ফিদেল কাস্ত্রো ও ক্রিকেট

অর্ক সাহা
ডিসেম্বর ২, ২০১৬
  ১৯৯৮ সাল, বয়স ততদিনে হয়ে গেছে ৭১।   ১৯৯৮ সাল, বয়স ততদিনে হয়ে গেছে ৭১।

কথিত আছে, বারবাডোসে ঝটিকা সফরে গিয়ে একবার ফিদেল কাস্ত্রো ক্রিকেট খেলতে নেমেছিলেন। ১৯৯৮ সাল, বয়স ততদিনে হয়ে গেছে ৭১। তিনি এবং বারবাডোসের প্রধানমন্ত্রী ওয়েইন আর্থার ব্রিজটাউন থেকে পশ্চিম উপকূলের পেইনেস বে’র দিকে ঘুরতে গিয়েছিলেন, যেখানে এয়ার কিউবানা ফ্লাইট বোম্বিং-এ মারা যাওয়া মানুষদের স্মৃতির সম্মানার্থে তাঁদের একটি স্মৃতিস্মারক উন্মোচন করার কথা ছিলো।

পথিমধ্যে পড়ে গেল একটা ক্রিকেট ম্যাচ, আর একজন প্রত্যক্ষদর্শীর ভাষ্য অনুসারে, ‘হঠাৎ নিরাপত্তাবাহিনীর সবগুলো গাড়ি এবং মিডিয়া যেন একসাথে জড়ো হয়ে গেলো, সবার নজর ছিলো ক্রিকেট পিচের দিকে।’ কাস্ত্রো ব্যাট হাতে তুলে নিলেন, আর্থারকে বললেন বোলিং করতে!

যৌবনে কাস্ত্রো বেসবল খেলতেন, যদিও গুজব অনুসারে ওয়াশিংটন সিনেটর টিমে ট্রায়াল দিয়ে টেকেননি তিনি। বাউন্সার বলে বেশ অস্বস্তিতে পড়ছিলেন বলে আর্থারকে থামিয়ে বরং বুকসমান উঁচ্চতায় বোলিং করতে বলেন। আর্থারও তাই করলেন; ফলাফল, ডাউন দ্য উইকেটে এসে সপাটে চালিয়ে ছক্কা!

তৃপ্ত ‘এল কমান্দান্তে’ কাস্ত্রো এবার সিদ্ধান্ত নিলেন, তিনি বোলিং করবেন। যেই ভাবা, সেই কাজ; হাতে তুলে নিলেন বল। প্রকৃতিগতভাবে তিনি বাঁহাতি, হাভানা ইউনিভার্সিটিতে পড়ুয়া অবস্থায় তিনি ছিলেন বেসবল টিমের পিচার। সুতরাং গায়ে যত জোর আছে, সেটা দিয়েই বল আর্থারের দিকে ছুড়ে মারলেন বেসবলের মত করেই। আর্থার এবার যতই নিয়ম বুঝান না কেন, কাস্ত্রো মানতে রাজি নন; তিনি ছুড়েই বোলিং করবেন!

প্রত্যক্ষদর্শীর ভাষ্যমতে, ‘বরাবরের মতই তিনি খেলাটা খেলেছিলেন নিজের নিয়মে।’

কাস্ত্রো ঠিকই বুঝতে পেরেছিলেন ক্রিকেটের রাজনৈতিক গুরুত্বটা, যাওয়ার পথে আর্থারকে এটাও বলেছিলেন, ক্যারিবিয়ান ক্রিকেট দল কীভাবে পুরো পশ্চিম ভারতীয় দ্বীপপুঞ্জকে এক সুতোয় বেঁধেছে। বিপ্লবের আগে কিউবাতেও ক্রিকেট খেলা হতো। বিংশ শতাব্দির শুরুর দিকে দু’লক্ষাধিক মানুষ কৃষিকাজে যোগ দেওয়ার জন্য ক্যারিবিয়ান

দ্বীপপুঞ্জ থেকে কিউবায় স্থানান্তরিত হয়। আর তাঁদের মধ্যেই জ্যামাইকা ও বারবাডোস থেকে যারা এসেছিলেন, তাঁরা সাথে করে নিয়ে এসেছিলেন ক্রিকেট খেলাটাও। ‘কালো ব্র্যাডম্যান’ নামে পরিচিত ওয়েস্ট ইন্ডিজের কিংবদন্তী ক্রিকেটার জর্জ হ্যাডলি আদতে বেড়ে উঠেছিলেন কিউবাতেই, পানামা থেকে আসার পর থেকে শুরু করে জ্যামাইকাতে থিতু হওয়ার আগ পর্যন্ত ছিলেন সেখানেই।

ক্রিকেটের প্রতি প্রচন্ড ঝোঁক ছিলো ইংরেজ উদ্যোক্তা স্যার জুলিয়ান কানের, রীতিমত পানির মত খসিয়েছেন টাকা, কম করে হলেও সেটা কয়েক মিলিয়ন হবে। জুলিয়ান ১৯২৮ সালে একবার হাভানাতে একটা ক্রিকেট দল নিয়ে যান। ওই সময়টাতে শহরে ছিলো পাঁচটা দল, বাকিরা স্যান্টিয়াগো এবং গুয়ানতানামোতে লিগ খেলাতে ব্যস্ত।

