টিকেটের নিরাপত্তা দেবে কে?

উদয় সিনা
অক্টোবর ১০, ২০১৬
  খেলোয়াড়দের নিরাপত্তা আছে, টিকেটের নিরাপত্তা নাই!  খেলোয়াড়দের নিরাপত্তা আছে, টিকেটের নিরাপত্তা নাই!

বাংলাদেশের ম্যাচের টিকেটকে অনেকে বলে থাকে সোনার হরিণ। আসলেই কী এটি সোনার হরিণ নাকি এর চেয়েও বেশি কিছু? রোববারের ম্যাচের টিকেট কিনতে আসা দুই বন্ধু তানভীর ও হিমেল অবশ্য এটাকে সোনার হরিণের চেয়েও বেশি কিছু বলেই মনে করেন।

সেই সোনার হরিণ হাতে পেতেই ভোরের সূর্য উঁকি দেয়ার সাথে সাথে মিরপুর ইনডোর স্টেডিয়ামে পৌঁছে যান দুই বন্ধু তানভীর ও হিমেল। ওরা ভেবেছিল এই সময়ে হয়ত মানুষের ভিড় ততটা হবে না। কিন্তু সেখানে পৌঁছে তাদের চোখ কপালে উঠার অবস্থা। বিশাল জনস্রোত মিরপুর ইনডোর স্টেডিয়ামে। মানুষের লাইন এত বড় যে লাইনের শেষ মাথায় পৌঁছতে পৌঁছতে ভালই বেগ পেতে হয় তাদের। এ সময় তাদের মনে টিকিট না পাওয়ার শঙ্কাও জেগে উঠে। সেই শঙ্কায় হতাশ হয়ে দুই বন্ধু লাইনে দাঁড়ানোর মানুষগুলোকে দুধের মাছি বলেও সম্বোধন করে ফেলেন একসময়। তাদের মতে, ১০ বছর আগে যখন খেলা হতো তখন তো এত মানুষ লাইনে থাকত না। তখন তো এই তানভীর, হিমেলদের এত বড় লাইনেও দাঁড়াতে হত না। আর এখন দল খুব ভাল করায় এই অবস্থা।

ভাল খেললে দর্শক বাড়বে এটা খুবই স্বাভাবিক। হতাশা ও আবেগের বশেই হয়ত এই কথাগুলো তারা বলেছে। কিন্তু তাদের হতাশা পরে পরিণত হয় ক্ষোভে। কারণ ছেলেদের লাইনে সবার সামনে যাদেরকে দেখেছিল তারা ঠিক সেই ছেলেগুলোই আগে টিকেট পেয়ে বেশি দামে বাইরে বিক্রি করছে। আসলে তারা ব্ল্যাকার। তাদের উদ্দেশ্যই ছিল ব্যবসা করার, খেলা দেখার নয়। তাদের জন্যই ক্রিকেটপ্রেমী জনসাধারণ খেলার দেখার আশা নিয়েও অনেকসময় দেখতে পারেন না । মূলত মিরপুরের স্থানীয়রাই দল বেধে টিকেট কিনতে ভোর বেলায় যথাস্থানে এসে দাঁড়িয়ে যায়। তারপর তারা টিকেট কিনে চড়াও দামে বিক্রি করে মানুষের কাছে। তাদের জন্যই শুধু টাইগারদের খেলা মাঠে বসে দেখার স্বপ্ন নিয়ে দূর থেকে আসা অনেকে টিকেট পান না। আর টিকেট না পেলে সেই ব্ল্যাকারদের কাছ থেকে তা সংগ্রহ করবে সেই উপায়ও নেই। কারণ তাদের কাছ থেকে টিকিট কেনার মূল্য অনেকসময় নিজেদের নাগালের বাইরে চলে যায়।

