সামনে তাকানোর সময়, সামনে এগোনোর সময়

নেয়ামত আল হাসান
জুন ১২, ২০১৭
 ‘এখান থেকে আমরা এখন সামনেই তাকাতে পারি কেবল!’ ‘এখান থেকে আমরা এখন সামনেই তাকাতে পারি কেবল!’

২০০৮ সালে বাংলাদেশ যখন নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে কোনো প্রতিযোগিতামূলক ম্যাচে তাদের প্রথম জয় তুলে নিয়েছিলো, তখন তা কেবলই একটা অঘটন বলে ধরে নিয়েছিলো ক্রিকেট বিশ্ব। সে ম্যাচের তিন বছর আগে বাংলাদেশ অজেয় অস্ট্রেলিয়া জয় করেছিল। ওই সময়ে পাকিস্তান, ভারত, শ্রীলঙ্কা, দক্ষিণ আফ্রিকার মতো পরাশক্তিকে হারিয়েছিলো বটে, তবে সেটা ছিল ঈদের চাঁদ দেখার দুর্লভ ঘটনা।

সে ম্যাচে বর্তমান অধিনায়ক মাশরাফি বিন মুর্তজা চার উইকেট নিয়েছিলেন, কিন্তু কিউইদের রানের চাকায় লাগাম পড়ানোর দায়িত্ব বর্তেছিলো স্পিনারদের ওপরই। সে ম্যাচে স্পিনারদের ঝুলিতে যাওয়া ৩২ টা ওভার তারই সাক্ষ্য দেয়। উপমহাদেশের মাটিতে বহিরাগতদের ঘায়েল করার সহজতম রেসিপি হচ্ছে স্পিনিং উইকেট বানিয়ে একগাদা স্পিনার লেলিয়ে দেয়া।

সেটা মেনেই মিরপুরে সেদিন রচিত হয়েছিলো কিউই বধ কাব্য। কে জানে, জুনায়েদ সিদ্দিক আর আশরাফুলের জুটি যদি আর কিছুক্ষণ ক্রিজে থাকতো পরের ম্যাচে, তাহলে র‍্যাংকিংয়ের ওপরের সারির দলের বিপক্ষে সিরিজ জয় ২০০৮ এই হয়ে যেতো কিনা!

ব্ল্যাকক্যাপরা তাঁদের পরের দুটো বাংলাদেশ সফর থেকে যখন ৪-০ আর ৩-০ তে ধবলধোলাই হয়ে তাসমানিয়ার পাড়ে ফেরে ক্রিকেটবিশ্ব ধীরে ধীরে বিশ্বাস করতে শুরু করে যে বাংলাদেশ উন্নতি করতে শুরু করেছে। তবে তা কেবল ঘরের মাঠে, চেনা কন্ডিশন আর পরিচিত দর্শকদের সামনেই সীমাবদ্ধ। এছাড়া নিউজিল্যান্ডের ক্ষয়িষ্ণু শক্তিও এর নেপথ্য কারণ হিসেবে অনেকে অজুহাত দাঁড় করান।

কিন্তু, গত নয় জুন, কার্ডিফে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে বাংলাদেশের জয়ের পর এমন কোনো কারণই ছিলোনা যা বাংলাদেশের কৃতিত্বকে ম্লান করতে পারে। সেদিনের পারফর্মেন্স ছিলো তাদের পালাবদলের প্রমাণ।

পূর্ণশক্তির নিউজিল্যান্ড দল (ডাবলিনের জয়ে যেটা ছিলোনা), টসে হার, বৈরী কন্ডিশন এসবকিছুকে জয় করতে হয়েছে সাহসী দল নির্বাচন আর ভয়ডরহীন অথচ সুচিন্তিত ক্রিকেট দিয়ে। বাঁচা-মরার লড়াইয়ের ম্যাচে ৩৩ রানে ৪ উইকেট হারিয়ে খাদের কিনারা থেকে ঘুরে দাঁড়িয়ে পরীক্ষায় উতরাতে হয়েছে, যেখানে এহেন পরিস্থিতিতে আগের বাংলাদেশের সবচেয়ে পরিচিত দৃশ্য ছিলো অসহায় আত্মসমর্পন অতঃপর তল্পিতল্পা গুটিয়ে বাড়ির পথ ধরা।

