‘সাঙ্গা’ চরিত

মেহেদী হাসান রোমেল
সেপ্টেম্বর ২৮, ২০১৬
 কুমার সাঙ্গাকারা কুমার সাঙ্গাকারা

 

প্রিন্স ফিলিপ একবার ক্রিকেট প্রসঙ্গে বলেছিলেন, ‘একজন পাগলের হাতে ক্রিকেট ব্যাটের থেকে বিপজ্জনক আর কিছু হতে পারে না।’ ডিউক অব এডিনবার্গের এ উক্তিকে উল্টো করে বললে— ‘একজন সুস্থ মানুষের হাতে ক্রিকেট ব্যাটের থেকে সৌন্দর্যমণ্ডিত আর কিছু হতে পারে না।’ কুমার সাঙ্গাকারা এ কথাটার উদাহরণ। শুধু রান সংখ্যা নয়, চোখজুড়ানো ব্যাটিংয়ের জন্যও ক্রিকেটামোদীদের মনে সাঙ্গার আসন চিরকালীন। পাশাপাশি বাগ্মী হিসেবেও অদ্বিতীয়। ক্রিকেট ইতিহাসের অন্যতম সেরা এ বাঁ-হাতি ব্যাটসম্যান গত মাসে সব ধরনের ক্রিকেট থেকে অবসর নেন। সাঙ্গাকারার জীবন আর ক্রিকেট দর্শন যে পথে বেড়ে উঠেছে, তার সুলুক সন্ধানের প্রথম পর্ব...

 

১.

আশি থেকে নব্বইয়ের দশকের সেই সময়। ক্যান্ডিতে আইন পেশায় বেশ পসার জমিয়েছেন কেশামা সাঙ্গাকারা। বাড়িতে অস্টপ্রহর সাক্ষাত্প্রার্থীদের আনাগোনা। তাদের ধৈর্যের নীরব পরীক্ষা নিতেন কেশামা। দেখা যেত, ঔপনিবেশিক আমলে তৈরি, শতাব্দীপ্রাচীন বিশাল বাড়ির হলঘরে মৌন অপেক্ষাব্রত পালন করছেন সাক্ষাত্প্রার্থীরা; ওদিকে বাড়ির পেছন দিকের উঠোনে কেশামা মেতে আছেন ছেলের সঙ্গে! মাঝে মধ্যে কুমারীর ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে যেত। স্বামীকে তাড়া দিতেন ‘যাও উনাদের সঙ্গে দেখা করো? আর কতক্ষণ অপেক্ষা করবে...? কেশামা ভ্রুক্ষেপহীন— ‘তো? অপেক্ষা করতে দাও। আগে ছেলের সঙ্গে কাজ, তার পর সাক্ষাত্।’

টেনিস বলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ক্লান্তিহীন ব্যাটিং। ছুটির দিনে বিছানাটা ছাড়তে হবে খুব সকালে। তখন শ্যাডো প্র্যাকটিসের লগ্ন! বাবার বেঁধে দেয়া নিয়ম। সন্ধ্যায় ব্যাটিং ক্লাস চলত রোজ। সেখানে মনোযোগী ছাত্রের ভূমিকায় কুমার সাঙ্গাকারা, শিক্ষাগুরু স্বয়ং তার বাবা কেশামা।

ট্রিনিট্রি কলেজে প্রথম কয়েক বছর রিপোর্ট কার্ড দাপিয়ে বেড়াত একটা মাত্র শব্দ ‘অনুপস্থিত’! লেখাপড়ায় অমনোযোগী ? একেবারেই অবান্তর প্রশ্ন। পড়াশোনায় সাঙ্গাকারা আগাগোড়াই তার সিগনেচার শট ‘বেন্ট নি কাভার ড্রাইভে’র মতোই মসৃণ। যথা লিকুইড ব্যাটিং, তথা স্বচ্ছ মস্তিস্ক। তাহলে!

