বাংলাদেশের টেস্ট যাত্রার বিষ্ময়কর ১৬ বছর: জ্যারর্ড কিম্বার

সঞ্জয় পার্থ
নভেম্বর ৬, ২০১৬
   ঐতিহাসিক জয়   ঐতিহাসিক জয়

গত ১০ বছরে বাংলাদেশের খেলা দেখার অনুভূতিকে যদি এক বাক্যে বলতে বলা হয়, কি বলবেন? উত্তরটা সোজা- আশা ও আশাভঙ্গের এক অদ্ভুত সংমিশ্রন। বাংলাদেশ আশা দেখাত, আবার সেই আশা ভাঙতেও বেশি সময় নিত না। হয়তো একটা সেশন ভাল খেলল বা একটা তরুণ ছেলে ভাল পারফর্ম করল, লোকে স্বপ্ন দেখতে শুরু করে দিত। কিন্তু পরের দিন, পরের ম্যাচ বা পরের সিরিজেই সেই  স্বপ্নের ডানা ধপাস করে মাটিতে আঁছড়ে পড়তো।

এমনকি তাদের সেরা খেলোয়াড়েরাও বহুবার স্বপ্নভঙ্গের যন্ত্রণায় পুড়িয়েছেন। তামিম ইকবাল লর্ডস রাঙিয়ে এসেছেন ৬ বছর হয়ে গেল, এখনো বেশির ভাগ সময়ই তাকে `মধ্যম শ্রেণির ব্যাটসম্যান' এই  তকমাই  গায়ে মাখতে হয়। সাকিব আল হাসান বিশ্বের সেরা অলরাউন্ডারদের একজন, কিন্তু ধারাবাহিকভাবে নিজের সেরা পারফরম আমরা করতে দেখেছি কি না, তা নিয়ে সন্দেহ আছে। হাঁটুর ইনজুরি মাশরাফির মত তুখোড় মস্তিষ্কের এক ক্রিকেটারকে বছরের পর বছর বাইরে বসিয়ে রেখেছে। আর তাদের প্রথম সুপারস্টার আশরাফুলের ফিক্সিং কেলেঙ্কারি তো আছেই।

টি টোয়েন্টি বিশ্বকাপে ভারতের বিপক্ষে ম্যাচটাই বোধহয় বাংলাদেশের অবস্থার সবেচেয়ে ভাল প্রতীকী চিহ্ন হতে পারে। টুর্নামেন্টটা বাংলাদেশ খেলতে এসেছিল ওয়ানডে বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালিস্ট হিসেবে, বিগত কিছুদিনে রঙিন পোশাকের উজ্জ্বল স্মৃতি নিয়ে, মুস্তাফিজুর রহমান নামের এক বিস্ময় বালককে সঙ্গে করে। কোন একটা আপসেট তারা ঘটাবে, এমনটাই ভেবেছিল সবাই। আপসেট তারা প্রায় ঘটিয়েই  ফেলেছিল। আপসেট শব্দটা নিয়ে কেউ কেউ আপত্তি তুলতে পারেন, কিন্তু ভারতের মাটিতে  ভারতকেই টি টোয়েন্টিতে হারানো যে কত কঠিন, এটা সবারই বোঝার কথা। পুরো ম্যাচটা দাপটের সাথে খেলার পরেও ম্যাচটা হেরেছিল তারা। মুশফিকুর রহিমের সেই আগাম উদযাপন, যা কিনা বাঁধিয়ে রাখার মত এক ছবি হওয়ার কথা ছিল, শেষ পর্যন্ত হয়ে গেল অপরিণত আচরণের প্রতিচ্ছবি!

এটাই প্রথমবার না যে বাংলাদেশ দলটার উপর সবাই আস্থা হারিয়ে ফেলছিল। বরং এই  ম্যাচ আরো একবার পুরোনো কথাটাই মনে করিয়ে দিয়েছিল, আর কবে পরিণত হবে এই  দল?

