নিরাপত্তা-চাঁদরে ঢাকা থাকবে ইংল্যান্ড

মোহাম্মদ ইশাম
অক্টোবর ২, ২০১৬
 বিসিবি প্রেসিডেন্ট নাজমুল হাসান বলেছেন ইংল্যান্ড থেকে আসা সমর্থকদের নিরাপত্তা ব্যবস্থাও বোর্ড নিবে বিসিবি প্রেসিডেন্ট নাজমুল হাসান বলেছেন ইংল্যান্ড থেকে আসা সমর্থকদের নিরাপত্তা ব্যবস্থাও বোর্ড নিবে

ইংল্যান্ড এর এই সফরে এলেক্স হেইলস খেলছেন না এজন্য যদি সবচেয়ে খুশি কেউ হয়ে থাকে তাহলে তা হবে বাংলাদেশের ফাস্ট বোলাররা। ইনজুরিতে থাকা মুস্তাফিজুর রহমানকে হারিয়ে কিছুটা দুর্বল হয়ে পড়া বোলিং ইউনিট এর জন্য প্রথম পাওয়ারপ্লে’তে বিগ হিটিং ব্যাটসম্যান হেইলস এর না থাকা মানেই একটু কম দুঃশ্চিন্তা।

ক্যাপ্টেন মাশরাফি মুর্তজার নেতৃত্বে আর চণ্ডিকা হাতুড়সিংহের নিবিড় তত্ত্বাবধানে গত দেড় বছরে পেস এটাক এ দারুণ উন্নতি করেছে দলটি, মাশরাফি নিজেও একজন পেস বোলার। এই নেতৃত্ব ইদানিং অন্ততঃ তিনজন পেস বোলার নিয়ে খেলতে নামে। মুস্তাফিজুর, তাসকিন, মাশরাফি, আর আল-আমিন হোসেন ভিন্ন ভিন্নভাবে পাকিস্তান, ইন্ডিয়া আর সাউদ আফ্রিকাকে দারুণ সংকটের মুখে ফেলেছিল, যারা ২০১৫ সালে প্রত্যেকেই বাংলাদেশের সাথে ওয়ান-ডে সিরিজ হেরেছে।

কিন্তু দুই সপ্তাহ আগে হেইলস যখন ১৭১ রান করে পাকিস্তান উড়িয়ে দিয়েছিল তখন বাংলাদেশের ড্রেসিং রুম নড়েচড়ে বসেছিল।

গত কয়েক বছরে ক্রিস গেইল, রোহিত শর্মা আর বিরাট কোহলি’র মতো অনেক বেশি রান করা ব্যাটসম্যানদেরকে পেইস বোলাররা অনেকবারই থামিয়েছে কিন্তু হেইলস এর মতো একই সাথে আক্রমনাত্বক আর বেশি রান করা খেলোয়াড়ের ঢাকা-চট্টগ্রাম এ খেলার চাইতে নিজের দেশে বসে থাকাটা প্রতিপক্ষের জন্য নিশ্চয়ই স্বস্তিদায়ক। শুরুতেই হেইলস এর মতো ব্যাটসম্যানদের আক্রমণ ঠেকানোর জন্য বাঁহাতি স্পিনারদেরও কখনো কখনো সামনে নিয়ে আসতে হয়েছে।

এখন, এর আর প্রয়োজন হবে না। ইওইন মর্গান এর অনুপস্থিতিও বাংলাদেশের জন্য সুবিধাজনক হবে। ইংল্যান্ড এর নেতৃত্ব দিবে নতুন অধিনায়ক যশ বাটলার, সেপ্টেম্বর ৩০ তারিখে পৌঁছে মাত্র ৭ দিন পর ৭ই অক্টোবর এর প্রথম ম্যাচ এ বাংলাদেশ এর বিরুদ্ধে খেলতে নামার আগে ভালোই মানিয়ে নেয়ার একটা ব্যাপার থাকছে অতিথিদের জন্য।

বাংলাদেশের মাঠের অবস্থা সম্পর্কে মর্গানের অভিজ্ঞতা আর স্পিনারদের আক্রমণ ইংল্যান্ড এর জন্য বেশ ভালোই হতে পারতো। এই যুগলের খেলতে যেতে রাজি না হওয়াটা, বিদেশিদের আতিথিয়তায় সুখ্যাতি থাকা আর বিশেষ করে এই আন্তর্জাতিক ক্রিকেট এর আয়োজক দেশ বাংলাদেশে এর জন্য নিঃসন্দেহে অসম্মানজনক।

আইসিসি পূর্ণ সদস্য হওয়ার অনেক আগে, সেই ১৯৮৮ সালেই আইসিসি নক আউট টুর্নামেন্ট সফলভাবে হোস্ট করেছিল বাংলাদেশ। ২০১১ তে ৫০ ওভারের আর ২০১৪ সালে টি-টুয়েন্টি ওয়ার্ল্ডকাপেরও হোস্ট করেছিল।

রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে ২০১৪’র বিশ্বকাপের আগে কিছুটা উদ্বেগ ছিল কিন্তু সবকিছুই শান্তিপূর্ণ ভাবে শেষ হয়েছিল। গতবছর অক্টোবর এ অস্ট্রেলিয়ার খেলতে আসতে অস্বীকৃতি জানানোটা দারুণ এক ঘা ছিল; একটা নির্দিষ্ট হুমকির কারণ দেখিয়েছিল অস্ট্রেলিয়া আর বাংলাদেশের ক্রিকেট বোর্ড আর নিরাপত্তা কর্তৃপক্ষ চেষ্টা করে সন্তুষ্ট করতে পারেনি তাদের।

