তামিমের মত খেলুক সবাই

নুসরাত মোহনা
মে ১৩, ২০১৭
 সেই তামিম ইকবাল বরাবরই ভয়-ডরহীন চরিত্র।
 সেই তামিম ইকবাল বরাবরই ভয়-ডরহীন চরিত্র।

আয়ারল্যান্ডে ত্রিদেশীয় সিরিজের প্রথম ম্যাচ শুরু হওয়ার সময় আমি উইকেটটি দেখে বিস্মিতই হয়েছিলাম। কারণ আধুনিক দিনের ক্রিকেটে  এই ধরণের উইকেট খুব কমই দেখা যায়, আধুনিক ক্রিকেটের যুগে কেবল ব্যাটসম্যান দের জন্য বড় বড় চার ছয় মারার উপযোগী মাঠই দেখা যায়।  ফলে, আউটফিল্ডের সাথে পার্থক্যহীন এই মাঠ দেখে কিছুটা বিরক্তও হিই।

এই ছোট মাঠ, বড় বড় চার-ছক্কা ও টি-টোয়েন্টির যুগে এমন সবুজ মাঠের দেখা পাওয়া দুষ্কর। একারণে, আমি কখনোই ভাবিনি যে, আয়ারল্যান্ড আমাকে , বাংলাদেশ এবং ভক্তদের ম্যালাহাইডের এমন একটি  মাঠ দিয়ে অবাক করবে মাঠ দিয়ে। এমন এক মাঠ যেখানে পিচ আর সবুজ আউটফিল্ডের পার্থক্য করতে পারেই কঠিন।

বাংলাদেশ সাধারণত এই ধরনের ট্র্যাক এবং ঠাণ্ডায় ব্যাটিং করতে অভ্যস্ত নয়। মাঝে মাঝেই আমার মনে সন্দেহ উঁকি দিচ্ছিল। তবে নিজেকে এই ভেবে শান্ত করছিলাম যে, বছরের পর বছর ধরে বাংলাদেশ যে কোন কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছে এবং যেকোন অবস্থায় মোকাবেলা করার আত্মবিশ্বাস অর্জন করেছে। প্রকৃতপক্ষে, ১৯৯৮ সালে কমন ওয়েলথ গেমসে আয়ারল্যান্ডের বিরুদ্ধে সেই অপমানজনক পরাজয়ের পর থেকে এই বাংলাদেশ দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে আসছে। তারা খেলার সময় প্রাণ দিয়ে খেলে এবং কোনভাবেই আত্মসমর্পণ করেনা।

বাংলাদেশের শুরুটা ভালো ছিল না। আমি এই ধরণের মাঠে এই ব্যাটিং বিপর্যয় মেনে নিতে পারতাম, কিন্তু সৌম্য সরকার ছাড়া, পনের ওভারের মধ্যে যে তিন টি উইকেট পতন ঘটেছে সেগুলি ছিল বাজে শট নির্বাচনের কারণে। এই ঘাসের মাঠে যেকোন ব্যাটসম্যানের জন্যই রান করা কঠিন। প্রচুর মুভমেন্ট ছিল, ক্রস ব্যাটে খেলা প্রায় অসম্ভব।

সাবি্বর বিপিএলের মতন বলে ব্যাট লাগাতে গিয়ে থার্ডম্যানের হাতে ধরা পড়েন, মুশফিক বলটিকে কাট করতে গিয়ে এবং সাকিব ওয়াইড বলকে মারতে গিয়ে আউট হন। কিন্তু একজন ব্যাটসম্যান অন্য প্রান্ত থেকে ব্যাটসম্যানদের এই আসা যাওয়ার মিছিল দেখছিলেন। বাংলাদেশের টপ অর্ডার ব্যাটসম্যানদের মনে ধাঁধা হয়ে যাওয়া মাঠে, নিজের ক্লাস প্রমাণ করার মিশনে নেমেছিলেন।

সেই তামিম ইকবাল বরাবরই ভয়-ডরহীন চরিত্র। তাঁর মধ্যে এই নির্ভীক মনোভাব তাঁকে যেকোন চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে সাহায্য করে। তিনি সব সময়ই আত্মবিশ্বাসের সাথে খেলেন. শুক্রবারও যে সেটা পারবেন বোঝা যাচ্ছিল ম্যাচের প্রথম বল থেকেই।

টিম মুরতাগের করা প্রথম বলটাই তামিম ইকবাল কোন সময় নষ্ট না করে লেগসাইডে ঠেলে দুই রান নিয়ে নিজের রানের খাতা খোলেন। মুরতাগ জানতেন আউটসাইড অফের যেকোন বলই তামিম পেটাতে চাইবেন, তাই শেষ বলটি সেভাবেই করেন, কিন্তু তামিম চতুরতার সাথে সে বলটি ছেড়ে দেন।

