বাংলাদেশে কাঁদি, বাংলাদেশেই হাসি

নুসরাত মোহনা
নভেম্বর ১, ২০১৬
  আমার বিশ্বাস সামনের কঠিন পথটা অতিক্রমের শক্তি আমাদের আছে।  আমার বিশ্বাস সামনের কঠিন পথটা অতিক্রমের শক্তি আমাদের আছে।

আমার বয়স তখন খুব বেশি না। আমার ক্রিকেট দেখার বয়স আরও কম। আশরাফুল হাবিবুল বাশার যখন খেলত ২০০৫-৬ সালের দিকে, হয়তোবা তখন থেকে দেখতাম একটু একটু; খুব বেশি বুঝতাম না! তখন হারলে খারাপ লাগত না, জিতলে খুশি হতাম!

তখনও আমি দলের ২-৩জন ছাড়া কারও নাম জানতাম না। পেস বোলিং কি, স্পিন বোলিং কি কিছুই বুঝতাম না! এরপর একটু একটু দেখতে দেখতে বোঝা শুরু করলাম অল্প অল্প। সাকিব মুশফিকের যখন অভিষেক হয় তখনও আমি জানিনা তাদের নাম।

এরপর ২০০৭ বিশ্বকাপ থেকেই ক্রিকেটের প্রতি অনেক আগ্রহ বেড়ে যায়। ভারতের বিপক্ষে ওই ম্যাচেই তামিম সাকিব মুশফিক কে দেখসি তখন থেকেই ফ্যান হয়ে গেছি। এরপর থেকে সবসময়ই খেলা দেখতাম বাংলাদেশের। বেশির ভাগই ম্যাচই হারতাম তখন। মাঝে মাঝে জিতলে আমাদের খুশি দেখে কে।

সবকিছুর মধ্যেই সবচাইতে বেশি ভাল লাগল সাকিব আল হাসান কে। তখনও ও বিশ্বসেরা হয়নি। বাংলাদেশ হারতো, আর আমর সাকিব তামিমের দিকে তাকিয়ে ইতিবাচক কিছু খোঁজার চেষ্টা করতাম।

এরপর খারাপ সময় গেছে বাংলাদেশ হারছে কিছু ম্যাচ। মাশরাফির অবস্থা তখন থেকেই মনে হয় খারাপ হচ্ছিল, যতদূর মনে পড়ে। এরপর লর্ডসে তামিমের সেঞ্চুরি হল। হারার পরও মনে হইত জিতে গেছি। সাকিব কে বিশ্বের এক নম্বর এ দেখে সবার কি মাতামাতি!

নিউজিল্যান্ড আসলে হুট করে সাকিব অধিনায়কত্বও পেয়ে গেল! আর দারুণ পার্ফরম্যান্সে মোটামুটি নিজের হাতে ৪-০ করে বাংলাওয়াশ করলো। মনে আছে স্কুল থেকে আসার সময় রেডিও তে খেলা শুনতে শুনতে এসেছি ওই সিরিজে। একটা মুহূর্তও যেন মিস না হয়!

প্রতিটা ম্যাচ জিতি আর পেপার কেটে কেটে ছবি গুলা একটা ডায়েরিতে জমাই। ডায়েরিটা এখনও আছে। ততদিনে সাকিব এর প্রতি ভালবাসাটা এতই বেড়ে গেছে যে একটু স্বার্থপর হয়ে গেছি। খেলা দেখি আর সাকিব কি করে দেখার জন্যে বসে থাকি।

২০১১ সালের বিশ্বকাপের রিক্সাতে সাকিব কে দেখে কি পরিমান ভাল লাগছিল বলে বোঝানো কষ্টের ! বিশ্বকাপে যখন ৫৮ রানে আর ৭৮ রানে অল আউট হইছে তারপরও আমি আশা হারাই নাই। এরপর ওকে নিয়া অসংখ্য বিতর্ক হইছে।

আমি সবসময় ওকে ডিফেন্ড করে গেছি। আম্মুর সাথে, আমার সবচেয়ে কাছের বন্ধুর সাধে, পরিচিত-অপরিচিত সবার সাথে - সাকিবই একমাত্র মানুষ মনে হয় যে সবসময় আমার বিশ্বাসের মূল্য দিয়ে গেছে। সেই কষ্টের মুল্য ও দিয়েছিল ওয়েস্ট ইন্ডিজ কেই ৬১ তে অল আউট করে।

