যে মাশরাফি সাধারণের একজন

আরিফুল ইসলাম রনি
নভেম্বর ৯, ২০১৬
   সেই ভ্রমণে মাশরাফির আদি বাড়িতে   সেই ভ্রমণে মাশরাফির আদি বাড়িতে

অনেক দিন থেকেই মাশরাফি বলছিল নড়াইলে ওদের বাড়িতে যেতে। ওর মাছের ঘের দেখাবে। নিজের হাতে করা সবজি ক্ষেত, সর্ষে ক্ষেত এসব দেখাবে। দুজনের সময় মিলছিল না। অবশেষে সুযোগ হলো গতবছর বিপিএল শেষে। তীব্র শীতের এক ভোরে আমরা রওনা হলাম।

মাশরাফির বরাবরই প্লেনে ভয়। এবার যেহেতু সঙ্গে স্ত্রী-বাচ্চারা নেই, মাশরাফি ঠিক করল নিজেই গাড়ী ড্রাইভ করে যাবে। মিরপুর থেকে মাওয়া ঘাট। সেখানে স্পিড বোটে পদ্মা পার হয়ে ওপারে আরেকটি গাড়ী অপেক্ষায় থাকবে। শতকোটি টাকা দিলেও আমি কখনোই মাশরাফির বাইকে উঠতে রাজী নই। বাইক পেলে সে স্রেফ ক্রেজি হয়ে যায়। কিন্তু গাড়ীতে আবার উল্টো। নিজের গাড়ী খুব যত্ন করে চালায়।

শহর ছেড়ে গাড়ী হাইওয়েতে উঠতেই দারুণ খুশি মাশরাফি। নব্বই দশকের মেলোডিয়াস হিন্দি গান চলছে, সে স্টিয়ারিং হাতেই তাল ধরছে। সিটে বসেই প্রায় নাচতে নাচতে বলল, “নড়াইল যেতে যে আমার কী ভালো লাগে রে ভাই!”

অবাক হয়ে দেখলাম, বাংলাদেশের ওয়ানডে অধিনায়ক, দল আর দেশ যার দিক তাকিয়ে থাকে, সেই নেতা বাড়ী ফেরার সময় কেমন কিশোরের মত লাফাচ্ছে। যেন লম্বা সময় হোস্টেলে থেকে বাড়ী ফিরছে কোনো কিশোর ছেলে!

যাই হোক, মাওয়া ঘাটে আগে থেকেই অপেক্ষায় ছিল স্পিড বোট। ঘাটে চা-টা খেয়ে আমরা উঠলাম স্পিড বোটে। একটু পরপরই মাশরাফি চালককে বলছেন, “আরও জোরে ছাড়েন, আরও জোরে।”

স্পিড বোট তার নামের স্বার্থকতা প্রমাণ করতে আরও স্পিডে চলছে। এক পর্যায়ে মাশরাফি ইচ্ছে হলো, সে চালাবে স্পিড বোট। আমরা প্রমাদ গুণলাম। তাকে ফেরাতেই পারি না! ঠিকই চলন্ত অবস্থায়ই স্পিড বোটের চালক বদল হলো। ড্রাইভার পাশে, চালাচ্ছে মাশরাফি! ছোটাচ্ছে ইচ্ছেমত।

এক পর্যায়ে কোনো ভাবে স্পিড বাড়াতে গিয়ে হুট করে স্পিড বোট ঝাঁকুনি দিয়ে ১৮০ ডিগ্রি ঘুরে গেল। এক পাশে কাতও হয়ে গেল। সঙ্গে সঙ্গে পাশ থেকে ড্রাইভার স্টিয়ারিং ধরে কোনো রকমে স্পিড বোট থিতু করলেন। আমরা আতঙ্কে প্রায় জমে গেছি। কিন্তু মাশরাফি দেখি খিলখিল করে হাসছে! মাশরাফি খুব ভালো সাঁতার জানে। তবে আমি এবং মাশরাফির আরেক বন্ধু বাবলু, আমরা কেউ সাঁতার জানি না।

স্পিড বোটের ড্রাইভার বলল, শীতের সময় না হয়ে অন্যসময় হলে এখানে অনেক বেশি ঢেউ থাকতে। সেক্ষেত্রে এইরকম হলে অবশ্যই স্পিড বোট উল্টে যেত। তখন ঢেউ ছিল না বলে বেঁচে গেলাম।

এখন ভাবলে মজাই লাগে। ঠিক জানি, স্পিড বোট ডুবে গেলেও মাশরাফি ঠিকই আমাদের বাঁচিয়ে তীরে তুলত। তবে সেদিন এই মুহূর্তে আত্মারাম খাঁচাছাড়া হওয়ার জোগাড় হয়েছিল!