প্রস্তুতিম্যাচের ভরাডুবির পরে ইংল্যান্ড ম্যাচে অতি সাবধানী হয়ে আট ব্যাটসম্যান নিয়ে মাঠে নামে বাংলাদেশ, একজন বোলারের অভাব পরে হাড়ে হাড়ে টের পান বাংলাদেশের অধিনায়ক। এ থেকে শিক্ষা নিয়েই কিনা অতি সাবধানতার সব বালাই লন্ডনে ছেড়েছুড়ে এসে কার্ডিফে ভয়ডরহীন ক্রিকেট খেলার চোয়ালবদ্ধ প্রতিজ্ঞা নিয়ে মাঠে নামে তাঁর দল।

তাসকিনের অন্তর্ভুক্তির ফলে চার পেসার নিয়ে খেলতে নামে বাংলাদেশ। নিউজিল্যান্ডের ব্যাটসম্যানদের ব্যর্থতার প্রধান কারণ হিসেবেও সেটাই সামনে চলে আসে। বোলাররা অধিনায়কের কাছ থেকে যোগ্য সমর্থন পেয়েছিলেন, যিনি রস টেলরের বিপক্ষে দুই স্লিপ আর এক লেগ গালি রাখতে ভয় পাননি।

ফিল্ডাররাও এদিন যোগ্য সহায়তা দিয়ে গেছেন বোলারদের। এতো কিছুর পরও যখন নিউজিল্যান্ড শেষ পাওয়ার-প্লেতে ঝড় তোলার প্রস্তুতি সম্পন্ন করে রেখেছিলো তখন পেসারদের পুরনো বলের যথাযোগ্য ব্যবহার আর পার্টটাইমার মোসাদ্দেককে ক্যাপ্টেন মাশরাফির বুদ্ধিদীপ্ত ব্যবহার ব্ল্যাক ক্যাপদেরকে ২৫ কিংবা আর বেশি রান থেকে বঞ্চিত রাখে।

২৬৫ রানের মাঝারি লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে শুরুতেই যখন বোল্ট-সাউদির পেস আর সুইঙের মিশেলে গড়া টুর্নামেন্টসেরা ওপেনিং স্পেলে টালমাটাল হয়ে যায় বাংলাদেশ টপঅর্ডার, ততক্ষণ পর্যন্ত মনে হচ্ছিলো এই বুঝি পুরনো ভাগ্য বরণ করতে হচ্ছে বাংলাদেশকে! সে আশংকার বাউন্সারকে পুল করে স্কয়ার লেগের উপর দিয়ে সীমানাছাড়া করার কাজটা করে দেন সাকিব আর মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ।

যদি দুজনে খোলসে ঢুকে কিউই বোলারদের খেলতেন তাহলে খুব জোড়ালো সম্ভাবনা ছিলো হঠাত বাউন্সারে হকচকিয়ে ক্যাচ তুলে দেওয়ার, কিংবা স্লোয়ারে বিভ্রান্ত হয়ে বোল্ড হওয়ার। সাকিব পরবর্তীতে সংবাদমাধ্যমকে বলেন যে তারা দুজনে ক্রিজে খুব কমই কথা বলেছেন।

আরো বলেন, ‘শুরুর দশটা ওভারে ওরা ভালো বোলিং করছিলো আর উইকেটের সুযোগ তৈরি করেছিলো!’ ৩৩ রানে ৪ উইকেট পড়ার পর ভড়কে না গিয়ে অবলীলায় কাট করেছেন সাউদির খাটো লেন্থের বলগুলোকে, মাহমুদউল্লাহও হাত গুটিয়ে বসে থাকেন নি, দলীয় সংগ্রহ ৭০ এর মাথায় জিমি নিশামকে স্কয়ার লেগের উপর দিয়ে সীমানার ওপারে আছড়ে ফেলেন।

