ক্রিকেট আমাদের কী লাগে

আহমেদ খান হীরক
অক্টোবর ২৭, ২০১৬
  ক্রিকেট আমাদের প্রাণ দিয়েছে  ক্রিকেট আমাদের প্রাণ দিয়েছে

সেই পাইলটের ছক্কা, সেই বুনো দৌড়, সেই আইসিসি ট্রফি জয়...

তারপর আর পেছন ফিরে তাকানো সময় কই পেলাম আমরা? আমরা ছুটে চলেছি সামনের দিকেই। ব্যাট-বল আর তাদের ঘিরে এক অনন্য অনুভূতি নিয়ে। এই অনন্য অনুভূতির উৎস কোথায়? ক্রিকেট নিয়ে আমাদের এই মাতামাতি, ক্রিকেট নিয়ে এই যে আমাদের হৃদয়ে রক্তক্ষরণ এর কারণ কী?

মনে রাখবেন ক্রিকেটই প্রথম আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আমাদের জয় উপহার দেয়। তার আগে বিশ্বের বিরাট পরিবারে আমরা ছিলাম এক কোণে পড়ে থাকা অবাঞ্ছিতের মতো। ক্রিকেটই আমাদের পরিচয় দেয়। বিশ্বের রাঘব বোয়ালদের সাথে হাতে হাত মেলাতে, কাঁধে কাঁধ মেলাতে, এমনকি চোখে চোখ রাখতে সাহস দেয়। যে আমাদের এত কিছু দিতে পারে তাকে আমরা হৃদয় দিবো না?

ক্রিকেটের হৃদয় দেয়ার গল্প অসম্ভব রকম পাগলাটে। আমি এক গণিতের গম্ভীর শিক্ষককে চিনতাম যিনি বাংলাদেশের ক্রিকেট হলেই টিভির সামনে গ্যাঁট হয়ে বসে যেতেন। নিজের সমস্ত গাম্ভীর্যকে জলবৎ তরলং করে মেহরাব হোসেন অপির একটা কাভার ড্রাইভে এমন উন্মাদের মতো হয়ে যেতেন যে বলার না। বাউন্ডারি লাইনে বল যখন ছুটে যাচ্ছে শিক্ষক তখন উত্তেজনায় চারের বদলে 'চের চের চের' বলে চিৎকার করছেন। চোখ ঘোলা হয়ে আসছে তাঁর। চার হয়ে গেলে যে রিলিফ তাঁর চেহারায় দেখা যেত তার সাথে অন্য কিছুর তুলনা সম্ভব নয়।

শিক্ষকটির স্ত্রী মানসিক ভারসাম্যহীন। বড় ছেলে ড্রাগ অ্যাডিক্টেড। স্বল্প বেতনের চাকরি। সারা জীবনে কখনো কোথায় জেতেন নি তিনি। জীবন তাঁকে হারাতে হারাতে একেবারে পাতালে গিয়ে ঠেকিয়েছি। সেই মানুষটি মেহরাবের একটি চারের ওপর ভর করে জিতে যান। সেই মানুষটি বিদ্যুতের একটা পঞ্চাশে হেসে কুটি কুটি যান। নিমিষে ভুলে যান তাঁর বর্তমান। ভুলে যান সমস্ত পরাজয়।

আমার বড় ভাই আমারই কাছ থেকে ক্রিকেট বুঝে নিয়ে বড় গাদ্দারি করলেন। এই উপমহাদেশের ক্রিকেট ছেড়ে তিনি কিনা সমর্থক হলেন অস্ট্রেলিয়ার। এমন শিওর দল গ্রহণে যারপরনাই আমি তাঁর ওপর বিরক্ত তো হলামই, ক্রিকেটের নানা বিষয় শেখানোতে অসহযোগীতাও শুরু করলাম। কিন্তু কী অবাক ব্যাপার... এক দিনের জন্যও মাঠে ব্যাট না ধরা মানুষটি শুধু টিভি দেখে দেখে (তখন আর ইন্টারনেট কই) আর রেডিও শুনে শুনে আমার থেকে ভালো ক্রিকেট বুঝে ফেললেন। আমার আগে টিভির সামনে বসে আমাকেই ক্রিকেট ব্যাখ্যা দিতে শুরু করলেন।

