ফার্স্ট ক্লাস নাকি পিকনিক ক্রিকেট!

অর্ক সাহা
মার্চ ১৪, ২০১৭
 টেস্টে ভাল করতে হলে ফার্স্ট ক্লাস ক্রিকেটে জোর দেওয়ার কোনো বিকল্প নেই। টেস্টে ভাল করতে হলে ফার্স্ট ক্লাস ক্রিকেটে জোর দেওয়ার কোনো বিকল্প নেই।

নাফিস ইকবাল কোনোদিন ভুলতে পারবেন না ১৯৯৯ সালের ওই দিনটার কথা, যেদিন তাঁর চাচা আকরাম খান তাঁকে জাতীয় ক্রিকেট লিগে খেলার কথা বলেন, ‘আমি তখন আমার সাদা রঙের জার্সিটা পড়ে বাড়ির পাশের রাস্তা দিয়ে হেঁটে এম.এ. আজিজ স্টেডিয়ামে গেলাম।  ড্রেসিংরুমে পৌছানোর পর আশেপাশে এত সিনিয়র সব খেলোয়াড়দের দেখে কিছুটা ঘাবড়ে গিয়েছিলাম।  আমরা প্রথমে ফিল্ডিং করলাম, আর সাইফুল্লাহ মাগসি ১৭০ রানের মত করলো। এরপর আমাদের ব্যাটিংয়ের পালা, আর আমি তাতে করলাম ১২৬। আমার পুরো পরিবার খেলাটা দেখতে এসেছিলো, ভীষণ গর্বের এক মুহুর্ত ছিল সেটা!’

সেটা ছিল এনসিএলের প্রথম মৌসুমের প্রথম রাউন্ড, বাংলাদেশের অভিষেক টেস্টের প্রায় এক বছর আগের কথা। জাতীয় ক্রিকেট লিগে তখন দুইদিন এবং তিনদিনের ম্যাচ হতো, তবে নেহায়েত অগোছালোভাবে। এনসিএল মূলত ছিলো বাংলাদেশের টেস্ট স্ট্যাটাস পাওয়ার পথে আর একটা অবতরণিকা পার হওয়ার উপায়, বেশ কয়েক বছর পর এই লিগ ফার্স্ট ক্লাস স্ট্যাটাস পায়। ফলে শ্রীলংকা এবং জিম্বাবুয়ের মত বাংলাদেশও ঘরোয়া লঙ্গার ভার্সন টুর্নামেন্ট ফার্স্ট ক্লাসের স্বীকৃতি পাওয়ার আগেই টেস্ট স্ট্যাটাস পেয়ে গেল।

সে সময় এটাকে ভাবা হতো ভবিষ্যৎ টেস্ট ক্রিকেটার গড়ে তোলার পথে তাঁদের স্কিল, মানসিকতা এবং দীর্ঘপরিসর ক্রিকেটের উপযোগী টেম্পারামেন্ট গড়ে তোলার মঞ্চ। টুর্নামেন্টটা ছিলো বিভাগভিত্তিক, যার মানে মফস্বল থেকে আসা ক্রিকেটারদের জন্য সুযোগ পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।  গত দুই দশক ধরেই এটা চলে আসছে, তবে খুব কম খেলোয়াড়ই ফার্স্ট ক্লাস সিস্টেমের মাধ্যমে বেরিয়ে এসেছে।

---------------

বাংলাদেশের ফার্স্ট ক্লাস যুগের শুরুর দিকের ঘটনা।  হাবিবুল বাশার একবার নেটে একজন সিনিয়র পেস বোলারকে খেলছিলেন। বোলার দৌড়ে এলেন, এরপর হঠাৎ করেই ওভার দ্য উইকেটের পরিবর্তে দিক বদলে রাউন্ড দ্য উইকেটে বল ছুড়লেন। বাশার হতভম্ব হয়ে খেলতে পারলেন না, গ্লাভস ঘেঁষে বলটি আঘাত হানলো ব্যাটের হ্যান্ডেলের উপরের দিকে। 

বাশার জিজ্ঞেস করলেন, ‘এইটা কি ছিল?’