কিন্তু জুলাই ১ তারিখের গুলশান ক্যাফেতে আক্রমণ পরিস্থিতি বদলে দিয়েছে অনেকটাই। ২০ জনকে নির্মমভাবে হত্যা করা এই জঙ্গি আক্রমণ এর ভয়াবহতার রেশ কাটিয়ে উঠতে বাংলাদেশিদের অনেক সময় লাগবে। এরপর সারাদেশ জুড়েই জোরদার করা হয়েছে নিরাপত্তা, বিশেষ করে ঐ আক্রমনের পর কিছুদিন হাই এলার্ট জারি ছিল। এরপর নিরাপত্তার জন্য সবসময়ই দেখা যাচ্ছে বিশেষ আয়োজন, বিশেষ করে ক্রিকেট স্টেডিয়ামগুলোতে। বাংলাদেশ ক্রিকেটের হোম গ্রাউন্ড শের-এ-বাংলা ক্রিকেট স্টেডিয়াম যেন এখন এক দুর্গ, খেলোয়াড়, কর্মকর্তা আর সাংবাদিকদের অন্ততঃ দুই-স্তরের নিরাপত্তা বিলয় পার হয়ে প্রবেশ করতে হয় ভেতরে।

সাথে সাথেই একটা শঙ্কা ছিল ইংল্যান্ড ক্রিকেট দল খেলতে আসবে কিনা, কিন্তু যথাযথ ব্যবস্থা নেয়ার জন্য সব কৃতিত্ত্ব নিঃসন্দেহে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের। তারা সবার আগে বিদেশি কোচদের আসাটা নিশ্চিত করেছে, বিশেষ করে রিচার্ড হলশ্যাল, ইংল্যান্ড এর প্রাক্তন ফিল্ডিং কোচ ছিলেন, এখন একই কাজ করছেন বাংলাদেশের জন্য। হলশ্যাল ফিরে আসার পরে যখন ইংল্যান্ড টীমকে খেলতে আসার জন্য আহবান জানিয়েছিল তখন বিসিবি একটু স্বস্তির নিশ্বাস ফেলতে পেরেছিল।

বিদেশি কোচরা এখন বাসা থেকে স্টেডিয়ামে যাওয়ার পথে সাথে থাকে নিরাপত্তাবহর, প্রত্যেকের সাথেই সবসময় থাকে একজন করে গানম্যান। ছবি ক্যাপশানঃ হেইলস এবং মর্গান নিরপত্তার অজুহাতে এরপর দুই সপ্তাহ পর ইংল্যান্ড যখন তাদের সফর নিশ্চিত করলো এবং সেপ্টেম্বর ৩০ এ বাংলাদেশে পৌঁছানোর কথা জানালো তখন বেশিরভাগ ভক্তদের মধ্যে দেখা গেল উল্লাস, এই সেইসাথে যুক্ত হলো সাবধানতা।

কেউই মাত্রাতিরিক্ত সুখী নয়, বিসিবি এবং বাংলাদেশের নিরাপত্তা বাহিনীতো অবশ্যই, যাদেরকে এখন রেগ ডিকাসন আর ইংল্যান্ড ক্রিকেট বোর্ড (ইসিবি) এর কাছে প্রমাণ করতে হবে যে তাদের সমস্ত নিরাপত্তা পরিকল্পনা ঠিকঠাকই আছে। বিশেষ করে, হেইলস আর মর্গান এর প্রত্যাহারের পর বাংলাদেশের সবাই এখন মনোযোগী যেন নিরাপত্তায় কোন ব্যাঘাত না ঘটে সেই দিকে। এর সাথে এটাও মনে রাখতে হবে ইসিবি আর ইংল্যান্ড ক্রিকেট টীম নিজের চোখে দেখার পরই একমাত্র নিশ্চিত হতে পারবে যে নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্ছিদ্র আছে।

বিসিবি প্রেসিডেন্ট নাজমুল হাসান বলেছেন ইংল্যান্ড থেকে আসা সমর্থকদের নিরাপত্তা ব্যবস্থাও বোর্ড নিবে। যদিও শুনতে এটা অসম্ভব মনে হয়, ঢাকা ও চট্টগ্রামে ইংল্যান্ড এর সমর্থক ও সাংবাদিকরা যে হোটেলগুলোতে থাকবে সেগুলোও নিরাপত্তার চাদরে ঢেকে দেয়ার আয়োজন করছে বিসিবি।

যদিও দ্বিতীয় টেস্ট ম্যাচ শেষ হওয়া পর্যন্ত বোঝা যাবে না কোন কিছুই। বাংলাদেশকে মাঠে এবং মাঠের বাইরে প্রমাণ করতে হবে নিজেদেরকে যে তারা এখনো আন্তর্জাতিক ম্যাচ আয়োজন এর স্বামর্থ রাখে। নিশ্চিতভাবেই ৩০ই সেপ্টেম্বর এ ইংল্যান্ড দল এর বাংলাদেশে আসার মতো এই বদান্যতা উৎসাহী করবে বাংলাদেশকে, যখন ক্রিকেট পাগল এই দেশের এমন এক সময়ে দরকার সামান্য একটু হাত বাড়িয়ে দেয়া।

 

The Times পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদন

অনুবাদ: কাজী মামুন

 

Category : অনুবাদ
Share on your Facebook
Share this post