তাঁর অস্ট্রেলিয়া ভক্তিটি ছিল প্রবাদের মতো। অস্ট্রেলিয়া ও সাউথ আফ্রিকার বিশ্বকাপের সেই বিখ্যাত সেমিফাইনালের পর ভাই আক্ষরিক অর্থেই নেচে ছিলেন। বাংলাদেশ আর অস্ট্রেলিয়ার সেই ম্যাচটিতে তাঁকে আমি দ্বিধাগ্রস্থ দেখেছি। দেশ হিশেবে বাংলাদেশকেই তাঁর সমর্থন করা উচিত অথচ অস্ট্রেলিয়ার প্রতিটি খেলোয়াড় তাঁকে এত দিন জয় এনে দিয়েছে। সেই দ্বিধাগ্রস্থতার মধ্যে আশরাফুলের সেঞ্চুরি, আফতার উড়িয়ে ছয়, পন্টিঙের মুখে শুকনো পাতার শোক আর আমার অস্ট্রেলিয়া ভক্ত ভাইটির হঠাৎ দুই হাত আকাশের দিকে তুলে চিৎকার! নিজের শার্টটা খুলে ঘুরাতে ঘুরাতে বাতাসে উড়িয়ে দেয়া!

এখন যতটুকু জানি আমার ভাইটি আর অস্ট্রেলিয়ার ক্রিকেট তেমন ফলো করে না। ব্যস্ততা বেড়েছে। কিন্তু ব্যস্ততা বাড়লে কী হবে? বাংলাদেশের অনুর্ধ্ব-১৯'এরও সব খোঁজ-খবর তাঁর নখদর্পনে। একটি জয় তাঁকে হলুদ থেকে নির্দ্বিধায় সবুজে রূপান্তরিত করেছে।

বাংলাদেশের খেলা চললে এখন প্রত্যেক রাস্তার প্রত্যেক মোড়ে একটা টিভিকে কেন্দ্র করে মানুষের জটলা থাকে। উত্তেজনা থাকে। চায়ের দোকানে, ভার্সিটির সিঁড়িতে, বাড়ির ড্রইঙে ক্রিকেটেরই আলোচনা চলতে থাকে। বাংলাদেশ আর বাংলাদেশের পারফরমেন্সই সেই আলোচনার মূখ্য বিষয়। বাংলাদেশ কী করে জিততে পারে, আরো কী করলে আরো ভালো করে জিততে পারে এই থাকে সমীকরণ।

ক্রিকেট আমাদের একত্রিত করেছে নিরুঙ্কুশভাবে।

আর অন্য কোনো ঘটনা আমাদের এতটা কাছে আনতে পারে নি। ক্রিকেট আমাদের আনন্দ দিয়েছে অনাবিলভাবে। আর অন্য কোনো ঘটনা এক সাথে সবার মুখে এভাবে হাসি ফোটাতে পারে নি।

এই তো সেদিন একটি নামী মেডিকেলের 'মা ও শিশু' অংশে বসে ছিলাম। চট্টগ্রাম টেস্টের পঞ্চম দিন শুরু হচ্ছে। করিডোরের মাথায় টিভি চালু হয়েছে। সাব্বির আর তাইজুল মাঠে নেমেছে। আমি করিডোরের মাঝামাঝি থেকে খেলা বোঝার চেষ্টা করছি। তাইজুল ঘুরিয়ে একটা চার মারার সাথে সাথে দেখলাম এক তরুণ ছুটে আসতে থাকল। আর হাত বাড়িয়ে আঙুল দিয়ে কাউকে নির্দেশ করল চার...

আমি তরুণের হাত থেকে সেই মানুষটিকে দেখলাম যাকে এই চার দেখানো হচ্ছে। দেখলাম দেয়ালের ওপাশে সোফার চেয়ারের ওপর খুব আড়ষ্টভাবে বসে আছে এক সন্তানসম্ভবা তরুণী। তার মুখে কষ্ট রয়েছে, হয়তো স্বাস্থ্যটা ভালো যাচ্ছে না। কিন্তু তরুণের হাতের চার থেকে হঠাৎই তার মুখ ঝলমল করে উঠল। রুগ্ন কণ্ঠে বলল, কে? তরুণটি বলল, তাইজুল! আরো বেশি হাসি প্রসারিত হলো তরুণীটির মুখে। যেন ভরসা পেয়েছে। যেন এবার কিছু একটা হবে। এবার বোধহয় জিতেই যাবো। তরুণী উঠতে চাইল। তরুণটি দ্রুত গিয়ে তাকে ধরে নিয়ে আসলো টিভির সামনে।

সন্তান সম্ভবা এক তরুণী তার স্বামীটির কাঁধে মাথা রেখে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে টেস্ট ম্যাচ দেখছে দৃশ্যটা দেখেই আমার চোখে পানি চলে এলো।

Share this post