‘সাঙ্গা’চরিত-২

মেহেদী হাসান রোমেল
অক্টোবর ২, ২০১৬
  ডি সিলভার মতো লংকান গ্রেটদের টোটকা গোটা ক্যারিয়ারে কম পাননি সাঙ্গাকারা ডি সিলভার মতো লংকান গ্রেটদের টোটকা গোটা ক্যারিয়ারে কম পাননি সাঙ্গাকারা

এমন অনেক টেস্ট আছে, যেখানে সাঙ্গাকারা ব্যাটিংয়ে ছন্দ খুঁজে পাননি। তাকে ধাতস্থ করতে তখন বেশি পরিমাণ বল ফেস করতেন নন-স্ট্রাইকের ব্যাটসম্যানরা। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ব্যাটসম্যানই যে ৫৭.৪০ ব্যাটিং গড় নিয়ে টেস্ট ক্যারিয়ার শেষ করবেন, তা হয়তো আগেই ঠাহর করতে পেরেছিলেন ডি সিলভা। কুঁড়ি থেকে কুসুম হয়ে ফোটার সে সময় সাঙ্গাকারাকে একদিন অনুশীলনে ডি সিলভা পরামর্শ দেন, ‘তুমি যদি স্ট্রেট ড্রাইভ করতে চাও তাহলে গ্রিপ পাল্টাতে হবে।’ অফসাইডে তখন শুধু থার্ডম্যান আর কাভার ড্রাইভের ওপর নির্ভর করতে হতো সাঙ্গাকে। কিন্তু গ্রিপ পাল্টানোর পর স্ট্রেট ড্রাইভও সংযুক্ত হয় তার শটের ঝুলিতে।

(প্রথম কিস্তির পর...)

 

৩.

এ প্রসঙ্গে সাঙ্গাকারার ব্যাখ্যা, ‘গ্রিপ পাল্টানোর আগে অফসাইডে শট খেলার জন্য শুধু থার্ডম্যান আর কাভারের মাঝামাঝি জায়গাটুকুর ওপর নির্ভর করতাম। কিন্তু ডি সিলভার পরামর্শমতো গ্রিপ পাল্টানোর পর একেবারে হঠাত্ করেই আবিষ্কার করলাম, আমি এখন বোলারদের পেছন দিয়েও শট খেলতে পারছি।’

ডি সিলভার মতো লংকান গ্রেটদের টোটকা গোটা ক্যারিয়ারে কম পাননি সাঙ্গাকারা। কিন্তু পর্দার অন্তরালে কেশামাই সাঙ্গাকারার নিয়ত ভাঙা-গড়া খেলার পথপ্রদর্শক। স্রোতের বিপরীতে লড়াই করে কীভাবে নিজের সেরাটা বের করে আনা যায়— এ বিদ্যেটা সাঙ্গাকারাকে তার বেড়ে ওঠার বয়সেই শিখিয়েছেন কেশামা। অনেক সময় এমন ঘটেছে, সামান্য একটা ব্যাপার নিয়ে মাসের পর মাস ছেলেকে খুঁচিয়েছেন কেশামা। পিতৃস্নেহের বদলে ধেয়ে আসা এ চারিত্রিক কঠোরতার বিরুদ্ধে সাঙ্গাকারা কখনই যুদ্ধ ঘোষণা করেননি। সয়ে গেছেন নীরবে। কিন্তু বিপরীত শিবির থেকে জবাব না পেলে কারইবা এক জিনিস নিয়ে সারাক্ষণ ক্যাচর-ক্যাচর করতে ভালো লাগে? সম্পূর্ণ দুই ঘরানার দুই রকম ব্যক্তিত্বের এই ‘টাগ অব ওয়ার’-এ সাঙ্গাকারার বাবা তাই আগেভাগেই আত্মসমর্পণ করতেন, ‘সবকিছু ভুলে যাও। তোমাকে যা যা বলেছি, সেসব মনে রাখার দরকার নেই। এসো আমরা নতুন একটি ব্যাপার নিয়ে শুরু করি।’