কান লোকাল খেলোয়াড়দেরকে নতুন স্টেডিয়াম খুঁজতে বলে দেন, এবং টেকনিকের উন্নতির জন্য এফ.এ.এইচ হেনলির লেখা ‘দ্য বয়েজ বুক অফ ক্রিকেট’ পড়ার নির্দেশ দেন। এমনকি চ্যালেঞ্জ কাপ নামের একটি টুর্নামেন্টের বন্দোবস্তও করে দেন, যেটা ১৯৫০ সাল অব্দি চালু ছিলো। কিউবান বিপ্লবের পর বেসবল সেখানে বেশ জনপ্রিয়তা অর্জন করে, ক্রিকেট যেন কিছুটা মিইয়ে যায়।

কাস্ত্রো চাচ্ছিলেন ক্যারিবিয়ান দেশগুলোর সাথে কিউবার মৈত্রী স্থাপন করতে, আর ক্রিকেট ম্যাচটা তাতে বেশ কাজে দিলো। একই ট্যুরে কাস্ত্রো জ্যামাইকা এবং গ্রেনাডা ঘুরে কিউবাতে গিয়ে হঠাৎ উপলব্ধি করলেন, ক্রিকেট থেকেও কিউবার কিছু পাওয়ার আছে। ব্যস, শুরু হয়ে গেলো দৌড়ঝাঁপ।

ক্রিকেট কমিশন গঠন হয়ে গেলো, তৃণমূল কার্যক্রমও শুরু করা হলো, এরপর ২০০২ সালে লিখিতভাবেই কিউবা আইসিসির সদস্য দেশ হয়ে গেলো। তবে সমস্যা হলো, কাস্ত্রো নির্দেশনা দিয়ে দিলেন বটে, তবে ক্রিকেট খেলতে জানা খুব বেশি কেউ ছিলো না দ্বীপদেশটিতে, ভালো মানের কিটের কথা তো বাদই দিলাম।

সুতরাং শুরু হলো ব্রিটেনের সবচেয়ে কৌতুহলোদ্দীপক কূটনৈতিক মিশন। হাভানার ব্রিটিশ দূতাবাস থেকে শুরু করে লন্ডনের পররাষ্ট্র মন্ত্রনালয় পর্যন্ত খবর ছড়িয়ে গেলো, এবং পথিমধ্যেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়ে গেল, ‘ক্রিকেটের মাধ্যমে শোষিত সমাজের মধ্যে ‘ফিল গুড ফ্যাক্টর’ তৈরির মাধ্যমে অফুরন্ত প্রাণোদ্দীপনা আনা সম্ভব, যুবসমাজকে বিভিন্ন অপরাধ থেকে দূরে রাখা এবং তাঁদের স্বাস্থ্যগত দিকে উন্নতিতেও রাখতে পারে বিশাল ভূমিকা।’

আর তাছাড়া আন্তর্জাতিক সম্পর্কে উন্নতির জন্য ক্রিকেট হতে পারে বেশ বড় হাতিয়ার। ফলে ক্রিকেটের জন্য ফান্ডিং আর আটকায়নি, যুক্তরাজ্য ক্রীড়া মন্ত্রনালয় থেকেই সেটা পাস হয়ে যায় খুব দ্রুতই।

দল চালানোর জন্য ব্রিটিশরা ঠিক কোনো ভ্যাকুয়াম ক্লিনার সেলসম্যানকে নিয়োগ দেয়নি, তবে টম রডওয়েল নামের একজন সাবেক চীফ অ্যাডভারটাইজিং এক্সিকিউটিভকে নিয়োগ করেছিলো।

নিজের বই ‘থার্ডম্যান ইন হাভানা’তে এটা নিয়ে তিনি নিজেই বেশ রসিকতা করেছেন। রডওয়েল বুঝতে পেরেছিলেন, পররাষ্ট্র অধিদপ্তরের মূল চাওয়া আসলে ছিলো কিউবাকে প্রাক্তন ওয়েস্ট ইন্ডিয়ান কলোনিগুলোর সাথে সংযোগ করতে সাহায্য করা, যাতে করে কাস্ত্রোর অবর্তমানে যুক্তরাজ্যের সাথে কিউবার মৈত্রী স্থাপিত হয়, এবং একই সাথে আমেরিকাও যেন তাতে নাখোশ না হয়।

এরপর ২০০৬ সালে আম্পায়ারিং এবং ক্রিকেটীয় আইনকানুনগুলো স্প্যানিশ ভাষায় রূপান্তর করে আনার উদ্দেশ্যে রডওয়েল হাভানার দিকে রওনা করেন। হাভানায় ফেরার পর ‘হাভানা স্পোর্টস ইউনিভার্সিটি’তে উদ্বোধনী ভাষণ দেওয়ার সময় বিভিন্ন ফিল্ডিং পজিশন নিয়ে কথা বলার পর রডওয়েল সম্মুখীন হন বেশ হাস্যরসের উদ্ভব করা এক প্রশ্নের, ‘ক্রিকেটে থার্ডম্যান যদি থাকতে পারে, তাহলে ফার্স্ট ম্যান এবং সেকেন্ড ম্যান কি দোষ করেছিলো?’

