বাঘ মামা থেকে মুশফিক: বীরত্বগাঁথা

মোহাম্মদ ইশাম
জানুয়ারী ১৮, ২০১৭
   লড়ছেন মুশফিক   লড়ছেন মুশফিক

ওয়েলিংটন টেস্টের আগে মুশফিক বলছিলেন, এই নিউজিল্যান্ডে ভালো পারফরম্যান্স কিভাবে একজন ব্যাটসম্যানের প্রোফাইলকে সমৃদ্ধ করতে পারে। ওয়েলিংটন টেস্টের শেষ দিনে দাঁতে দাঁত চেপে বাউন্সারের সাথে লড়াই করে সেই মুশফিকুর নিশ্চিতভাবেই নিজেকে অন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন; যে লড়াই শেষ হয়েছে টিম সাউদির বাউন্সারে ডাক করতে গিয়ে ঘাড়ে আঘাত পেয়ে।

তাদের মূল লক্ষ্য মুশফিকুরের মাথা ছিল না। নিউজিল্যান্ড বোলাররা ধারাবাহিকভাবে তাঁর আঘাতগ্রস্ত আঙ্গুল লক্ষ্য করে শর্ট পিচ বল করে গেছেন। বিশ্বের যেকোনো স্মার্ট বোলিং অ্যাটাকই অবশ্য এটাই করত।

পঞ্চম দিন মুশফিকুরের খেলা প্রথম বলটাই ছিল শর্ট বল। বলটা তাঁর ব্যাটের হাতলে লেগে চার হয়েছিল। সেই প্রথম বল থেকেই তাঁকে তাঁর আঙুলের ব্যাপারে সতর্ক থাকতে হয়েছিল। প্রতি ওভারে স্ট্রাইকে এসেই অন্তত দুটো করে শর্ট বল খেলতে হয়েছে মুশফিককে। কিন্তু মুশফিক ঘাবড়ে যাননি, বেশিরভাগ বলকেই দক্ষতার সাথে খেলেছেন তিনি।

বাউন্সার সামলানোর প্রায় সব প্রথাগত উপায়ই প্রয়োগ করেছেন মুশফিক। মাথার উপর দিয়ে চলে যাওয়া বলগুলোতে ডাক করেছেন, গলা তাক করে আসা বলগুলো লিভ করেছেন। যে বলগুলো অতটা বাউন্স করেনি, সেগুলোতে বলের লাইনে গিয়ে ডিফেন্ড করেছেন। মুশফিকুর চ্যালেঞ্জটা লড়েছেন, একবারো পিছপা হননি।

কিউই বোলারদের এই লেন্থ কিছুটা বিস্ময়কর মনে হতে পারে, কারণ হোম কন্ডিশনে বরাবরই তাদের মূল লক্ষ্য থাকে ব্যাটসম্যানকে সামনের পায়ে খেলতে বাধ্য করা। কিন্তু দলে নিল ওয়াগনারের অন্তর্ভুক্তির পর থেকে তারা এই নতুন কৌশলও অবলম্বন করছে। পাঁজর কিংবা আঙুল লক্ষ্য করে ধারাবাহিক বোলিংয়ে ওয়াগনার এককথায় অসাধারণ।

পঞ্চম দিনের প্রথম সেশনে মুশফিকুর যেভাবে ব্যাটিং করছিলেন, কিছুক্ষণের জন্য মনে হয়েছিল বাংলাদেশের নিউজিল্যান্ডের কাছ থেকে খেলার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নিচ্ছেন। অনেক সময় ব্যাটসম্যানেরা এই ধরণের ইনিংস খেলতে খেলতে অধৈর্য হয়ে পড়েন; কিন্তু যে ৫২টি ডেলিভারি খেলেছেন মুশফিকুর তাকে ধীরস্থিরই মনে হয়েছে।

সম্ভবত সে কারণেই মাঠে অ্যাম্বুলেন্স প্রবেশের পরেও তিনি খেলা চালিয়ে যেতে চেয়েছিলেন। এমনকি হাসপাতালে নেয়ার পরেও তিনি মাঠে ফিরে খেলতে চেয়েছিলেন। উপায় থাকলে তিনি নিশ্চিতভাবেই হাসপাতাল থেকে একটা ট্যাক্সি নিয়ে সরাসরি এক কিলো দূরের বেসিন রিজার্ভে চলে আসতেন, এবং ১৩ রান থেকে আবার ব্যাটিং শুরু করতেন।