সেবার অনেকদিন পর নড়াইল গিয়েছে মাশরাফি। বিশ্বকাপ থেকে পরের সিরিজগুলোতেও টানা সাফল্য তো ছিলই। বিপিএলের হ্যাটট্রিক শিরোপা জয় তখনও তরতাজা। নড়াইলেও রাস্তায় বের হলে মাশরাফিকে নিয়ে টানাটানি-হুড়োহুড়ি। ছবি-সেলফির অনুরোধ। জমায়েত, ভীড়-বাট্টা। বাড়িতে লোকের স্রোত।

বাড়াবাড়িটা দেখে একটু বিরক্তই মাশরাফি, “আগে এরকম ছিল না। নড়াইলে আমাকে খুব আলাদা করে দেখা হতো না। ঘরের ছেলের মতোই দেখত সবাই, আমি নির্বিঘ্নে ঘুরে বেড়াতাম, আড্ডা দিতাম। বিশ্বকাপের পর থেকেই দেখছি এরকম হয়ে গেছে। ফেসবুক এসে আরেকটা বড় ঝামেলা করছে। সবাই সেলফি তুলবে, তার পরই ছুট। ফেসবুকে দেবে।”

তার পরও নিজের শহরে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। সেদিন ছিল পৌরসভা নির্বাচন। ভোট দিয়ে এলেন। আসার পথেই খবর পেলেন প্রশাসনের বড় এক কর্তা দেখা করতে চান। তার পরিচয়-পদবী বলছি না। কয়েকজনকে দিয়ে খবর পাঠালেন। যে পথে আমরা হাঁটছিলাম, সেই পথেই পড়ে সেই কর্তার বাসভবন। মাশরাফির আগ্রহ দেখা গেল সামান্যই।

শেষ পর্যন্ত গেলোই না। বরং রাস্তা ছেড়ে ঢুকে পড়ল পাশেই ঘিঞ্জি মতো একটি জায়গায়। বেশ কিছু ঝুপড়ি ঘর গায়ে গা লেগে দাঁড়িয়ে। মাশরাফির কোনো এক বন্ধুর বাসা। আমাদের সমাজের তারা খুব নিম্নশ্রেণির। কিন্তু মাশরাফির খুব কাছের! তাকে দেখে ওই ঘরকটার মানুষেরাও খুব খুশি। তবে তারা ছবি বা সেলফি তুলতে ব্যস্ত হলো না। বিগলিত হয়েও পড়ল না। তাদের কাছে মাশরাফি বাংলাদেশের অধিনায়ক নন, স্রেফ অতি আপন কৌশিক।

মাশরাফি গিয়ে আপনজনের মতোই কথা বলছেন। মাটিতে বসলেন। কি রান্না হয়েছে বাড়িতে, জানতে চান। তার বন্ধুর স্ত্রী দাওয়ায় বসে ছিলেন কয়েক মাস বয়সী ছেলেকে নিয়ে। মাশরাফি গিয়ে সেই বাচ্চাকে কোলে তুলে নিলেন। জড়িয়ে ধরলেন। একটু আগেই হয়ত দুধ খেয়েছে বাচ্চাটি। মাশরাফির কোলে গিয়ে সব উগড়ে দিল। অবাক হয়ে দেখলাম, মানুষটির মুখে একটিও বিরক্তির চিহ্ন নেই। বরং হেসে হেসে মজা করছে! নিজেই একট টুকরো কাপড় নিয়ে আগে বাচ্চার মুখ মুছে দিল, পরে নিজের গা-হাত। বাড়ির মানুষেরাও কিন্তু একটুও তটস্থ হলো না। তারাও খুব স্বাভাবিক!

কারণ তাদের কাছে এটি স্বাভাবিকই। আমাদের জন্য বিস্ময়, কিন্তু তারা এসব দেখে অভ্যস্ত। আমরা যতটা ভাবি, মাশরাফি আসলে তার চেয়েও অনেক বড় মনের মানুষ!

 

Share on your Facebook
Share this post