১৩ বছর আগে বাংলাদেশ সফরেই শুরু হয় ইংলিশ বিপ্লব

খেলাধুলা ডেস্ক
অক্টোবর ৮, ২০১৬
 সায়মন ব্রিগসের অভিজ্ঞতা সায়মন ব্রিগসের অভিজ্ঞতা

শুক্রবার টেলিভিশন চালু করেই নস্টালজিক হয়ে গেলাম। জেসন রয়ের বিপক্ষে বাংলাদেশ ক্রিকেটের বিশ্বস্ত হাত মাশরাফি বিন মুর্তজা সিরিজের প্রথম বলটা করার জন্য ছুঁটে আসছেন। ১৩ বছর আগে টেস্ট ক্রিকেটের নবীন সদস্যদের মাটিতে এভাবেই নিজেদের ইতিহাসের প্রথম সফর শুরু করেছিল ইংল্যান্ড। সেবারও সাইট স্ক্রিনের কাছ থেকে এভাবেই দৌঁড়ে আসতে দেখা গিয়েছিল মাশরাফিকে।

সেসময় মাশরাফির বিপক্ষে এমন অনেকেই ছিলেন যারা এখন নেই। যেমন নাসির হুসেন, মার্ক বুচাররা ধারাভাষ্যে ব্যস্ত হয়ে গেছেন। আমার স্পষ্ট মনে হচ্ছে সেটাই ছিল অধিনায়ক হিসেবে মাইকেল ভনের প্রথম সিরিজ।

ঢাকায় উড়ে আসা মাইকেল ভনের দলটা নি:সন্দেহে ফেবারিট ছিল। যাদের বিপক্ষে লড়াই তারা আগের ২৪ টি টেস্টের ২৩ টিতেই হেরে বসে আছে। কাগজে কলমে ‘অর্থহীন’ সেই সিরিজের একটা তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা ঘটেছিল। ইংল্যান্ড দল সেই সময় ‘জিম’ আবিষ্কার করেছিল।

দেশ থেকেই বিমানে করে তারা পাওয়ারব্যাগ, হাইড্রো বেল্ট ও প্রোটিন পাওডার নিয়ে এসেছিল। এর সাথে ট্রেনিংয়ে নানারকম নতুন কিট যুক্ত হয়েছিল। গ্রাহাম থর্প বরাবরের মতোই অন্যমনষ্ক থাকতেন। অনুশীলনে উল্টো-পাল্টা কিট নিয়ে চলে আসতেন। কোচ ডানকান ফ্লেচারও সেটা দেখে অগ্নিমূর্তি ধারণ করতেন।

‘বাংলাদেশে প্রথম দু’সপ্তাহ মোটামুটি টানা বৃষ্টি হয়েছিল। আমাদের আর কিছুই করার ছিল না। বৃষ্টিটা এসে বরং উপকারই করেছিল’, স্মৃতিচারণা করছিলেন নাইজেল স্টককিল, ইংল্যান্ডের ফিটনেস ম্যানেজার। সেসময় ঢাকায় তীব্র বর্ষণে অনেক এলাকা পানির নিচে চলে গিয়েছিল। ফলে ক্রিকেটীয় অনেক রকম অবকাঠামোই ব্যবহারের অনপযুক্ত হয়ে গিয়েছিল।

কোনোমতে একদিন নেট প্র্যাকটিসের সুযোগ পেয়েছিল ইংল্যান্ডে। কি ভাগ্য! সেদিনই আবার আসেননি টিম বাসের চালক। আগের রাতেই নাকি তার এক আত্মীয়ের মৃত্যু হয়েছিল।

তাই মাইকেল ভন ও তার দলকে বড় একটা সমং কাটাতে হয়েছিল ও হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালেই (হোটেল শেরাটন)। ওয়ানডে সিরিজ খেলতে অ্যান্ড্রু স্ট্রস এসে তো রীতিমত বোকাই বনে গেলেন, ‘টেস্ট ক্রিকেটারদের ফিটনেস লেভেল দেখে আমি স্র্রেফ বিমোহিত। মিডলসেক্সে আমরাও অনেক পরিশ্রম করেছি, তবে সেখান থেকে আমরা এমন কিছু পাইনি।’

সবাই ফিটনেসের ব্যাপারে এতটা সচেতন ছিলেন না। মনে আছে সামারসেটের বিশালদেহী অলরাউন্ডার ইয়ান ব্ল্যাকওয়েল বলেছিলেন, ‘১২ কেজি? মাথা খারাপ! এত ওজন কমাতে তো আমার একটা পা-ই ফেলে দেওয়া লাগবে।’ পরদিন সকালেই সতীর্থরা যখন ফলমূল আর সিরিয়ার দিয়ে নাশতা সারছিলেন, ব্ল্যাকওয়েলকে তখন দেখা গেলা মুরগির ঠ্যাং চিবাতে।

জিমে ঘাম ঝরানোর সংস্কৃতিটা তখন থেকে শুরু হয় ইংল্যান্ড দলে। স্টককিল বলেন, ‘এখনকার ইংল্যান্ড দলের দিকে তাকা। সবারই শরীর অ্যাথলেটদের মত। খেলাটা খেলতে তারা অন্তত শারীরিক ভাবে সক্ষম। ২০০৩ সালে আমরা এতটাও স্বপ্ন দেখিনি। তবে, এরপর থেকে ক্রীড়া বিজ্ঞানেও অনেক উন্নয়ন হয়েছে। লাভবরো বিশ্ববিদ্যালয়ে মাত্রই তো ন্যাশনাল পারফরম্যান্স সেন্টার যাত্রা শুরু করলো। ফলে এখন ইংলিশ ক্রিকেটে অনেক নতুন নতুন আইডিয়া আসছে।’

আর ওই জিমওয়ার্কগুলোই ভনের চরিত্রটা সবার সামনে নিয়ে আসে। এটা কাজে লাগিয়েই চতুর ভন নাসির হুসেনের যুগ থেকে ইংল্যান্ডের ক্রিকেটকে নতুন এক দিনের দিশা দেন। সেবার পরের মাসেই ইংল্যান্ড শ্রীলঙ্কা সফরের যায়, যদিও সেখানে বাজেভাবে হারে।

কিন্তু আসল খেলা শুরু হয় দেশে ফেরার পরে। দেশের মাটিতে টানা ছয়টি সিরিজ জিতে বসে ইংল্যান্ড। ১৮৮০-এর দশকের পর সেটাই ছিল ইংল্যান্ডের সর্বোচ্চ সাফল্য। তারই ধারাবাহীকতায় ২০০৫ সালের অ্যাশেজেও সফল হয় ইংল্যান্ড।

কি একটা সময় ছিল! ইংল্যান্ড জিতে যাচ্ছিল। চ্যানেল ফোর দর্শকদের চোখের সামনে প্রতিটা বল নিয়ে হাজির হচ্ছিল। আর এর সব কিছুর সূচনা হয়েছিল ঢাকার ইন্টার কন্টিনেন্টাল হোটেলের এক ঘর্মাক্ত জিমে!

লেখাটি দ্য টেলিগ্রাফে How a gym in Bangladesh started the England revolution-এই শিরোনামে প্রকাশিত হয়।

Share this post