সৌম্যও সাব্বিরের আউট তামিমকে আরও সংযত করে। তিনি আবেগকে ধরে রেখে খেলেন। তিনি কন্ডিশনের সাথে মানিয়ে নিতে উইকেটে আরও বেশি সময় কাটানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন।বল গুলোর মান যাচাই করে ধীরে খেলছিলেন তামিম। নতুন বলের গতিবিধি প্রতিহত করার জন্য বলের লাইনের পেছনে গিয়ে ব্যাট চালাচ্ছিলেন। তিনি মুশফিককে একটি বাউন্ডারি মারতে দেখেও নিজে মারতে যাননি বরং ধীরে সুস্থে খেলে বোলারদের ছন্দ ভাঙতে চাচ্ছিলেন।

ষষ্ঠ ওভারের দ্বিতীয় বলে তামিম প্রথম বাউন্ডারি মারেন দুই উইকেট পাওয়া পিটার চেজকে। তার দ্বিতীয় বাউন্ডারিটিও চেজের বিরুদ্ধে ছিল। ফাইন লেগের দিকে সেই হালকা ফ্লিকটিই বাংলাদেশ দলের দিকে মোমেন্টাম ঘুরিয়ে দিয়েছিল। নবম ওভারে মুরগাগ একটি অফ স্ট্যাম্পের উপরে এবং অন্যটি অফ স্ট্যাম্পের বাইরে বল করে। তামিম অসাধারণ টাইমিংয়ের দুটি বলই সীমানার বাইরে পাঠান। এই অসাধারণ কভার ড্রাইভ তামিমের বলকে সফট-হ্যান্ডে খেলেন, আর সিমিং কন্ডিশনে এই টেকনিকটা যেকোনো ব্যাটসম্যানের জন্যই খুব জরুরী।

মুশফিক ও সাকিব আউট হয়ে যাওয়ার পরও তামিম ছিলেন অনড়। তিনি মাহমুদউল্লাহ রিয়াদের সাথে একটি অসাধারণ জুটি গড়েন এবং নিয়মিতভাবে স্ট্রাইক রোটেট করেন। তামিম ও মাহমুদউল্লাহদের মধ্যে বোঝাপড়া ছিল প্রশংসনীয় এবং তারা দুজনেই সিঙ্গেল এবং ডাবল নিয়ে নিয়মিতভাবে রানের চাকা সচল রেখেছিলেন। ২৩তম ওভারে দ্বিতীয় বলের মধ্যে স্টুয়ার্ট থম্পসন অফ স্টাম্পের পাশে বল করেন যা তামিম দ্রুততার সাথে মেরে রিয়াদকে দ্রুত এক রান নিতে বলেন। এই রান আয়ারল্যান্ডকে ফিল্ডিং পরিবর্তন করতে বাধ্য করে, যার ফলে পরবর্তী বলে  রিয়াদ লেগ সাইডে তিন রান নিতে পারেন।

তামিমের ব্যারি ম্যাকার্থির প্রতি আলাদা পছন্দের ব্যাপার ছিল। ম্যাকার্থির বিরুদ্ধে তার স্ট্রাইক রেট ছিল ১৩৩.৩৩ এবং তার বলে বাউন্ডারি ছিল তিনটি। তামিমের বোলিং আক্রমণে দ্বিতীয় আইরিশ বোলার ছিলেন পিটার চেজ। স্টুয়ার্ট থম্পসন এবং মার্তাগ তামিমের টেকনিক এবং মেজাজ এর পরীক্ষা নিচ্ছিলেন, কিন্তু, তিনি তাদের বিরুদ্ধে তিনি শান্ত এবং সহনশীল ছিলেন।

তামিম তার হাফ সেঞ্চুরি পেয়েছেন ম্যাকার্থির করা ডেলিভারিতেই। এটা ইতোমধ্যেই তার সেরা এক ইনিংসে পরিণত হচ্ছিল এবং তার ও মাহমুদউল্লাহের মধ্যে ৮৬ রানের জুটি স্বাগতিকদের জন্য হুমকি প্রমাণিত হচ্ছিল তবে এর মধ্যে বৃষ্টি এসে ম্যাচটাকে মেরেই ফেললো।

তবে নিশ্চিত ভাবেই বলা যায়, বাংলাদেশ এই ত্রি-দেশীয় সিরিজ ব্যাটিং-বন্ধুত্বপূর্ণ ট্র্যাকে খেলার সুযোগ পাবেনা। অনেকে সোশ্যাল মিডিয়ায় এই উইকেটকে সমালোচনা করেছে, কিন্তু আমি এর পক্ষে।

বিস্ময়করভাবে এই ‘বোলিং-ফ্রেন্ডলি’ সবুজ মাঠে বাংলাদেশের খেলা দেখে সন্তুষ্ট হতে পেরেছি । আমি বিশ্বাস করি বাংলাদেশকে আরও উন্নতি করতে সাহায্য করবে এমন ‍উইকেট। এবং অবশ্যই, আসন্ন ম্যাচগুলোতে অন্যান্য ব্যাটসম্যানরাও তামিমের মতোই খেলবে বলে আশা রাখি।

- ক্রিকেটসকার.কম অবলম্বনে

Category : অনুবাদ
Share on your Facebook
Share this post