তবে সাঙ্গাকারার একটি ব্যাপারে কেশামা তার অবস্থান থেকে কখনো সরে আসেননি। ‘পরিবর্তন’— এ আপ্তবাক্যটা সাঙ্গার গোটা ক্যারিয়ারে ভীষণভাবে সমর্থন করে গেছেন কেশামা। সাঙ্গার ভাষায়, ‘বাবার যুক্তি ছিল পরিবর্তনকে সবসময় ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করো। এতে তোমার ব্যাপ্তি ঘটবে। সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা অনুযায়ী নিজেকে পাল্টাতে পারলে তা সবসময়ই বেড়ে ওঠার সহায়ক।’

সাঙ্গাকারা শুরুর দিকে তার বাবার এসব যুক্তিকে অতটা পাত্তা দিতেন না। ‘বাবার আবিষ্কৃত নতুন দর্শন, যা কিছুদিন পরই পাল্টে যাবে’— বিশ্বাস করতেন সাঙ্গাকারা। কিন্তু সে উপলব্ধিটা এখন পাল্টে গেছে, ‘আসলে এ কথাটা হয়তো আমার বাবার জীবনদর্শন। নিজের ক্রিকেট ক্যারিয়ারের প্রতিটি মুহূর্তেও আমি ঠিক একইভাবেই ভেবেছি।’

সিরিজ থেকে সিরিজ— নিজেকে নিয়ে ভাঙা-গড়ার খেলায় মেতেছেন সাঙ্গাকারা। টেকনিকে অণুমাত্র ভুল থাকলেও তা শুধরে নিয়েছেন। এসব জিনিস চোখের দেখায় ধরা যায় না। কিন্তু সাঙ্গাকারার গোটা ক্যারিয়ারটা মেলে ধরলে দেখা যায়— অফস্ট্যাম্পের বাইরে নড়বড়ে শটগুলো ধীরে ধীরে আরো জমাট হয়েছে, সুইপে দুর্বলতা এখন অতীত, স্কয়ার কাটগুলো আর আগের মতো বাতাসে ভাসে না।

ক্রিকেটে ‘ফর্ম’ ব্যাপারটা একেবারেই আপেক্ষিক। কেউ প্রথম বল থেকেই ছন্দে থাকে, কেউ আবার সারা দিন উইকেটে থেকেও স্বচ্ছন্দ হতে পারে না— এর কারণটাও ফর্ম। সাঙ্গাকারার ক্যারিয়ারেও এমন সময়ের আবির্ভাব ঘটেছে বহুবার, “এমন অনেক ইনিংস আছে, যেখানে আমি মোটেও ছন্দে ছিলাম না। দেখা গেছে, টানা ২ ঘণ্টা  নড়বড়ে ব্যাটিং করার পর হঠাত্ করেই একটা বল মোকাবেলায় সবকিছু পাল্টে যায়। শরীর আর মন ব্যাটিংয়ের ‘জোন’-এ ঢুকে পড়ে।” এটা সাঙ্গাকারার ক্যারিয়ারের শুরুর দিকে অহর্নিশ ঘটেছে। সে সময় ডি সিলভা, জয়াসুরিয়া, মাহেলাদের মাঝে সাঙ্গাকে নিয়েই সবচেয়ে কম ভেবেছেন প্রতিপক্ষ দলের বোলাররা। দেখা যেত দিন শেষে সে হাফসেঞ্চুরি করে অপরাজিত। পরের দিন ওপেনিং স্পেলে টিকবেন না— সাঙ্গাকে নিয়ে সবার এমন ধারণা থাকলেও ধীরে ধীরে তা পাল্টে ফেলেছেন। অবসর নেয়ার আগ পর্যন্তও সাঙ্গাকারা উইকেটে টিকে থাকা মানে প্রতিপক্ষ দলের শরীর চুইয়ে ফোঁটা ফোঁটা অবিরত রক্তক্ষরণ। ৩৮ ইঞ্চি উইলোকে অস্ত্রোপচারের ছুরির মতোই নিখুঁত ব্যবহার করেছেন এ লংকান গ্রেট।

