আমাদের পঞ্চপাণ্ডব

অর্ক সাহা
জুন ১২, ২০১৭
 বর্তমানে পাঁচজন ক্রিকেটার বাংলাদেশ দলের মেরুদণ্ড হিসেবে কাজ করছেন। 

 বর্তমানে পাঁচজন ক্রিকেটার বাংলাদেশ দলের মেরুদণ্ড হিসেবে কাজ করছেন।

বর্তমানে পাঁচজন ক্রিকেটার বাংলাদেশ দলের মেরুদণ্ড হিসেবে কাজ করছেন। সাকিব আল হাসান, তামিম ইকবাল, মাশরাফি বিন মর্তুজা, মুশফিকুর রহিম এবং মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ প্রত্যেকেই দলে ভিন্ন ভিন্ন ভূমিকা পালন করে থাকেন। নেতৃত্বগুণের পাশাপাশি তাঁরা ব্যাটিং ও বোলিংকে এক সুতোয় বাঁধেন। তাছাড়া উত্তরোত্তর বর্ধনশীল প্রত্যাশার চাপ, তরুণ খেলোয়াড়দের কাঁধে হাত রেখে উৎসাহ যোগানো, জার্সির কালার স্কিম ঠিক করা থেকে শুরু করে টিম ডিনার কোথায় হবে সেটাও ঠিক করেন তাঁরাই!

দলে যদিও তাঁদের দায়িত্বের বিশেষ অন্ত নেই, তবে দিনশেষে তাঁরাও নিজেদের পারফরম্যান্সের জোরেই দলে টিকে আছেন। চ্যাম্পিয়নস ট্রফির প্রথম দুই ম্যাচে যদিও তামিম – মুশফিক এগিয়ে এসেছিলেন, তবে কার্ডিফে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে মাহমুদউল্লাহ, মাশরাফি এবং সাকিবের উপর চাপটা ছিলো আরো অনেক বেশি। 

তবে সেই চাপ দূরে ঠেলে তাঁরা পারফর্ম করেছেন ঠিকই। মাহমুদউল্লাহ-সাকিবের অতিমানবীয় ২২৪ রানের পার্টনারশিপের আগে দুর্দান্তভাবে দলকে নেতৃত্ব দিয়েছেন মাশরাফি, এরপর মাহমুদউল্লাহ এবং সাকিব দুজনই অসাধারণ দুটো হান্ড্রেড করে দলকে এনে দিয়েছেন অবিস্মরণীয় এক জয়।

বেশ কিছু ইনজুরিতে ভোগার ফলে মাশরাফি ঠিক নিজের পুরোনো রূপে নেই। তিনি এখন দলের অধিনায়ক, এবং এখনও নিয়মিতভাবেই সমালোচকদের জবাব দিচ্ছেন মাঠেই। কার্ডিফে দারুণ গুরুত্বপূর্ণ একটা স্পেল করেছেন তিনি, বুঝিয়ে দিয়েছেন কেন তিনি ২০১৫ বিশ্বকাপের পর থেকে বাংলাদেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ উইকেটসংগ্রাহক। বস্তুত, বর্তমানে খেলা বোলারদের মধ্যে লাসিথ মালিঙ্গার পর সর্বোচ্চ উইকেটসংগ্রাহীর তালিকায় তিনি আছেন দ্বিতীয় অবস্থানে!

অন্যদিকে, মাহমুদউল্লাহ্‌ও নিজের প্রাপ্য স্বীকৃতিটা কখনও পান না। দলে তাঁর জায়গাটা নিয়ে সবসময়ই প্রশ্ন ওঠে ; তিনি ভালো করলে জনগণের দাবি তাঁকে উপরে খেলানোর, আর খারাপ খেললেই দাবি ওঠে দুম করে বাদ দিয়ে দেওয়ার। 

মাশরাফি এবং মাহমুদউল্লাহ দুজনই এমন প্রশ্নের মুখোমুখি হতে শিখে গেছেন, কিন্তু সাকিব তো জাতীয় দলে নিশ্চিত খেলোয়াড়দের একজন। তিনি বাংলাদেশের সেরা ক্রিকেটার, বিশ্বের সেরা অলরাউন্ডার এবং ওয়ানডেতে সবচেয়ে অভিজ্ঞতাসম্পন্ন ব্যাটসম্যানদের একজন। বস্তুত, পাঁচ নম্বরে ব্যাটিং করা ব্যাটসম্যানদের মধ্যে এখন পর্যন্ত ওই পজিশনে ১০০ বা তার চেয়ে বেশি ম্যাচ খেলেছেন, এমন সংখ্যাটা ওয়ানডে ইতিহাসেই সাকিবসহ মাত্র পাঁচজন! 

