বাংলাদেশের জন্য ভালবাসা (কড়া নিরাপত্তাসহ)

সঞ্জয় পার্থ
জানুয়ারী ৭, ২০১৭
 যদি ক্যানবেরায় বেড়ে ওঠা এবং খেলা ও ফটোগ্রাফির প্রতি ভালোবাসা থাকা এক তরুণ সেখানে যেতে চায় তাহলে? যদি ক্যানবেরায় বেড়ে ওঠা এবং খেলা ও ফটোগ্রাফির প্রতি ভালোবাসা থাকা এক তরুণ সেখানে যেতে চায় তাহলে?

এক মুহূর্তের জন্য আমার মনে হয়েছিল আমি হয়তো অক্টোবরে বাংলাদেশ-ইংল্যান্ড টেস্ট সিরিজটা কাভার করতে যেতে পারব না। এজেন্সিগুলো একজন ফটোগ্রাফারকে এমন একটা জায়গায় পাঠাতে সাবধানতা অবলম্বন করছিল যেখানে প্রয়োজনীয় কোন কাজ ছাড়া ভ্রমণ করতে নিষেধ করেছিল বৈদেশিক অফিসগুলো। বাংলাদেশ ও ইংল্যান্ডের সেরা কিছু ক্রিকেটারের ছবি তোলাকে নিশ্চয়ই প্রয়োজনীয় কোন কাজ বলা যায় না! যায় কি?

কিন্তু যদি ক্যানবেরায় বেড়ে ওঠা এবং খেলা ও ফটোগ্রাফির প্রতি ভালোবাসা থাকা এক তরুণ সেখানে যেতে চায় তাহলে? যদি সে সফরের কিছু মুহূর্তকে ক্যামেরার ফ্রেমে বন্দী করার জন্যই সফরটাকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করে তাহলে? আর যদি লোকটা সামান্য পাগলাটে হয় তাহলে তো কোন কথাই নেই!  

নভেম্বর-ডিসেম্বরে ইংল্যান্ডের ভারত সফর কাভার করাটা যেহেতু কিছুটা অসম্ভবই মনে হচ্ছিল, আমি তাই বাংলাদেশ সফরে যাওয়ার জন্যই সাংবাদিক ভিসার আবেদন করলাম। কাজটা যতটা সহজ হওয়ার কথা ছিল ততটা সহজ অবশ্য হল না। বেশিরভাগ সময়টাই আমাকে মধ্য লন্ডনে বিভিন্ন ফর্ম ও ছবি ডেলিভারি করার কাজে ও হাই কমিশনের কম্পিউটারে অনলাইন ফর্ম পূরণ করার কাজে ব্যস্ত থাকতে হল। 

কাউন্টারে একজন বন্ধুবৎসল মানুষ আমার কাছ থেকে অফেরতযোগ্য ১০৩ ডলার জমা নিল। সফরের সময় দ্রুত ঘনিয়ে আসছিল। আমাকে বলা হল ২০ অক্টোবরের দিকে আমার ভিসা লন্ডনে তৈরি হয়ে যাবে। মনে মনে ভাবলাম, বাহ! বেশ ভালো তো! চট্টগ্রাম টেস্টও শুরু হচ্ছে ২০ অক্টোবরেই, যা কিনা কেনসিংটন অফিস থেকে মোটামুটি ৭০০০ কিলোমিটার দূরে!  

১৮ তারিখে আমি লন্ডন যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম এই আশায় যে হয়তো আমার ভিসা হয়ে গেছে। আমি আগেরবারের ওই কাউন্টারটাতেই গেলাম। লোকটা হয়তো আমাকে চিনতে পেরেছিল, কেননা আমাকে দেখা মাত্রই তার মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠেছিল। লোকটা আমাকে বলল আমার ভিসা তৈরি। আমার হাতে আমার ভিসা তো ছিল, কিন্তু চট্টগ্রাম টেস্টের টস হতে তখন আর মাত্র ৩৮ ঘণ্টা বাকি!

টিকেট বুকিং ও প্যাকিং শেষ করে যাত্রা শুরু করতে করতে দেখি আমার হাতে সময় আছে আর মাত্র ১৯ ঘণ্টা! দোহা হয়ে যাওয়া প্রথম ফ্লাইটটা বেশ ভালো ছিল। ইনফ্যাক্ট আমি একাই চার সীট দখল করে গিয়েছি, ইকোনমি ক্লাসের প্যাসেঞ্জার মাত্রই জানেন, এটা লটারি জেতার চেয়ে কোন অংশে কম নয়!

