তখন সাদা পোশাকের স্বপ্নে বিভোর ছিল বাংলাদেশ

সঞ্জয় পার্থ
মার্চ ১৪, ২০১৭
  ১৯৯৭ সালের আইসিসি ট্রফি জয় টেস্টের পথে অনেকটাই এগিয়ে নেয় বাংলাদেশকে  ১৯৯৭ সালের আইসিসি ট্রফি জয় টেস্টের পথে অনেকটাই এগিয়ে নেয় বাংলাদেশকে

মধ্য নব্বইয়ের দশকেও ক্রিকেট ছিল বাংলাদেশিদের কাছে ফুটবলের পর দ্বিতীয় জনপ্রিয় খেলা আইসিসি ট্রফিগুলোতে বেশ কিছু ব্যর্থ পারফরম্যান্সের কারণে দেশে ক্রিকেটের জনপ্রিয়তা আরও কমছিল এই অবস্থায় ১৯৯৬ সালে ক্রিকেট বোর্ডে নতুন কমিটি আসে, যার দায়িত্বে ছিলেন এমন একজন মানুষ যার দূরদর্শী চিন্তাভাবনা সবাইকে তাক লাগিয়ে দিয়েছিল তার মাত্র চার বছর পরেই স্বপ্ন বাস্তবে রুপ নেয়, বাংলাদেশ হয় আইসিসির দশম টেস্ট খেলুড়ে দেশ

সাবের হোসেন চৌধুরী, বিসিবি প্রেসিডেন্ট (১৯৯৬-২০০১): বিসিবি প্রেসিডেন্ট হিসেবে আমার প্রথম বোর্ড মিটিংয়ে আমি বলেছিলাম, আমাদের এই ৫ বছর মেয়াদী শাসনকালের জন্য আমাদের একটি লক্ষ্য থাকা উচিত। আমাদের অবিশ্বাস্য কিছু করে দেখাতে হবে, এই ধারণাটার গোড়াপত্তন আমিই করেছিলাম। তখন আমরা সহযোগী দেশ ছিলাম, কিন্তু আমি সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছাতে চেয়েছিলাম। তখনকার সময়ে টেস্ট খেলুড়ে দেশ হওয়ার জন্য আইসিসির কোন নির্দিষ্ট বস্তুগত মানদণ্ড ছিল না। জিম্বাবুয়ে যখন টেস্ট স্ট্যাটাস পাওয়ার আবেদন করেছিল তখন তারা বলেছিল, ৩ বার আইসিসি ট্রফি জয়ের পরেও যদি তারা টেস্ট স্ট্যাটাস না পায়, তাহলে জিম্বাবুয়ের ক্রিকেট মরে যাবে। 

আহমেদ সাজ্জাদুল আলম ববি, বিসিবি পরিচালক: প্রবীণ সাংবাদিক জামান ভাই একবার একটা আর্টিকেল লিখেছিলেন ‘নবম টেস্টের জন্য অপেক্ষ’ এই শিরোনামে। আর্টিকেলটি মূলত আমাদের টেস্ট খেলা নিয়েই লিখা হয়েছিল। আমরা টেস্ট খেলার ব্যাপারে ভাবছিলাম, কিন্তু কবে নাগাদ সেটি সম্ভব হবে সেটি আমরা জানতাম না। সাবেরের চিন্তাটাকে তখন অনেকেই বাস্তবসম্মত চিন্তা হিসেবে মানতে চায়নি।

সাবের: আমরা টেস্ট স্ট্যাটাসের জন্য আবেদন করার পরপরই একজন সাবেক ক্রিকেটার আমাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, ‘সাবের, মজা হচ্ছে, নাকি? তুমি কখনোই এটা পাবে না।’ কিন্তু এটা যে সম্ভব সেটা বিশ্বাস করবার মত সাহস আমাদের ছিল।