সাকিব খুব একটা অফ ফর্মে যান না, তবে কোনোভাবে চলে গেলেও সেটা নিয়ে চিন্তা করা সর্বশেষ ব্যক্তি সম্ভবত তিনি নিজেই। নিউ জিল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচের আগে শেষ ওডিআই সেঞ্চুরিটা তিনি করেছেন ২০১৪ সালে, সর্বশেষ ম্যান অফ দ্য ম্যাচও হয়েছেন গত বছর সেপ্টেম্বরে। কিন্তু তিনি নিজের খেলাটা এতটাই ভালোভাবে জানেন যে, আগে থেকেই বুঝতে পারছিলেন একটা বড় ইনিংস আসন্ন। অধিকাংশ কোচ এবং অধিনায়ক তাই তাঁকে আড়াল করতে কখনও ভুল করেন না।

টি-টোয়েন্টি লিগগুলোতে লোয়ার অর্ডার ব্যাটসম্যান হিসেবে খেলার কারণে যদিও সাকিবের ব্যাটিং কিছুটা ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে, তবে ওভারঅল অ্যাপ্রোচটা কিছুটা নড়বড়ে করে দিলেও একই সাথে সম্ভবত সেটা তাঁর রেঞ্জও বাড়িয়েছে বেশ কিছুটা। মাঝে মাঝে নিজের হাই-প্রোফাইল ইমেজটা তুলে ধরার প্রবণতা দেখা গেছে তাঁর মাঝে। প্রতিপক্ষ যখন ম্যাচে জাঁকিয়ে বসেছে, সেই মুহুর্তে প্রতিপক্ষের উপর চড়াও হয়ে খেলাটা ঝুঁকিপূর্ণ, সাকিব এদিক থেকে মিশ্র ফলাফল পেয়েছেন।

নিউ জিল্যান্ডের বিপক্ষে চড়াও হয়ে খেলার আগে বল যখন সাপের মত সুইং করছিলো, সেই কঠিন সময়টা অনায়াসেই পার করে ফেলেছিলেন। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, কেন উইলিয়ামসনের হাতে স্লগ ওভারে সেরকম ফায়ার পাওয়ার থাকবে না, আর সেটারই পূর্ণ সদ্ব্যবহার করেছেন তিনি। বল হাতেও রেখেছেন দারুণ অবদান ; কোনোভাবেই ব্যাটসম্যানকে ভড়কে দেওয়ার চেষ্টা করেননি, বরং তাঁর লেংথ দিয়েই পরীক্ষা নিয়েছেন ব্যাটসম্যানদের এবং ৫২ রান দিয়ে উইকেটশূন্য থেকেই শেষ করেন ১০ ওভারের কোটা।

দশ বছর ধরে শীর্ষ পর্যায়ে ক্রিকেট খেলার পরও সাকিব বাংলাদেশের ব্যক্তিত্বের অন্যতম প্রধান একটা দিক থেকে নিজেকে বিরত রেখেছেন, আস্ফালন। তিনি সে দায়িত্বটা দিয়েছেন নিজের ব্যাট-বলকেই। তাঁকে সবাই শুধু শুধু কি আর ‘মিস্টার কুল’ বলেন?

সাকিব সচরাচর কোনোরকম ইস্যুতে কোনোরকম কথাবার্তা বা আলোচনায় জড়াতে চান না। বাংলাদেশের অন্য খেলোয়াড়দের থেকে অনেকটা উচ্চতায় থাকার পরও সাক্ষাতকারগুলোতেও নিজেকে নিয়ে মোটেই দম্ভ দেখান না। ভারত বা অয়াকিস্তানের আরো অনেক খেলোয়াড়দের মত তিনিও অনেক কিছুর সাথে ব্যবসায়িকভাবে জড়িয়ে থাকলেও সেগুলো বাইরে খুব একটা ছড়ায় না।

