আনন্দ-বেদনার কাব্য

জিষ্ণু ব্যানার্জী
মার্চ ২০, ২০১৭
    একটাই বাংলাদেশ, প্রথম ও শেষ প্রেম!    একটাই বাংলাদেশ, প্রথম ও শেষ প্রেম!

জিততে তখন লাগে দুই রান। জয় নিশ্চিত। হঠাৎ সৈকতের ব্যাট ছুঁয়ে বল জমা পড়ল উইকেটকিপার ডিকওয়েলা-র হাতে। আম্পায়ার আউটের সিগনাল দিতেই পুরো অফিসে তুমুল হাততালি শুরু হল। হাততালি আর থামে না। আমি অবাক! হঠাৎ করেই সব শ্রীলঙ্কার সাপোর্ট করা শুরু করল নাকি?

কাহিনি বুঝলাম কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই। যেই সময়ে আমার পিসিতে সৈকত উইকেটকিপারকে ক্যাচ দিয়েছে, সেই সময়েই অন্যান্য পিসি-তে মিরাজ সুইপ করে দুই রান নিয়ে নিয়েছে! আমার স্ট্রিমিং লিঙ্ক আমাকে প্রায় তিন বল পিছিয়ে রেখেছে!

একটা সময় ছিল, যখন রাত ভোর হয়ে যেত পাঁচ কালা থেকে পাঁচ লাল আর পাঁচ লাল থেকে পাঁচ কালায়। একটা সময় ছিল, যখন রুমমেটকে কিছু বলতে হলে একটা চিৎকার দিতাম, ‘এই ব্যাটা, এদিক শোন!’ একটা সময় ছিল, যখন অনেক রাতে খেতে যাওয়ার ইচ্ছা হলে হেঁটে হেঁটেই রওয়ানা দিতাম পাঁচভাই বা পানসী রেস্ট্যুরেন্টে। একটা সময় ছিল, যখন কোন একটা টিভির দোকানের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় দাঁড়িয়ে পড়তাম বাংলাদেশের খেলার টানে।

সেই দিনগুলো চলে গেছে। জীবন এখন আটকে গেছে ১০টা-৬টায়। আবেগগুলো উড়ে চলে গেছে অ্যান্টার্কটিকা। তার জায়গা নিয়েছে যান্ত্রিকতা। পাঁচ কালা থেকে পাঁচ লালে যেতে ইচ্ছা হলে খুঁজে বের করি অনলাইনে টুয়েন্টি-নাইন খেলার কোন একটা ওয়েবসাইট। রুমমেটের সাথে কথা বলার দরকার হলে এখন আর ‘এই ব্যাটা, এদিকে শোন’ বলে চিৎকার দিই না। বরং মেসেঞ্জারে একটা নক দিই - ‘হাই’ অনেক রাতে খেতে যাওয়ার ইচ্ছা হলে লগ ইন করি ফুড পাণ্ডা কিংবা হাংরি নাকি-তে।

তবে কোন একটা টিভির দোকানের সামনে দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় এখনও দাঁড়িয়ে পড়ি মুশির একটা স্লগ সুইপ কিংবা সৌম্যর একটা পেরিস্কুপ অথবা মুস্তাফিজের একটা অফ কাটার দেখার জন্য। কি ভাবছেন? আবেগটা চলে গেছে, কিন্তু অভ্যেসটা রয়ে গেছে?

নাহ, এই আবেগটা যায়নি।

গত ইংল্যান্ড সিরিজের প্রথম ওয়ানডেতে মাঠে ছিলাম। ৫১ বলে ৩৯ লাগত বোধহয়, হাতে ছয় উইকেট। দেখতে দেখতে শেষ ছয়টা উইকেট পড়ে গেল।

নর্দান গ্যালারি থেকে ২২ গজের আয়তাকার জায়গাটা তখন ঝাপসা হয়ে গেছে চোখের জলে। ২০১২ এশিয়া কাপ ফাইনাল দেখেছি। ২০১৪ এশিয়া কাপে পাকিস্তানের সাথে ৩২৭ রান করেও হেরেছি। ভারতকে ১০৭ রানে আটকে দিয়ে নিজেরা গুটিয়ে গেছি ৫৮ রানে। সবচেয়ে ডিপেন্ডেবল দুই ব্যাটসম্যান ক্রিজে থাকার পরেও করতে পারি নি তিন বলে এক রান। আর কত সইবো?

সয়েছি অনেক, কিন্তু পেলাম কি? আমি বলবো, পেয়েছি ২০১২ এশিয়া কাপ ফাইনালের পর সাকিব-মুশি-নাসিরের সাথে পুরো জাতির চোখের জল। পেয়েছি বেন স্টোকসের স্ট্যাম্প ফেলে দিয়ে সাকিবের সাথে সারা দেশের একসাথে স্যালুট। পেয়েছি আজকে সৈকত ক্যাচ দেওয়ার পর অফিসের সব মানুষের কোরাসে হাততালি।

কিছু কিছু জিনিস সব যান্ত্রিকতার ঊর্ধ্বে। কিছু কিছু জিনিস উড়ে অ্যান্টার্কটিকা চলে যেতে পারে না। কিছু কিছু জিনিস আসে বুকের গভীর থেকে। কিছু কিছু জিনিস ভালবাসার।

ভালবাসি ক্রিকেট। ভালবাসি লাল-সবুজ। একটাই বাংলাদেশ। প্রথম ও শেষ প্রেম!

Share on your Facebook
Share this post