তাঁর শিক্ষকতার বিশাল পরীক্ষা ছিলো স্থানীয় বেসবল ডায়মন্ডে যেদিন গুয়ানতানামো এবং হাভানার মধ্যে ম্যাচ হয়। ম্যাচটা হয়েছিলো দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে ডিপ্লোমেটিক ব্যাগে করে নিয়ে আসা ম্যাট বিছানো ক্রিকেট পিচে।

অবধারিতভাবেই এলবিডব্লিউ নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয় সে ম্যাচে। প্যাডে বল লাগার পরও হাভানার একজন ব্যাটসম্যান মাঠ ছাড়তে অস্বীকৃতি জানান। ব্যাপারটার মীমাংসা ন্যাশনাল ডিরেক্টর অফ রিক্রিয়েশন হোসে সিদানিও’র হস্তক্ষেপে, তিনি খেলোয়াড়দের মনে করিয়ে দেন কাস্ত্রো’র নীতি, ‘বিপ্লবীদেরকে অবশ্যই খেলার মধ্যে মনোনিবেশ করতে হবে। দারুণ সম্ভাবনাময় যুবকদেরকে বেছে নেওয়া হবে এবং যথোপযুক্ত ট্রেনিং দেওয়া হবে। খেলার মধ্য দিয়েই বিপ্লব চালিয়ে যেতে হবে। পিতৃভূমি, নাহলে মৃত্যু! জয় আমাদের হবেই!’

বিশাল বড় অগ্নিঝড়া বক্তৃতার পর রডওয়েল বুঝলেন, সিদানিও আসলে বলতে চেয়েছিলেন, ব্যাটসম্যান আউট!

সিদানিও একাই খেলোয়াড়দের যন্ত্রনা দেননি, গোদের উপর বিষফোঁড়া হয়ে ছিলেন কেন লিভিংস্টোন নামের আরো একজন। লিভিংস্টোন ব্যবসায়িক একটি কাজে ভেনেজুয়েলা থেকে এসেছিলেন হাভানায়, হুগো শ্যাভেজ শেষ মুহুর্তে ব্যবসায়িক কাজটা স্থগিত করে দেন। ফলে তিনি আটকা পড়ে যান হাভানাতেই।

এক প্রত্যক্ষদর্শী বলেন, ‘রডওয়েল আমাদেরকে বলেছিলেন, যখন লিভিংস্টোন এসে পৌছাবেন, তখন যেন এমনভাবে তাঁকে অভ্যর্থনা জানানো হয় যেন মনে হয় তিনি আমাদের মেলায় হারিয়ে যাওয়া ভাই। সুতরাং গাড়ি থেকে নামার সাথে সাথে তাঁকে আমরা জড়িয়ে ধরলাম, ক্যামেরা নিয়ে এদিকসেদিকে ক্লিক করে ছবি তুলতে শুরু করলো সবাই, আমরাও ক্রিকেটের শক্তি নিয়ে কিছু জ্ঞানগর্ভ কথা হজম করে নিলাম লিভিংস্টোনের থেকে।’

নিঃসন্দেহে লিভিংস্টোনের বক্তৃতায় উদ্বুদ্ধ হয়ে এক যুগ পর এখনো কিউবায় ক্রিকেট খেলা চলছে। ছয় প্রদেশে সব মিলিয়ে ১,১৫০ জন রেজিস্টার্ড খেলোয়াড় রয়েছেন। স্যার জুলিয়ান কানের প্রবর্তিত সেই চ্যালেঞ্জ কাপ আবার শুরু করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

কাস্ত্রোপরবর্তী যুগ শুরু হয়েছে বটে, তবে সেটার প্রভাব এখনো অতটা প্রতীয়মান হয়নি। উইনস্টন চার্চিলের মতো করেই বলা যায়, ‘হতে পারে, ভবিষ্যতে হয়তো দ্বীপটা এখনকার মতই থাকবে। হয়তো ইংল্যান্ড সেটা হাতছাড়া করবে না। হয়তো কিউবা স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে বিশ্বে পরিচিত হবে। হয়তো কিউবা তাঁদের সমুদ্রবন্দর খুলে দেবে বাণিজ্যের সুবিধার্থে, হয়তো কিউবা হার্লিংহামে ঘোড়া পাঠাবে, আর লর্ডসে পাঠাবে ক্রিকেটার!’

মূল লেখাটি ‘Fidel Castro, cricket, and a crackpot Foreign Office plan for Cuba’ শিরোনামে ব্রিটিশ দৈনিক দ্য গার্ডিয়ানে লিখেছেন অ্যান্ডি বুল

Category : অনুবাদ
Share this post