অন্য প্রান্ত থেকে উত্তর এলো, ‘তুমি সামনে অনেক ফার্স্ট ক্লাস আর টেস্ট খেলবে।  এগুলো প্রায়ই হবে।’

বাশার হাসলেন, আর পরবর্তী বোলারকে ফেস করার জন্য নেটে ফিরে গেলেন।

আসলে ওই সিনিয়র ফাস্ট বোলার রানআপ মিস করেছিলেন বলেই অন্য পাশ থেকে বল করেছিলেন। তাঁর রসিকতার অভ্যাসটা সম্পর্কে জানা থাকায় বাশার তেমন কিছু মনে করেননি।

এটা মজার একটা ঘটনা হলেও পুরো দেশেই ক্রিকেটারদের লঙ্গার ভার্সন ক্রিকেটটা ধরতে বেশ কিছুদিন সময় লেগে গেছে। কেউ কেউ ভাবতেন, ভারী ব্যাট হয়তো কিছুটা অ্যাডভান্টেজ দেবে।  আবার কেউ কেউ ভাবতেন, হালকা ব্যাটেই বোধহয় সুবিধা হবে। রাজশাহীর ক্রিকেটাররা প্রথম বুঝতে পারলেন, চারদিনের একটা ম্যাচ খেলার জন্য ফিটনেসটা জরুরী। ঢাকা, চট্টগ্রাম এবং সিলেট তাঁদের বিচারবুদ্ধি আর ট্যালেন্টে বাঁধ দেওয়ার চেষ্টা করে, তবে তা ধোপে টেকেনি।

---------------

এনসিএলের আবেদন ক্ষয়ে যেতে খুব বেশিদিন সময় লাগেনি।  কয়েক সিজনের মধ্যেই খেলোয়াড়েরা একে ‘পিকনিক ক্রিকেট’ বলতে শুরু করলো। এই টুর্নামেন্টে খেলে যে টাকা আসতো, সেটা যুগ যুগ ধরে সবচেয়ে মর্যাদাজনক টুর্নামেন্ট হিসেবে চলে আসা ঢাকা প্রিমিয়ার লিগের তুলনায় নিতান্তই অপ্রতুল। 

আর এই টুর্নামেন্টের মানও ছিলো নেহায়েতই হতাশাজনক। ঢাকা প্রিমিয়ার লিগে যেখানে খেলোয়াড়দের প্রতিদিন চাপের মধ্যে খেলে যেতে হতো, সেখানে ফার্স্ট ক্লাস ম্যাচ খেলতে গেলেই কেমন একটা নিস্তব্ধ পরিবেশ সৃষ্টি হয়ে যেত। বিভাগীয় দলগুলোও মাঝেমধ্যে বুঝে উঠতে পারতো না, কেউ খারাপ করলে তাঁকে আসলে কি বলা উচিত।  বরিশালের মত জায়গাগুলোতে ভালো খেলোয়াড় উঠে আসছিলো না বলে একই খেলোয়াড়ই খেলে গেছেন অনেক বছর ধরে।  আর চট্টগ্রাম এবং সিলেটে যখন খেলোয়াড় উঠে আসা বন্ধ হয়ে গেলো, প্রশাসন তাতে তেমন একটা গা করেনি।

---------------

আশা করা হচ্ছিলো, ঘরোয়া ফার্স্ট ক্লাস ক্রিকেট থেকে হয়তো বাংলাদেশের টেস্ট দল বিশেষ উপকৃত হবে। তবে ঢাকা প্রিমিয়ার লিগ এবং সাম্প্রতিককালের যুব ক্রিকেট প্রোগ্রামই সবচেয়ে বেশি ইমপ্যাক্ট ফেলেছে বাংলাদেশের টেস্ট ক্রিকেটে। 

