদিন থেকেই রোমাঞ্চ শুরু। রিও-র শিহরন নিয়ে পার করতে হয়েছে পুরো একটি বছর। তারপর এলো সেই দিন। ৩১ জুলাই ভোর সোয়া ৬টায় টার্কিশ এয়ারে চেপে বাংলাদেশের প্রায় প্রতিপাদ স্থানের পথে রওনা। সহজ করে বলি। বাংলাদেশের ঠিক উল্টো পাশে চিলি। এই বিষয়টাকে ভুগোলের ভাষায় বলে প্রতিপাদ স্থান। আর চিলির মতোই ব্রাজিলও যেহেতু দক্ষিণ আমেরিকা অঞ্চলে, সে কারনে প্রায় প্রতিপাদ স্থান বলা। মাঝখানে ইস্তানবুলে ২২ ঘন্টা বিদঘুটে ট্রানজিট মিলিয়ে প্রায় ২ দিনের জার্নি। কিন্তু রিও রোমাঞ্চের কাছে এ কোন ছার!

১ আগস্ট গভীর রাতে গিয়ে পা রাখলাম অলিম্পিকের শহর রিও ডি জেনিরোতে। আমিসহ একই যাত্রায় ছিলাম বাংলাদেশের আরো তিন সাংবাদিক। দৈনিক জনকন্ঠের মজিবর রহমান, দৈনিক কালের কন্ঠের সাইদুজ্জামান আর ডেইলি স্টারের রনি। অন্য একটি এয়ারলাইন্সে চড়ে একেবারে একই সময় রিও-তে পৌঁছায় একাত্তর টেলিভিশনের দুই রিপোর্টার উপল নন্দী আর ফাহিম রহমান। বলে রাখা ভাল আমরা এই ৬ জন অলিম্পিকের দিনগুলোতে ছিলাম একসঙ্গে। এয়ারপোর্ট থেকে হোটেলে পৌছে বিছানায় শরীর সঁপে দিতে ঘড়ির কাঁটায় রাত ৩টা। সকালে ঝকঝকে রোদ আমাদের স্বাগত জানাল পৃথিবীর সুন্দরতম শহরের একটি রিও ডি জেনিরোতে। সেই সঙ্গে শুরু হয়ে গেলে আমার প্রথম অলিম্পিক।

ক্রীড়া সাংবাদিকতায় এটা আমার ১৬তম বছর। আমি কখনোই খুব ট্যুর পাগল মানুষ নই। প্রথম দিন থেকে ভেবে এসেছি একটি অলিম্পিক আর একটি ফুটবল বিশ্বকাপ করলেই স্মৃতি হিসাবে যথেষ্ট। এই দুটো ক্ষেত্রে বাংলাদেশের কোন চাওয়া পাওয়া নেই। কিন্তু ক্রীড়া সাংবাদিক হিসাবে এটাই চুড়ান্ত গন্তব্য। আমি সৌভাগ্যবান যে অলিম্পিক কাভার করেছি এমন একটি শহরে যার আবেদন অলিম্পিক ছাড়াও অনেক। জানি বেঁচে থাকলে ঠিকই কোন একটি ফুটবল বিশ্বকাপও কাভার করে ফেলব। কষ্ট পাই চারপাশে সতীর্থ সাংবাদিকদের মধ্যে ট্যুর নিয়ে ঠোকাঠুকি দেখে। মাঝে মাঝে মনে হয়, খেলার আবেদন এখন হারিয়ে যেতে বসেছে পাসপোর্টে ভিসার ওজন বাড়ানোর কাছে। সাংবাদিকতায় ৯ বছর পার করার পর প্রথম ট্যুর করেও আমি এতটুকু অসন্তুষ্ট নই। এটি ছিল আমার ক্যারিয়ারের ৫ নম্বর ট্যুর যা কিনা আজকাল অনেকে প্রথম দুই বছরেই ছাড়িয়ে যায়। তারপরও অসন্তুষ্টি পিছু ছাড়ে না। অলিম্পিক ফেরত সাংবাদিক হিসাবে বলি, খেলাটাকে ভালবাসলে ট্যুর কোন ছার!