মাহেলা একবার তার ইয়ারের অনুশীলনের সামর্থ্য নিয়ে মন্তব্য করেছিলেন, ‘কুমার যখন ব্যাট করে তখন সে শুধুই ব্যাট করে, শুধুই ব্যাট করে। যখন কিপিং করে তখন সে শুধুই কিপিং করে, শুধুই কিপিং করে আর শুধুই কিপিং করে।’ ‘ধৈর্য’— শব্দটার সঙ্গে সাঙ্গার মন দেয়া-নেয়া স্কুল বয়স থেকে, যখন একটি মেয়ের প্রণয় ইচ্ছার কোপানলে অতিষ্ঠ হয়েছেন সাঙ্গাকারা। সৌভাগ্যক্রমে সে মেয়েটাই আজ সাঙ্গার জীবনের ইনিংসে সঙ্গী! মাহেলার মতে, স্কুল বয়সে ইয়েহালির কাছে রীতিমতো নাকাল হতে হয়েছে সাঙ্গাকে। ইয়েহালির দুই যমজ বান্ধবী ছিল। শত্রুপক্ষের (সাঙ্গা) ওপর  গোয়েন্দাগিরি চালানোর দায়িত্বটা সেই দুই বোন জিনি ও দিলুর ওপর ছেড়ে দেন ইয়েহালি। আজ এত বছর পর সেই দিনগুলো স্মরণ করতে গিয়ে দুই বোনের উক্তি, ‘তার সম্পর্কে খোলনলচে জানতে আমরা ইংরেজি সাহিত্যের ক্লাসে যেতাম। প্রথম যে ব্যাপারটা আমরা খেয়াল করি, সে বাকি ছেলেদের থেকে আলাদা। অনেকটা শিক্ষকের পোষা ছাত্রের মতো। সামনের বেঞ্চে বসত। প্রশ্নের উত্তর দিত পটাপট।’

স্কুলজীবনের সাঙ্গাকে জ্ঞানের সুমদ্রে সবচেয়ে বেশি করে টানত ইংরেজি কবিতার ঢেউ। ইয়েহালিকে থরে-বিথরে প্রেমপত্র পাঠিয়েছেন সাঙ্গাকারা। সেসব চিঠিতে তার নিজের অনুভূতির থেকে মিল্টন-শেক্সপিয়ার-চসার-কিটস-শেলিদের লাইনগুলোই বেশি প্রাধান্য পেয়েছে। জিনি ও দিলুর বাসা ছিল সাঙ্গা আর ইয়েহালিদের বাসার কাছাকাছি। চিঠির বাহক হিসেবে তারা কর্তব্যের পরাকাষ্ঠা প্রদর্শন করলেও নৈতিকতার খাতায় তাদের যোগফল শূন্য! ইংরেজি কবিতার প্রতি সাঙ্গার অসম্ভব রকম ভালোবাসাটা তার পরিবার আর ইয়েহালির বাইরে প্রথম ধরতে পেরেছিলেন জিনি ও দিলু। কীভাবে— এ প্রশ্নটা একেবারেই অবান্তর। পৃথীবির যেকোনো প্রান্তেই প্রেমের চিঠি বাহকরা সবাই একই রকম! অজুহাত দেখানোর ক্ষেত্রেও এরা সমগোত্রীয়। জিনি আর দিলু যেমন ব্যাখ্যা করলেন, ‘ইয়েহালি মাঝে মধ্যে এসব চিঠি পড়ে শোনাত। বাইরে থেকে বোঝা না গেলেও কুমার ভেতরে ভেতরে ভীষণ রোমান্টিক। যদিও এসব নিয়ে কথা বলা সে পছন্দ করে না।’

প্রেম-চিঠি-ইংরেজি কবিতা— সাঙ্গার কাছে এসব হারানো অতীতের সত্যতা খুঁজতে যাওয়া অর্থহীন। তার বক্তব্য, ‘জিনি ও দিলু যা বলেছে, তার কোনো কিছুই সত্য নয়।’ কিন্তু ইয়েহালিকে থামানোর সাধ্য কার! পাশেই বসে থাকা স্বামীর প্রতি তার ইয়র্কার, ‘সত্যিই? তুমি আমাকে চিঠি লেখনি? পাঁচ পৃষ্ঠার চিঠিও আছে আমার কাছে।’

—‘সম্ভবত ওটাই আমার লেখা একমাত্র চিঠি।’

—‘সব চিঠিই আমি যত্ন করে রেখে দিয়েছি। আচ্ছা, এটা বাদ দাও। চিঠির পাশাপাশি জিনি ও দিলুকে দিয়ে যে তুমি নিয়মিত চকোলেটও পাঠিয়েছ...?’