আশকারা দিতেন বাবা— ‘আজ স্কুলে যাওয়ার প্রয়োজন নেই। তুমি আমার সঙ্গে বাইরে যেতে পারো।’ সাঙ্গাকারা বেরিয়ে পড়তেন বাবার কনিষ্ঠা ধরে। লক্কড়-মার্কা পারিবারিক ভ্যানে চেপে কোনো দিন আমপারার পশ্চিমে কিংবা অনুরাধাপুরের উত্তরে রওনা হতেন বাপ-বেটা। এসব অঞ্চলে কেস থাকত কেশামার। দুর্গম পথঘাট। যুদ্ধোত্তর শ্রীলংকার এবড়ো-খেবড়ো কাঁচা রাস্তা। তার ওপর ভ্যানের অবস্থা যাচ্ছেতাই। যন্¿ণার পাশাপাশি একটা অজানা রোমাঞ্চ ঘিরে ধরত সাঙ্গাকারাকে। ‘আমাদের একজন ড্রাইভার ছিলেন। একবার ড্রাইভ করার সময় তার কব্জি ভেঙে যায়! খুব শক্ত ছিল আমাদের ভ্যানের গিয়ার ট্রান্সমিশন ব্যবস্থা’— সে সময়ের স্মৃতিচারণ করেন আজকের কুমার সাঙ্গাকারা।

শৈশবে আর ১০টা দস্যি ছেলের মতো সাঙ্গাকারাকেও খুব করে টেনেছে বাড়ির সদর দরজার চৌকাঠের ওপাশের পৃথিবী। কিবা বন্ধু কিবা প্রতিবেশী, সবার সঙ্গেই সাঙ্গাকারার খেলা চলত গোধূলি অব্দি। একবার তো মায়ের বারণ অমান্য করে বাসা থেকে বেরিয়ে পড়েছিলেন। পরবর্তীতে তার ঘরে ফেরার নেপথ্য নায়ক রাস্তার এক বেওয়ারিশ কুকুর। কামড়ে দিয়েছিল!

শৈশবের এই দস্যি সাঙ্গাকারাই কিন্তু আবার তার মনের অজান্তেই অসাম্প্রদায়িক। নিজ ঘরেই তার শুরু। ১৯৮৩ সালে ‘ব্ল্যাক জুলাই’ রায়টের সেই কালো ছয়দিন। এ সময় তামিলদের কচুকাটার মতো মেরেছে সিংহলিজরা। উত্তপ্ত রক্তগঙ্গাকে তোয়াক্কা না করে কিছু তামিল পরিবারকে আশ্রয় দেন কেশামা। সাঙ্গাকারার খুশি দেখে কে! মা-বাবার কাছে তার ছয় বছরের অবুঝ মনের আবদার, বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে এভাবে দিনযাপনের রীতিটা প্রত্যেক বছর পালন করলে কী মজাটাই না হতো!

সাঙ্গাকারার শৈশব থেকে যৌবনের ধাপে ধাপে শ্রীলংকার সংঘাতপূর্ণ কালো দিনগুলোর ছাপ। কিন্তু তটিনী যেমন পাথরকে পাশ কাটিয়ে গড়িয়ে চলে নিজ গন্তব্যে, ক্রিকেটে মজে সাঙ্গাকারাও তেমনি সংঘাত এড়িয়েছেন। কেশামার প্রত্যক্ষ মদদপ্রাপ্তির অন্তর্নিহিত দর্শনটা বড় হয়ে বুঝতে পেরেছেন সাঙ্গাকারা, ‘আমার বাবার যুক্তি ছিল খুব সহজ— খেলাধুলাই যদি করো, তবে সেটা সঠিকভাবে করাই শ্রেয়— কথাটা মেনে নিতে আমার কোনো আপত্তি ছিল না।’

