ইংল্যান্ড জিততেছে, এই খুশিতে চলেন আপনাদের বার্গার খাওয়াই…

আরিফুল ইসলাম রনি
জুন ১১, ২০১৭
 বৃষ্টির মধ্যেই হাঁটা দেন তিনি। আমি তাকিয়ে থাকি। মাথায় ঘুরতে থাকে, ‘স্পেশাল টাইম, স্পেশাল ছবি।’ বৃষ্টির মধ্যেই হাঁটা দেন তিনি। আমি তাকিয়ে থাকি। মাথায় ঘুরতে থাকে, ‘স্পেশাল টাইম, স্পেশাল ছবি।’

তখনও পর্যন্ত আমরা তিনজনই ছিলাম ‘স্যান্ডউইচ’। আশা ও নিরাশার মাঝখানে ছিলাম চ্যাপ্টা। ইংল্যান্ড জিতবে নাকি অস্ট্রেলিয়া? বার্মিংহামে যেতে হচ্ছেই। তবে সেমিফাইনাল খেলতে নাকি দেশে ফেরার উড়ানে চাপতে?

সকালে স্ত্রী, ভাই, বাচ্চাদের বিদায় দেওয়ার পর থেকেই ক্যাপ্টেনের মন ভার। গাড়ীতে ওঠার পর সাহেল ছাড়তেই চায় না বাবাকে। সে কী কান্না! বিদায় দেওয়ার পর বাবার মনও কাঁদে। সেই মনটাই আবার একটু পর পরই বার্মিংহামে ছুটে যায়। স্কোর কত?

দুই ওভারেই নেই ইংল্যান্ডের দুই ওপেনার। আগে থেকেই ভার হয়ে থাকা মন তখন রীতিমত ভারাক্রান্ত। হোটেলে বসে অসহ্য লাগে। বেরিয়ে আসেন। ফোন পাই, ‘*** লেখেন মিয়া, কেউ পড়ে আপনার লেখা? বাইর হন…।’ বললাম, ‘একটু ঘুরতে থাহেন, আইতাছি…।’ আমরা দুজন বের হই। তিনজন ঘুরতে থাকি। আড্ডা দেই।

আর? আর ভান করি…!

বার্মিংহামকে পাত্তা না দেওয়ার ভান। এজবাস্টন থেকে দূরে থাকার ভান। যেন ইংল্যান্ড গোল্লায় গেলেও কিছু আসে যায় না। অ্যালেক্স হেলস গন টু হেল। রয় তো আগেই ক্ষয়। স্কোর দেখে মেজাজ খিচ্চে গেল। বললাম, ‘রুটও টুট টুট…।’ শুনে ক্যাপ্টেন বলেন, ‘তাইলে সব শেষ… রুট থাকলে হইত, এখন আর সম্ভব না…**** **** ****।’

ক্রিকেট আবার দূর, অন্য সব কথার সুর। আবার আয়োজন করে খুব, ভানের জগতে ডুব। ওয়েন মর্গ্যানের চেয়ে মর্গ্যান ফ্রিম্যানকে নিয়ে কথা বলা যায়। বেন স্টোকসের চেয়ে বরং স্টোক সিটি!

কিন্ত এজবাস্টনে খেলা জমে ওঠে দারুণ। কার্ডিফে আমাদের পরস্পরকে ফাঁকি দেওয়ার খেলাও জমজমাট। ফোনে খুব জরুরী কোনো টেক্সট দেখা বা লেখার উসিলায় স্কোরে চোখ বুলিয়ে নেওয়া!

ওদিকে রানের জোয়ার বাড়ে। এদিকে আমাদের প্রাণের জোয়ার বাড়ে। মর্গ্যান-স্টোকসের ছক্কা-চার, আমাদের ভানের হার। ভান ভেসে যায় বানে। আমরা বলি, দারুণ জুটি। মন যতোই গুতোয়, ম্যাচ তো মুঠোয়!

হৃদস্পন্দন দুরু দুরু থেকে দ্রিম দ্রিম…মন ভীরু ভীরু থেকে উড়ু উড়ু…

কিন্তু কিন্তু কিন্তু… আমরা স্বান্তনার প্রেক্ষাপটও তৈরি করে রাখি, এখনও অনেক পথ বাকি! খেলাটা ক্রিকেট, নাই নিশ্চয়তার টিকেট। একটু পর বলি, ‘নাহ, কাজ হয়ে গেছে। বাটলার, মঈন এখনও বাইরে আছে।’ মাজহার (ঢাকা ট্রিবিউনের ক্রিকেট সাংবাদিক ও সাবেক ক্রিকেটার মাজহার উদ্দিন অমি) বলে, ‘রশিদও ভালো ব্যাট পারে।’ ক্যাপ্টেন বলেন, ‘ব্যাটিং প্লাঙ্কেটও তো খারাপ করে না রে!’