ব্ল্যাকাররা ১০০ টাকার টিকেটের মূল্য বেধে দেয় ১৫০০ থেকে ২০০০ টাকা পর্যন্ত। ১৫০ টাকার টিকেটের ক্ষেত্রে সেটা হয় ২৫০০ থেকে ৩০০০ টাকা। আর এতে করে দূর থেকে আসা সাধারণ ক্রিকেটপ্রেমিদের খেলা না দেখার আক্ষেপ নিয়ে বাড়ি ফিরতে হয়। তাছাড়া শুধু পুরুষরা নয়। মিরপুরে দেখা যায় নারী ব্ল্যাকারও। নারীদের লাইনে যারা দাঁড়ায় তাদের সিংহভাগই ব্ল্যাকার। তাদেরকে যদি জিজ্ঞাসা করা হয় কার কার খেলা তাহলে সেটাও ভাল করে বলতে পারে না অথচ টিকেট কাটতে ভোর বেলায় এসে লাইনে দাঁড়িয়ে পড়ে। তারপর টিকেট নিয়ে ব্যাপক দামে বিক্রি করে বাইরে।

টিকেটের কালোবাজারি থামাতে বিসিবি সম্প্রতি নতুন পদক্ষেপ নিয়েছে। সেটি হলো অনলাইন থেকে টিকেট সংগ্রহ করা। সহজ ডট কম এ ম্যাচের  এক দিন আগেই টিকিট কাটতে পারে জনসাধারণ। কিন্তু সহজ.কম এ টিকিট কাটা ততটা সহজ না। মাত্র ৭-১০ মিনিটেই শেষ হয়ে যায় হাজার হাজার টিকেট। এটা কিভাবে সম্ভব সেটা জানা নেই কারোরই। তাই তো আফগানিস্তান সিরিজে সহজ.কম তাদের সার্ভিসের জন্য যতটা প্রশংসা কুড়িয়েছিল ঠিক ততটাই ধিক্কার পাচ্ছে এখন জনসাধারণের কাছ থেকে ইংল্যান্ড সিরিজে।

সহজ.কমের পাশাপাশি ম্যাচের দিন মিরপুর ইনডোর স্টেডিয়ামে টিকেট পাওয়া যায় যেখানে সবচেয়ে বেশি কালোবাজারি দেখা যায়। সেখান থেকে টিকিট সংগ্রহ করতে মানুষের অনেক দুর্ভোগ পোহাতে হয়। টিকিট ছাড়ার কথা ৯ টায় থাকলেও ছাড়া হয় ১০ টারও পরে।

সবচেয়ে বড় কথা হলো সবকিছু যেন সুষ্ঠুভাবে সম্পাদিত হয় এবং কালোবাজারি রুখার লক্ষ্যে নিয়োজিত পুলিশরাই হলো বড় ব্ল্যাকার। ব্ল্যাকাররা তাদের সামনে দিব্যি টিকেট বিক্রি করে আর তারা তা শুধু দেখে যায়। ব্ল্যাকারদের বিপক্ষে স্টেপ নেয়া তো দূরে থাক, তারা নিজেরাই ব্ল্যাকারদের মত টিকিট বিক্রি করে। কয়েকজনকে দেখা যায় পুলিশকে  টিকিট ব্যবস্থা করার কথা বলতে। তারপর তারাও ব্ল্যাকারদের মত একটা দাম বেধে দেয়। তবে তাদের দাম ব্ল্যাকারদের চেয়ে কম অঙ্কের হয়ে থাকে। তাছাড়া ব্ল্যাকাররা শুধু যে লাইনে দাঁড়িয়েই টিকিট কিনে পরে বিক্রি করে এমনটিও নয়। এমন অনেক ব্ল্যাকার আছে যারা ম্যাচের আগেই টিকিট পান। আর তারা তা পুলিশের মাধ্যমেই পেয়ে থাকেন এমন কথাও অনেকের মুখ থেকে শোনা গেছে। আর এইসব কিছু মিলিয়ে ভোগান্তি হয় সাধারণ ক্রিকেটপ্রেমীদের যারা তানভীর, হিমেলদের মত ঘন্টার পর ঘন্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও টিকিট নামক সোনার হরিণের দেখা পান না।

নিরাপত্তা ইস্যুতে ইংল্যান্ড সিরিজের জন্য খেলোয়াড়দের তো অনেক নিরাপত্তা দিচ্ছে বিসিবি। কিন্তু টিকেটের নিরাপত্তা কী দেবে বিসিবি? কালোবাজারি ঠেকাতে বিসিবি পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। কিন্তু, যাদেরকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে তারা কতটুকু সৎ উপায়ে টিকিট বিক্রি করছে সে প্রশ্নের উত্তর কী দিতে পারবে বিসিবি?

Share on your Facebook
Share this post