এরপর ২০১২ সালে আবার আনন্দ উপলক্ষ হয়ে এশিয়া কাপ আসলো। সবাইকে হারানোর পর ২ রানে হেরে গিয়েছিলাম পাকিস্তানের বিপক্ষে। বিশ্বাস করেন এখনও ওই ভিডিও দেখলে আমার চোখে পানি জমে যায়। ওই দিন আমার রিয়াদের উপর একটুও রাগ লাগেনি। বরং ওদের কান্না দেখে অনেক খারাপ লাগছিল!

মুশফিককে যখন সাকিব জড়ায় ধরে কাদতেসিল আমি টিভির সামনে হা হয়ে বসেছিলাম। আমার চোখ দিয়েও পানি ঝরছিলো। এরপর থেকেই আমরা ওয়ানডে ফরম্যাটে অনেক স্ট্রং হয়ে গেছি। এরপরও হেরেছি, বাজে ভাবেও হেরেছি।

দুই রানেও হেরেছি, জিততে জিততে হারছি- অনেক কষ্ট পেয়েছি। তারপরও ওয়ানডেতে আমরা নিজেদের একটা অবস্থানে নিয়ে গিয়েছিলাম ওই সময়ে। দুশ্চিন্তা ছিল কেবল টেস্ট ক্রিকেট নিয়ে।

আমরা যারা প্রতিটা মুহুর্তে এই দলের সাথে হেসেছি-কেঁদেছি, আমাদের অনেক কষ্ট হয়েছে যখন আমরা বিদেশিদের মুখে সমালোচনা শুনেছি। জিওফ্রে বয়কট যখন বাংলাদেশকে নিয়ে বাজে কথা বলেছে তখন আমি ক্রিকেট কি জিনিস তাই জানতাম না। তারপরও কষ্ট লেগেছে।

ভাবেন তো যারা লাইভ শুনেছে তাদের কেমন লাগা উচিত? আমরা যারা প্রতি মুহুর্তে একটা জয়ের আশায় বসে থাকতাম তাদের এখনও ওই সব কথা গায়ে লাগে ভাই। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে এই ১০৮ রানের টেস্ট জয়ের পরও হয়তো কেউ কেউ বলবে - একটা ম্যাচ জিতেই এত উৎসব, স্পিন পিচ না বানালে জিততো না, বিদেশি কি করে সেটা দেখতে হবে... ইত্যাদি।

তাদেরকে বলবো, আমাদের কাছে এই জয়ের অনেক কিছু, অনেক বড় কিছু।:) আমরা সাকিব-তামিম দের মুখে অসহায়ত্ব দেখে এসেছি। সেঞ্চুরির পরও তামিমকে পরাজিত দলে দেখে এসেছি। এশিয়া কাপের সিরিজ সেরা খেলোয়াড় হওয়ার পরও সাকিবের চোখে পানি দেখেছি। এখন এই জয়ে আমরা উৎসব করবো না তো কে করবে? 

ওয়ানডেতে আমাদের সামর্থ্য নিয়ে প্রশ্ন তোলার কেউ নেই এখন। কিন্তু, টেস্টের ব্যাপারটা ভিন্ন। সেখানে দাঁড়িয়ে সবচেয়ে বেশি টেস্ট খেলা দল, সবচেয়ে বেশি অভিজ্ঞ দল, অনেক পরিপক্ক একটা দলকে আমরা এভাবে হারিয়ে দিলাম, টানা দুই টেস্টে লড়াই করে গেলাম সমান তালে - এই অর্জনের কি কোনোই গুরুত্ব নেই?

বলতে পারেন বড় দল হতে গেলে অল্পে খুশি হওয়া যাবেনা। না এই বাংলাদেশ অল্পতে খুশি হওয়ার দল নয়। দলটা জানে সামনের পথটা আরও কঠিন, আরও কাঁটা দিয়ে ভরা। কিন্তু, সমর্থক হিসেবে আমি বিশ্বাস করি সেই কঠিন পথটা অতিক্রমের শক্তি আমাদের আছে।

Share this post