এই সাকিবের দরকার কী?

আজাদ মজুমদার
ফেব্রুয়ারী ১২, ২০১৭
 সাকিব আল হাসান সাকিব আল হাসান

কে সেরা টেস্ট অলরাউন্ডার? রবিচন্দন অশ্বিন, নাকি সাকিব আল হাসান?

আর যার কাছেই করুন, বাংলাদেশি ফ্যানদের কাছে এই প্রশ্ন করতে যাবেন না অন্তত। অশ্বিন হয়তো দুজনের মধ্যে তুলনামূলক ভালো বোলার হতে পারেন, এই সময়ের অন্য যেকোনো বোলারের তুলনায় দলকে বেশি সংখ্যক ম্যাচও জেতাতে পারেন। কিন্তু বাংলাদেশি ফ্যানরা বলবেন, সাকিব দুজনের মধ্যে তুলনামূলক ভালো ব্যাটসম্যান এবং সে কারণে তিনিই সেরা অলরাউন্ডার। কিন্তু তথ্য-উপাত্ত আপনাকে অন্যকিছুই বলবে।

লোয়ার অর্ডারে ব্যাট করার পরেও সাকিবের যতগুলো টেস্ট সেঞ্চুরি আছে, অশ্বিনেরও ঠিক ততগুলোই আছে। সাকিবের ব্যাট যেভাবে বাংলাদেশকে সহায়তা করেছে, সাম্প্রতিক সময়ে অশ্বিনের ব্যাট খুব সম্ভবত তার চেয়েও বেশি সহায়তা করেছে ভারতকে। এবং এই জিনিসগুলোরই প্রতিফলন পড়েছে সাম্প্রতিক সময়ের র‌্যাংকিংয়ে সে কারণেই সাকিব নিজের ক্যারিয়ারের সেরা রেটিং পয়েন্ট পাওয়ার পরেও বেশ কিছু সময় ধরেই অশ্বিন টেস্টে আইসিসির সেরা অলরাউন্ডার।

একটা জিনিস অন্তত পরিষ্কার, বাংলাদেশের ব্যাটিং সাকিবকে ঘিরেই আবর্তিত হয়, ভারতীয় দলে যেই সুবিধাটা অশ্বিন কখনোই পাবেন না। সাকিব দলের সেরা ব্যাটসম্যান হওয়ার পরেও ভারতীয় দলের একজন লোয়ার অর্ডার ব্যাটসম্যানের সাথে তাঁর ব্যাটিংয়ের তুলনা করা হচ্ছে, এই জিনিসটাই বলে দেয় যে সাকিবের ব্যাটিংয়ে কিছু তো সমস্যা হচ্ছেই। সাকিবের স্কিল নিয়ে কোন সমস্যা নেই, তাঁর সীমাবদ্ধতা নিয়েও না। সমস্যা একটা বিষয় ঘিরেই, তাঁর মানসিকতা।

নিজের সম্পর্কে তিনি নিজে কি বিশ্বাস করেন, হায়দ্রাবাদ টেস্টের ৩য় দিন শেষে সাকিব নিজেই সে ব্যাপারে একটা ধারণা দিয়েছেন। তাঁর দলের ফলো অন এড়াতেই দরকার আরও ২৭২ রান, এমন সময় অশ্বিনের একটি বলে টার্নের বিপরীতে খেলতে গিয়ে নিজের উইকেটটা বিলিয়ে দিয়ে এসেছেন। এবং এমন ‘অপরাধ’ তিনি প্রথমবারের মত করেননি। চট্টগ্রামে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে তিনি এমনটা করেছেন, ওয়েলিংটনে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে করেছেন, এছাড়া অতীতে আরও বহুবার করেছেন। ২০১২ সালে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে খুলনা টেস্টে দিনের শেষ ওভারে ৯৭ রানে থাকা অবস্থায়ও তিনি এমনভাবে ‘আত্মহত্যা’ করেছেন।