 বাংলাদেশকে বলা হয় ক্রিকেট ইতিহাসের অন্যতম ভাগ্যবান দল। কেউ কেউ বলতে পারেন সেই  পাকিস্তান আমল থেকেই তো ক্রিকেট খেলে আসছে দেশটি। কিন্তু শীর্ষ পর্যায়ে খেলতে আসার পর মাত্র একটি স্মরণীয় জয়ই তাদের টেস্ট স্ট্যাটাস এনে দিল। শ্রীলঙ্কা আর জিম্বাবুয়েও ভাগ্যের ছোঁয়া পেয়েছিল, তবে এতটা বোধহয় না।

কেনিয়া ১৯৯৬ বিশ্বকাপে ওয়েস্ট ইন্ডিজকে হারাল, ২০০৩ বিশ্বকাপে শ্রীলঙ্কা ও বাংলাদেশকে হারাল, নিউজিল্যান্ডের ওয়াকওভারের সুবিধা নিয়ে সেমিফাইনালেও খেলল। কিন্তু তারপরেও তাদের ভাগ্যে টেস্ট স্ট্যাটাস জোটেনি। আইরিশরা টানা তিনটি সফল বিশ্বকাপ কাটিয়েছে, বিশ্বকাপে পাকিস্তান আর ইংল্যান্ডের মত দলকে হারিয়েছে, তাও তারা টেস্ট স্ট্যাটাস পায়নি।

বাংলাদেশে তরুণদের প্রাধান্য দিতে বারবার তাদের সিনিয়র খেলোয়াড়দের ছেঁটে ফেলা হয়েছে। বাংলাদেশের ক্রিকেটে নেক্সট জেনারেশন বলতে আসলে কিছু ছিলই না। একটা আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন একাদশ গড়ে তুলতে তারা ব্যর্থ হয়েছে। আর তাদের সাবেক বোর্ড চেয়ারম্যান, যিনি কিনা তখন আইসিসিরও সভাপতি ছিলেন, সর্বসমক্ষে অভিযোগ করেন তার দলের বিরুদ্ধে অন্যায় করা হয়েছে!

সবকিছু মিলিয়েই অনেক ক্রিকেট ফ্যান সিদ্ধান্তে পৌছে গিয়েছিলেন, এই  দলটাকে দিয়ে কিচ্ছু হবে না। মনে হচ্ছিলো, এই এতোকাল ধরে দুর্বল পারফরম্যান্স করা দলটা দিয়ে আর কখনোই হবে না।

তবে বাস্তবতা হল, বাংলাদেশের আসলে তখন ভাল দল হয়ে ওঠার কথাই ছিল না। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ধারাবাহিক  হওয়ার প্রধান পূর্বশর্ত হল নিয়মিত আন্তর্জাতিক ক্রিকেট খেলা। খেলতে খেলতেই  পরিণত  হয়ে উঠেছে, এমন বহু নজির ক্রিকেটে আছে।

 নিউজিল্যান্ড তাদের ১ম টেস্ট জিতেছিল নিজেদের ১৬ তম সিরিজে, যে সিরিজে ইতোমধ্যে ক্যারিবীয়রা ৩-০ তে এগিয়ে ছিল। প্রথম টেস্ট সিরিজ জিততে ব্ল্যাককাপদের লেগেছিল ৩৯ বছর, ১৯৬৯ এ  পাকিস্তানের বিপক্ষে ১-০ তে জিতেছিল তারা। প্রথম সিরিজ জেতার আগে ৯২ টেস্টে তাদের জয়ের সংখ্যা ছিল মাত্র ৬ টি। এমনকি ২য় সিরিজটি জয়ের জন্যও তাদের আরো ১০ বছর অপেক্ষা করতে হয়েছিল! তবে নিউজিল্যান্ডের বদলে যাওয়ার শুরু কিন্তু এসব জয় দিয়ে নয়, বদলে যাওয়ার শুরু এক ড্র সিরিজ দিয়ে। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে যখন তারা ৩ টেস্টের সিরিজ ০-০ তে ড্র করতে সক্ষম হল, তখনই তাদের বদলে যাওয়ার ক্ষণগণনা শুরু হয়েছিল। তারা টেস্ট জেতেনি, কিন্তু সম্মান জিতেছিল। আর এরপর ক্রমাগত উন্নতিও করে গেছে।