১৯৯৭ তে প্রথমবারের মত আইসিসি ট্রফি জয়, আর তারপর ১৯৯৯ বিশ্বকাপের পারফরম্যান্স দিয়ে বাংলাদেশ নিজেদের দাবির পক্ষে জোরালো আওয়াজ তোলার মত যথেষ্ট শক্তিশালী প্ল্যাটফর্ম পায় লক্ষ লক্ষ লোক তাদের জয় উদযাপন করেছিল, এবং দেশে ফেরার পর খেলোয়াড়দের উষ্ণ সংবর্ধনাও দিয়েছিল সহযোগী একটি দেশের এমন পারফরম্যান্সের ফায়দা তুলতে ভুল করেননি সাবের, কুয়ালালামপুরে আইসিসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে তাঁর দাবি জানিয়ে বসলেন

সাবের: ১৯৯৭ তে কুয়ালালামপুরে আইসিসি ট্রফি জয়ের পরেই আমি ডেভিড রিচার্ডসকে বলেছিলাম যে আমরা টেস্ট স্ট্যাটাসের জন্য আবেদন করব। রিচার্ডস উত্তরে বলেছিলেন, ‘আমি শুনছি তোমার কথা।’

১৯৯৭ তে ওয়ানডে স্ট্যাটাস পাওয়ার পরে বিসিবির পরবর্তী লক্ষ্য ছিল ইন্ডিপেন্ডেন্স ট্রফি, ১৯৯৮ তে প্রথম আইসিসি নকআউট টুর্নামেন্ট এবং এশিয়ান টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনালের মত গুরুত্বপূর্ণ সিরিজগুলো আয়োজন করা

সাবের: আমরা প্রথম আইসিসি নকআউট টুর্নামেন্ট আয়োজন করেছিলাম, কারণ আমি জানতাম কেবল মাঠের পারফরম্যান্স দিয়ে আমরা টেস্ট স্ট্যাটাস পাব না। আমি আলি বাখের ও জগমোহন ডালমিয়াকে বলেছিলাম যে ক্রিকেটের বিশ্বায়ন ঘটানোর জন্য বাংলাদেশ হচ্ছে সবচেয়ে যৌক্তিক পছন্দ।

সে সময়ের আইসিসি প্রেসিডেন্ট ডালমিয়া বাংলাদেশের সমর্থনে ছিলেন তিনি নিয়মিত পরামর্শ দিতেন কিভাবে প্রক্রিয়াটাকে পরিচালনা করা যায় তিনি তখনকার বিসিবি সেক্রেটারি সৈয়দ আশরাফুল হক সাবের হোসেনকে এগিয়ে যাওয়ার পথ দেখাতে লাগলেন ১৯৯৯ এর দিকে সাবের সদস্য দেশগুলোর মধ্যে একটা ভোটাভুটির আয়োজন করে দেখতে চাইলেন কারা তাঁর পাশে আছে এরইমধ্যে বাংলাদেশ এশিয়ার বাইরেও বেশ কিছু বন্ধুরাষ্ট্র জোগাড় করে ফেলেছিল

সৈয়দ আশরাফুল, এসিসির সাবেক সভাপতি: সাবের চেয়েছিল ১৯৯৯ এর আইসিসি মিটিংয়ে একটা ভোটের আয়োজন করতে, কিন্তু জাগগু দা’র (জগমোহন ডালমিয়া) কাছে ধারণাটা ভালো লাগেনি। তিনি বলেছিলেন যে বাংলাদেশ কেবল তিনটা দেশের ভোট পাবে- ভারত, পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কা। কিন্তু তারপরেও সাবের একবার দেখতে চাচ্ছিল ভোটের ফল কিরকম হয়। শেষ পর্যন্ত আমরা ৫ ভোট পেয়েছিলাম, ওয়েস্ট ইন্ডিজ ও জিম্বাবুয়েও আমাদের পক্ষে ভোট দিয়েছিল।

১৯৯৯ তে ইয়ান বিশপের নেতৃত্বে ওয়েস্ট ইন্ডিজ দল বাংলাদেশে খেলতে এসেছিল। ওই সিরিজে এনামুল হক মনি পাঁচ উইকেট পেয়েছিল, এবং আরও কয়েকটি ঘটনা ঘটেছিল। বিশপ আমাকে বলেছিল যে তাঁর মতে আমরা টেস্ট স্ট্যাটাসের জন্য প্রস্তুত। আমি তাঁকে বলেছিলাম, ‘দয়া করে গিয়ে এটা প্যাট রুশো (তৎকালীন ওয়েস্ট ইন্ডিজ বোর্ড প্রধান) কে জানাও।’ আমরা জিম্বাবুয়েরও একজন বন্ধু পেয়েছিলাম, পিটার চিঙ্গোকা।