বেশিরভাগ সময়েই ব্যাটিংয়ে তাঁর এমন আত্মাহুতি দলের পরাজয়ই ডেকে এনেছে। ব্যাট হাতে সাকিব বাংলাদেশকে যত ম্যাচ জিতিয়েছেন, তার চেয়ে বেশি ম্যাচ বাংলাদেশকে তাঁর হঠকারিতার জন্য হারতে হয়েছে কিনা, এটা রীতিমত একটা বিতর্কের বিষয় হয়ে গেছে এখন। এবং অপ্রিয় হলেও সত্য, সাকিব ভক্তদের কাছে তাঁকে সমর্থন করার মত যথেষ্ট পরিমাণ যুক্তি নেই। তারপরেও তারা বলতে পারেন, সাকিব এমনই, এটাই সাকিব। খেলার ধরণ বদলে ফেললে তিনি আর সাকিব আল হাসান থাকবেন না। প্রেস কনফারেন্সে এসে সাকিব নিজেও এমনটাই বলেছেন।

এখানেই চলে আসে আসল প্রশ্ন, বাংলাদেশের কি সত্যিই এই সাকিব আল হাসানকে প্রয়োজন?

এটা সত্যি যে সাকিবের চেয়ে ভালো অলরাউন্ডার বাংলাদেশের নেই। সাকিবের চেয়ে ভালো ব্যাটসম্যানও হয়তো তাদের নেই। সাকিব বোলিং দিয়ে দলে নিজেকে অপরিহার্য করে তুলেছেন। তাই কেবলমাত্র বোলার হিসেবে খেললেও দলে নিজের জায়গা সম্পর্কে সম্পূর্ণ নিশ্চিত থাকতে পারেন তিনি।

কিন্তু একজন পরিপূর্ণ অলরাউন্ডার হওয়ার মৌলিক সংজ্ঞাই হচ্ছে, তাঁকে শুধু বোলার কিংবা শুধু ব্যাটসম্যান দুইভাবেই দলে জায়গা করে নেয়ার মত দক্ষতা থাকতে হবে। এই মুহূর্তে বাংলাদেশ দলে ব্যাটসম্যান সাকিবের জায়গা কি অপূরণীয়?

খুব সম্ভবত না।

যে খেলোয়াড় ম্যাচের পরিস্থিতিকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে সবসময় নিজের মতই খেলে, দলে তাঁর জায়গা কতদিন অপরিহার্য থাকে? যে এক ইনিংসে ডাবল সেঞ্চুরি করে পরের ইনিংসেই দলকে বিপদে ফেলে দেয় এবং তার মাশুল গুনতে হয় দলকে, এমন খেলোয়াড় দলে থাকার সুবিধাটা কি? তার চেয়েও বড় কথা, যে ব্যাটসম্যান দলের প্রয়োজন থাকা সত্ত্বেও নিজেকে বদলানোর তাগিদ অনুভব করেনা, তেমন ব্যাটসম্যান দলে রাখার দরকার টা কি?

সাকিব আল হাসান যত ভালো মানের ব্যাটসম্যানই হোন না কেন, অন্তত বিরাট কোহলি বা এ.বি.ডি. ভিলিয়ার্সের মানের ব্যাটসম্যান নন। ডি ভিলিয়ার্স ৭৫ বলে যেমন টেস্ট সেঞ্চুরি করতে পারেন, তেমনি দলের প্রয়োজনে গিয়ার বদলে ২২০ বলে ৩৩ রানের ইনিংসও খেলতে পারেন। কোহলির মত আক্রমণাত্মক ব্যাটসম্যান টানা চার সিরিজে ডাবল সেঞ্চুরি করতে পারেন, মাত্র একটি ছয় মেরেই পারেন।

এবং এই দুজনকেই সাকিবের চেয়ে আক্রমণাত্মক ব্যাটসম্যান বলে মানা হয়। পরিস্থিতির দাবি মেনে তাঁরা দুজনেই নিজেদের খেলা বদলে ফেলতে পারেন। তাঁরা আজকে গ্লোবাল সুপারস্টার, কেননা তাঁরা তাদের দলের জন্য খেলেন। সাকিব এদের থেকে তো বটেই, এমনকি টেলএন্ডারদের থেকেও পিছিয়ে পরছেন, কেননা তিনি নিজের জন্য খেলছেন।

বাংলাদেশের কি আসলেই এই অলরাউন্ডারকে প্রয়োজন?

Who needs this Shakib? শিরোনামে লেখাটি ক্রিকউইজে প্রথম প্রকাশিত

Category : অনুবাদ
Share on your Facebook
Share this post