শুভেচ্ছা বন্ধু, অভিনন্দন

মাজহার উদ্দিন অমি
অক্টোবর ২৮, ২০১৬
  মুশফিকুর রহিম  মুশফিকুর রহিম

সালটা ২০০৫।

আমরা তখন অনুর্ধ্ব-১৯ দলের হয়ে অস্ট্রেলিয়া সফর করছি। অস্ট্রেলিয়ার দশটি প্রদেশ ঘুরে ঘুরে প্রাদেশিক যুব দলগুলোর সাথে ম্যাচ খেলছি। রিচার্ড ম্যাকিন্স এই অসাধারণ সফরটা আয়োজন করেছিলো। সেই সফরে আমরা ৯টা ম্যাচ জিতেছিলাম; একটা টাই হয়েছিলো।

পঞ্চম ম্যাচটা খেলে আমরা তখন ব্রিসবেনে। ফাহিম স্যার (নাজমুল আবেদীন ফাহিম) জানালেন, আমাদের ক্যাপ্টেন দেশে ফিরে যাবে। আমরা একটু হতচকিত হয়ে গেলাম। স্যার বললেন, ও জাতীয় দলের সাথে টেস্ট সফরে ইংল্যান্ডে যাবে।

আমরা বিষ্মিত হয়ে দেখলাম, আমাদেরই একটা বন্ধু সেই বয়সে আমাদের দল থেকে বেরিয়ে গিয়ে লর্ডসে টেস্ট খেলে ফেললো। হ্যা, মুশফিকুর রহিমের কথা বলছিলাম। আমাদের টিমমেট মুশফিক, আজকের টেস্ট অধিনায়ক মুশফিক।

দেখতে দেখতে সেই ঘটনার ১১ বছর পার হয়ে গেলো। অন্য কোনো দেশ হলে মুশফিক এতো দিনে শত টেস্ট খেলে ফেলতো। সেটা হয়নি। তারপরও আজ অনন্য এক অর্জনের দুয়ারে দাড়িয়ে ক্যাপ্টেন; আজ সে মাত্র তৃতীয় বাংলাদেশী ক্রিকেটার হিসেবে ৫০তম টেস্ট খেলতে নামবে।

এটা আমার জন্য খুব গর্বের ব্যাপার যে, এই অসম্ভব পরিশ্রমী এবং দেশের ক্রিকেটের অসামান্য এক প্রতিভা মুশফিক কোনো একদিন আমার টিমমেট ছিলো। আমরা একসাথে খেলেছি।

মুশফিকের সাথে আমার প্রথম খেলা শুরু অনুর্ধ্ব-১৫ দল থেকে।

আমি অনুর্ধ্ব -১৩ দলের হয়ে বয়সভিত্তিক ক্রিকেট শুরু করি। মুশফিকরা ছিলো বিকেএসপিতে। আমি বাইরে পড়াশোনা করেছি। ফলে সে সময় পরিচয় ছিলো না। আমরা যখন কলকাতায় সিএবির আমন্ত্রণে সিরিজ খেলতে গিয়েছিলাম; ইডেনে খেলা ছিলো।

সেই দলে সাকিব, তামিম, মুশফিক যোগ দিলো। সেই থেকে একটা লম্বা পথ আমরা একসাথে পাড়ি দিয়েছি। চার-পাচা বছর টানা একসাথে ক্যাম্পে থেকেছি, একটার পর একটা বয়সভিত্তিক ক্রিকেট টূর্নামেন্ট খেলেছি।

একটু বিনয়ের সাথে জানানো যেতে পারে, এর ভেতরে অনুর্ধ্ব -১৫ এশিয়া কাপে এই দলটার অধিনায়কত্বও করেছি আমি।

সে একটা অসাধারণ সময় ছিলো। সাধারণ একটা ক্রিকেট দলে যেমন হয়, সিরিজ থাকলে বা সফরে শুধু খেলোয়াড়রা একসাথে থাকে, আমাদের ক্ষেত্রে তা ছিলো না। আমরা প্রায় সারা বছর একসাথে থাকতাম। বিকেএসপিতে আবাসিক ক্যাম্প হতো। টিভি রুমে দুষ্টুমি, একসাথে হইচই; অনেক অনেক স্মৃতি। সবকিছু বলে দেওয়াটাও ঠিক হবে না।

মুশফিককে একটু আলাদা করে নোটিশ করতাম আমরা।

ও তো প্রবল পরিশ্রমী ছিলোই। আর ছিলো ভয়ানক ডিসিপ্লিনড। পাশাপাশি খুব পড়ুয়া ছিলো। ক্রিকেটের বই কিংবা অন্য কোনো বই; সবসময় হাতে থাকতো। টিভি রুমে বাকীরা যখন টেলিভিশনে তাকিয়ে আছে, মুশফিক হয়তো তখন কোনো একটা বইয়ে চোখ বোলাচ্ছে ওখানে বসে।

এভাবেই মানুষ নিজের জন্য পথ তৈরী করে নেয়।

আজ আমাদের পথ দু দিকে চলে গেছে। আমি আর মুশফিক এখনও খেলা থাকলে একই মাঠে যাই। আমি যাই কাচে ঘেরা প্রেসবক্সে; মুশফিক ব্যাট হাতে কিংবা গ্লাভস করে মাঠে নেমে পড়ে। আমি প্রেসবক্সে বসে মুশফিকের ডাবল সেঞ্চুরির রিপোর্ট লিখে পাঠাই।

ভেতরে মাঝে মাঝে এই অনুভূতিটা কাজ করে যে, আমিও হয়তো ওখানে থাকতে পারতাম!

তবে আফসোস কখনো হয় না। বরং গর্বে বুকটা ভরে যায়। কাউকে বলি না। কিন্তু আমি প্রচন্ড গর্ব বোধ করি। আমার একটা টিম মেট সেঞ্চুরি করছে, ডাবল সেঞ্চুরি করছে! আমার একটা টিম মেট বিশ্বসেরা অলরাউন্ডার হচ্ছে। আমার একটা টিম মেট আজ ৫০তম টেস্ট খেলতে নামছে!

এর চেয়ে বড় গর্ব আর কী আছে?

এই গর্বটা উপহার দেওয়ার জন্য ধন্যবাদ মুশফিক। আজ এই দিনে অভিনন্দন ক্যাপ্টেন। অনেক শুভেচ্ছা, বন্ধু।

Share this post