শুধু নিউজিল্যান্ড না, প্রথম টেস্ট জিততে দক্ষিণ আফ্রিকাকে অপেক্ষা করতে হয়েছে ১৫ বছর। ভারতের প্রথম দুটি সিরিজ জয় ছিল পাকিস্তান ও নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে, যারা তখনো পর্যন্ত সিরিজ জয়ের স্বাদ পায়নি। ইংল্যান্ডকে টেস্টে প্রথম হারাতে ভারতকে খেলতে হয়েছে ১৫ টি টেস্ট, সময়ের হিসেবে ১৯ বছর। আর ইংল্যান্ডের বিপক্ষে সিরিজ জিততে অপেক্ষা করতে হয়েছে আরো ১০ বছর। 

নতুন দলগুলো খুব বেশি টেস্ট খেলার সুযোগ পায় না, বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও সেটাই  হয়েছে। বাংলাদেশ অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে টেস্ট খেলেনা ১০ বছর হয়ে গেছে, ইংল্যান্ডের বিপক্ষে খেলল ৬ বছর পরে। ১৬ বছরের টেস্ট ক্যারিয়ারে বাংলাদেশ ইংল্যান্ডের সাথে টেস্ট খেলতে পেরেছে মাত্র ১০ টি, তাদের বিপক্ষে প্রথম টেস্ট জয়টাও এল দশম টেস্টে। ভারতের কিন্তু লেগেছিল ১৫ টেস্ট!

এমনটাও কিন্তু না যে বাংলাদেশ তার প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটের উপর খুব বেশি ভরসা করতে পারত। টেস্ট খেলুড়ে দেশ হওয়ার আগে পর্যন্ত তাদের কোন প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটই  ছিল না! জাতীয় ক্রিকেট লিগ শুরু হয়েছে টেস্ট মর্যাদা পাওয়ার মাত্র ১ বছর আগে। ধারাবাহিক এবং উন্নত মানের টেস্ট দল হতে গেলে মানসম্মত প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটের কোন বিকল্প নেই। বাংলাদেশ যখন টেস্ট খেলা শেখা শুরু করেছে, সেই একই সময়ে তারা তাদের প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটের কাঠামো গঠনও শুরু করেছে! অথচ একটি শক্ত প্রথম শ্রেণির কাঠামোর উপর ভিত্তি করেই একটি টেস্ট দলের জন্ম হওয়ার কথা।

পাকিস্তানের ফজল মাহমুদের মানের একজন বোলার খুঁজে পেতে নিউজিল্যান্ডকে ৪০ বছর অপেক্ষা করতে হয়েছে। বাংলাদেশ সেদিক দিয়ে ভাগ্যবান, একজন মুস্তাফিজুর রহমানকে খুঁজে পেতে তাদের অতদিন অপেক্ষা করতে হয়নি। একজন টপ কোয়ালিটি বোলার খুঁজে পেতে একজন দক্ষ অধিনায়ক, নির্বাচক, কোচ, পিচ, প্রতিযোগিতামূলক ক্রিকেট কাঠামো সবই প্রয়োজন। কলমের খোঁচায় একটা একাদশ হয়তো দাঁড় করানো যায়, কিন্তু তা দিয়ে প্রতিযোগিতা করা যায় না। ২০১০ সালে ইংল্যান্ড যখন বাংলাদেশ সফরে এল তখন একটা গল্প বেশ প্রচলিত হয়েছিল। তখন গোটা বাংলাদেশেই বোলিং মেশিন ছিল মাত্র ৩টা। অন্যদিকে  ইংল্যান্ডের এক স্কুলেই  নাকি এর চেয়ে বেশি বোলিং মেশিন ছিল!

কথাটা শুধু বলার জন্যই  বলা না। বাংলাদেশ শুধুই ইংল্যান্ডের ১১ জন ক্রিকেটারের বিপক্ষে খেলেনি, তারা ক্রিকেট বিশ্বের অন্যতম সংগঠিত ক্রিকেট বোর্ড ও তাদের সেরা একাদশটির বিপক্ষে খেলেছে। তারা এমন একটা দলের বিপক্ষে জিতেছে যাদের প্রায় ২০০ বছরের প্রথম শ্রেণির ক্রিকেট খেলার ইতিহাস রয়েছে, যাদের প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটের মানদন্ডকে গোটা বিশ্ব আদর্শ বলে মানে। তারা বিশ্বের ২য় সর্বাধিক ধনী ক্রিকেট বোর্ডটির সাথে লড়াই করে জিতেছে। তারা শুধু ১১ জন ক্রিকেটারের বিপক্ষেই খেলেনি, একটা ক্রিকেট সংস্কৃতির বিপক্ষে খেলেছে।