কিন্তু আপত্তি উঠেছে। চলেছে যুক্তি আর পাল্টা যুক্তির লড়াই। ২ ঘণ্টার অনুশীলনে দেড় ঘণ্টাই এসব! বাকি আধঘণ্টায় দেড় ঘণ্টার অনুশীলন! এর পরও থামেনি বাপ-বেটার যুক্তি আর খণ্ডন। সাঙ্গাকারা সবসময় ফোকর খুঁজতেন। পূর্বপ্রজন্মের যুক্তি খণ্ডনেই তো উত্তর প্রজন্মের যত সুখ! অনাদিকাল ধরে এ তো প্রজন্মেরই ধারা। সাঙ্গাকারার মনে বাবাকে পরাজিত করার সুখটা সবসময়ই অনির্বচনীয়। তাকে ভুল প্রমাণ করা মানেই আরেকটু বেড়ে ওঠা। বড় রান করতে পারলে কেশামাকে তাই দাঁড়াতে হতো সাঙ্গাকারার কাঠগড়ায়, ‘আমি এভাবে রান করি। তোমার শেখানো ধারা থেকে যা একেবারেই আলাদা।’ ভুলটা ধরতে পেরেছেন বড় হওয়ার পর। এখন সাঙ্গাকারার উপলব্ধি, ‘যত বড় হয়েছি ততই ধারণাগুলো আমার কাছে স্বচ্ছ হয়ে উঠেছে। তখন বাবার কথার মূল্যটা বুঝতে পেরেছি।’

২.

টেস্ট ছাড়ার ভাবনাটা প্রথম সাঙ্গার মাথায় এসেছিল গত বছরের মাঝামাঝি নাগাদ। তার বন্ধু ও সতীর্থ মাহেলা জয়াবর্ধনেও তখন টেস্ট ছাড়ি ছাড়ি করছেন। সাঙ্গাকারাই প্রথম মাহেলাকে ফোন করে বলেছিলেন, ‘আমরা দুজন এভাবে একই সঙ্গে জাতীয় দল ছেড়ে দিতে পারি না। এতে যে দলের মেরুদণ্ড ভেঙে পড়বে, তা আগেই ঠাহর করতে পেরেছিলেন সাঙ্গাকারা। তাই ভাবনাটা তখন আপাতত শিকেয় তোলা থাকে। বোর্ড তার মুখ থেকে অবসরের কথা প্রথম জানতে পারে গত বছরের শেষ নাগাদ। লংকান অধিনায়ক অ্যাঞ্জেলো ম্যাথুস তাত্ক্ষণিকভাবে সাঙ্গাকে সিদ্ধান্তটা পুনর্বিবেচনার অনুরোধ জানান। এ পর্যন্ত দুবার সিদ্ধান্তটা পাল্টেছেন সাঙ্গা। পি সারা ওভালে শেষ টেস্ট খেলার আগে ক্রিকেট বিশ্লেষকরাও তার ফর্মের দিকে তাকিয়ে যুক্তি দেন, টেস্ট আঙিনায় আরো এক থেকে দুই বছর খেলার মতো সামর্থ্য রয়েছে সাঙ্গার।

কিন্তু অর্জুনা রানাতুঙ্গা, অরবিন্দ ডি সিলভা, সানাথ জয়াসুরিয়াদের বিদায়ের লগ্নটা নিজের চোখেই দেখেছেন সাঙ্গা। সেসব অভিজ্ঞতায় ঋদ্ধ সাঙ্গাকারার উপলব্ধি— ‘শ্রীলংকায় কারো বিদায় নেয়াটা সত্যিই অনেক কঠিন। আরো এক বছর খেললে দলের এমনকি লাভ হবে! কী এমন আহামরি অবদান রাখতে পারব? হ্যাঁ, জাতীয় দল চাইলে আমরা সিনিয়র খেলোয়াড়রা তরুণদের সাহায্য করতে সবসময় প্রস্তুত আছি। কিন্তু আমার বিদায়টা দেরি হওয়া মানে আরেকজনের ভবিষ্যত্ বিলম্বিত করা।’