দোহা-ঢাকা ফ্লাইট টেক অফ করতেই ৩ ঘণ্টা দেরি করল। ফলে চট্টগ্রামের কানেকটিং ফ্লাইট ধরার সম্ভাবনা যে আরও ক্ষীণ হয়ে পরল সেটা বুঝতে কোন অসুবিধা হল না আমার।

ঢাকায় নেমে আরও প্রায় ১ ঘণ্টা অপেক্ষা করলাম আমার ব্যাগ আসার জন্য, এবং ততক্ষণে আমি মোটামুটি নিশ্চিত, ফ্লাইট মিস করতে যাচ্ছি আমি। আমি সর্বোচ্চ যেটা করতে পারতাম তা হল আভ্যন্তরীণ টার্মিনালের ভেতরে গিয়ে পরবর্তী ফ্লাইটের জন্য একটা টিকেট কিনে ফেলা। ৮.৪৫ এর দিকে (টেস্ট শুরু হতে তখন কেবল ৪৫ মিনিট বাকি) নভোডেস্কে গিয়ে একটা টিকেট কেনার চেষ্টা করলাম আমি। মনে মনে ভাবছিলাম কপাল ভালো হলে ১০ টার ফ্লাইটের টিকেট পেলেও পেতে পারি।

কিন্তু অবিশ্বাস্যভাবে কাউন্টারের লোকটি বলে উঠল, ‘আমরা আপনাকে ৯ টার ফ্লাইটের টিকেটই দিতে পারি।’ নিরাপত্তারক্ষীদের চেকিং এর পর কিছুক্ষণের মধ্যেই আমি একটি সুদৃশ্য উড়োজাহাজে চড়ে বসলাম। ওই একই ফ্লাইটে যাচ্ছিলেন ইসিবি’র মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা টম হ্যারিসন। টম আমাকে হোটেল অব্দি লিফট দেয়ার প্রস্তাবও দিলেন। এর কিছুক্ষণের মধ্যেই আমরা নিজেদের চট্টগ্রামের ব্যস্ত রাস্তায় বিশাল পুলিশি পাহারার মধ্যে চলমান দ্রুতগতির এক যানবাহনের মধ্যে আবিষ্কার করলাম।

টেস্ট ততক্ষণে শুরু হয়ে গেছে। মাঠে ইংল্যান্ডের অবস্থাও তখন খুব বেশি সুবিধার না, অল্প রানেই ওদের ৩ উইকেট চলে গিয়েছিল। হোটেলে পৌঁছার পর টম আমাকে বলল সে কিছুক্ষণের মধ্যেই মাঠে যাবে, এবং আমাকে তাঁর বহরে যোগদানের জন্যেও আমন্ত্রণ জানাল। প্রস্তাবটা নিঃসন্দেহে চমৎকার ছিল। লোকটাকে বেশ বন্ধুভাবাপন্ন সজ্জন ব্যক্তি বলেই মনে হল।

আরেকজন কঠোর পরিশ্রমী, বন্ধুবৎসল, প্রতিভাবান সাংবাদিক জর্জ ডোবেল তার সাথে রুম শেয়ার করার অফার দিল। তার চমৎকার ব্যবহারের জন্য তাকে পর্যাপ্ত ধন্যবাদ দেয়াও যথেষ্ট নয়। মিডিয়ার লোকেরা তো আমাদের ‘উদ্ভট জোড়ি’ বলেও ডাকতে শুরু করে দিল!

আমি টমের সাথেই মাঠে গেলাম। যেহেতু টম একজন ভিআইপি, আমাদের গাড়ি সোজাসুজি গেট দিয়ে ভেতরে ঢুকে গেল। আমার সমস্যাটা ছিল আমি একটা গুরুত্বপূর্ণ ক্রিকেট ম্যাচ কাভার করতে এসেছি, তার উপর কঠিন নিরাপত্তার মধ্যে, কিন্তু আমার কাছে কোন পাস ছিল না। গলায় ক্যামেরা ঝুলিয়ে আমি এমনভাবে গ্যালারিতে ঘুরতে লাগলাম যেন আমার ওখানেই থাকার কথা! হ্যাঁ আসলে আমার ওখানেই থাকার কথা, কিন্তু গলায় একটা যথাযথ পাস সহ, যেটা আমার কাছে ছিল না। চল্লিশ বা তার চেয়েও বেশি পুলিশ পেরিয়ে আমি সরাসরি মিডিয়া সেন্টারে গিয়ে ঢুকলাম। এতক্ষণ সব ঠিকঠাকই ছিল, কিন্তু সমস্যাটা হল যখন আমি দিনশেষে অপরাজিত ব্যাটসম্যানের ছবি তুলতে একেবারে কাছে চলে গেলাম। কিছু শ্যেনদৃষ্টি সম্পন্ন কর্মকর্তা খেয়াল করলেন আমার গলায় কোন পাস নেই। তিনি গর্জন করে উঠলেন, ‘আপনি এখানে থাকতে পারবেন না’। দিনের খেলা শেষ হয়ে গিয়েছিল বলে তেমন কোন সমস্যা হল না আর।