কিন্তু তারপরেও বাংলাদেশকে অনেক প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হতে হয়েছিল অস্ট্রেলিয়া, সাউথ আফ্রিকার মত প্রধান দেশগুলোর সমর্থন তাদের দরকার ছিল সেই কারণেই সাবের ওইসব বোর্ডের সাথে ব্যক্তিগতভাবে যোগাযোগ করতে শুরু করেন

সাবের: আমাদের অনেক ধরণের ক্রিকেট কূটনীতি করতে হয়েছিল। আমার মনে হয় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভ্রমণ ছিল অস্ট্রেলিয়া আর সাউথ আফ্রিকায়। আমরা জানতাম যে এশিয়ান দেশ, ওয়েস্ট ইন্ডিজ ও জিম্বাবুয়ের কাছ থেকে আমরা সমর্থন পাব, কিন্তু নয়টি পূর্ণ সদস্য দেশের মধ্যে আমার অন্তত সাতটি ভোটের প্রয়োজন ছিল। ইংল্যান্ডের ব্যাপারে আমি অতটা নিশ্চিত ছিলাম না, সে কারণেই আমাদের ফোকাসের বেশিরভাগটা পরে অস্ট্রেলিয়া ও সাউথ আফ্রিকার উপর। বিসিবি ও তাদের বোর্ডের মধ্যে আমি উন্নয়ন চুক্তি করি। আর এই মাঠের বাইরের কূটনীতিগুলোই আমাদের খেলার মানের ঘাটতিকে পুষিয়ে দিয়েছিল।

দেশেও সাবের আশরাফুল প্রচুর সমর্থন পেয়েছিলেন আইসিসির পাঠানো পরিদর্শকেরা এমন একটি দেশে এসে পরেছিলেন, যে দেশের মানুষেরা এই আন্তর্জাতিক খেলাটিকে আরও এগিয়ে নিতে চাইছিল

আশরাফুল: পুরো বোর্ডই আমাদের সাহায্য করেছে। ববি এবং ড: নিজামুদ্দিন আহমেদ আমাকে বিডের কাগজপত্র তৈরিতে সহায়তা করেছিল। এছাড়া আইসিসির তিন পরিদর্শক- গ্রাহাম ডাউলিং, নাসিম-উল-গণি ও অ্যান্ডি পাইক্রফট ও ভালো রিপোর্টই দিয়েছিল।

মোটামুটি এমন সময়েই বাংলাদেশ সাবেক প্রোটিয়া ক্রিকেটার এডি বারলোকে কোচ হিসেবে আইসিসি ট্রফি এনে দেয়া ১৯৯৯ বিশ্বকাপে নিয়ে যাওয়া গর্ডন গ্রিনিজের স্থলাভিষিক্ত করে গ্রিনিজের মত বারলোও খুব দ্রুত খেলোয়াড়দের পিতৃতুল্য জায়গাটা নিয়ে নেন

ক্যালি বারলো, সাবেক কোচ এডি বারলোর স্ত্রী: এডির সাথে প্রথমে যোগাযোগ করেছিল সাউথ আফ্রিকার ইউনাইটেড ক্রিকেট বোর্ড। তারা সাবের ভাইয়ের কাছ থেকে জানতে পেরেছিল যে বাংলাদেশের একজন ক্রিকেট পরিচালক বা কোচের দরকার। আমি সম্পূর্ণ সৎ ভাবে বলতে পারি, এটি ছিল আমার আর এডির জীবনের অন্যতম সুখের সময়। বাংলাদেশের মানুষ আমাদের প্রতি খুবই আতিথেয়তাপরায়ণ ছিল, এবং তারা এডির কাছ থেকে কিছু শিখতেও আন্তরিক ছিল। সে সময়টা এডির জন্য, খেলোয়াড়দের জন্য এবং ক্রিকেট প্রশাসকদের জন্যেও শিক্ষণীয় সময় ছিল। মৌসুমি সময়ে বাইরে অনুশীলনে অসুবিধা হত, তাই আমাদের ইনডোর অনুশীলনের ব্যবস্থা করতে হত।