শ্রীলংকা এবং জিম্বাবুয়ের মত টেস্ট খেলার বেশ আগে থেকেই লঙ্গার ভার্সন ক্রিকেট খেলার সৌভাগ্য হয়নি বাংলাদেশের। ১৯৮০ সালের আগে শ্রীলংকার ঘরোয়া লীগ ফার্স্ট ক্লাস স্ট্যাটাস পায়নি, সেটা পেতে পেতেতাঁদের টেস্ট স্ট্যাটাস পাওয়ার পর বেশ কিছুদিন সময় লেগে গেছে। 

সারা ট্রফি নামের প্রিমিয়ার টুর্নামেন্ট ১৯৮৭-৮৮ সালের আগে ফার্স্ট ক্লাস স্বীকৃতি পায়নি। এর আগে জিম্বাবুয়েতে তিনদিনের ম্যাচ হতো, যাতে পরবর্তীতে ফার্স্ট ক্লাস ক্লাব হিসেবে স্বীকৃত দলগুলোই পরষ্পরের মোকাবেলা করতো। তাছাড়া ভৌগোলিক কারণে বিভিন্ন বিদেশি দলের সঙ্গে ক্রিকেট খেলার সুযোগ পেতো, যা ফার্স্ট ক্লাসের সম-মর্যাদার বলে গণ্য করা হতো। অন্যদিকে শ্রীলংকান কোনো দল বিদেশে গেলেও সে ম্যাচগুলোকে ফার্স্ট ক্লাস ম্যাচ বলা হতো।

জিম্বাবুয়েতে যদিও ১৯০৩ সালের পর থেকেই লোগান কাপ চলে আসছিলো, তবে এটা ফার্স্ট ক্লাস চ্যাম্পিয়নশিপের মর্যাদা পায় ১৯৯২ সালে জিম্বাবুয়ের টেস্ট স্ট্যাটাস পাওয়ার পর।  এর আগে এটা ঠিক ফার্স্ট ক্লাস টুর্নামেন্ট ছিলো না বটে, তবে এতেও একাধিক ইনিংস এবং দীর্ঘপরিসর ক্রিকেটপদ্ধতি ছিলো। জিম্বাবুয়েতে ঠিক কবে ক্রিকেটের আগমন ঘটে, সেটা নিয়ে বেশ বিতর্ক থাকলেও অধিকাংশের মতেই ১৮৯০ সালে কলোনিয়াল সেটলারদের আগমনের সময় থেকেই ক্রিকেট খেলা শুরু হয়েছে বিভিন্ন স্থানে। 

এটা মনে রাখা প্রয়োজন, লোগান কাপ কিন্তু জিম্বাবুয়ে টেস্ট স্ট্যাটাস পাওয়ার আগ পর্যন্ত ফার্স্ট ক্লাস স্বীকৃতি পায়নি। তবে জিম্বাবুইয়ানরা প্রতিনিয়তই ফার্স্ট ক্লাস খেলে এসেছে মিডলসেক্স এবং লিস্টারশায়ারের মত উঁচুমানের দলগুলোর সাথে, এছাড়া পাকিস্তান ইন্টারন্যাশনাল এয়ারলাইন্স, যুব ওয়েস্ট ইন্ডিজ, যুব অস্ট্রেলিয়া এবং শ্রীলংকার বিপক্ষে ফার্স্ট ক্লাস ম্যাচগুলো তো ছিলোই! ১৯৮০ সালের আগে তৎকালীন রোডেশিয়া, যাকে আমরা এখন জিম্বাবুয়ে নামে চিনি, দক্ষিণ আফ্রিকার কুরি কাপে নিয়মিত অংশগ্রহণ করতো।

ফলে তাঁদের স্বাধীনতা পাওয়ার পর প্রশ্ন উঠলো, তাঁরা কি দক্ষিণ আফ্রিকার ঘরোয়া ফার্স্ট ক্লাস চ্যাম্পিয়নশিপের মধ্যেই থাকবে – এবং জাতিবিদ্বেষজনিত কারণে একঘরে হয়ে থাকার ঝুঁকি নেবে – নাকি কুরি কাপ থেকে বেরিয়ে গিয়ে নিজেদের মত করে রাস্তা খুঁজে নেবে।  তাঁরা পরের অপশনটি বেছে নিয়েছিলো।