খেলোয়াড়েরা দ্রুতই একটা বৃহৎ আকৃতির বাসে করে মাঠ থেকে বেরিয়ে গেল এবং র‍্যাডিসন ব্লু হোটেলে ফেরত এল। আমি জর্জকে তার বৃহদাকার রাজকীয় বিছানা ছেড়ে দিয়ে এক কোনায় সোফাতে শুয়ে পরেই খুশি ছিলাম।

টেস্টটা অনেক জমজমাট ছিল, কিন্তু আমি আসলে মাঠ/হোটেলের এই ‘বন্দীদশা’ থেকে মুক্ত হয়ে ক্রিকেট খেলায় ব্যস্ত কিছু বাচ্চার ছবি তুলতে চাইছিলাম। আমি ইংল্যান্ড দলের নিরাপত্তা বিশ্লেষক রেগ ডিকাসনের সাথে আমার পরিকল্পনার বিষয়ে কথা বললাম। টেস্টের ৩য় দিন মাঠ থেকে ২০০ গজ দূরত্বের একটি স্কুল ভ্রমণে গিয়ে বেশ অবাক হয়ে গেলাম। আমি ভেবেছিলাম স্কুলের ভেতরে গিয়ে ছবি তুলে আনতে আমাকে বেশ বেগ পোহাতে হবে, কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে নিরাপত্তারক্ষীরা উঠে দাঁড়িয়ে আমাকে সালাম দিয়ে ভেতরে ঢুকতে দিল!

এর আগে ২০১১ সালে আমি একটা ছেলের ছবি তুলেছিলাম। হোটেল থেকে বিনা পুলিশি পাহারায় একটা গাড়ি নিয়ে আমি ওই ছেলেটাকে খুঁজতে বেরিয়ে গেলাম। কিন্তু তাকে খুঁজে পেলাম না। সত্যি বলতে শহরের আশেপাশের যে কয়টি ছবি তুলেছিলাম, তার বেশিরভাগই আবছা হয়েছিল।

পরেরদিন সকালে দুইজন পুলিশের পাহারায় আমি আবার চট্টগ্রাম শহরে ঘুরতে বেরোলাম। কিছু ছবি তুলেছিলাম, কিন্তু অসাধারণ কোন ছবি যে তুলেছিলাম তা না। এবার সময় ঢাকায় পা রাখার।

ঢাকা টেস্ট ৩ দিনেই শেষ হয়ে গেল, যার অর্থ আমি আরও অতিরিক্ত ২ দিন সময় পেলাম ছবি তোলার জন্য।

আমি ডিকাসনের কাছে বাইরে গিয়ে আরও কিছু ছবি তোলার পরিকল্পনা তুলে ধরলাম। ডিকাসন আমাকে সাথে একজন পুলিশ নিয়ে যেতে বলল। আমার নিরাপত্তার দায়িত্বে নিয়োজিত কর্মকর্তা আমাকে একটা গাড়িতে নিয়ে বসালো, যেখানে আগে থেকেই আরও ৫ জন পুলিশের পোশাক পরা পুলিশ বসে ছিল, যাদের মধ্যে ৩ জনের হাতে ছিল ভয়ংকর কিছু অস্ত্র। আমি পার্কে খেলারত কিছু বালকের ছবি তোলার জন্য ঘুরছিলাম, কিন্তু একদল পুলিশ সাথে ঘোরায় সেটা সম্ভবপর হল না।

পরের দিন আমি আবার ওই পার্কেই গেলাম, তবে এবার পুলিশ ছাড়া। জুয়েল খান নামের ১৬ বছরের একটি ছেলের দেখা পেলাম, যে কিনা অবলীলায় মিড উইকেট দিয়ে ছক্কা মেরেই যাচ্ছিল। যদি সে একটাও বল মিস-হিট করত, তাহলে আমার গায়ে লাগতে পারত। কিন্তু এরকম কিছু ছবি তোলার জন্য এটুকু রিস্ক নেয়াই যায়। কে জানে, ৪-৫ বছরের মধ্যে এই জুয়েল খানই বাংলাদেশের হয়ে খেলতে পারে!

বাংলাদেশে আমি চমৎকার কিছু সময় কাটিয়েছি। খুব সম্ভবত আমার জীবনের সেরা সফর ছিল এটা। আরেকবার সেখানে যেতে আমার দেরি সহ্য হচ্ছে না। ধন্যবাদ বাংলাদেশ। হয়তো এটা প্রয়োজনীয় কোন সফর ছিল না, কিন্তু অনুপ্রেরণাদায়ী ও অবিস্মরণীয় অবশ্যই ছিল।

___________

- মুল লেখাটি To Bangladesh with love (and tight security) শিরোনামে ইএসপিএন ক্রিকইনফোতে লিখেছেন ফিলিপ ব্রাউন। লেখান ইংল্যান্ড ভিত্তিক একজন অস্ট্রেলিয়ান ফ্রিল্যান্স ফটোগ্রাফার, তিনি এখন পর্যন্ত ২০০ টিরও বেশি টেস্ট ম্যাচের ছবি তুলেছেন।

Category : অনুবাদ
Share this post