২০০০ সালের ২৬ জুন লন্ডনে আইসিসির বার্ষিক কনফারেন্সে সাবের আশরাফুলকে বলা হল বাংলাদেশের টেস্ট স্ট্যাটাস পাওয়ার যৌক্তিকতা তুলে ধরতে

সাবের: আমি ৪৫ মিনিট ব্যাপী একটা প্রেজেন্টেশন দিয়েছিলাম, যার পুরোটাই ছিল আমাদের টেস্ট স্ট্যাটাস পাওয়ার সম্ভাবনা ও সুযোগ নিয়ে। শেষ দিকে আমাদের কিছু প্রশ্ন করা হয়েছিল। তারপর ভোটাভুটি শুরু হয়। আমাদের অন্তত ৭ টি ভোটের লক্ষ্য ছিল, কিন্তু শেষ পর্যন্ত আমরা ৯ ভোটের সবকয়টিই পেয়েছিলাম। বাংলাদেশ ক্রিকেটের ভবিষ্যতের জন্য এই ভোট পর্ব দারুণ এক আত্মবিশ্বাস বয়ে নিয়ে এসেছিল। সহযোগী দেশগুলোও খুব খুশি ছিল যে তাদের মধ্য থেকে একটি দল সর্বোচ্চ পর্যায়ে খেলার সুযোগ পাবে।

রোডম্যাপে অসংখ্য প্রতিবন্ধকতা থাকা সত্ত্বেও আমাদের পরিকল্পনা দারুণভাবে কাজে এসেছিল। তখনকার দিনে আইসিসি মিটিংয়ে যোগদান করার বিমান টিকেট কাটার জন্যও আমাদের ফান্ডের দরকার হত। কিন্তু তারপরেও বোর্ডের মধ্যে একটা দুর্দান্ত টিমওয়ার্ক গড়ে উঠেছিল, যা সত্যিই প্রশংসনীয় ছিল।

বাংলাদেশের জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ সময় ছিল সেটা। ক্রিকেট বাংলাদেশে খেলার চেয়েও বেশি কিছু, ক্রিকেট এখানে জাতীয় ঐক্য গড়ে তোলার একটি প্ল্যাটফর্ম। মানুষকে একতাবদ্ধ করার জন্য ক্রিকেট এখানে উপযুক্ত ফ্যাক্টর। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের পর এই ১৯৯৭ সালের আইসিসি ট্রফি জয়ের ফলেই পুরো দেশ একত্রিত হয়েছিল।  

প্রধানমন্ত্রীর সাথে আমি তাড়াতাড়ি কিছু কথা বলে নেই, তারপর আমার বাবা-মাকে ফোন করি। সৈয়দ আশরাফুল হক আমার সাথেই ছিলেন, আর আমিনুল ইসলাম বাইরে অপেক্ষা করছিলেন। তারপর আমরা আইসিসি প্রেসিডেন্ট ম্যালকম গ্রে কে সাথে নিয়ে একটা সংবাদ সম্মেলন করি। ইতিহাস ভাষায় বর্ণনা করা অসম্ভব। আমি মনে করি এটা আমার জীবনের সবচেয়ে খুশির সময় ছিল।

কিছুদিনের মধ্যেই বিসিবি ইংল্যান্ড ভারতের কাছে আমন্ত্রণপত্র পাঠায় নিজেদের ইতিহাসে প্রথম টেস্টে অংশগ্রহণ করার জন্য কিন্তু ব্যস্ত শিডিউল থাকায় ইংল্যান্ড সে আমন্ত্রণ গ্রহণ করতে পারেনি এগিয়ে এল ভারত, আগস্টে ঘোষণা দিল, বাংলাদেশের প্রথম টেস্টে প্রতিপক্ষ হিসেবে অংশগ্রহণ করবে তারা এর আগে পাকিস্তান জিম্বাবুয়ের অভিষেক টেস্টেও অংশগ্রহণ করেছিল ভারত নভেম্বরে অভিষেক টেস্টের পূর্ণ প্রস্তুতির জন্য বিসিবি দিনরাত কাজ শুরু করে 