—‘হ্যাঁ, কারণ স্কুলে তোমরা কি সব ছাইপাশ খেতে— আমার ভীষণ দুশ্চিন্তা হতো।’

—‘ইংরেজি কবিতার বইটাও তাহলে তুমি পাঠাওনি?’

সাঙ্গাকারা এবার নিরুত্তর। ইয়েহালির মুখে বিজয়ীর হাসি। তার এ হাসিটা কিনতে সাঙ্গাকারাকে বাবার কাছে দেয়া ব্যাটিংয়ের পরীক্ষার মতোই দিতে হয়েছে প্রেমের পরীক্ষা। সাঙ্গার শৈশবের ইয়ার দর্শনা সেনারাথের কাছে জানা গেল সে কথা, ‘ইয়েহালিকে সে ছোটবেলা থেকেই ভীষণ পছন্দ করে। আমার মনে আছে, স্কুলে পড়াকালীন সে প্রতিদিন অন্তত একটা করে ১০০ রুপির পে-ফোন কার্ড কিনত। বাসার ফোন থেকে ইয়েহালির সঙ্গে কথা বলার সুযোগ ছিল না। এর কিছুদিন পর ওরা (ইয়েহালি) কলম্বোয় স্থানান্তর হয়। কিন্তু সাঙ্গা হাল ছাড়েনি। দেখা যেত, কিছু একটা পছন্দ হলে সে ওটা কিনে নিয়ে রওনা হতো কলম্বোর পথে।’

.

ক্রীড়াঙ্গনের বাইরেও সাঙ্গাকারার মতো কোনো তুকতাক ছাড়াই খ্যাতির শিখরে পৌঁছানো মানুষের সংখ্যা শ্রীলংকায় বিরল। সমালোচকদের কথার জবাবটা ব্যাটের পাশাপাশি কথায়ও দিয়েছেন সাঙ্গাকারা। প্রকাশ্যে সমালোচনা করেছেন ক্রিকেট বোর্ডের প্রশ্নবিদ্ধ নীতির। অনেকের মতে, শুধু সমালোচনার জবাব দেয়ার সময়ই সাঙ্গাকারা তার তৃণ থেকে বের করে থাকেন সবচেয়ে ক্ষুরধার অস্ত্রটা— ‘প্রখর যুক্তিবোধ’। এমন অনেক ইনিংসের শুরুতে নড়বড়ে ছিলেন সাঙ্গাকারা। কিন্তু মাইক্রোফোনের সামনে সাঙ্গাকারা সবসময়ই নদীর স্রোতের মতোই স্বচ্ছন্দ। সংবাদ সম্মেলনে একেকটি প্রশ্নের চারটি করে জবাব দিতে পারেন সাঙ্গা— মতামতটা বহুদিনের অভিজ্ঞ গণমাধ্যমকর্মীদের। কৌতুকবোধের ক্ষেত্রেও সাঙ্গার ‘সেন্স অব হিউমার’ অতুলনীয়। একটা উদাহারণ দেয়া যায়— ২০০৯ সালে পাকিস্তান সফরে প্রথম টেস্টে অভিষেক ঘটে থারাঙ্গা পারানাভিথানার। সেই টেস্টের প্রথম ইনিংসে প্রথম বলেই আউট হন পারানাভিথানা। পরের ইনিংসেও মাত্র ৯ রান করে রান আউট হন তিনি। দ্বিতীয় টেস্টের তৃতীয় দিনে মাঠে যাওয়ার পথে সন্ত্রাসীদের বোমা হামলার শিকার হয় শ্রীলংকান টিম বাস। বুকে স্প্লিন্টারবিদ্ধ হয়ে কাতরাচ্ছিলেন পারানাভিথানা। তাই দেখে কৌতুকের লোভ সামলাতে পারেননি সাঙ্গা— ও মাই গড! প্রথম ইনিংসে তুমি প্রথম বলেই আউট হলে। পরের ইনিংসে রান আউট। আর এখন তোমাকে গুলি হজম করতে হচ্ছে! প্রথম সফরেই কী ভয়ানক অবস্থা!’ (চলবে)

 

 

Category : অনুবাদ
Share this post