ব্যাটিংয়ের প্রতি মুশফিকুরের নেশার কথা অনেকেরই জানা। এবং মুশফিকুরের ব্যাটিং যে শুধু শট খেলার সময়ই দৃষ্টিসুখকর, তেমনটাও না। টেকনিকের দিক থেকে মুশফিক বেশ শক্ত। টেকনিক ঠিক রেখে রান করে যাওয়াতে মুশফিক বরাবরই পারদর্শী। শর্ট পিচ বোলিংয়ের ক্ষেত্রে মুশফিকের টেকনিক অন্যান্য বাংলাদেশি ব্যাটসম্যানদের চেয়ে অনেকটাই উন্নত, অন্তত গত তিন দশকের মধ্যে তো অবশ্যই অন্যতম সেরা।

মধ্য ১৯৮০ এর দশকের ব্যাটসম্যানদের বাউন্সার কিভাবে সামলাতে হয় সে ব্যাপারে খুব অল্পই জ্ঞান ছিল। কথিত আছে যে ১৯৮৬ এশিয়া কাপে বাউন্সারের আঘাতে ক্ষত-বিক্ষত হয়ে সাবেক বাংলাদেশি ব্যাটসম্যান রফিকুল আলমের ডাকনামই হয়ে গিয়েছিল ‘বাঘ মামা’!

টুর্নামেন্ট চলাকালে এক ম্যাচের পর রফিকুল তাঁর শার্ট খুললে এক সতীর্থ দেখতে পান, রফিকুলের শরীরে কালশিটের দাগ এমনভাবে বসে গিয়েছিল, তাঁর দেহের উপরিভাগ অনেকটা বাঘের মত ডোরাকাটা দেখাচ্ছিল!
বাংলাদেশের পিচ খুবই স্লো এবং লো ছিল। ফলে নব্বইয়ের দশকের সত্যিকারের ফাস্ট বোলারদের গতিশীল বাউন্সি বল খেলতে বাংলাদেশি ব্যাটসম্যানদের একপ্রকার হিমশিম খেতে হত।

২০০০ সালে টেস্ট স্ট্যাটাস পাওয়ার অর্থ দাঁড়ায় আরও বেশি করে বাউন্সি উইকেটে খেলতে যেতে হবে বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানদের। দেশের বাইরে বেশিরভাগ সমস্যাই হত বাউন্স বল খেলতে গিয়ে। এমনকি দেশের মাটিতেও বাংলাদেশের বিপক্ষে এই অস্ত্রই ব্যবহার করত প্রতিপক্ষ বোলাররা। দেশের মাটিতেও বাউন্সারের আঘাতে আহত হয়েছেন অভিজ্ঞ ব্যাটসম্যানেরা। যেমনটা হয়েছিলেন আকরাম খান, ২০০৩ সালে সাউথ আফ্রিকার বিপক্ষে।

সাকিব-তামিম-মুশফিকদের জেনারেশন যখন একটি নির্দিষ্ট সিস্টেমের মধ্য দিয়ে এবং উন্নত কোচিং ও অনুশীলন ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে গড়ে উঠছিল, তখন থেকেই সঠিকভাবে শর্ট বল খেলতে পারার ব্যাপারটি জাতীয় পর্যায়ে গুরুত্ব পেতে শুরু করে। ২০১০ সালের পর থেকে যখনি কোন ব্যাটসম্যান দৃশ্যপটে আবির্ভূত হয়েছেন, ক্রিকেটাঙ্গনে প্রথম যে প্রশ্নটি উচ্চারিত হয়েছে তা হল, ছেলেটি শর্ট বল খেলতে পারে তো?
এই ছেলেদের বেশিরভাগেরই শর্ট বল খেলার কৌশল করায়ত্ত হয়েছে রিচার্ড ম্যাকিন্সের অধীনস্থ এইচপি (হাইপারফরম্যান্স) ইউনিটে এসে। বোলিং মেশিনের ব্যবহার তাদেরকে দ্রুতগতির বল ও শর্ট পিচ ডেলিভারির সাথে খাপ খাইয়ে নিতে অনেকটা সাহায্য করেছে।