ববি: টেস্ট স্ট্যাটাস পাওয়ার পর আমাদের ফোকাস ছিল অভিষেক টেস্ট আয়োজনের দিকে। আমাদের প্রস্তুতিতে আমরা কোন খামতি রাখতে চাইনি। মূল দুই আম্পায়ার ডেভিড শেফার্ড ও স্টিভ বাকনর যখন ঢাকায় এসে পৌঁছালেন, তখনই কেবল আমাদের বিশ্বাস হতে লাগল, সত্যিই ঢাকায় টেস্ট ম্যাচ হতে যাচ্ছে! এরপর আর পিছন ফিরে তাকাইনি আমরা।

২০০০ সালের মে তে বাংলাদেশ দলকে একটি বড় পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছিল এডি বারলো অসুস্থ হয়ে পরেন, আর তাঁর পরিবর্তে কোচের দায়িত্ব পান সারওয়ার ইমরান

সারওয়ার ইমরান, বাংলাদেশের সাবেক কোচ: আমি কোচ হই ২০০০ সালের মে মাসে, এশিয়া কাপের ঠিক আগে আগে। তখনো আমরা টেস্ট স্ট্যাটাস পাইনি। এডি বারলো অসুস্থ হয়ে পরেছিলেন, তাই আমাকে কোচের দায়িত্ব দেয়া হয়। আমিই দলকে কেনিয়ায় আইসিসি নকআউট টুর্নামেন্টে নিয়ে গিয়েছিলাম, কিন্তু তারপরেও আমি নিশ্চিত ছিলাম না অভিষেক টেস্টের কোচ কে হবেন।

আমার মনে হয় কোচ হওয়ার দৌড়ে আমরা দুজন ছিলাম, আমি আর দিপু রায়চৌধুরী। শেষ পর্যন্ত আমাকেই নিয়োগ দেয়া হয়, কিন্তু কোচ হওয়ার পরে অনুশীলন ক্যাম্পে আমি কেবল সাউথ আফ্রিকান ফিজিও গেভিন বেঞ্জাফিল্ডকে পাশে পেয়েছিলাম। এখনকার দিনে যেমন ব্যাটিং, বোলিং, ফিল্ডিংয়ের জন্য আলাদা আলাদা কোচ থাকে, তখন এমনটা ছিল না। আমি একাই তিন বিভাগ সামলাতাম।

অভিষেক টেস্টের দিন যতই ঘনিয়ে আসতে লাগল, বিসিবি কর্মকর্তারা আরও বেশি করে ব্যস্ত হয়ে পরতে লাগলেন সাধারণ মানুষের মধ্যেও প্রচুর উন্মাদনা লক্ষ্য করা যাচ্ছিল

ববি: মানুষের মধ্যে ব্যাপক উত্তেজনা খেয়াল করছিলাম আমরা। খেলা শুরুর আগের দিন মধ্যরাতে নিরাপত্তাকর্মীরা টয়লেটে ১০-১১ জন মানুষকে আটক করে। তারা ওখানে লুকিয়ে ছিল শুধুমাত্র এই কারণে যেন টেস্ট শুরুর দিন সকালে তারা স্টেডিয়ামে সীট পায়!

দ্বিতীয় দিন শেষে বাংলাদেশই চালকের আসনে ছিল দেশের অভিষেক টেস্টে সেঞ্চুরি করা মাত্র দ্বিতীয় ব্যাটসম্যান হন আমিনুল ইসলাম বুলবুল

আমিনুল ইসলাম: নব্বইয়ের ঘরে অনেকক্ষণ আটকে ছিলাম আমি। অন্যপ্রান্তে ছিল পাইলট। আমি তখন সাম্প্রতিক সময়ে অভিষেকেই সেঞ্চুরি করেছে এমন ব্যাটসম্যানদের কথা ভাবছিলাম।

আমি ভাগ্যবান ছিলাম যে মাইলফলকটিতে আমি পৌঁছেছিলাম আমার অন্যতম প্রিয় একটি শট প্যাডেল সুইপ খেলে। আনঅর্থোডক্স একটা শট ছিল। আমার লক্ষ্যই ছিল যত বেশি সময় সম্ভব ব্যাটিং করে যাওয়া। দারুণ একটা অনুভূতি হয়েছিল।