তাঁর সম্পর্কে বেশ কিছু বিতর্কও সৃষ্টি হয়েছে - যেমন ক্যামেরার দিকে অশালীন অঙ্গভঙ্গির কারণে তিন ম্যাচের নিষেধাজ্ঞা, তাঁর স্ত্রীর নামে অশালীন মন্তব্য করাতে মেজাজ হারিয়ে একজন দর্শককে প্রহার, কিংবা ২০১৪ সালের জুলাই মাসে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট ছেড়ে দেওয়ার হুমকি। শেষ দুটো ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে তিনি ছয় মাসের নিষেধাজ্ঞা পান, যা পরে বিসিবি কর্তৃক কমিয়ে আনা হয়। আর এরপর থেকে যেন আরো খোলসে ঢুকে গেছেন সাকিব, এখন আর আগের মতো মিডিয়াতে মন খুলে কথা বলেন না কিংবা কারো সম্পর্কে বিরূপ মন্তব্যও করেন না। সম্ভবত একবার বলেছিলেন, বাংলাদেশি খাবার হয়তো বিগ হিটার তৈরি করার জন্য যথেষ্ট নয়, হয়তো কিছুটা অরেঞ্জ জুসও প্রয়োজন। এই শেষ, আর কিচ্ছু নয়!

মাহমুদউল্লাহ তো সেটুকুও বলেন না, যদি না নিশ্চিত করা হয় সেটা ড্রেসিংরুমের মধ্যেই থাকবে! ২০১২ সালে দলের সেরা ‘প্র্যাংকস্টার’ এবং দলের সেরা ‘গ্যাংনাম-স্টাইল ডান্সার’ হিসেবে তাঁর বেশ পরিচিতি আছে। তাঁর দারুণ সেন্স অফ হিউমার রয়েছে, যেটা পারতপক্ষে আমাদের সামনে আসে না। মাঝেমধ্যে অবশ্য কিছুটা আত্মসংশয়ে ভোগেন, যেটার কিয়দংশ আমরা দেখতে পেয়েছি ১৮ মাস ব্যাপি রানখরায় ভোগার সেই খারাপ সময়টুকুতে।

এরপর ২০১৫ বিশ্বকাপে ব্যাক-টু-ব্যাক সেঞ্চুরি হাঁকিয়েছেন, তবু টপ অর্ডারে নিজের জায়গা ধরে রাখতে পারেননি। সেটার জায়গায় তাঁকে বলা হলো সীমিত ওভারের ক্রিকেটে, বিশেষ করে টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে ফিনিশার হয়ে উঠতে! তিনি সেই ভূমিকাতেও বেশ মানিয়ে নিয়েছিলেন গত ১২ মাসে, তবে এরপর গত ডিসেম্বর থেকে আবার যেন কিছুটা রানমন্দা তাঁর ব্যাটে।

পরিস্থিতি আরো খারাপ হলো, যখন বাংলাদেশের শততম টেস্টে বাদ পড়লেন মাহমুদউল্লাহ। এমনকি টিম ম্যানেজমেন্ট তাঁকে ওখানে অহেতুক বসিয়ে না রেখে দেশে ফেরত পাঠানোর কথাও ভেবেছিলো! তবে পরে বিসিবি প্রেসিডেন্ট নাজমুল হাসান পাপনের হস্তক্ষেপে তাঁকে স্কোয়াডে রাখা হয়। এরপর ওডিআই স্কোয়াডেও টিকে যান কোনোমতে, যদিও বেশ কিছু রিপোর্টে এসেছিলো তাঁর বাদ পড়ার সম্ভাবনার কথা।

গত মাসে ডাবলিনে অনুষ্ঠিত নিউ জিল্যান্ডের বিপক্ষে একটি ম্যাচ উইনিং ৪৬ রানের ইনিংসে কিছুটা আত্মবিশ্বাস ফিরে পান মাহমুদউল্লাহ, তবে তাঁর সামর্থ্য নিয়ে প্রশ্ন তখনও বিদ্যমান। চ্যাম্পিয়নস ট্রফির প্রথম ম্যাচে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ছয় রান করতে মাত্র ছয়টি বল লাগে তাঁর, যদিও পরের ম্যাচে আট রানেই অ্যাডাম জাম্পার বলে বাজে শট খেলে প্যাভিলিয়নে ফিরে যান তিনি। এরপর নিউ জিল্যান্ডের বিপক্ষে মহাকাব্যিক এক সেঞ্চুরি করলেন, নিজেও বুঝি হাঁফ ছেড়ে বাঁচলেন! তবে মাহমুদউল্লাহ তাতেই আত্মতুষ্টিতে ভোগার মানুষ নন।