অলিম্পিক আমাদের সেই বিশালতা শেখায়। সারাবিশ্বের মানুষ এক শহরে। অলিভার নামের একজনের সঙ্গে দেখা হয়েছিল কোপাকাবানা সৈকতে যিনি ছাত্র অবস্থায় ১৯৭২ মিউনিখ অলিম্পিক দেখেছেন। সেই থেকে আর কাটাতে পারেননি অলিম্পিক প্রেম। বয়স এখন প্রায় ৭০, তারপরও চলে এসেছেন রিও’২০১৬-র স্বাক্ষী হতে। একইভাবে আমি অন্তত ৫০০ শিশু দেখেছি যাদের স্টলারে চড়িয়ে অলিম্পিকের স্বাক্ষী করে রেখেছেন তাদের বাবা-মা। এদের কারো বয়সই বছর পেরোয়নি। এদের অনেককে আমি বন্দী করে রেখেছি আমার মোবাইলে। এদেশে দেখি অনেক সময়ই ছোট শিশু নিয়ে আমরা এদিক ওদিক যেতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি না। সেই আমি রিও থেকে পেয়েছি ভিন্ন শিক্ষা। মারাকানা স্টেডিয়ামে লাখো মানুষের রিদমিক চিৎকার শুনেছি। ব্রাজিলের স্বর্ণ জেতা দেখেছি সেখানে। এই স্মৃতির কোন তুলনা হয় না। সবকিছুর পরও ব্রাজিল তো ফুটবলেরই দেশ।

প্রথমে হোটেলে থাকলেও পরে আমরা থেকেছি অ্যাপার্টমেন্টে। সেটা কিনা আবার আটলান্টিকের দিকে মুখ করা। ভাবা যায়। ঘুমে ভেঙে উঠে জানালা খুললেই আটলান্টিকের হাওয়া এসে ধাক্কা দেয়। নীচে নেমে দু’পা বাড়ালেই হাত বাড়িয়ে টেনে নেয় কোপাকাবানা সৈকত। অদ্ভুত এই বিচ জেগে থাকে ২৪ ঘন্টা। লবনের দানার মতো মিহি বালির আস্তরন বিচ ভলিবল আর বিচ ফুটবলের জন্য আদর্শ। বাহার অলিম্পিক পার্কও ছিল অসাধারন। রিও ধন্য হয়েছে সর্বকালের সেরা দুই অলিম্পিয়ান মাইকেল ফেলপস আর উসাইন বোল্টে। বিদায়ী অলিম্পিকেও তাদের দিয়েছে দু’হাত ভরে। বাংলাদেশ থেকে অংশ নেয়া ৭ জনের পারফরম্যান্স যথারীতি বলার মতো কিছু নয়। তবে প্রথমবারের মতো সরাসরি কোয়ালিফাই করেও সিদ্দিকুর রহমান হতাশ করেছেন বেশী। ৫৯ জনে তিনি শেষের থেকে তৃতীয়!

ক্রাইস্ট দ্য রিদিমারকে দিয়েই শেষ করি। একটা দিন ফাঁকা করে রওনা দিলাম যীশুকে দেখতে। পাহাড়ের চুড়ায় পৌঁছে চোখ ছাড়াবড়া, রিদিমার ঢেকে আছে ঘন মেঘে। এমন মেঘ প্রায়শই বিভিন্ন পাহাড়ের চুড়া ঢেকে ফেলে। আবার ১৫-২০ মিনিট পর সরেও যায়। সেদিন পুরো ২ ঘন্টা অপেক্ষাতেও মেঘ সরল না। আশে পাশের সবার মধ্যেই পরিষ্কার আকাশে রিদিমারের সঙ্গে ছবি না তুলতে পারার আক্ষেপ। কিন্তু সত্যি বলছি আমার একবিন্দু আক্ষেপ নেই। সবাই ছবি তুলে রিদিমারকে স্মৃতিতে রাখে। আমি রেখেছি মনের কোনে। সবাই পরিষ্কার আকাশে যীশুর সঙ্গে ছবি তোলে। কিন্তু আমি দেখেছি মেঘে ঢাকা ঐশ্বরিক এক যীশুকে।

অলিম্পিক আমাকে শিখিয়েছে, জীবনটাকে চাইলেই ভিন্নভাবে ভাবা যায়!

 

রাকিবুল হাসান

স্পোর্টস এডিটর, মাছরাঙা টেলিভিশন

abar_aronne@yahoo.com

  

Share on your Facebook
Share this post