আমাদের ক্রিকেটে আমরা অনেক ধাপ পার করে এসেছি- সহযোগী ধাপ, ওডিআই খেলা ও জেতা, এবং সবশেষে আসে টেস্ট ক্রিকেট।

ড্রেসিংরুমেও অনেক উত্তেজনা ছিল, ক্যালি বারলো তাঁর স্বামীকে নিয়ে উপস্থিত ছিলেন আমিনুল যখন সেঞ্চুরি করলেন তখন তারা ড্রেসিংরুমের বাইরেই দাঁড়িয়ে ছিলেন

ক্যালি বারলো: খুব সহজেই অনুমান করা যায় সেদিন ড্রেসিংরুমের পরিবেশ কেমন ছিল! নিজেদের প্রথম টেস্ট ম্যাচ খেলতে পেরে সবাই খুব উত্তেজিত ছিল। আমি প্রেসবক্সে ছিলাম, একজন আমাকে জিজ্ঞেস করল বাংলাদেশ কত রান করবে। আমি বলেছিলাম ৩০০ রানের আশা করছি আমি, কিন্তু ৪০০ ও হয়ে যেতে পারে। সে আমার দিকে খুব আশ্চর্য হয়ে তাকিয়েছিল, কিন্তু সত্যিই বাংলাদেশ ৪০০ করে ফেলার পর তার চেহারা কেমন হয়েছিল ভাবুন একবার!

অনেকেই বিশ্বাস করেন যে, প্রথম টেস্ট খেলার উত্তেজনা ছেলেমানুষীর কারণেই বাংলাদেশ দ্বিতীয় ইনিংসে মাত্র ৯১ রানে আটকে গিয়েছিল

ইমরান: আমি আত্মবিশ্বাসী ছিলাম, কারণ ভারতের বিপক্ষে আমাদের হারানোর কিছুই ছিল না। কিন্তু ৩য় দিনের দিনই যখন ভারত ৭ উইকেট হারিয়ে ফেলল, এবং আমাদের চেয়ে তখনো ৩৪ রান পেছনে ছিল, তখনই লোকজন জয়ের পরিকল্পনা করে ফেলতে লাগল। আমি সবসময় বলেছি আমাদের ড্রয়ের উদ্দেশ্যে ব্যাট করা উচিত ছিল। কিন্তু তারপরেই আমরা ৯১ রানে অলআউট হয়ে গেলাম। তাও আমি মনে করি ১ম ইনিংসে আমরা ভালো ব্যাটিং করেছিলাম।

কিন্তু বিশ্ব ক্রিকেটে যে বাংলাদেশের পদার্পণ ঘটেছে, মাঠে এবং মাঠের বাইরে সে বিষয়টি বাংলাদেশ খুব ভালভাবেই বুঝিয়ে দিতে পেরেছিল

আশরাফুল: খেলা চলাকালীন এক ইন্টারভিউতে টনি গ্রেগ আমাকে বাংলাদেশের ক্রিকেট দর্শন নিয়ে প্রশ্ন করেছিলেন। আমি তাঁকে বলেছিলাম, হাবিবুল বাশার আমাদের ক্রিকেট দর্শন। লাঞ্চের আগেই সে ৪৪ রানের একটা ঝড়ো ইনিংস খেলেছিল। তাই আমি গ্রেগকে বলেছিলাম, এটাই আমাদের দর্শন, মানুষকে আনন্দ দেয়া।

আমি কখনোই ভাবিনি আমার জীবদ্দশায় বাংলাদেশ টেস্ট কিংবা ওডিআই স্ট্যাটাস পাবে। কিন্তু এখন দেখুন, বাংলাদেশ শততম টেস্ট খেলতে নামছে! এটাই প্রমাণ করে, সঠিক লক্ষ্য থাকলে যেকোনো কিছুই অর্জন করা সম্ভব।

--------------------------

- When Bangladesh strode onto the Test stage শিরোনামে মূল লেখাটি ইএসপিএন ক্রিকইনফোতে লিখেছেন ক্রিকেট বিষয়ক গণমাধ্যমটির বাংলাদেশ প্রতিনিধি মোহাম্মদ ইশাম।

Category : অনুবাদ
Share on your Facebook
Share this post