কিন্তু ওই যে, মনের কোণে ভয়। স্বান্তনারই হয় জয়। ক্যাপ্টেন বলেন, ‘অস্ট্রেলিয়া খতরনাক ভাই, এখনও একটা উইকেট পড়লি বাকিগুলাও খায়ে দেবে…।’

আমরা ঘুরতে থাকি। কত প্যাঁচাল আর কত ক্যাচাল! স্পোর্টস শপে ঢুকি। কেডস দেখি, কনভার্স দেখি, অ্যাডিডাস, নাইকি, পিউমা….। ‘এখানে অ্যাসিক্স আর নিউ ব্যালান্স নাই…’ আফসোসের সুরে বলি। এমন ভাব যে থাকলে দোকান খালি করে ফেলতাম। আসলে তো পকেটই খালি!

তিনজনই স্কোর দেখছি তখন বলে বলে। জয়টাও এলো বলে! ইংল্যান্ডের জয়? ধুর আমাদেরই জয়!

উইকএন্ডে কার্ডিফ সিটি সেন্টারে কত লোকে ভীড়! এত লোকের মাঝেও হঠাৎ শরীর নাচিয়ে ক্যাপ্টেন বলে ওঠেন, ‘কী যে ভালো লাগতিছে ভাই…. সেমিফাইনাল, আইসিসির টুর্নামে্ন্টের সেমিফাইনাল!’

আমরা হাসি। আমরা কাঁদি? নাহ, কান্না কোথায়! কার্ডিফের আকাশ কাঁদছে। সেই জলই মাথা চুইয়ে চোখ বেয়ে ফোটায় ফোটায় নামছে। কবিতায়, গানেই তো বলেই, বৃষ্টি আর কান্নার রঙ আলাদা! চোখে তবে কার্ডিফের বৃষ্টি জলই হবে।

বৃষ্টি একটু বাড়ে। জ্যাকেটের হুডি টেনে দেই আমরা। বৃষ্টি জলেরা এবার আর চোখে পাত্তা পায় না।

‘ইংল্যান্ড জিততেছে, এই খুশিতে চলেন আপনাদের বার্গার খাওয়াই….।’ হ্যাঁও বলি না, না বলার তো প্রশ্নই আসে না। হাঁটতে থাকি। তখনই বুঝতে পারি, পেট তো চো চো করছে!

বার্গার আসে। ‘খেয়ে দেখেন তো কেমন? এখানকার বার্গার সবচেয়ে ভালো হওয়ার কথা…’ আমরা খাই। ভালো-খারাপ বুঝি না, আজ সব ভালো পাই!

তার লাঞ্চ আগেই হয়ে গেছে সময়মতোই। আমরা দুজন খাই। হুট করেই তিনজন হাসি। কারণ ছাড়াই। বিশ্বাস হতে চায় না। আলু ভাজা চিবুতে চিবুতে তিনি বলেন, ‘এইডা কী হইল ভাই, আসলেই আমরা সেমিফাইনালে!’ আমরা হাসি। বিশ্বাসটাও কেমন বিশ্বাস হতে চায় না। সত্যিটাও কেমন মনে হয় মায়াবী বিভ্রম। আমরা সেমিফাইনালে!

আমি ফিরে যাই দুই দিন আগে। নিউ জিল্যান্ড ম্যাচের আগের দিন প্রেস কনফারেন্স শেষে প্র্যাকটিস করতে মাঠে ঢোকার আগে আমাকে বললেন, ‘ভাই, যা থাকে কপালে, কালকে উড়ায়া দিব…।’ আমি তার চোখের দিকে তাকাই। এই চাহনি চিনি। আগেও দেখেছি। এই চাহনি মিথ্যা বলেছে কমই।

তখনই জানতাম, নিউ জিল্যান্ড শেষ। এটা অবশ্য জানতাম না, অস্ট্রেলিয়াও শেষ হবে। জানতাম না, সেমিতে খেলব। শুধু জানতাম, আরেকটি গল্প রচিত হচ্ছে। মিথের মতো, অথচ বাস্তব অসংখ্য গল্পের ভান্ডারে যোগ হয়ে গেল নতুন আরেকটি, ‘কালকে উড়ায়া দিব...।’

দেশে হোক বা কদাচিৎ বাইরে, তার সঙ্গে প্রতিদিন শুধু ফাজলামো, খুনসুটি, কথার পাল্টাপাল্টি, গুতাগুতিই চলে। অনেক অনেক দিন পর, আবার তার সঙ্গে কাধ মিলিয়েছিলাম ম্যাচ শেষে।

তার কথাতেই আবার সম্বিত ফেরে। দেখি সিরিয়াস মুখে বলছেন, ‘কেউ কিন্ত কতি পারবি না যে আমরা ভাগ্যের জোরে খেলতিছি। অষ্ট্রেলিয়াও ১ পয়েন্ট ভাগ্যের জোরে পাইছে নিউ জিল্যান্ডের সাথে। আজকেও ওদের হাতেই ছিল ওদের ভাগ্য। জিতলেই হতো! আমরা আমাগো কাজ করছি, ওরা পারে নাই। যোগ্য কে?’