ব্যাটিংয়ে যতটা স্বচ্ছ, ততই সরল সাঙ্গার যুক্তি। গলেতে যেবার সাইদ আজমলকে চূর্ণ করলেন কিংবা লর্ডসে জেমস অ্যান্ডারসনকে, তখনকার সাঙ্গাকে দেখে মনে হয়, পৃথিবীর প্রথম প্রভাত থেকেই সাঙ্গা তার ব্যাট হাতে নেমেছেন বোলারদের শাসন করতে। তার বেন্ট নি কাভার ড্রাইভ কিংবা ব্যাক ফুট পাঞ্চে ‘নির্মম’ শব্দটা অনুপস্থিত বলেই আমাদের চোখে তা নিখাদ ক্রিকেটীয় জ্যামিতিক সৌন্দর্য! শ্রীলংকার গলি-উপগলি, তস্য গলির পাঁচিলে ডি সিলভা, জয়াসুরিয়া কিংবা জয়াবর্ধনের নাম খুঁজে পাবেন। সহজাত প্রতিভাবলেই লংকানদের হূদয়ে ঠাঁই পেয়েছেন তারা। অথচ ক্যারিয়ারের শুরুতে স্পিনের বিপক্ষে সাঙ্গার পা চলত না। ডাউন দ্য উইকেটে এসে ঠকেছেন কতবার! সেই সাঙ্গা তার ক্যারিয়ারের শেষ পরিচ্ছেদে এসে পেলেন গার্ড অব অনার। সবচেয়ে পেশাদার ক্রিকেটার— এমন তকমাও উড়ে এসেছে। তার ব্যাটিংয়ের ‘ক্লাস’ নির্ণয়ে ক্রিকেটীয় বিশ্লেষণের ঝাঁপি খুলে বসেন পণ্ডিতরা। সাঙ্গাকারাকে লংকান ক্রিকেট খনি থেকে উঠে আসা ‘দরিয়া-ই-নুর’ ভাবলে ভুল করবেন! সে ‘কোহিনুর’, কিন্তু আমরা তা টের পেয়েছি ধীরে ধীরে, এ পথে নিজের ব্যাটিংকে দিনের পর দিন ঘষামাজা আর পরিশোধনের মাধ্যমে সাঙ্গাকারা নিজেকে কোথায় স্থাপন করেছেন, তা ঠাহর করা যায় পল ফারব্রেসের এ কথায়, ‘নিজের জীবনের জন্য ব্যাটিং করতে যদি কাউকে বেছে নিতে বলা হয়, তাহলে আমি বারবার সাঙ্গাকারাকেই বেছে নেব।’

কিপিং ছেড়ে পুরোদস্তুর ব্যাটসম্যান হয়ে ওঠার আগে এগেইনেস্ট দ্য স্পিনের বিপক্ষে সাঙ্গার পা চলত না। ভেরিয়েশনে বোকা বনেছেন বহুবার। স্কয়ার কাটে পারফেকশন ছিল না। এমন অনেক টেস্ট আছে, যেখানে সাঙ্গাকারা ব্যাটিংয়ে ছন্দ খুঁজে পাননি। তাকে ধাতস্থ করতে তখন বেশি পরিমাণ বল ফেস করতেন নন-স্ট্রাইকের ব্যাটসম্যানরা। কিন্তু শেষ পর্যন্ত এ ব্যাটসম্যানই যে ৫৭.৪০ ব্যাটিং গড় নিয়ে টেস্ট ক্যারিয়ার শেষ করবেন, তা হয়তো আগেই ঠাহর করতে পেরেছিলেন ডি সিলভা। কুঁড়ি থেকে কুসুম হয়ে ফোটার সে সময় সাঙ্গাকারাকে একদিন অনুশীলনে ডি সিলভা পরামর্শ দেন, ‘তুমি যদি স্ট্রেট ড্রাইভ করতে চাও তাহলে গ্রিপ পাল্টাতে হবে।’ অফসাইডে তখন শুধু থার্ডম্যান আর কাভার ড্রাইভের ওপর নির্ভর করতে হতো সাঙ্গাকে। কিন্তু গ্রিপ পাল্টানোর পর স্ট্রেট ড্রাইভও সংযুক্ত হয় তার শটের ঝুলিতে।

(চলবে...)

 

 

 

 

 

Category : অনুবাদ
Share this post