আগে বিকেএসপিই ছিল খেলোয়াড়দের একমাত্র ভরসাস্থল, কিন্তু গত ৬-৭ বছর ধরে মিরপুরের একাডেমি, ইনডোর ও আউটডোর নেট ব্যাটসম্যানদের টেকনিকে উন্নতি আনার ক্ষেত্রে যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।
২০১৫ বিশ্বকাপের আগে নেটে গ্রানাইটের স্ল্যাব ব্যবহার নিশ্চিতভাবেই মাহমুদউল্লাহর মত ব্যাটসম্যানদের অফ সাইডে অন দ্য আপ খেলার টেকনিককে আরো উন্নত করেছে।

শর্ট বল কিভাবে আরও জোরের সাথে খেলতে হয় সেটাও ব্যাটসম্যানেরা রপ্ত করেছেন এই অনুশীলনের মাধ্যমে। তবে একটা জিনিস লক্ষণীয় ছিল যে গত ৩ বছর ধরে বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানদের টেকনিকের এই পরীক্ষা বেশিরভাগ সময় দেশের মাটিতেই দিতে হচ্ছিল। নিউজিল্যান্ডে এই সিরিজের আগে বাংলাদেশের সর্বশেষ দ্বিপাক্ষীয় সফর ছিল ওয়েস্ট ইন্ডিজে, সেই ২০১৪ সালের আগস্ট-সেপ্টেম্বরে।

এখনকার ক্রিকেটে ব্যাকফুটে স্বচ্ছন্দভাবে খেলতে পারা একপ্রকার পূর্বশর্তই হয়ে দাঁড়িয়েছে। দিন দিন ব্যাটসম্যানদের টেকনিক এতটাই উন্নত হয়েছে যে আধুনিক ব্যাটসম্যানেরা এখন নিয়মিতই ফ্রন্ট ফুটে পুল শট খেলছে!

শর্ট বল খেলার টেকনিকে উন্নতি আনার ব্যাপারটা মাঝেমধ্যেই একটু আধটু ঝিমিয়ে পরেছে, কিন্তু ওয়েলিংটনে মুশফিকুরদের যেমন পরীক্ষা দিতে হল তেমন পরীক্ষা অবশ্যই ব্যাটসম্যানদের টেকনিকে উন্নতি আনার বিষয়টাকে আরও জোরদার করবে।

হ্যামস্ট্রিং ইনজুরিতে পরে সীমিত ওভারের সিরিজ প্রায় পুরোটাই মিস করার পর মুশফিকুর বলেছিলেন ড্রেসিংরুমে তিনি প্রায় কান্নাই করে দিয়েছিলেন নিউজিল্যান্ডে এসে অমন ফ্ল্যাট উইকেটে ব্যাটিং না করতে পেরে। প্রথম ইনিংসে ১৫৯ রানের ইনিংসটা নিশ্চয়ই সেই ক্ষতে কিছুটা হলেও প্রলাপ দিয়েছে।

কিন্তু মুশফিকুরের কাছে প্রথম ইনিংসের চেয়ে দ্বিতীয় ইনিংসটাই বোধহয় বেশি তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে থাকবে, কারণ মুশফিকুর এখন জানবেন, বিশ্বের যেকোনো জায়গায় এধরণের পরীক্ষা দিতে তিনি এখন প্রস্তুত। বাংলাদেশ এই বছর ভারত, শ্রীলঙ্কা ও সাউথ আফ্রিকা সফর করবে, এরপর নিজেদের দেশে আতিথ্য দেবে পাকিস্তান ও অস্ট্রেলিয়াকে। বাংলাদেশি ব্যাটসম্যানদের জন্য তাই প্রচুর শর্ট বল অপেক্ষা করে আছে সামনে। এই সিরিজের মত বাকি সিরিজগুলোতেও মুশফিক এভাবেই শর্ট বল খেলার চ্যালেঞ্জে সামনে থেকে নেতৃত্ব দেবেন। ডাক করবেন, বলের লাইন থেকে নিজেকে সরিয়ে নেবেন, কিন্তু লড়াইয়ে হাল ছেড়ে দেবেন না একবারও।

লেখাটি প্রথম প্রকাশিত ক্রিকইনফোতে

অনুবাদ: সঞ্জয় পার্থ

Category : অনুবাদ
Share on your Facebook
Share this post