গভীর মনোযোগে আলু ভাজায় সস লাগাই আর গম্ভীর হয় বলি, ‘ঠিক কথা, হক কথা।’ আমরা যেমন জানি, গোটা ক্রিকেট দুনিয়া জানে। আমরা যোগ্য হিসেবেই উঠেছি।

আ্ড্ডা চলে। আমরা সময় নিয়ে সময় নেই। সেমিফাইনালে উঠেছি, তাৎক্ষনিক ওই সময়টাকে লম্বা করি, অনুভূতিটাকে বাড়তে দেই। তারিয়ে তারিয়ে উপভোগ করি।

বের হই। দেশ থেকে তার বন্ধুদের ফোন আসতে থাকে। আনন্দের খিস্তি-খেউড়। আমরা চিল্লাই। ব্রিটিশ কেতার লোকজন আড়চোখে তাকায়। আমরা সোজা চোখে দেখি।

বার্মিংহামে যখন বৃষ্টি, কার্ডিফের আকাশও তখন কাঁদছে। ডাকওয়ার্থ-লুইসে এগিয়ে ইংল্যান্ড। অস্ট্রেলিয়ার হার নিশ্চিত। বৃষ্টির দিকে তাকিয়ে কিছুক্ষণ তন্ময় ক্যাপ্টেন, প্রকৃতির সঙ্গে মিশিয়ে দিলেন নিজের অনুভূতিটাও, ‘আহা বৃষ্টি…আনন্দ বৃষ্টি…!’

হঠাৎ মাথার হুডি ফেলে দিয়ে একটু ভিজলেন বৃষ্টিতে। মাখামাখি হলেন আনন্দধারায়। আমি দেখি। আমি ভাবি, এই মানুষটিই তো বাংলাদেশ। কার্ডিফের আনন্দধারায় অবগাহন করছে আসলে গোটা বাংলাদেশই...!

হুট করে মনে হয়, সময়টাকে ছবিতে ধরে রাখতে হবে। বাংলাদেশ সেমিফাইনালের ওঠার মুহূর্তটায় বাংলাদেশের হৃদস্পন্দনকে ফ্রেমবন্দী করতে হবে। ফ্রেমটাই একসময় কথা বলবে। এই সময়ের অনির্বচনীয় অনুভুতিটাকে ভবিষ্যতে বয়ে নেবে হয়ত এই ছবিই। কী আশ্চর্য, ক্যাপ্টেনও একইরকম ভাবলেন! বলেন, ‘দাঁড়ান, চুল ঠিক করে নেই। স্পেশাল টাইম, স্পেশাল ছবি বলে কথা।’

হোটেলে ফিরতে হবে। টিমমেটদের সাথে সেমির আনন্দ করতে হবে। সকালে তার স্ত্রী-সন্তানরা যাওয়ার পরই মোসাদ্দেক ঘোষণা দিয়েছেন, ‘ভাবী চলে গেছেন, আজকে থেকে আবার ভাইয়ের রুমে হামলা হবে।’

হ্যাঁ, ওরা তার রুমেই পড়ে থাকে। দলের ম্যানেজার ও অধিনায়ককে সবসময় স্যুইট রুম দেওয়া হয়। কিন্তু আমাদের ক্যাপ্টেনের আবার এসবে অরুচী। নিজের স্যুইট রুমটা সবসময় কোচকে ছেড়ে দেন। নিজেও নিজের রুমে বেশির ভাগ সময় ঘুমান ফ্লোরে। অন্যরা নিজের রুম ছেড়ে গাদাগাদি করে তার বিছানায়। আজকের দিনটায় গাদাগাদি একটু বেশি হবেই!

বৃষ্টির মধ্যেই হাঁটা দেন তিনি। আমি তাকিয়ে থাকি। মাথায় ঘুরতে থাকে, ‘স্পেশাল টাইম, স্পেশাল ছবি।’

আমাদের প্রথম সেমিফাইনালে ওঠার মাহেন্দ্রক্ষণ… মুহূর্তটি যতটা স্পেশাল, ‘স্পেশাল’ শব্দটিও কি ততটা স্পেশাল? ইতিহাসের নতুন মোড়ে পা দেওয়ার আগের এই প্রতিটি মুহূর্তই তো একেকটি আনন্দময় অনন্তকাল!

আনন্দ বৃষ্টিতে ভিজে আনন্দ চিত্তে হোটেলে ফিরি…

- ফেসবুক থেকে

Share on your Facebook
Share this post