এই  জয়ের আগে বাংলাদেশের টেস্ট অর্জন বলতে ছিল কেবল জিম্বাবুয়ে আর ভগ্নদশার ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে জয়। রঙিন পোশাকে তাদের কীর্তি অবশ্য আরেকটু বেশি রঙিন। টানা ৬টি ওয়ানডে সিরিজ জিতেছে, বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনাল খেলেছে, এশিয়া কাপের ফাইনাল খেলেছে, চ্যাম্পিয়নস ট্রফিতে জায়গা করে নিয়েছে। সাদা চোখে এগুলোকে খুব বড় অর্জন বলে মনে হবে না। কিন্তু বাংলাদেশ কোন অবস্থা থেকে শুরু করেছিল, আর ক্রিকেটে উন্নতি করা কতটা কঠিন, এই  দুটো জিনিস মাথায় রাখলে ১৬ বছরে বাংলাদেশের অর্জনকে অবিস্মরণীয়ই বলতে হবে। তাদের কোন কাঠামো ছিল না। কাগজে কলমে একটা দল বানিয়ে খেলোয়াড়দের আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের কঠিন মঞ্চে ছেড়ে দেয়া হয়েছিল। তাদের যথেষ্ট পরিমাণ অর্থনৈতিক শক্তি ছিল না, ক্রিকেটে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের মধ্যে দিয়ে যেতে হয়েছে। তারপরও তাদের ক্রিকেট দমে যায়নি।

ইংল্যান্ডের বিপক্ষে বাংলাদেশের এই  জয়টাকে  শুধুই একটা জয় হিসেবে দেখলে ভুল করা হবে। বাংলাদেশ যেনতেন কোন দলের বিপক্ষে জেতেনি, তারা ক্রিকেট সংস্কৃতির দিক থেকে তাৎপর্যপূর্ণ একটা দলের বিপক্ষে জিতেছে। দশমবারের চেষ্টায় তারা নিজেদের ক্রিকেট ইতিহাসের অন্যতম স্মরণীয় ঘটনাটির জন্ম দিয়েছে। কাছাকাছি শক্তিসম্পন্ন দুটি দলের সিরিজ হলে এই সিরিজটিকে কেবল দারুণ প্রতিযোগিতাপূর্ণ এক সিরিজ বলেই  চালিয়ে দেয়া যেত। কিন্তু দুই দলের শক্তি, ক্রিকেট অবকাঠামো আর সংস্কৃতির কথা মাথায় রাখলে এই সিরিজটাকে ঐতিহাসিক বলেই  স্বীকৃতি দিতে হবে। হয়তো আজ থেকে বহু বছর পরে এই দিনটাকেই  বাংলাদেশের বড় দল হয়ে ওঠার দিন বলে স্বীকৃতি দেয়া হবে!

তাদের সমর্থকের এরপরও আশা ও যন্ত্রণামুক্ত হবে না; কারণ অনেক অনেক সাফল্য পাওয়ার মধ্যে যদি কখনো ব্যর্থতা আসে, সেটাও আরও যন্ত্রণার। তবে তাদের সত্যিকারের উন্নয়ন আসবে তখনই, যখন প্রতিপক্ষ আশা নিয়ে থাকবে যে, এবার অন্তত বাংলাদেশ ব্যর্থ হবে এবং বাংলাদেশ ঠিকই সেই আশা করা লোকেদের দলকে হারিয়ে চলবে। যখন বাংলাদেশকে বাকীরা সত্যিই অপছন্দ করতে শুরু করবে, এড়িয়ে যেতে চাইবে এবং সহানুভূতি দেখাবে না, তখনই বোঝা যাবে, অবশেষে বাংলাদেশের দিনটা এসেছে।

এটা হতে অনেক সময় লাগবে। তবে ক্রিকেট এমনই-একটু সময় লাগেই।

জ্যারর্ড কিম্বার: ইএসপিএনক্রিকইনফোর লেখক এবং বিখ্যাত ক্রিকেট সাংবাদিক

কিম্বারের এই লেখাটি প্রথম প্রকাশিত: www.espncricinfo.com

Category : অনুবাদ
Share this post