কেন উইলিয়ামসন সাধারণত তার বোলারদের ঘুরিয়ে ফিরিয়ে ব্যবহার করতে পছন্দ করেন, এদিনও তার ব্যত্যয় ঘটেনি, কিন্তু তার এ প্রচেষ্টাও তাকে সাফল্যের মুখ দেখাতে ব্যর্থ হয়।

শুধু বাউন্ডারি হাঁকানোই নয়, মিশেল স্যান্টনার যখন ৪২ তম ওভারে আক্রমনে ফেরত আসেন তখন মাহমুদউল্লাহ লেগসাইডে গ্যাপ বের করেন এবং ক্রমাগত ডাবল বের করে সমীকরণটাকে আরো সহজ করে দেন।

উপায়ান্তর না দেখে ব্ল্যাকক্যাপরা আবারো স্কয়ার লেগ, ফাইন লেগ আর থার্ডম্যানে ফিল্ডার রেখে তাকে বাউন্সারে বিভ্রান্ত করার কৌশল বেছে নেয়, কিন্তু রিয়াদ এ চেষ্টাটিকেও কিপারের মাথার উপর দিয়ে সীমানার ওপারে আছড়ে ফেলেন।

ছয় ওভার বাকি থাকতে যখন বোল্টকে আক্রমণে আনেন উইলিয়ামসন তখনো আরো ৩৪ রান বাকি। তখন চাইলেই সিঙ্গেল নিয়ে খেলা শেষ করে দেয়ার কথা ভাবতে পারতেন দুজনে। কিন্তু সাকিব তা করেন নি। বোল্টের করা গুডলেন্থের বলটিকে যখন মিড অফের উপর দিয়ে সীমানার বাইরে আছড়ে ফেলেন তখন নিউজিল্যান্ডের আশার সলতেতে জ্বলতে থাকা নিভু নিভু আলোটিও দপ করে নিভে যায়।

গ্যালারিতে থাকা বাংলাদেশি দর্শক, যারা শুরু থেকে মাঝের ওভারগুলো পর্যন্ত চুপচাপ বসে ছিলেন তারা প্রাণ ফিরে পেতে শুরু করে, নিরপেক্ষ দর্শকেরাও এতে শামিল হন যারা কিনা নিছকই ছুটির দিন কাটাতে মাঠে গিয়েছিলেন।

এই বিশেষ দিনগুলোর সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে বাংলাদেশ ক্রিকেটে। সাউদির ভাষায়, ‘ওরা উন্নতি করছে, ঘরের মাঠে তো রীতিমতো অপ্রতিরোধ্য! তারা জানে ঘরের মাঠটাকে কিভাবে ব্যবহার করতে হয়। আর এখন তারা দেশের বাইরেও ভালো করছে। দেশের বাইরে এমন পারফরমেন্স আরো বাড়বে যখন এরা আরো বেশি দেশের বাইরে খেলার সুযোগ পাবে। গত বছরদুয়েকে এরা তা পাচ্ছেও। আমার মতে, আমরা আগামী বছর তিনেকের মধ্যে একটি লড়াকু বাংলাদেশকে দেখতে পাবো, যারা দেশে ও দেশের বাইরে সমানতালে ম্যাচ বের করতে পারে!’

দেশের বাইরে খেলার সুযোগের কথা বলতেই মাশরাফি আসন্ন দক্ষিণ আফ্রিকা সফরের কথা মনে করিয়ে দেন। টেস্ট স্ট্যাটাস পাওয়ার পরে এটা হবে সর্বসাকুল্যে বাংলাদেশের দ্বিতীয় দক্ষিণ আফ্রিকা সফর।

ল্যাপ অফ অনার দেওয়ার পরে মাশরাফি এই বলে শেষ করেন যে, ‘আইসিসির মেজর টুর্নামেন্টে একটা জয় মানে বিশেষ কিছু। এর যোগ্য হয়ে উঠতে আমাদের অনেকটা পথ পাড়ি দিতে হয়েছে। আমাদের দৃষ্টি প্রসারিত। এখান থেকে আমরা এখন সামনেই তাকাতে পারি কেবল!’

- Bangladesh's coming of age শিরোনামে মূল লেখাটি প্রকাশিত হয় ক্রিকবাজে।

Category : অনুবাদ
Share on your Facebook
Share this post