জিম্বাবুয়ের প্রথম টেস্ট দলে থাকা খেলোয়াড়দের মনে হয়, তাঁদের দেশের বিভিন্ন প্রদেশের ক্রিকেট একটা মান বজায় রেখেছিলো। বিভিন্ন সফরকারী দলের সাথে ফার্স্ট ক্লাস ম্যাচও তাঁদের উন্নতিতে বিশেষ ভূমিকা রেখেছিলো। যেসব আন্তর্জাতিক ক্রিকেটার জিম্বাবুয়ে সফর করেছিলেন, তাঁদের মধ্যে ডিন জোন্স, ব্রুস রিড, কোর্টনি ওয়ালশ, জেফ ডুজন এবং ম্যালকম মার্শাল অন্যতম।

---------------

২০০০ সালের পর বিসিবি বিভাগগুলোকে নিজেদের টিম গড়তে না বলে বরং স্কোয়াডের শক্তিমত্তা অনুযায়ী নিজেরাই একটা টিম দিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়।  সিদ্ধান্তটা ব্যাকফায়ার করে - বিভিন্ন বিভাগে খেলা ক্রিকেটাররা নিজের বিভাগের হয়ে খেলতে না পারায় দলের প্রতি দায়িত্ববোধটা খুব কম আসছিলো, সবাই বরং নিজের পারফরম্যান্সের দিকেই বেশি নজর দেয়, ফলে দলগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতামূলক মনোভাবটা একদম কমে যায়। 

২০১৩ সালে তৎকালীন বোর্ড প্রেসিডেন্ট আ.হ.ম. মোস্তফা কামাল সকল ফার্স্ট ক্লাস ক্রিকেটারদেরকে একটা বেতন স্কিমের আওতায় আনেন এবং ‘বাংলাদেশ ক্রিকেট লীগ’ চালু করেন, যেটা তুলনামূলকভাবে পরিশোধিত অঞ্চলভিত্তিক ফার্স্ট ক্লাস টুর্নামেন্ট।  এ টুর্নামেন্ট চালু হওয়ার ফলে অন্তত এনসিএল থেকে ভালো মানের ক্রিকেট নিশ্চিত হয়।   

হ্যা, কেউ ঘরোয়া লিগে দারুন কিছু করে দেখালেও তাতে ভরসা খুব কমই রাখা হয়।  হয় তাঁকে বয়সভিত্তিক ক্রিকেটের মধ্য দিয়ে উঠে আসতে হয়, নতুবা ‘এ’দলের হয়ে নিজেকে প্রমাণ করতে হয়।  কিন্তু মুশকিল হচ্ছে, ‘এ’ দলের খেলাই হয় কদাচিৎ। 

সত্যি বলতে, বাংলাদেশের ফার্স্ট ক্লাস ক্রিকেট ঠিক সেভাবে ক্রিকেটারদের মূল্য দিতে পারেনি, এভাবেই চলে আসছে অনেকদিন ধরেই।  আশা করা হচ্ছে, পরবর্তী পাঁচ বছরের মধ্যে বিসিএল হয়ে উঠবে বাংলাদেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ফার্স্ট ক্লাস টুর্নামেন্ট।  কিন্তু যতদিন না সেখান থেকে কোনো খেলোয়াড় বেরিয়ে না আসে যে সহজেই টেস্ট দলের সাথে তাল মিলাতে পারবে, ফার্স্ট ক্লাস ক্রিকেট ততদিন পিকনিক ক্রিকেট হিসেবেই চলতে থাকবে।

First-class cricket or picnic cricket? শিরোনামে মূল লেখাটি ইএসপিএন ক্রিকইনফোতে লিখেছেন ক্রিকেট বিষয়ক গণমাধ্যমটির বাংলাদেশ প্রতিনিধি মোহাম্মদ ইশাম।
 

Category : অনুবাদ
Share on your Facebook
Share this post