মাশরাফিও নিশ্চয়ই আয়েশে বসে থাকবেন না, তিনি নিজেও গত বছর ডিসেম্বর থেকে কিছুটা কঠিন সময় পার করছেন, যার চূড়ান্ত পরিণতি পায় আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টি ক্রিকেট থেকে অবসরের মাধ্যমে। বলা হয়ে থাকে, টি-টোয়েন্টি ফরম্যাট থেকে বিসিবি তাঁকে সরে যেতে বলাতে বিসিবির মুখে চপেটাঘাত হিসেবেই শ্রীলংকার বিপক্ষে প্রথম টি-টোয়েন্টিতে টসে নেমে এই সিদ্ধান্ত জানান মাশরাফি।

তবে নতুন বল হোক কিংবা পুরোনো, এখনও মাশরাফি বাংলাদেশের সেরা বোলার। বড় ম্যাচগুলোতে এখনও তিনি সুইং এবং সিম মুভমেন্ট আদায় করতে পারেন, যেটা খেয়াল না করে মারতে গেলে ব্যাটসম্যানদের যথেষ্ট বিপাকে পড়তে হয়। তাঁর স্বল্পগতিও ব্যাটসম্যানকে স্তম্ভিত করে দিতে সক্ষম।

বাংলাদেশ দলে তাঁর অনুপ্রেরণাদায়ী অন-ফিল্ড এবং অফ-ফিল্ড উপস্থিতিও উপেক্ষণীয় নয়। মাশরাফিকে সামনে থেকে প্লেয়ার ম্যানেজমেন্টের ব্যাপারটা সামলাতে হয়, তবে অনিশ্চয়তায় ভরা এক পরিবেশের মধ্যে থেকে ভারসাম্য আনাটাও খুব সহজ ব্যাপার নয়! এছাড়া সিনিয়র খেলোয়াড়েরা ফর্মহীনতায় ভুগতে থাকলে তরুণ খেলোয়াড়দের থেকে সেরাটা বের করে আনতে হয় তাঁকে।

তামিম বেশ সবিস্তারেই বলেছিলেন মাশরাফি ২০১৫ বিশ্বকাপে কিভাবে তাঁর প্রতি বিশেষ যত্ন নিয়েছিলেন। সাকিব, মাহমুদউল্লাহ বা মুশফিকের জন্য অবশ্য অন্যভাবে এগোতে পারেন, কেননা তিনি জানেন কার সাথে কীভাবে কি করলে তাঁরা উদ্বুদ্ধ হতে পারেন। নিষ্ঠুর বাস্তবতাকে খুব সহজে মেনে নিতে পারার অদ্ভুত এক গুণ আছে তাঁর, প্রতিকূল পরিবেশেও অনায়াসেই খাপ খাইয়ে নিতে পারেন, সেটা মাঠে হোক, ড্রেসিংরুমে মিটিং চলাকালীন কিংবা টিম হোটেলে।

মাশরাফি এবং অন্য চারজন সিনিয়র ক্রিকেটাররা বাংলাদেশের জন্য দারুণ যত্ন এবং দায়িত্বের সঙ্গে খেলে চলেছেন, তরুণ এবং উঠতি খেলোয়াড়দের সামনে স্থাপন করছেন অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত। বাংলাদেশের দ্রুত এই উত্তরোত্তর উন্নতিযাত্রায় মূল স্তম্ভ তাঁরাই, আর তাঁদের এখনও অনেকটা রাস্তা পেরোনো বাকি!

- ইএসপিএন ক্রিকইনফোতে Into the heart of Bangladesh's rise শিরোনামে মূল লেখাটি লিখেছেন ক্রিকেট বিষয়ক গণমাধ্যমটির বাংলাদেশ প্রতিনিধি মোহাম্মদ ইশাম

Category : অনুবাদ
Share on your Facebook
Share this post